খেলাপি ঋণের ৮৭ শতাংশই আদায় অযোগ্য

2

হামিদ বিশ্বাসঃ বিদায়ী বছরে ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৪ হাজার ৩৩১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে ৯ দশমিক ১ শতাংশ ঋণ মোটামুটি ভালো বা ‘সাব-স্ট্যান্ডার্ড’, ৪ দশমিক ১ শতাংশ সন্দেহজনক বা ‘ডাউটফুল’ এবং ৮৬ দশমিক ৮ শতাংশ মন্দ মানের খেলাপি বা ‘ব্যাড অ্যান্ড লস’। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ হিসাবে ‘ব্যাড অ্যান্ড লসকে’ আদায় অযোগ্য খেলাপি ঋণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্টে এসব তথ্য প্রকাশ পেয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বহুদিন থেকেই খেলাপি ঋণে হাবুডুবু খাচ্ছে ব্যাংকিং খাত। ব্যাংকার, পরিচালকদের অনিয়ম এবং দুর্নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ আমানতকারীরা। বেশকিছু ব্যাংক ও নন ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) আমানত ফেরত দিতে পারেনি- এমন ঘটনা নিকট অতীতে অনেক ঘটেছে। এনবিএফআইয়ের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এখনও তা প্রযোজ্য। এরপরও ঋণখেলাপিদের একের পর এক সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। খেলাপি ঋণের সংজ্ঞাও বারবার পাল্টানো হচ্ছে। তাদের মতে, ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর না হলে এ সমস্যার সমাধান হবে না।

জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ঋণখেলাপিদের ধরার পরিবর্তে ছাড় দেয়া হচ্ছে। আবার নতুন করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণখেলাপির সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এটা ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত। একটা সময় ঋণশৃঙ্খলায় চরম অবনতি ঘটতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী যায়, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ করেছে ১০ লাখ ১১ হাজার ৮২৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৯৪ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। এর আগে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। ২০১৯ সালের মার্চ শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকায়। একই বছরের জুন শেষে ১ লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা এবং সেপ্টেম্বর শেষে ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা ছিল খেলাপি ঋণের পরিমাণ। অথচ ২০১৯ সালের ডিসেম্বর শেষে এই ঋণের পরিমাণ ৯৪ হাজার ৩৩১ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের প্রথম ৯ মাসে (জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর) ২২ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ বাড়লেও শেষ তিন মাসেই (সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর) খেলাপি ঋণ কমেছে ২১ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা। কিন্তু এ সময় ঋণ আদায় ছিল খুবই সামান্য।

পর্যাপ্ত অঙ্কের ঋণ আদায় ছাড়া হঠাৎ খেলাপি ঋণ কমে যাওয়ার এই চিত্র কতটা গ্রহণযোগ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা বলছেন, দেশে প্রকৃত খেলাপি ঋণের অঙ্ক ৩ লাখ কোটি টাকার কম হবে না। খেলাপি ঋণ কমাতে সরকারের নির্দেশনায় খেলাপিদের নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে খেলাপির প্রকৃত চিত্র আড়াল হয়ে গেছে। বিশেষ করে গণছাড়ের আওতায় শীর্ষ ঋণখেলাপিরা পুনঃতফসিল করেছেন বলেই অঙ্কটি এত কম দেখাচ্ছে।

২০১৯ সালে সর্বোচ্চ ৫২ হাজার ৭৭০ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়। গত বছর ২ শতাংশ এককালীন টাকা জমা দিয়ে ১০ বছর মেয়াদে খেলাপি ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে সুদের হার ধরা হয় ৯ শতাংশ। এ সুযোগে অনেক খেলাপি গ্রাহক ঋণ নিয়মিত করে ফেলেন। এর আগে ২০১৮ সালে ২৩ হাজার ২১০ কোটি টাকা, ২০১৭ সালে ১৯ হাজার ১২০ কোটি টাকা, ২০১৬ সালে ১৫ হাজার ৪২০ কোটি টাকা এবং ২০১৫ সালে ১৯ হাজার ১৪০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়।

এ প্রসঙ্গে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ঋণ পুনঃতফসিলে নীতিমালা শিথিল করায় গত বছরে এত ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে। এসব ঋণ আবার খারাপ হয়ে পড়বে। তবে বড় দুশ্চিন্তা বর্তমান সময় নিয়ে। গত বছর সবচেয়ে বেশি পুনঃতফসিল করা হয় শিল্প খাতের খেলাপি ঋণ, যা মোট পুনঃতফসিল ঋণের ৩০ শতাংশ। এরপরই সাড়ে ১৮ শতাংশ ঋণ পুনঃতফসিল করে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাত। এছাড়া ১১ দশমিক ৭ শতাংশ ঋণ পুনঃতফসিল হয় বৈদেশিক বাণিজ্য খাতের।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, ব্যাংকগুলো সব বিচার-বিবেচনা করে ঋণ পুনঃতফসিল করে। এরপর প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নেয়। এর ফলে ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হয়।

ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, খেলাপি ঋণের ৬৩ দশমিক ৩ শতাংশ ১০ ব্যাংকের কাছে। আর পাঁচ ব্যাংকের কাছে খেলাপি ঋণের ৪৫ দশমিক ৮ শতাংশ।যুগান্তর