কোন্দল বড় দুই দলেই

যুগবার্তা ডেস্কঃ শরীয়তপুরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সংসদের বাইরে থাকা বিএনপিতে রয়েছে কোন্দল। পছন্দের লোকজন নিয়ে কমিটি করা নিয়েই এই কোন্দল। আওয়ামী লীগে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে হামলা সংঘর্ষ ও বাড়িঘর লুটপাটের মতো ঘটনাও রয়েছে।

সাতটি উপজেলা নিয়ে গঠিত তিনটি সংসদীয় আসনের কোথাও কোথাও আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে সংসদ সদস্যদের বিরোধ আছে।

তবে দলের এ কোন্দলকে নেতৃত্বের লড়াই বলে দাবি করে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অনল কুমার দে বলেছেন, তাঁরা বিরোধ কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবেন এবং আগামী নির্বাচনে সব আসনেই দলের প্রার্থী জয়ী হবেন।

অন্যদিকে বিএনপি নেতারা বলছেন, দল নির্বাচনে গেলে নিজেদের মধ্যকার বিরোধ নিরসন করে আওয়ামী লীগের দুর্গে আঘাত হানতে চান সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক কার্যক্রম চোখে পড়ার মতো নয়। জামায়াতসহ অন্য রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে।

১৪ লাখের বেশি জনসংখ্যার শরীয়তপুরের সংসদীয় আসন তিনটি হলো শরীয়তপুর-১ (সদর-জাজিরা), শরীয়তপুর-২ (নড়িয়া-সখিপুর), শরীয়তপুর-৩ (ভেদরগঞ্জ-ডামুড্যা-গোসাইরহাট)।

আওয়ামী লীগ : স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি দীর্ঘ ১৪ বছর পর জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন হয়। সম্মেলনে শুধু সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে নাম ঘোষণা করা হয়। বলা হয়েছিল দ্রুত সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে।
কিন্তু প্রায় ১৮ মাস পেরিয়ে গেলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে ব্যর্থ হয়েছেন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। পদপ্রত্যাশীরা এ দুজনকে দায়ী করার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকেও দুষছেন। তৃণমূল নেতাদের অভিযোগ, সমন্বয়হীনতা ও গ্রুপিংয়ের কারণেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি।
জানা গেছে, সম্প্রতি জেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটির প্রস্তাব কেন্দ্রে পাঠিয়েছেন সাধারণ সম্পাদক অনল কুমার দে। তবে প্রস্তাবিত এ কমিটির বিষয়ে আপত্তি তুলেছেন তৃণমূল নেতারা। তাঁদের দাবি, অযোগ্য ও দলীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ নেই এমন ব্যক্তিদের নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটির প্রস্তাব করেছেন সাধারণ সম্পাদক। তিনি অন্য নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করেননি।

তৃণমূল নেতারা বলছেন, পূর্ণাঙ্গ কমিটি না হওয়ায় দলের কর্মকাণ্ড দিন দিন ঝিমিয়ে পড়ছে। বিশেষ দিবসগুলোও যথাযথভাবে পালন করতে পারছেন না সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। দলীয় কার্যালয়ের সাইনবোর্ডও নেই। বেশির ভাগ সময়ই কার্যালয় তালা দেওয়া থাকে।

এদিকে উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়েই সংসদ সংসদ ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরোধের শুরু হয়। এরপর তৃণমূলের কমিটি গঠন ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধ আরো চরম আকার ধারণ করে। এর জের ধরে জেলার বিভিন্ন স্থানে অর্ধশতাধিক সংঘর্ষ, বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে।

নেতাকর্মীরা জানায়, শরীয়তপুর-১ (সদর-জাজিরা) আসনে ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের প্রার্থী হন দলের সাংগঠনিক সম্পাদক বি এম মোজাম্মেল হক। কিন্তু দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে প্রার্থী হন স্থানীয় নেতা মোবারক আলী শিকদার। মোজাম্মেল হক সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তখন থেকেই দুজনের মধ্যে বিরোধ এবং তাঁদের অনুসারীদের মধ্যে আধিপত্যের লড়াই শুরু হয়। গেল জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আবার নির্বাচিত হন মোজাম্মেল হক। এরপর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে মোবারক আলী শিকদার জাজিরা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এ দুজনের অনুসারীদের মধ্যে প্রায়ই হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে থাকে। অন্যদিকে সদর উপজেলায়ও রয়েছে দলের দুই পক্ষের বিরোধ। এর জের ধরে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ইকবাল হোসেন অপু ও সংসদ সদস্য মোজাম্মেল হকের সমর্থকদের মধ্যে প্রায়ই ঘটে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা।

নড়িয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়াকে কেন্দ্র করে স্থানীয় আওয়ামী লীগ বিভক্ত হয়ে পড়ে। একটি পক্ষ সংসদ সদস্য শওকত আলীর সমর্থক, আরেকটি পক্ষ দলের আরেক সাংগঠনিক সম্পাদক এ কে এম এনামুল হক শামীমের সমর্থক। দুপক্ষকেই দলীয় কর্মসূচি আলাদাভাবে পালন করতে দেখা যায়।

নড়িয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাসানুজ্জামান খোকন বলেন, ‘নড়িয়ায় দলে কোনো বিরোধ নেই। আমরা মূল ধারার রাজনীতির সঙ্গে রয়েছি। সংগাঠনিক নিয়মেই দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করছি। ’

