ক্ষমতার এক যুগ: উন্নয়ন আছে সমতা নেই

8

ডেস্ক রিপোর্ট: টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতার এক যুগ পার করল আওয়ামী লীগ সরকার। এই ১২ বছরে উন্নয়ন অগ্রগতিতে বাংলাদেশ যে এগিয়েছে তাতে কোনো প্রশ্ন নেই। নানাবিধ দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে নিজস্ব আয়ে পদ্মাসেতুর পূর্ণ অবয়ব দিয়ে বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে, ‘আমরাও পারি’। বাংলাদেশের নিজস্ব স্যাটেলাইট এখন মহাকাশে। কিন্তু বৈষম্য নিরসন করে সমতা আনায়ন, জবাদিহীতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি প্রতিরোধ, সন্ত্রাস-সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদ ও মাদক নির্মূল, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রুপদান এবং মানবাধিকার ও বিচার বিভাগকে শক্তিশালী করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাসহ আরো অনেক বিষয়’ই এখনো অধরাই আছে। পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাও। সংবিধানের চার মূলনীতি গণতন্ত্র, জাতীয়তাতাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র উপেক্ষিতই আছে। বরং সময়ে সময়ে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে আপোষ করা হয়েছে সাম্প্রদায়িক অপশক্তির সাথে। অন্যদিকে সরকারের সব অর্জন ম্লান করেছে দুর্নীতির ঘুনপোকা। যে কথা নানা সময়ে ভাষণে, বক্তৃতায় স্বীকার করেছেন আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। জাতির উদ্দেশ্যে ভাষনেও তারই ইঙ্গিত দিয়েছেন। ফলে আগামী দিনে এসব চ্যালেঞ্জ নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে বাংলাদেশকে।
মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অপশক্তি ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর সাথে আঁতাত করে পুরো বাংলাদেশকে জঙ্গিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল বিএনপি-জামাত জোট সরকার। গোটা দেশজুড়ে রাষ্ট্রীয় মদদে চলছিল জঙ্গিবাদী সন্ত্রাস। সেখান থেকে গণতন্ত্র উদ্ধার এবং দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ফিরিয়ে নিতে সকল অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের মধ্যদিয়ে বিএনপি-জামাত জোট সরকারকে উৎখাত করে ১৪ দল। তারপরে দুই বছরের অগণতান্ত্রি ও অরাজনৈতিক শক্তির শাসনের পর আসে ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচন। ২৩ দফা ভিত্তিতে প্রথমে ১৪ দল পরে মহাজোট নামে সেই নির্বাচনের মধ্যদিয়ে ক্ষমতায় আসে আজকের ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। তারপর ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনেও সকল ষড়যন্ত্রের জবাব দিয়ে নিরঙ্কুশ বিজয়। সেই থেকে টানা ১২ বছর ক্ষমতায় আছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। নানা সমালোচনা থাকলেও এই ১২ বছরে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে-একথা বিরোধীরাও স্বীকার করতে বাধ্য হবে। তলাবিহীন ঝুড়ির বাংলাদেশকে আজ মার্কিনীরাও বলছেন উন্নয়নের রোল মডেল। বাংলাদেশের প্রশংসায় পঞ্চমুখ বিশ্ব নেতারাও। এমডিজির সব শর্ত পূরণ করে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে। এগিয়ে যাচ্ছে উন্নত দেশের স্বপ্নে। বাংলাদেশের উন্নয়ন দেখে ‘ভুখা বাঙালি’ বলে অবজ্ঞা করা ওই পাকিস্তানিরাই এখন ইমরান খানকে বলছে ‘আমাদের কানাডা নয়, ‘বাংলাদেশ বানিয়ে দাও।’
