এমএইচ নাহিদ: ১৮১৪ সালে ক্যাপিটাল হিল পুড়েছিল ব্রিটিশদের হিংসার আগুনে। মার্কিন ইতিহাসের ঐতিহ্যবাহী সেই ভবনেই স্মরণকালের ন্যাক্কারজনক হামলার দৃশ্য দেখল পুরো বিশ্ব। দুই’শো বছরের বেশি সময় পর এবারের হামলাকারি কোনো বহিঃশত্রু নয়, স্বয়ং মার্কিনীরাই। দুনিয়াজুড়ে নিন্দার ঝড় ওঠা এই অভস্য বর্বর হামলার মধ্যদিয়ে মার্কিন গণতন্ত্রের মুখোশ উন্মোচিত হয়ে গেল।
সাম্রাজ্যবাদী কর্তৃত্ব ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার নেশায় এতদিন ধরে স্বঘোষিত বিশ্ব মোড়ল যে আমেরিকা দুনিয়ার মানুষকে বুঝাতে চেয়েছিল গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সভ্যতায় তারাই সেরা, ক্যাপিটাল হিলের হামলা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল অন্য দেশকে গণতন্ত্রের ছবক দেওয়া মার্কিনীরা কতটা অসভ্য, কতটা বর্বর! অবশ্য জঘন্যতম এই হামলায় সকল মার্কিন নাগরিককে অসভ্য বলা যায় না। কারণ এ নৈরাজ্য করেছে কেবল ট্রাম্প সমর্থক উগ্রবর্ণবাদী দক্ষিণপন্থীরা। এর মূলে রয়েছে শ্বেতাঙ্গবাদী আধিপত্যের অমানবিক শক্তি। আর প্রত্যক্ষ মদদদাতা ও উস্কানিদাতা হলেন বিশ্ব উন্মাদ খ্যাত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তার প্রমাণ হামলার কয়েক ঘন্টা আগে তিনি তার সমর্থকদের বলেছিলেন, “সবাই ক্যাপিটালে চল, দুর্বল হলে চলবে না। দেশকে ফিরে পেতে হলে শক্তি দেখাতে হবে। আমিও তোমাদের সাথে যাব।” তার এই বক্তব্যের পর হাজার হাজার মানুষ ক্যাপিটাল হিলে হামলা করে। যাদের মাথায় ছিল ট্রাম্প টুপি আর হাতে বিশাল ব্যানারে লেখা ট্রাম্প-২০২০।
হামলা করেছে ‘প্রাউড বয়েজ’-এর মতো উগ্র শ্বেতাঙ্গবাদী, অভিবাসী বিরোধী গোষ্ঠী, আর সোস্যাল মিডিয়ায় তথাকথিত চক্রান্তের কাহিনী ছড়ানো ‘কিউ অ্যানন’ সমর্থক। ওরা আসলে গণতান্ত্রিক শক্তি নয়, ওরা শ্বেতাঙ্গ ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে হিংস্র অমানবিক শক্তি। ফলে ২০ জানুয়ারি ‘ট্রাম্প কালের’ অবসান হলেই যে, মার্কিনে শান্তি ফিরে আসবে তা মনে করেন না মার্কিন সমাজবিজ্ঞানীরা। মনে করেন না বিশ্ব সমাজতত্ত্ববিদ ও রাজনৈতি বিশ্লেষকরাও। সকলেই সামনে দেশটিতে শ্বেতাঙ্গ উগ্রবর্ণবাদের অশনি সঙ্কেত দেখছেন।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, জো বাইডেনের জয়কে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে ৬ জানুয়ারি দুপুরে ক্যাপিটাল হিলে শুরু হয় মার্কিন কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশন। এর আগেই কয়েক হাজার কর্মী সমর্থকদের সামনে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্পের হুঙ্কার “বাইডেনের বিজায় ঠেকাতে ক্যাপিটাল হিলের দিকে অগ্রসর হও।” তারও আগে ১৯ ডিসেম্বর বলেছিলেন, “৬ জানুয়ারি রাজধানীতে বিরাট প্রতিবাদ হবে, সেখানে আসুন। আর নির্বাচনের পরপরই ট্রাম্প সমর্থকরা বলেছিল, “সভ্যতা বাঁচাতে আমরা যুদ্ধে যাচ্ছি। বাইডেনের হাত থেকে আমেরিকা বাঁচাতে।” এই তো তিন সপ্তাহ আগে ট্রাম্পের টুইট, ‘ ৬ জানুয়ারি ডিসি-তে থাকবেন। দারুণ ধামাকা হবে’। সত্যি তিনি ধামাকা’ই দেখালেন। যে ধামাকায় হতবাক মার্কিনীরা, হতবাক পুরো দুনিয়া!
