খালেদার মুক্তি তফসিলের আগেই চায় বিএনপি

20

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং ‘নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার’সহ সাত দফা দাবির বাস্তবায়ন চায় বিএনপি। গতকাল রবিবার বিকেলে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভা থেকে এসব দাবি জানানোর পাশাপাশি দলটির পক্ষ থেকে ১২টি লক্ষ্যও ঘোষণা করা হয়েছে।

এ ছাড়া অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে দুদিন জেলা ও বিভাগীয় শহরে সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। আর দাবি মানা না হলে ধীরে ধীরে আন্দোলনের কর্মসূচি বাড়ানো হবে বলেও ঘোষণা দেওয়া হয়। রাজপথ ছাড়া নেত্রীর মুক্তি সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন বক্তারা।
এত দিন সভা-সমাবেশে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকার দাবি করে এলেও বিএনপি এবার তা থেকে সরে এসেছে। জনসভা থেকে যে সাত দফা ঘোষণা করা হয়েছে তাতে ‘নির্দলীয়’ সরকারের দাবি নেই। এমনকি জনসভার ব্যানারেও ‘নির্দলীয়’ শব্দটির উল্লেখ ছিল না।

সভাপতির বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমাদের একজন আইনজীবী কারাগারে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। দেশনেত্রী খুব অসুস্থ। কিন্তু তাঁকে সেই অসুস্থতা পরাজিত করতে পারেনি।

তাঁকে দুর্বল করতে পারেনি। সেই অসুস্থতা নিয়েই তিনি আমাদের জানিয়েছেন, দেশবাসীকে জানিয়েছেন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য তিনি যেকোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত আছেন। দেশনেত্রী বলেছেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই যে দানব ফ্যাসিস্ট সরকার আমাদের বুকের ওপরে চেপে বসে আছে তাকে সরাতে হবে। ’
বিএনপির মহাসচিব আরো বলেন, ‘এই সরকার দেশকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এই জাতিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। সকল প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দিয়েছে। জনগণকে সরকারের প্রতিপক্ষ বানিয়ে নির্যাতন-নিপীড়ন করছে। বহু মানুষকে তারা গুম করছে। ’ তিনি বলেন, শুধু ১ সেপ্টেম্বর থেকে আজ পর্যন্ত চার হাজার ৯৪টি মামলা দেওয়া হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে চার হাজার ৩১৯ জনকে। আসামি করা হয়েছে জ্ঞাত-অজ্ঞাত দুই লাখ ৭২ হাজার ৭৩০ জনকে। এসব গায়েবি মামলা।

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘পুলিশ কর্মকর্তারা একবারও চিন্তা করছেন না এই সব মামলা যে দিচ্ছেন ভবিষ্যতে কী হবে! যখন তদন্ত হবে তখন দেখা যাবে এই মামলাগুলোর কোনো ভিত্তি নেই, বানোয়াট মামলা। তখন সবাইকেই জবাবদিহি করতে হবে। তখন সবাইকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। এই সরকার রেহাই পাবে না। ’

ফখরুল বলেন, ‘সরকার কয়লাকে ধুলো, সোনাকে তামা বানিয়েছে। ব্যাংক থেকে টাকা লুট করে নিয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক খালি করে দিয়েছে। পাঁচ বছর, দশ বছর চুরি করেছে, এখন আরো করতে চায়। ’ তিনি বলেন, “আমাদের দেশকে ও জনগণকে রক্ষা করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আওয়ামী লীগ ভয় পেয়েছে। মারাত্মকভাবে ভয় পেয়েছে। এত ভয় পেয়েছে এখন মামলা করা ছাড়া আর কোনো উপয় নেই। সব জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছে আর বিএনপির ষড়যন্ত্রের ভূত দেখছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। রাতের বেলায় দুঃস্বপ্ন দেখে মানুষ। আওয়ামী লীগ স্বপ্ন দেখে ‘বিএনপি বিএনপি’ বলে চিৎকার করে ওঠে। এরা স্বপ্ন দেখে ‘খালেদা জিয়া, তারেক রহমান’ বলে চিৎকার করে উঠে ভয়ে। ” তিনি বলেন, ‘এই দেশের প্রতিটি মানুষ এখন খালেদা জিয়া হচ্ছে। প্রতিটি মানুষ এখন তারেক রহমানে পরিণত হচ্ছে। বাংলাদেশকে জনগণ ভয়াবহ ফ্যাসিষ্ট সরকারের থাবা থেকে মুক্ত করে আনবেই। ’