এই দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশ জয় করেছে সমুদ্রসীমা। সিটমহল সমস্যা সমাধান করে বাড়িয়েছে স্থলসীমাও। ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করে বাংলাদেশের নিজস্ব স্যাটেলাইট ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ মহাকাশে। কেবল তাই নয় অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অভাবনীয় সাফল্য এসেছে। বার্ষিক প্রবৃদ্ধি উঠেছে ৮ এর ঘরে। বার্ষিক রিজার্ভ পৌঁছে গেছে ৪২ বিলিয়ন ডলারের উপরে। বেড়েছে রেমিটেন্স। মাথাপিছু আয় এখন ২ হাজার ৬৪ মার্কিন ডলার। মাতৃমৃত্যু ও শিশু মৃত্যুর হার কমেছে। গড় আয়ু ৭২ বছর। পদ্মাসেতু নিয়ে বিশ্ব ব্যাংককে চ্যালেঞ্জ করেছিল বাংলাদেশ। বলেছিল বাংলাদেশ নিজস্ব আয়ে পদ্মাসেতু করে দেখিয়ে দিবে। দেখিয়েছেও। স্বপ্নের পদ্মাসেতু এখন বাস্তবে রুপ নিয়েছে। কেবল তাই নয়, রুপপুর পারমানবিক কেন্দ্র, মেট্রোরেল, ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-চিটাগাং মহাসড়কসহ অনেক মেগা প্রকল্প করছে বাংলাদেশ। এরকম আরো বহু উন্নয়নের চিত্র আছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
কিন্তু এত এত উন্নয়নের পরেও সেই উন্নয়নের ফসল গেছে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের ঘরে। শতকরা ৫ ভাগ মানুষ উন্নয়নের সুফল ভোগ করছেন। যারা লুটেরা-দুর্নীতিবাজ। দুর্নীতি-লুটপাটের মাধ্যমে এরা দেশের টাকা বিদেশে পাচার করছে। কানার বেগমপাড়া, মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম করছে। এরা আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। উন্নয়নের সব অর্জন এই ঘুনপোকার দল শেষ করে দিয়েছে। পর্দা, বালিশ, বই, ঢেউটিন, কয়লাসহ নানা কাণ্ডের মাধ্যমে এই ঘুনপোকারা সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। জন্ম হয়েছে পাপিয়া, শাহেদ, সাবরিনা, গোল্ডেন মনিরসহ আরো অনেক লুটেরাদের। এরকম আরো বড় বড় রাঘববোয়ালরা এখনো ধরা ছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। লুটপাটের মাধ্যমে যারা টাকার পাহাড় গড়েছে। আবার গরিবের ১০ টাকার চাল গেছে বড়লোকের পেটে। টিসিবির তেল দেখা গেছে লুটেরাদের খাটের নিচে। দুর্নীতিবাজ আমলা, জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতারা গরিবের রিলিফ নিয়েও লুটপাট করেছে। ১২ বছরে পুরো বাংলাদেশটাই দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য বানিয়েছে। চলেছে লুটপাট ও দুর্নীতির মহোৎসব। এমন কোনো সেক্টর নেই যেখানে দুর্নীতি হয় নি। এই মেয়াদে করোনা মহামারি দেখিয়েছে স্বাস্থ্যখাতের বেহাল দশা। একদিকে লুটপাট চলেছে, অন্যদিকে অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা। মানুষ দেখেছে ড্রাইভার মালেক কিভাবে অর্থের পাহাড় গড়ার আশ্চর্য প্রদীপ পেয়েছে। কেবল মালেক নয়, এরকম বহু মালেক স্বাস্থ্যখাতে ঘাপটি মেরে লুটপাট করেছে। খবর রটেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ইটও নাকি দুর্নীতিতে জড়িত। অবশেষে পদত্যাগ করেন স্বাস্থ্যের ডিজি। কিন্তু বিশ্লেষকরা বললেন, ডিজির পদত্যাগ করলেই সমাধান হবে না। দুর্নীতি-অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা রোধ করে পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকেই ঢেলে সাজাতে হবে। কেবল কি স্বাস্থ্যে লুটপাট চলেছে? অন্যান্য খাতেও। দুর্নীতির ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী জিরোটলারেন্স নীতি গ্রহণ করেও তা প্রতিরোধ করা যায় নি। যেসব দুর্নীতিবাজ ধরা পড়েছে তারা চুনোপুঁটি মাত্র। দুর্নীতির মূল হোতারা ছিল ধরা ছোঁয়ার বাইরে।
ওদের লুটপাটের কারণে দেশের ৯৫ ভাগ মানুষ বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। বেড়েছে গরিব মানুষের সংখ্যা। ধনী-গরিবের বৈষম্য প্রকোট হয়েছে। করোনায় মানুষ না খেয়ে মরেনি, তবে ভাতের থালায় ভাত কমেছে। কাজ নেই, আয় নেই। কিন্তু ব্যয় বেড়েছে হু হু করে। নিত্যপণ্যের বাজারে আগুন লেগেছে বাজার সিন্ডিকেটের কারণে। পেঁয়াজ কাণ্ড, আলু কাণ্ডসহ সিন্ডিকেটের নানা কাণ্ডে অসহায় ছিল সাধারণ মানুষ। বাজারে রীতিমতো মানুষের পকেট কেটেছে ব্যবসায়ী নামক শকুনের দল। এখনো কাটছে। বাজারে চাল, তেলের দাম আকাশচুম্বি। অন্যান্য পণ্যের দামও লাগামহীন। এসব নিয়ন্ত্রণ করতে পারে নি সরকার। বরং নানা সময় উদ্যোগ নিয়ে অসহায়ত্ব প্রকাশ করতেই দেখা গেছে। করোনা কর্মহীন আর বাজারে নিত্যপণ্যের দামবৃদ্ধিতে মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। এই করোনাতেও ১১.৪ শতাংশ ধনী বেড়েছে। অথচ দারিদ্র্যের প্রান্তসীমায় চলে গেছেন শতকরা ৪০ ভাগ মানুষ। এমনিভাবে সরকারের ১২ বছরের উন্নয়নের ফসল গেছে ৫ ভাগ মানুষের হাতে। বঞ্চিত হয়েছেন ৯৫ ভাগ মানুষ। ফলে সমতার প্রশ্নে বাংলাদেশ এগোতে পারে নি।
সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে জবাবদিহীতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও সফলতার পাল্লা ভারি নয়। উল্টো সরকার আমলাতন্ত্রের খপ্পড়ে পড়েছে। অনেক রাজনৈতিক বোদ্ধারাই বলেছেন করোনার চেয়ে শক্তিশালী আমলাতন্ত্র। যেখান থেকে বেরিয়ে আসা যায় নি। সাম্প্রতিক সময়ে উপজেলা চেয়ারম্যানদের আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে আমলাতন্ত্রের সেই চিত্রই উঠে এসেছে।
সন্ত্রাস ও মাদক নির্মূলের ক্ষেত্রেও সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কিন্তু সে উদ্যোগ খুব বেশি সফলতার মুখ দেখে নি। বন্ধ হয়নি ইয়াবা ব্যবসা। অন্যান্য মাদক ব্যবসাও চলছে রমরমাভাবে। যারা গ্রেপ্তার হয়েছে তারা খুচরা ব্যবসায়ী, সেবনকারী ও বাহক। মাদক সম্রাটরা আড়ালেই থেকেছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও তেমন নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় নি। এই বারো বছরে অসংখ হত্যা, ধর্ষণ, ছিনতাই-রাহাজানির ঘটনা ঘটেছে। দিনে-দুপুরে প্রকাশ্যে মানুষ হত্যা চলেছে। ধর্ষণের রঙ্গমঞ্চে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল-কলেজ, মন্দির-গির্জা, রাস্তা-ঘাটে ধর্ষণের চিত্র ছিল ভয়াবহ। ধর্ষণ হয়েছে বাড়িতেও। নারী তার ঘরেও নিরাপদ ছিল না। বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে ধর্ষণ বেড়েই চলেছে। এই অবস্থা থেকে মুক্ত হতে পারে নি বাংলাদেশ।
বাহাত্তরের সংবিধানে ফেরা ছিল সময়ের দাবি। যুদ্ধাপরাধের বিচার হয়েছে। জঘন্য মানবতাবিরোধী অপরাধে অপরাধি রাজাকার-আল বদর নেতাদের বিচারের রায় কার্যকরও হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধাপরাধী দল হিসেবে জামাতের রাজনীতি পুরোপুরি বন্ধ করা যায় নি। বন্ধ করা যায় নি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়া সংবিধান অনুযায়ী ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা। বঙ্গবন্ধু নিজে বলেছিলেন বাংলাদেশে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করা যাবে না। সেই বিষয়ে এগোতে পারে নি বাংলাদেশ। উল্টো রাজনৈতিক দল না হলেও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে হেফাজত এগিয়েছে দাপটের সাথে। ১৩ দফা দাবি মেনে পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন, নারী নীতিমালা বাস্তবায়ন না করা, সুপ্রীমকোর্টের নারী ভাস্কর্য, বিমানবন্দরে লালন ভাস্কর্য অপসারণ, কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান দেওয়ার পর তারা আরো উৎসাহি হয়ে বাংলাদেশের শেকড় ধরে টান দিয়েছে। গত বছরের শেষের দিকে তারা জাতির জনকের ভাস্কর্য গুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ধর্মবাদী আস্ফালন দেখিয়েছে। এদের সাথে আপোষকামিতার ফল যে শুভ নয়, তা টের পাওয়া গেছে। এরকম আরো বহু বিষয়ের সমাধান হয় নি গত বারো বছরে।
তাই আগামী দিনে অর্থনীতির ৭ চ্যালেঞ্জ সহ সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্নে, সন্ত্রাস জঙ্গিবাদ মাদক ও দুর্নীতি প্রতিরোধের প্রশ্নে এবং সর্বোপরি জবাবদিহীতা নিশ্চিত করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দেওয়াসহ আরো বহু বিষয় কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে সমতা ও ন্যায্যতার বাংলাদেশ বিনির্মাণের চ্যালেঞ্জ নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে ক্ষমতাসীন এই সরকারকে-মন্তব্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের। তানাহলে উন্নয়ন থমকে দাঁড়াবেই না কেবল, মুখ থুবড়েও পড়তে পারে।