খালেদা জিয়ার সুস্থতা বিতর্ক

যুগবার্তা ডেস্কঃ কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সুস্থ আছেন, নাকি তিনি অসুস্থ—এ নিয়ে গত দুই দিনে জনমনে নানা বিভ্রান্তি ডালপালা ছড়িয়েছে। তবে সরকার-বিএনপি এবং কারা কর্তৃপক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যে গতকাল শুক্রবার খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরা কারাগারে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করেছে। অবশ্য গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেনি তারা। এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, অসুস্থতার কথা বলে খালেদা জিয়া কোর্ট অ্যাভয়েড করেছেন।

কারা অধিদপ্তরের চিকিৎসক ডা. মাহমুদুল হাসান গতকাল সন্ধ্যায় বলেন, ‘আমি ওনাকে নিয়মিত চেকআপ করি। তিনি সুস্থ আছেন। তাঁর রক্তচাপ ঠিক রয়েছে। আজ বিকেলেও (গতকাল শুক্রবার) তাঁর প্রেশার মাপা হয়েছে। প্রেশার নরমাল রয়েছে। ৮০ বাই ১২০ পাওয়া গেছে। তিনি কারাগারে আসার পর ৭০ বাই ১২০ ছিল। কখনো ৮০ বাই ১২০ রক্তচাপ পাওয়া গেছে। কখনো কখনো ৯০ বাই ১২০। আর কারাগারে আনার আগে থেকে তাঁর পায়ে সমস্যা রয়েছে। সেই সমস্যা আগের মতোই আছে। তাঁর শারীরিক অবস্থা আগের চেয়ে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কারা কর্মকর্তা জানান, বিএনপি চেয়ারপারসন সুস্থ আছেন। হাসপাতালে নেওয়ার মতো অসুস্থ হলে তাঁকে নেওয়া হতো বলে উল্লেখ করেন তিনি। ওই কর্মকর্তা অবশ্য জানান, গত ২৮ মার্চ একটি মামলায় তাঁকে আদালতে হাজির করার কথা ছিল। কিন্তু খালেদা জিয়া হাজিরা দিতে যেতে রাজি না হওয়ায় তাঁকে পাঠানো যায়নি। ফলে কারাগার থেকে আদালতকে জানানো হয়েছে যে তিনি অসুস্থ থাকায় পাঠানো যায়নি। তিনি আরো বলেন, ‘উনি সম্মানিত মানুষ। উনি যেতে না চাইলে জোর করে নেওয়া যায় কি?’

এদিকে পূর্বনির্ধারিত থাকার পরও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে কারাগারে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে না দেওয়ার ঘটনাসহ পুরো বিষয়টিকে বিএনপির হাইকমান্ড ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখছে। তাদের প্রথম সন্দেহ; বিএনপির রাজনৈতিক এজেন্ডা সরকার বাধাগ্রস্ত করতে চাইছে বলেই ফখরুলকে দেখা করতে দেওয়া হয়নি।

আবার আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ মনে করেন, বিএনপির এ ধরনের অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। তিনি বলেন, ‘আমাদের সাধারণ সম্পাদক স্পষ্ট করে বলেছেন, চিকিৎসকরা পরামর্শ দিলে বিএনপি চেয়ারপারসনকে চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনে বিদেশে পাঠানো হবে। এখানে ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ তারা কেন খোঁজে তা স্পষ্ট নয়। আসলে ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়েই বিএনপির প্রতিষ্ঠা, ফলে সব কিছুতে দলটি ষড়যন্ত্র খুঁজবে এটিই স্বাভাবিক। ’

একটি সূত্রের দাবি, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের বাইরে তৃতীয় ধারার কয়েকটি দলের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের সিদ্ধান্তের বিষয়ে খালেদা জিয়ার মতামত নেওয়াসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক এজেন্ডা নিয়ে তাঁর সঙ্গে আলোচনার কথা ছিল মির্জা ফখরুলের। বিএনপির দ্বিতীয় সন্দেহ, অসুস্থতার নামে খালেদা জিয়াকে চাপ দিয়ে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য সরকার চক্রান্ত করছে। তৃতীয়ত, বিএনপির ভেতর নানা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে দলটিকে দুর্বল করতে চাইছে সরকার। এমনকি খালেদার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে প্রয়োজনে বিএনপিকে ভেঙে ফেলার ষড়যন্ত্র রয়েছে বলেও মনে করেন দলটির স্থায়ী কমিটির নেতারা।

গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সুচিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর দাবি তুলেছেন। সুস্পষ্ট প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের দিয়ে অবিলম্বে তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং তাঁদের সুপারিশ অনুযায়ী পরবর্তী চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। ’ ফখরুল বলেন, ‘এ জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা হচ্ছে, অবিলম্বে খালেদা জিয়ার প্রাপ্য জামিন ও তাঁকে মুক্তি দিয়ে তাঁর চিকিৎসার জন্য বাইরে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। ’

এদিকে ফখরুলের এই বক্তব্যের পরপরই আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর সভা শেষে দেওয়া ব্রিফিংয়ে দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘চিকিৎসকরা পরামর্শ দিলে খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানো হবে। ’

সূত্র জানায়, দুই মহাসচিবের এমন বক্তব্যের পর ‘খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানো হচ্ছে’ এমন গুঞ্জন নতুন মাত্রা পায়। বিশেষ করে ফখরুলবিরোধিরা ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ নিয়ে মাঠে নামে এবং জোর গুঞ্জন ছাড়ায় যে ওই বক্তব্যের নেপথ্যে কোনো ষড়যন্ত্র রয়েছে।

তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল জানান, বিষয়টি সংবাদ সম্মেলনেই সংশোধন করা হয়েছে। আমি বলেছি, সবার আগে বিএনপি চেয়ারপারসনকে মুক্তি দিতে হবে। এরপর উনি নিজে চিকিৎসকদের সঙ্গে পরামর্শ করে দেশে নাকি বিদেশে চিকিৎসা করাবেন, সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। এ বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

বিএনপির প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে অবশ্য খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর দাবি সরাসরি ছিল না। এতে বলা হয়েছে, ‘বিভিন্ন সময় দেশনেত্রী উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে চিকিৎসা করিয়েছেন, তাঁর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানাচ্ছি। ’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীও জানান, বিষয়টি সংবাদ সম্মেলনে বসেই সংশোধন করে দেওয়া হয়েছে।

খালেদা জিয়ার অসুস্থতা সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান গতকাল রাতে বলেন, ‘আমি খবর নিয়ে যেটুকু জানতে পেরেছি, খালেদা জিয়া সুস্থ আছেন। আদালতে যাওয়ার দিন অসুস্থতার কথা বলে তিনি কোর্ট অ্যাভয়েড করেছেন। ’ খালেদা জিয়ার শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে সরকার ষড়যন্ত্র করছে বলে বিএনপি নেতারা যে অভিযোগ করেছেন সেই সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তাঁদের এ বক্তব্য সঠিক নয়। ’

স্থায়ী কমিটির অন্তত চারজন সদস্য বলেন, সরকারের মূল টার্গেট, বিএনপির মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা। যে কারণে ফখরুলকে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। জেল কর্তৃপক্ষ হঠাৎ ফোন করে জানিয়েছে বিএনপি চেয়ারপারসন অসুস্থ, দেখা হবে না।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মির্জা ফখরুলকে কারা কর্তৃপক্ষের এই বার্তা পৌঁছেছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের একান্ত সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার। সরকারসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সাক্ষাত্সূচি বা যোগাযোগ তিনিই করে থাকেন।

আবদুস সাত্তার বলেন, জেল কর্তৃপক্ষ থেকে একজন কর্মকর্তা তাঁর কাছে এমন বার্তা দিয়েছেন। ফলে এখানে বিএনপি বা দলটির মহাসচিবের কিছুই করার নেই। এক প্রশ্নের জবাবে তিনিও বলেন, বিষয়টি নিয়ে মাঝখানে কিছু লোক বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন সুস্থ না অসুস্থ, সে বিষয়ে আমাদের কাছে তথ্য নেই। ’ তিনি বলেন, ‘আমরা তাঁর সুচিকিৎসা চাই। কিন্তু পুরো বিষয়টিতে কেন যেন ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। তাঁকে আটকে রেখে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে বলে মনে হয়। ’ তবে কোনো ষড়যন্ত্রে কাজ হবে না বলেও মন্তব্য করেন দলটির অন্যতম এই নীতিনির্ধারক।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মতে, পুরো বিষয়টিকে যেভাবে সরকার হ্যান্ডল করছে তাতে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। পর্দার আড়ালে নানা খেলাধুলা চলছে বলে বাজারে গুঞ্জন রয়েছে। সরকারকে এসব স্পষ্ট করতে হবে। তিনি বলেন, ‘প্রথমবার সরকার আমাদের পুরো স্থায়ী কমিটিকে সাক্ষাতের অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু পরে অসুস্থতার কথা বলে আমার সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়টি বাতিল করা হলো। সেটি সরকার করতে পারে। কিন্তু ‘ষড়যন্ত্র’ চলছে, এটি আমরা আগেও বলেছি। ’

স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর মতে, সরকার নানাভাবে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে। এর আগেও তারা বিএনপিতে নানা বিভ্রান্তি তৈরি করে ব্যর্থ হয়েছে। সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েই মহাসচিব হিসেবে ফখরুল সাহেবকে কারাগারে চেয়ারপারসনের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার কথা বলা হয়েছিল। এ নিয়ে বিভ্রান্তির কোনো সুযোগ নেই।

কারা কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে গত ৭ মার্চ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সাতজন নেতা কারাগারে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেন। দেড় ঘণ্টার ওই সাক্ষাৎ কার্যত বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে পরিণত হয়। কিন্তু সব নেতার উপস্থিতিতে নীতিনির্ধারণী বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক সময় সম্ভব হয় না। ফলে গত মঙ্গলবার দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক করে সার্বিক বিষয়ে আলোচনার জন্য ফখরুলকে দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং সে অনুযায়ী ফখরুলের সাক্ষাতের জন্য সময়ও নির্ধারণ হয় বিকেল ৩টায়। তবে শেষ পর্যন্ত খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে পারেননি ফখরুল। জেল কোড অনুযায়ী খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্য, চিকিৎসক এবং তাঁর আইনজীবীরা কারাগারে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে পারবেন। এর বাইরে অন্য কেউ দেখা করতে চাইলে সে ক্ষেত্রে সরকার বা জেল কর্তৃপক্ষের অনুমতির প্রয়োজন হবে।

খালেদা জিয়ার ভাই শামীম এস্কান্দারের স্ত্রী কানিজ ফাতেমা ও তাঁর এক ছেলে এবং আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান ও তাঁর মেয়ে গতকাল কারাগারে খালেদা জিয়াকে দেখতে যান।-কালেরকন্ঠ