ক্ষুব্ধ চিকিৎসক-নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা

4

রাজবংশী রায়ঃ করোনা চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের থাকা, খাওয়া ও যাতায়াত ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আসছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী তারা একটানা পনেরো দিন দায়িত্ব পালন শেষে পরবর্তী পনেরো দিন ছুটিতে কোয়ারেন্টাইনে থাকবেন। তবে এই সময়ে তারা আবাসন সুবিধা পাবেন না। নিজেদের বাসা-বাড়িতে অবস্থান করতে হবে। দায়িত্ব পালনকালে তাদের স্বাস্থ্য বিভাগের নির্ধারিত সরকারি ভবনে থাকতে হবে। আবাসিক সুবিধা না নিলে সরকার নির্ধারিত হারে ভাতা পাবেন। হাসপাতাল থেকে সরকার নির্ধারিত আবাসস্থলে যাতায়াতের জন্যও সরকার নির্ধারিত যানবাহন ব্যবহার করতে হবে।
ঈদের ছুটির আগে ২৯ জুলাই ওই পরিপত্র জারি করেছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। তবে ওই পরিপত্র নিয়ে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ফেসবুকে ওই পরিপত্রের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন চিকিৎসকরা। ছুটি শেষে গত রোববার রাজধানীর কয়েকটি হাসপাতালের চিকিৎসকরা বিষয়টি নিয়ে দফায় দফায় বৈঠকও করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজধানীর একটি সরকারি হাসপাতালের এক চিকিৎসক বলেন, পরিপত্রের বিষয়টি নিয়ে সবার মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। কারণ পরিপত্রটি পুরোপুরি অবৈজ্ঞানিক। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হবে। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে তাদের পরিবারের সদস্যরা সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়বেন। সুতরাং এটি বাতিল করা জরুরি।

অপর এক চিকিৎসক বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা অনুযায়ী একজন চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী একটানা সাত দিন দায়িত্ব পালন করবেন। পরবর্তী ১৪ দিন সরকার নির্ধারিত প্রতিষ্ঠানে কোয়ারেন্টাইনে থাকবেন। এই সময়ে করোনা পজিটিভ না হলে পরবর্তীতে তিনি আবারও কাজে ফিরবেন। এভাবেই চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা কাজ করে আসছিলেন। কিন্তু নতুন পরিপত্রে তা বদলে ফেলা হয়েছে।
রাজধানীর একটি সরকারি হাসপাতালের এক পরিচালক সমকালকে বলেন, তার প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক ও অন্য স্বাস্থ্যকর্মীরা বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করার জন্য তাকে অনুরোধ করেছেন। ওই পরিপত্রে যেসব বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে, সেগুলো নিয়ে সবার মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। চিকিৎসকদের বক্তব্য, তারা পাঁচতারকা হোটেল চান না। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ হলে যে কোনো ছোট হোটেল কিংবা সরকারি ভবনে থাকতে তাদের আপত্তি নেই। সুতরাং সংশ্নিষ্টদের এসব বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে।
যা আছে পরিপত্রে : ওই পরিপত্রে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে করোনা চিকিৎসায় যুক্তদের জন্য কয়েকটি নির্দেশনা জারি করা হয়। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আবদুল মান্নান স্বাক্ষরিত ওই পরিপত্রে বলা হয়, কভিড-১৯ চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত সরকারি চিকিৎসক, নার্স ও অন্য স্বাস্থ্যকর্মীরা সাধারণভাবে একাধারে ১৫ দিনের বেশি দায়িত্ব পালন করবেন না। প্রতি মাসে ১৫ দিন দায়িত্ব পালন শেষে পরবর্তী ১৫ দিন তারা কোয়ারেন্টাইনে ছুটিতে থাকবেন। চিকিৎসক ও অন্য স্বাস্থ্যকর্মীরা ১৫ দিন কর্মকালে পৃথক অবস্থানের জন্য বিশেষ ভাতা, খাবারসহ আবাসন সুবিধা পাবেন।