তার উস্কানিতে ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটাল হিলে যা হলো তা নজিরবিহীন। সিঁড়ি দিয়ে, পাঁচিড় টপকে, গেট দিয়ে বন্দুক-রড, লাঠি হাতে ঢুকে পড়েন ট্রাম্প সমর্থকরা। তখনো নির্বিকার মার্কিন পুলিশ ও নিরাপত্তা কর্মীরা। হামলাকারিরা চিৎকার করে বলতে থাকেন,“ কোথায় ওরা (সিনেটররা)। ভাংচুর করে স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির অফিস। টেবিলে উঠে নাচতে থাকে। উপরাষ্ট্রপতি মাইক পেন্সের চেয়ারেও বসতে ছাড়েন নি। কেবল বসাই নয়, বন্দুক উঁচিয়ে দাম্ভিকতার সাথে সিগারেট টানতে থাকে। সাড়ে চার ঘন্টা ধরে চলা সেই তান্ডবের ছবি ও ভিডিও চিত্র দেখেছেন গোটা দুনিয়ার মানুষ। দেখেছেন কতটা অসভ্য, কতটা বর্বর আর অমানবিক ওই দক্ষিণপন্থী অগণতান্ত্রিক অপশক্তি। যেভবন থেকে সারা দুনিয়াকে গণতন্ত্র ও মানবিকতার ছবক দিতে বিল পাশ হতো, সেই ভবনেই ওরা হামলা করে মার্কিন গণতন্ত্রের ইতিহাসে নোংরামির শেষ পেরেক মেরে দিল।
আপাতত শান্ত আমেরিকা। শেষ পর্যন্ত জো বাইডেনকে প্রেসিডেন্ট এবং কমলা হ্যারিসকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে মার্কিন কংগ্রেস। কিন্তু যা হলো তা কোনো বিছিন্ন ঘটনা নয়। এটা স্পষ্ট ভাষায় বলা যায় বর্ণবাদী রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ। বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে শ্বেতাঙ্গ আদর্শ নিয়ে রাজনীতি করেন এটি তার জ্বলন্ত উদাহরণ। অতএব বাইডেনের বিজয়ের মধ্যদিয়ে যে মার্কিন ইতিহাসের অপরাজনীতির অবসান হবে না তার যতেষ্ঠ শঙ্কা থেকেই গেল।
সেই সাথে প্রমাণ হলো আমেরিকার গণতন্ত্রেও গলদ আছে। কারণ নির্বাচনের আগ থেকেই ট্রাম্পের প্রচার-‘তিনি জিতে গেছেন’। নির্বাচন আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। কিন্তু ফলাফলে তার পরাজয় স্পষ্ট হওয়ায় ভোল পাল্টাতে থাকেন। তাকে নাকি কারচুপি ও ধাপ্পার মাধ্যমে হারানো হয়েছে। তিনিই বিজয়ী। অতএব হোয়াইট হাইস ছাড়ার প্রশ্নই আসে না। মামলাও করেন ৬২ টি। যার সবক’টিতে ট্রাম্প হেরেছেন। তারপরেও পরাজয় মেনে না নিয়ে ৬ জানুয়ারি অগণতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতায় থাকতে ক্যাপিটাল হিলের হামলায় উস্কানি দেন। এর পরেও কি মার্কিনীরা বলবেন, গণতন্ত্রে তারাই সেরা। বিশ্বনেতারা বলছেন, এটা আর তাদের বলার অধিকার নেই। কোন মুখ নিয়ে এখন তারা দুনিয়াকে গণতন্ত্র, মানবিকতা ও সভ্যতার ছবক দিবেন?
অন্যদিকে ক্যাপিটাল হিলে ন্যাক্কারজনক হামলার পরেও ৪৫ শতাংশ মার্কিনীরা তা সমর্থন করছেন। ৮৫শতাংশ রিপাবলিকানরা মনে করেন ট্রাম্পের বাকি সময় পর্যন্ত ক্ষমতা থেকে সরানো অনুচিত হবে। এই ধারণা থেকে স্পষ্ট যে ট্রাম্প যুগের অবসান হলেও ট্রাম্পিজম ও উগ্র শ্বেতাঙ্গবাদী চিন্তা ধারা অবসান হবে না, বরং তা আরো ভয়ঙ্কর হবে। মার্কিন সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এ হামলা দেখিয়ে দিল আগামী চার বছর অনিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক সংঘাত হতে চলেছে। মার্কিন ইতিহাসে হত্যা নির্যাতনের ইতিহাস নতুন নয়। এই দেশেই মার্টিন লুথারকে হত্যা করা হয়েছে। নাগরিক অধিকার আন্দোলনের কর্মী, ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী ও কমিউনিস্টদের হত্যা করা হয়েছে এই আমেরিকাতেই। ট্রাম্পের রাজত্বেও ২০১৮ সালে ধর্মস্থানে ইহুদিদের হত্যা করা হয়। ভার্জিনিয়ায় রাস্তায় নয়া নাৎসিবাদের হিংসা দেখেছে, হিদার হারারের হত্যা দেখেছে। অতএব ট্রাম্প সরে গেলেই বিপদ চলে যাবে না তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। কারণ হামলাকারিদের হাতে কেবল ট্রাম্পের পতাকাই নয়, ছিল কনফারেটের পতাকাও। শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদ নতুন কিছু ক্ষোভ নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে। আমেরিকায় ট্রাম্পিজম, স্বৈরাচারি, বর্ণবিদ্বেষী, গণবিদ্বেষী ও বিজ্ঞানবিরোধী রাজনীতি ততোদিন থাকবে, যতদিন না তার শিকড় দূর করা না যায়। ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছে লড়াই শেষ নয়, কেবল শুরু হয়েছে। অতএব স্পষ্টতই সামনে আমেরিকায় উগ্র শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদী আভিজাত্যের দাম্ভিকতা, অমানবিকতা ও অগণতান্ত্রিক অপশক্তির আস্ফালন বাড়বে বৈ কমবে না।-লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা ও পেশায় শিক্ষক।

*মতামত বিভাগে প্রকাশিত সকল লেখাই লেখকের নিজস্ব ব্যক্তিগত বক্তব্য বা মতামত।