খাদ্যাভাবে জবিয়ানরা

অন্তু আহমেদঃ প্রতিষ্ঠার এক যুগ পার হলেও অভাব ও দূর্ভোগ যেন পিছু ছাড়ছে না জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) শিক্ষার্থীদের। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা অনুভব করতে থাকে একের পর এক সমস্যা। হল নেই, ক্লাসরুম সংকট, একমাত্র ক্যান্টিন সেখানেও পঁচা-বাসি খাবার।

ক্যান্টিনে নিম্নমানের খাবারের উচ্চ মূল্য যেন শিক্ষার্থীদের জীবনকে বিষাক্ত করে তুলেছে। ভর্তুকির অভাবে গলাকাটা দামে বিক্রি করা হচ্ছে জবির ক্যান্টিনের নিম্নমানের খাবার। এতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় শিক্ষার্থীদের।

প্রায় ২৮ হাজার শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়টিতে মোট তিনটি ক্যান্টিন থাকলেও খোলা থাকে একটি । অবকাশ ভবনে অবস্থিত ক্যান্টিনটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালীন এবং কলা অনুষদে অবস্থিত রেভেনাস প্লাস ক্যান্টিন (সম্পূর্ণরূপে বেসরকারি) ও বিজনেজ স্টাডিজ ভবনে শিক্ষক লাউঞ্জের সামনে অবস্থিত টিচার্স ক্যাফে (যা এখন বন্ধ)।

কেন্দ্রীয় ক্যান্টিনের অবস্থা:
অবকাশ ভবনে অবস্থিত কেন্দ্রীয় ক্যান্টিনে সকালের নাস্তায় আধা সিদ্ধ পরটা, ডাল/ভাজি (কখনো থাকে কখনো থাকে না), ছোট ছোট সিংগারা (ভেতরে সবজি কখনো কখনো পচাঁ পাওয়া যায়), এর সঙ্গে পাতলা সস এই হল জবি ক্যান্টিনের সকালের নাস্তা। আর দুপুরের খাবার মানেই শুধু খিচুড়ি আর তেহারী। খিচুড়ির দাম ৩০ টাকা, পরোটার দাম ৫ টাকা, তেহারী ৪০ টাকা যা খুবই নিম্নমানের। যা বাহিরের দামের থেকে বেশিও বলা যায়।কারন পাশের রেস্তোরাতেও ৪৫টাকায় মুরগীর বিরিয়ানি পাওয়া যায় যা কিনা মানে জবি ক্যান্টিন থেকে উন্নত।
ক্যান্টিনে শুধু খাবার মানের সমস্যা তা নয়, সমস্যা রয়েছে বসার জায়গারও। যখন শিক্ষার্থীরা এক সাথে খাবার খেতে চান বিশেষ করে সকাল ৯ টা এবং দুপুর ১২ টায় তখন আসনের অভাবে সেখানে খাবার নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় বেশিরভাগ শিক্ষার্থীদের। ক্যান্টিনের মধ্যে বসে খাওয়ার জন্য কয়েকটি টেবিল থাকলেও নেই পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা। গোনা কয়েকটি বেঞ্চ ও কয়েকটি ভাঙ্গা চেয়ার।

ক্যান্টিনের পাশেই রয়েছে একটি শৌচাগার। যেটা দীর্ঘদিন ধরেই সংস্কার ও পরিষ্কার করা হয় না। ফলে সেখান থেকে বের হয় মারাত্মক দুর্গন্ধ। যে দুর্গন্ধ ক্যান্টিনের ভেতর পর্যন্ত পৌঁছায়। এটাও ক্যান্টিন বিমুখতার অন্যতম কারণ।

বরাবরের মত নিরব প্রশাসন:
ক্যান্টিনের অভিযোগ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তেমন কোনো চিন্তা নেই বললেই চলে। ক্যান্টিনে কোন ভর্তুকি দেয় না বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
জানা যায়, ক্যান্টিনের ব্যবহারকৃত গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল ছাড়া আর কোন ভূর্তকি বা সুবিধা দেয়া হয়না বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ফলে শিক্ষার্থীদের টাকায় চলে জবির ক্যান্টিন। উচ্চমূল্য দিয়ে মানসম্মত খাবার পাচ্ছেন না শিক্ষার্থীরা।

ক্যান্টিনে খাবারের দাম বেশি থাকায় অনেক শিক্ষার্থী বাইরের ফুটপাতের কমদামী খাবার খেতে বাধ্য হচ্ছেন। ফুটপাতের খাবার খেয়ে নানা ধরনের রোগ যেমন- ডায়রিয়া, আমাশয়ের মত পেটের পীড়ার সম্মুখীন হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। ফলে তারা প্রতিনিয়ত বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন।এমনকি পিত্তথলির ক্যান্সার এ আক্রান্ত হবার হার বাড়ছে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের।কয়েকজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এমনিতেই আমাদের মেসে থাকতে হয় ফলে খরচ বেশি হয়। ক্যাম্পাসে এসে অপেক্ষাকৃত কম দামে খাবো কিন্তু সেখানেও দাম অনেক বেশি। ফলে অনেক সময় না খেয়েই ক্লাস করতে হয়।
বিভিন্ন সময় ক্যান্টিনে ভর্তুকি বাড়ানো, খাবারের দাম কমানো ও মান বাড়ানোর দাবি জানিয়ে প্রায়ই বিভিন্ন কর্মসূচি দিয়ে থাকেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখার প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো।

গত বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি আন্দোলনের মুখে ক্যান্টিন সঙ্কট নিয়ে শাখা ছাত্রলীগ, ছাত্র মৈত্রী, ছাত্র ইউনিয়ন, জাসদ ছাত্রলীগ, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের প্রতিনিধি হিসেবে সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের সাথে বৈঠক করেছে জবি প্রশাসন।

বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমানের সভাপতিত্বে ক্যান্টিন সঙ্কট নিরসনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক সেলিম ভূঁইয়াকে প্রধান করে ৪ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়। কমিটিকে দু’সপ্তাহের মধ্যে ক্যান্টিনের বিভিন্ন সমস্যা ও তার সমাধান খুঁজে বের করা জন্য উপাচার্য সময় বেঁধে দিলে ওই মিটিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. সেলিম ভূঁইয়া উপাচার্যের কাছে দু-মাস সময় চান। উপাচার্য সময় মঞ্জুর করার পর ছয় মাসেও এ কমিটি কোনো ফলাফল দিতে পারেনি।

ফলে ক্যান্টিনে খাবারের মান বাড়ানো ও দাম কমানোর দাবিতে শিক্ষার্থীদের লাগাতার আন্দোলনে প্রশাসনের আশ্বাসের ছ’মাস পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো ফল দিতে পারেনি প্রশাসন।
এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্রিয় বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনগুলো।

এ ব্যাপারে জবি ছাত্রকল্যাণ পরিচালক শফিকুল ইসলামের সাথে কথা বলার চেষ্টা করা হলে, তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।