পরিপত্রে বলা হয়, ঢাকা মহানগরের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা ১৫ দিন কর্মকালে পৃথক অবস্থানের জন্য বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস একাডেমি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ম্যানেজমেন্ট (বিয়াম), জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমি, ন্যাশনাল একাডেমি অব এডুকেশনাল ম্যানেজমেন্ট (নায়েম), টিচার্স ট্রেনিং কলেজ ও জাতীয় স্থানীয় সরকার ইনস্টিটিউটে অবস্থান করতে পারবেন। আর ঢাকা মহানগরের বাইরে সব জেলা ও উপজেলার ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে সেখানে অবস্থিত বিভিন্ন সরকারি ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে তাদের জন্য এমন ব্যবস্থা করা হবে। সংশ্নিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আবাসিক স্থাপনাসমূহের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে আবাসন সুবিধা গ্রহণে ইচ্ছুক স্বাস্থ্যকর্মীদের আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে এবং সেজন্য প্রয়োজনীয় অর্থ আবাসিক স্থাপনাসমূহের কর্তৃপক্ষের বিল দাখিল সাপেক্ষে পরিশোধ করবেন।
যাতায়াতের বিষয়ে পরিপত্রে বলা হয়, কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত স্থাপনায় অবস্থানকারী চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের যাতায়াতের জন্য আবশ্যিকভাবে (প্রাপ্যতা সাপেক্ষে) বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিসি) যানবাহন ব্যবহার করতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে যানবাহনের ভাড়া পরিশোধের জন্য বিআরটিসির কাছ থেকে প্রাপ্ত বিলের ভিত্তিতে বরাদ্দ দাবি করতে হবে। যেখানে বিআরটিসির যানবাহন নেই, সেখানে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে রিকুইজিশন করা বা ভাড়ায় যানবাহন ব্যবহার করা যেতে পারে।
ভাতার বিষয়ে পরিপত্রে বলা হয়, কভিড-১৯ চিকিৎসায় সম্পৃক্ত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা চিকিৎসাসেবা প্রদানকালে নির্ধারিত আবাসিক সুবিধা গ্রহণ না করলে ভাতা পাবেন। এজন্য ঢাকা মহানগরীর চিকিৎসকরা দৈনিক দুই হাজার ও ঢাকার বাইরের চিকিৎসকরা এক হাজার ৮০০ টাকা করে ভাতা পাবেন। ঢাকা মহানগরীর নার্সরা এক হাজার ২০০ ও ঢাকার বাইরের নার্সরা এক হাজার টাকা এবং ঢাকা মহানগরীর অন্য স্বাস্থ্যকর্মীরা ৮০০ ও ঢাকার বাইরের ৬৫০ টাকা করে দৈনিক ভাতা পাবেন। কেউ এক মাসে ১৫ দিনের বেশি ভাতা পাবেন না।
শুরুতেই হোঁচট : রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক ডা. রওশন আনোয়ারের এক অফিস আদেশের সূত্র ধরে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের হোটেলে কোয়ারেন্টাইন সুবিধা প্রত্যাহারের বিষয়টি আলোচনায় আসে। ২ আগস্ট জারি করা ওই আদেশে বলা হয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জারি করা পরিপত্র অনুযায়ী হাসপাতালের যারা হোটেলে অবস্থান করতে ইচ্ছুক, তাদের সেখানে নিজ খরচে থাকতে হবে। এ আদেশের পর মুগদা হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও অন্য স্বাস্থ্যকর্মীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। অনেকে দায়িত্ব পালনে অনীহা প্রকাশ করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মুগদা হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানান, রোস্টার অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের শেষ দিনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ফোন করে সবাইকে জানায়, হোটেলে কোয়ারেন্টাইনে অবস্থান করা যাবে না। হোটেল কর্তৃপক্ষও সবাইকে হোটেল ছাড়ার বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার কথা জানায়। এ ঘটনায় সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। অনেকের বাসাবাড়িতে বয়স্ক মা-বাবা আছেন। পরিবারের অন্য সদস্যরাও আছেন। অনেকের কোয়ারেন্টাইনের জন্য পৃথক কক্ষেরও ব্যবস্থা নেই। এরপরই তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
চিকিৎসকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনও (বিএমএ) এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায়। পরে ওই হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কোয়ারেন্টাইনের জন্য নতুন করে তিনটি হোটেল বরাদ্দ করা হয়। আপাতত মুগদা হাসপাতালের সমস্যার সমাধান হলেও অন্য প্রতিষ্ঠানের বিষয়গুলো নিশ্চিত হয়নি। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, নতুন পরিপত্র পুরোপুরি কার্যকর হতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে। এর আগ পর্যন্ত সবকিছু আগের নিয়মে চলবে।
অবৈজ্ঞানিক বলছেন বিশেষজ্ঞরাও :ওই পরিপত্রের সমালোচনা করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগের জারি করা পরিপত্রটি অবৈজ্ঞানিক ও অমানবিক। পরিপত্রটির বিষয়ে হয়তো কোনো চিকিৎসা বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলোচনা কিংবা পরামর্শ করা হয়নি। সেটি হলে এ ধরনের পরিপত্র জারি হতো না। হাসপাতালে দায়িত্ব পালনের সময় একজন চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী আবাসন, খাওয়া ও যাতায়াতের সুবিধা পাবেন। কিন্তু একটানা পনেরো দিন দায়িত্ব পালনের পর পরবর্তী কোয়ারেন্টাইনের জন্য বাসাবাড়িতে অবস্থান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং অবৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত। আর অমানবিক বলার কারণ অনেকের বাসায় পৃথক কক্ষ নেই। অনেকের বাসায় বয়স্ক মা-বাবা ও স্ত্রী-সন্ত্মান আছেন।
তিনি বলেন, হাসপাতালে দায়িত্ব পালনকারী ওই চিকিৎসক, নার্স কিংবা স্বাস্থ্যকর্মী যদি করোনা পজিটিভ হয়ে থাকেন এবং তিনি পরিবারের সদস্যদের সংস্পর্শে গেলে তারাও ঝুঁকিতে পড়বেন। এখন প্রশ্ন হলো, কারও সন্তান চিকিৎসক হওয়ার কারণে তার মা-বাবাকেও ঝুঁকিতে পড়তে হবে? তার স্ত্রী ও সন্তানকেও ঝুঁকি নিতে হবে? রাষ্ট্র তো এই অমানবিক আচরণ করতে পারে না। অধ্যাপক নজরুল আরও বলেন, জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির একজন সদস্য হিসেবে এটুকু বলতে পারি যে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তারা আমাদের সঙ্গে আলোচনা করেনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএমএ মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগের ওই পরিপত্র নিয়ে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা উদ্বিগ্ন। অনেকে বিএমএকে বিষয়টি জানিয়েছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গতকাল রাতে বিএমএর একটি বৈঠক হওয়ার কথা।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য :এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আবদুল মান্নান বলেন, পরিপত্র জারি করা হয়েছে ঠিকই কিন্তু সেটি এখনও কার্যকর হয়নি। এটি যাচাইবাছাই করে দেখা হচ্ছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের আবাসন, খাওয়া ও যাতায়াত সুবিধা নিশ্চিত করতে গিয়ে বড় ধরনের অর্থ ইতিমধ্যে ব্যয় হয়েছে। করোনার সংক্রমণ দীর্ঘায়িত হলে এ ধরনের ব্যয় চালিয়ে যাওয়া কষ্টসাধ্য হতে পারে। এজন্য আগেভাগে একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সুতরাং পনেরো দিন ডিউটি পালনের পর কোয়ারেন্টাইন ছুটিতে সবার বাসাবাড়িতে থাকতে হবে না। বিশেষ করে যাদের বাসায় কোয়ারেন্টাইন করার ব্যবস্থা নেই, তারা সংশ্নিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে থাকতে পারবেন। আবার কেউ পজিটিভ হলে তার জন্যও পৃথক ব্যবস্থা থাকবে।
স্বাস্থ্যসেবা সচিব আরও বলেন, হোটেলে কোয়ারেন্টাইনে থাকা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অনেক চিকিৎসক অনীহা প্রকাশ করে আসছিলেন। কারণ সাত দিন ডিউটি করার পর ১৪ দিন হোটেলে কোয়ারেন্টাইনে থাকা এবং পরে আবারও কাজে যোগদান করলে তারা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ বঞ্চিত হচ্ছিলেন। সুতরাং এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই এটি করা হয়েছে। তাছাড়া পরিপত্রটি জারি করার আগে অন্যান্য দেশের এ সম্পর্কিত ব্যবস্থাপনাও খতিয়ে দেখা হয়েছে। এরপরও কোনো অসামঞ্জস্য থাকলে তা নিয়ে আলাপ-আলোচনা হতে পারে এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।সমকাল