ফখরুল বলেন, ‘ব্যবসায়ীরাও আজ অস্থির হয়ে গেছে। কর দিতে দিতে আর চাঁদা দিতে দিতে তাদের অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। তারা আর বাঁচতে পারছে না। এই করের টাকা নিয়ে সরকার তা লুট করছে। পদ্মা সেতু বানাচ্ছে। ১০ হাজার কোটি টাকার বদলে এখন ব্যয় তিন গুণ বাড়িয়েছে। প্রতিটি মেগা প্রজেক্টে তারা চার গুণ ব্যয় বাড়িয়ে তা লুট করছে। এই লুটপাট বন্ধ করুন। ’

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা প্রসঙ্গে ফখরুল বলেন, ‘এই মামলায় সম্পূর্ণ মিথ্যাভাবে তারেক রহমানকে জড়ানো হয়েছে। এই মামলার রায় ১০ অক্টোবর দেবে বলেছে। এই মামলা সম্পূর্ণ সাজানো মামলা। তিনবার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করে প্রধান সাক্ষী মুফতি হান্নানকে ২০০ দিন নির্যাতন করে তার কাছ থেকে মিথ্যা জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। তাকে ফাঁসি দিয়ে এই মামলাকে শেষ করে দেওয়া হয়েছে। ৬২ জন সাক্ষী শেষ হওয়ার পর তৃতীয়ারের মতো আওয়ামী লীগের একজন নেতাকে ধরে নিয়ে এসে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়ে তারপর নতুন করে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। এই মামলার শুনানিকে আমরা কখনোই গ্রহণ করতে পারি না। ’

জনসভায় যোগ দেওয়ার পথে বিভিন্ন স্থানে বাধা এবং নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের তীব্র নিন্দা জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘অবিলম্বে গ্রেপ্তার হওয়া নেতাকর্মীদের নিঃশর্ত মুক্তি দিন। নইলে দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে। ’

দুই দিনের কর্মসূচি : জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই সাত দফা দাবিতে আন্দোলনের দুই দিনের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা দিয়েছেন ফখরুল। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে আগামী ৩ অক্টোবর জেলা শহরে সমাবেশ ও জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি প্রদান এবং ৪ অক্টোবর বিভাগীয় শহরে সমাবেশ ও বিভাগীয় কমিশনারের কাছে স্মারকলিপি প্রদান।

ফখরুল বলেন, ‘আমরা সাত দফা যে দাবি দিলাম এ দাবিতে এই কর্মসূচি দিচ্ছি। এরপর পর্যায়ক্রমে আমরা আন্দোলনকে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে যাব। ইনশাআল্লাহ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা এই সরকারকে বাধ্য করব দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে এবং তারেক রহমানকে ফিরিয়ে আনতে এবং আমাদের যেসব নেতাকর্মী বন্দি রয়েছে তাদের মুক্তি দিতে। নইলে আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা হবে এবং এই সরকারের পতন ঘটানো হবে। ’