জেলার প্রস্তাবিত পূর্ণাঙ্গ কমিটির বিষয়ে হাসানুজ্জামান বলেন, ‘তালিকায় অনেকের নাম রয়েছে যারা কখনোই আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। অনেক ত্যাগী নেতাকে বাদ দিয়ে কমিটি প্রস্তাব করা হয়েছে। তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই জেলা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ওই কমিটি প্রস্তাব করেছেন। আমরা তার প্রতিবাদ জানিয়েছি। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গেও আমরা কথা বলেছি। ’

জানতে চাইলে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অনল কুমার দে বলেন, দলে অভ্যন্তরীণ কোনো কোন্দল নেই। মাঝে মধ্যে যেসব হামলা-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে তা রাজনৈতিক কারণে হচ্ছে না। সামাজিক কারণেই এসব হামলা-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে থাকে। হয়তো সামাজিক নানা বিষয়ে নেতাকর্মীরা সম্পৃক্ত থাকতে পারে।

জেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটির বিষয়ে অনল কুমার বলেন, কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবিত কমিটি নিয়ে ওঠা অভিযোগ সঠিক নয় দাবি করে তিনি বলেন, ‘দলীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ ও ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করেই পূর্ণাঙ্গ জেলা কমিটি প্রস্তাব করা হয়েছে। আশা করি শিগগিরই কমিটি অনুমোদন পাবে। ’

বিএনপি : দলীয় সূত্রে জানা যায়, জেলা কমিটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দলে বিভক্তি রয়েছে। আলাদাভাবেই আন্দোলন সংগ্রাম ও কেন্দ্রীয় কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে দলটির নেতাকর্মীরা। একটি পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন জেলা বিএনপির সভাপতি সফিকুর রহমান কিরণ ও সাধারণ সম্পাদক সরদার এ কে এম নাসির উদ্দিন কালু। অন্যপক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি জামাল শরীফ হিরু।

দলীয় নেতাকর্মীরা বলছে, মামলা-হামলা ও পুলিশের বাধার কারণে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাতে পারছে না তারা। অধিকাংশ কর্মসূচিই পালন করা হয় নেতাকর্মীদের বাড়িতে। সম্প্রতি সদস্য সংগ্রহ কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।

জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য জামাল শরীফ হিরু বলেন, সম্প্রতি জেলা বিএনপির ১৫১ সদস্যের যে কমিটি দেওয়া হয়েছে তাতে অনেক ত্যাগী নেতাকে রাখা হয়নি। কমিটি করার আগে কোনো কাউন্সিল হয়নি। সাংগঠনিক নিয়ম মেনে কমিটি না করায় ত্যাগী নেতাকর্মীরা বিভক্ত হয়ে পড়েছে।

তবে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সরদার নাসির উদ্দিন কালু বলেন, বিএনপি একটি বড় রাজনৈতিক দল। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কারণে অনেকেই পদবঞ্চিত হয়েছে। পদবঞ্চিত কিছু নেতাকর্মী তাদের মতো করে কর্মসূচি পালন করছে।

জাতীয় পার্টি : দলটির জেলা ও উপজেলা কমিটি থাকলেও সাংগঠনিক কার্যক্রম চোখে পড়ার মতো নয়। ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা। তবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলার তিনটি আসনেই দলটি প্রার্থী দেবে বলে জানিয়েছেন জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি মো. মাসুদুর রহমান।

জেলার তিনটি সংসদীয় আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী যাঁরা : শরীয়তপুর-১ (সদর-জাজিরা) আসনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে পাঁচজনের নাম শোনা যাচ্ছে। তাঁরা হলেন বর্তমান সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বি এম মোজাম্মেল হক, উপকমিটির সহসম্পাদক ইকবাল হোসেন অপু, রফিকুল ইসলাম কোতয়াল ও মেহেদী জামিল, জাজিরা উপজেলা চেয়ারম্যান মোবারক আলী শিকদার।

এ আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে আছেন জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সরদার এ কে এম নাসির উদ্দিন কালু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মনিরউজ্জামান দীপু ও আলতাফ মাহমুদ শিকদার।

শরীয়তপুর-২ (নড়িয়া-সখিপুর) আসন থেকে সাবেক ডেপুটি স্পিকার কর্নেল শওকত আলী ছয়বার নির্বাচিত হয়েছেন। বর্তমান সংসদ সদস্য কর্নেল শওকত এবারও দলের মনোনয়ন পাবেন বলে আলোচনা রয়েছে। এ ছাড়া দলটির সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় আছেন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এ কে এম এনামুল হক শামীম ও আওয়ামী লীগ নেতা সুলতান মাহমুদ সিমন।

এ আসনে জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য শফিকুর রহমান কিরণ, দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য জামাল শরীফ হিরু, ডা. কে এ জলিল মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে।

শরীয়তপুর-৩ (ভেদরগঞ্জ-ডামুড্যা-গোসাইরহাট) আসনে আওয়ামী লীগের বর্তমান সংসদ সদস্য নাহিম রাজ্জাক। আগামী সংসদ নির্বাচনেও তিনি প্রার্থী হতে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে। এ ছাড়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অনল কুমার দে, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বাহাদুর বেপারী প্রার্থী হতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে।

এ আসনে বিএনপির প্রয়াত নেতা সাবেক সংসদ সদস্য হেমায়েতউল্লাহ আওরঙ্গজেবের সহধর্মিণী তাহমিনা খান আওরঙ্গজেব, সাইদ আহমেদ আসলাম, মিয়া নুরউদ্দিন অপু মনোনয়ন প্রত্যাশী বলে জানা গেছে।-কালেরকন্ঠ