ফখরুল দলের সাত দফা দাবি ও ১২ দফা লক্ষ্য ঘোষণা করেন।

সাত দফা দাবি : বিএনপির সাত দফা দাবি হলো—১. একাদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই খালেদা জিয়ার মুক্তি ও তাঁর সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, তারেক রহমানসহ সব বন্দির মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার; ২. জাতীয় সংসদ বাতিল করা; ৩. সরকারের পদত্যাগ এবং সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে নির্বাচকালীন নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠা; ৪. প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ সশস্ত্র বাহিনী নিয়োগ নিশ্চিত করা; ৫. নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার বিধান নিশ্চিত করা; ৬. নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং সুষ্ঠু নির্বাচন প্রক্রিয়ার পর্যবেক্ষণে তাদের ওপর কোনো প্রকার বিধি-নিষেধ আরোপ না করা; ৭. নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করা; দেশের সব বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীর মুক্তি, সাজা বাতিল ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার; নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার তারিখ থেকে নির্বাচনের ফলাফল চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত চলমান সব রাজনৈতিক মামলা স্থগিত রাখা ও নতুন কোনো ধরনের মামলা না দেওয়ার নিশ্চয়তা, পুরনো মামলায় কাউকে গ্রেপ্তার না করার নিশ্চয়তা এবং কোটা সংস্কার আন্দোলন ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, সাংবাদিকদের আন্দোলন, সামাজিক গণমাধ্যমের স্বাধীন মত প্রকাশের অভিযোগে ছাত্র-ছাত্রী ও সাংবাদিকসহ সবার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার এবং গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তির নিশ্চিয়তা দেওয়া।

১২ লক্ষ্য : সমাবেশে দলের ১২টি লক্ষ্য তুলে ধরেন বিএনপির মহাসচিব। তিনি বলেন, ‘আমরা যদি জনগণের ভোটে সরকার গঠন করতে পারি তাহলে রাষ্ট্রের সর্বস্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে একটি ন্যায়ভিত্তিক কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠন করা হচ্ছে আমাদের লক্ষ্য। ’ অন্যান্য লক্ষ্য হলো সব প্রতিহিংসার রাজনীতির অবসানে জাতীয় ঐকমত্য গঠন; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দলীয়করণের ধারার বদলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা; রাষ্ট্রক্ষমতায় গ্রহণযোগ্য ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা; স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচারক নিয়োগ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ক্ষমতা নিশ্চিত করা; সশস্ত্র বাহিনীকে আরো আধুনিক, শক্তিশালী ও কার্যকর করা; গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা; দুর্নীতি প্রতিরোধে দায়িত্বরত প্রতিষ্ঠানগুলোর যথাযথভাবে সংস্কার; সব নাগরিকের মৌলিক মানবাধিকারের নিশ্চয়তা বিধান; সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়—এ মূলনীতি অনুসরণ করে জাতীয় মর্যাদা ও স্বার্থ সংরক্ষণ করে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ; প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক সৎ প্রতিবেশীসুলভ বন্ধুত্ব ও সমতার ভিত্তিতে ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ, বিনিয়োগ ইত্যাদি ক্ষেত্রে আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার কার্যকর উদ্যোগ ও পদক্ষেপ গ্রহণ; কোনো ধরনের সন্ত্রাসবাদকে মদদ না দেওয়া এবং কোনো জঙ্গিগোষ্ঠীকে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না দেওয়া; সর্বনিম্ন আয়ের নাগরিকদের মানবিক জীবন নিশ্চিত করে, আয়ের বৈষম্যের অবসানকল্পে অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ, শ্রমজীবী জনগণের জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, সারা দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিশ্চিত করা এবং স্নাতক ও সমমান পর্যন্ত শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা।

জনসমুদ্র সোহরাওয়ার্দী উদ্যান : সরেজমিন দেখা যায়, মঞ্চের সামনে ৩০ ফুট জায়গায় বেষ্টনী ছিল। উদ্যানের চারপাশে টাঙানো ছিল ১০০ মাইক। শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদলের কর্মীদের নিয়ে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী করা হয়েছে। মাঠের বিভিন্ন অংশে গ্রেপ্তার নেতাদের মুক্তির দাবিতে তাদের ছবিসংবলিত ব্যানার টানানো ছিল। জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ছবিও ছিল এসব ব্যানারে। দুপুর ২টায় জনসভা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে নেতাকর্মীরা উদ্যানে আসা শুরু করেন সকাল ১০টা থেকেই। দুপুর ১টা পর্যন্ত সভামঞ্চে দেশাত্মবোধক ও দলীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিতে লেখা গানও ছিল তার মধ্যে। দুপুর ২টার আগেই সমাবেশস্থল জনসমুদ্রের রূপ পায়। ৩টার মধ্যেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও এর চারপাশ পূর্ণ হয়ে যায়। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের মূল ফটকের সামনে, মৎস্যভবন থেকে শাহবাগ পর্যন্ত সড়কেও জনস্রোত দেখা যায়।

কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে সভার কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর প্রথমে বক্তব্য দেন ছাত্রদল সভাপতি রাজীব আহসান। সন্ধ্যায় মাগরিবের নামাজের আগ মুহূর্তে সমাবেশ শেষ হয়।

জনসভা উপলক্ষে সকাল থেকে পুলিশ, র‌্যাবসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক সংখ্যক সদস্য মোতায়েন ছিল। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন প্রাঙ্গণে জলকামান, প্রিজন ভ্যান রাখা ছিল।

গ্রেপ্তার : জনসভা চলাকালীন রাজধানীর কয়েকটি এলাকা থেকে কয়েকজনকে আটক করে পুলিশ। শাহবাগের কাছ থেকেও আটক করা হয় কয়েক যুবককে। সমাবেশে বক্তারাও এ অভিযোগ করেন।

‘প্রধান অতিথি খালেদা জিয়া’ : মঞ্চের পেছনে ব্যানারে প্রধান অতিথি হিসেবে নাম রাখা হয় বিএনপির চেয়ারপারসন কারাবন্দি খালেদা জিয়ার। মঞ্চে খালেদা জিয়ার জন্য একটি চেয়ারও রাখা ছিল। বিষয়টির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে জনসভা থেকে দলের প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, ‘প্রতীক হিসেবে দেশনেত্রীর নাম প্রধান অতিথি হিসেবে লেখা হয়েছে। তিনি এখন কারাবন্দি। আমরা তাঁর মুক্তি চাই। ’

প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্যে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘গায়ের জোরে আপনারা ক্ষমতায় আছেন, আন্তর্জাতিক স্বীকৃত স্বৈরাচার। এ দেশের মানুষ এই সরকারের হাত থেকে মুক্তি চায়। একাদশ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করতে আজ জাতি ঐক্যবদ্ধ। তাই এখনো সময় আছে। আমাদের দাবি মেনে নিন। তফসিল ঘোষণার আগে পদত্যাগ করুন। সংসদ ভেঙে দিন। নির্বাচনে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ সেনাবাহিনী মোতায়েনের ব্যবস্থা করুন। সব দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করুন। ’ বিএনপির এই নেতা বলেন, এই দেশে খালেদা জিয়াকে ছাড়া, বিএনপিকে ছাড়া কোনো অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে পারে না। জনগণ হতে দেবে না।

বিএনপির জনসভার অনুমতি প্রসঙ্গ তুলে ধরে খন্দকার মোশাররফ বলেন, ‘আপনারা জনসভা করেন অনুমতি নিতে হয় না। আর আমরা জনসভা করতে চাইলে নাশকতা বিশৃঙ্খলার কথা বলা হয়। দেখে যান আমরা শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করছি। কোথায় বিশৃঙ্খলা দেখছেন? কোথায় নাশকতা দেখছেন?’ তিনি বলেন, ‘আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমেই আমাদের দেশনেত্রীকে কারাগার থেকে মুক্ত করতে হবে। ’

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কঠোর সমালোচনা করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘এটা বাক্স্বাধীনতার ওপর চরম আঘাত। এ আইনের ৩১, ৩২, ৪৩ ধারা আরো ভয়ংকর। নির্বাচনের আগে এই আইন পাস করা হয়েছে, যাতে সরকারের অপকর্মগুলো প্রকাশিত না হয়। আমরা ক্ষমতায় গেলে সাত দিনের মধ্যেই এই আইন বাতিল করব। এই আইনে পুলিশকে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে তা রক্ষীবাহিনীকেও দেওয়া হয়নি। পুলিশ ইচ্ছা করলে যে কাউকে যেকোনো মুহূর্তে গ্রেপ্তার করতে পারে কোনো পরোয়ানা ছাড়াই। ঘরে ঢুকে কম্পিউটারের ডিভাইস খুলে নিলেও কারো কোনো অনুমতি নিতে হবে না। ’

মওদুদ বলেন, ‘জীবনে কোনো দিন দেখি নাই, ঘটনা ঘটে নাই; কিন্তু মামলা হয়। গত ১০ দিনে পাঁচ শতাধিক মামলা হয়েছে। এ পর্যন্ত বিএনপির দুই লক্ষাধিক নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। আমাদের কোনো যুবক রাতে বাড়িতে থাকতে পারে না। এ অবস্থা চলতে পারে না। ২৪ ঘণ্টার নোটিশে জনসভার অনুমতি দিয়েছে। যদি ৭২ ঘণ্টা সময় পেতাম তাহলে ঢাকা শহরে কোনো রাস্তা শূন্য থাকত না। ২৪ ঘণ্টার নোটিশে এ জনসমুদ্র একটাই ইঙ্গিত করে, এই সরকারের পতনের সময় হয়ে গেছে। অনুমতি ছাড়াই আমরা আমাদের কর্মসূচি পালন করব। ভবিষ্যতে আমাদের কর্মসূচি পালন করব। রাজপথ ছাড়া সারা দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ। এক দিনের জন্য আপনারা যদি মাঠে নামেন এই সরকারের পতন হবে। সময় আসছে। সমস্ত জাতি আজ ঐক্যবদ্ধ। সব দল-মত-নির্বিশেষে মানুষ এই সরকারের পতন চায়। ’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বলেন, ‘আজ থেকে আন্দোলন-সংগ্রাম শুরু হয়েছে। এটা শেষ হবে সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে। ’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্য সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া বলেন, ‘আপনারা রাস্তায় নামুন। বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি হবেই হবে। ’

দলের স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ড. আব্দুুল মঈন খান বলেন, ‘জনগণের দাবি উপেক্ষা করে অতীতে পৃথিবীর কোনো স্বৈরশাসক টিকে থাকতে

পারেনি, ভবিষ্যতেও পারবে না। আমরা বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য করে আওয়ামী লীগকে একঘরে করে ফেলব। ’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, ‘সরকার জাতীয় ঐক্য ভাঙতে শুরু থেকেই চেষ্টা করছে। এখন জাতীয় ঐক্য হলে ভালো, না হলে ক্ষতি নেই। বিএনপিকেই আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। ’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্য সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘রাস্তায় যারাই থাকবে, তাদের সঙ্গেই ঐক্য হবে। রাজপথে যদি শয়তানও থাকে, তার সঙ্গে ঐক্যের জন্য প্রস্তুত বিএনপি। ’

দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমরা রাজপথে নামলে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করবেন। দেশে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে। সেই নির্বাচনের মাধ্যমে খালেদা জিয়া আবারও প্রধানমন্ত্রী হবেন। ’

শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি ও আব্দুস সালাম আজাদের পরিচালনায় জনসভায় আরো বক্তব্য দেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুুল্লাহ আল নোমান, মেজর জেনারেল (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহম্মদ, সেলিমা রহমান, বরকতউল্লা বুলু, মোহাম্মদ শাহজাহান, খন্দকার মাহবুব হোসেন, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, শামসুজ্জামান দুদু, জয়নাল আবেদীন, নিতাই রায় চৌধুরী, শওকত মাহমুদ, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আমানউল্লাহ আমান, জয়নুল আবদিন ফারুক, ফজলুর রহমান, হাবিবুর রহমান হাবিব, আতাউর রহমান ঢালী, যুগ্ম মহাসচিব মাহবুব উদ্দিন খোকন, মজিবর রহমান সরোয়ার, মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, খায়রুল কবীর খোকন, সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, আসাদুল হাবিব দুলু, মাহবুবে রহমান শামীম, সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, বিলকিস জাহান শিরিন, শামা ওবায়েদ, বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক আলহাজ সালাহউদ্দিন আহমেদ প্রমুখ।-কালেরকন্ঠ