কোটার কাটায় মেধাবীরা কোণঠাসা

ফাহমিদা হকঃ আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনায় সব নাগরিকের জন্য রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। যেখানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি – সংক্রান্ত অধ্যায়ের ১৯(১) অনুচ্ছেদে সব নাগরিকের জন্যে সমতা নিশ্চিত করার বিধান রয়েছে। মৌলিক অধিকার-সংক্রান্ত অধ্যায়ের ২৯ নম্বর অনুচ্ছেদের ১ নম্বর উপ-অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের জন্য সব নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই অনুচ্ছেদের ৩(ক) উপ- অনুচ্ছেদে নাগরিকদের কোন অনগ্রসর অংশ যাতে প্রজাতন্ত্রের কর্মে উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব লাভ করতে পারে, সে উদ্দেশ্যে শুধু তাদের অনুকূলে বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে। আর সেটাও অনন্ত কালের জন্যে নয়, উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত।

যেমনটি আমরা দেখতে পাই সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসন কোন নির্দিষ্ট সময় পর আবার পর্যালোচনা সাপেক্ষে মেয়াদ কাল নিদিষ্ট করা হয়। বর্তমানে দেশে পাঁচ শতাংশ কোটা রাখা হয়েছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্যে। প্রতিবন্ধী এক শতাংশ, মুক্তিযােদ্ধার সন্তানদের জন্য ৩০ শতাংশ, নারী ও জেলা কোটা ১০ শতাংশ করে। সব মিলিয়ে কোটার জন্যে বরাদ্দ ৫৬ শতাংশ। বাকী ৪৪ শতাংশের জন্যে মেধার প্রতিযোগিতা যাকে বৈষম্যমূলক কোটার বিপরীতে লড়াই করতে বাধ্য করা হচ্ছে মেধাবীদের।

কোটা ব্যবস্থা ঐতিহাসিক এবং আর্থ সামাজিক কারণেই এসেছে। এটা শুধু বাংলাদেশের নয়, পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও রয়েছে এ ব্যবস্হা। যেহেতু কোটা ব্যবস্হার মূল উদ্দেশ্যই অনগ্রসর শ্রেণীকে এগিয়ে আনা, আর সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদে সরকারি চাকরিতে সকল নাগরিকের যেমন সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে তেমনি অনগ্রসর শ্রেণীকে বিশেষ সুবিধা দেয়ার কথা আছে, তাই কোটা বাতিলের দাবিতে সহিংস আন্দোলন না করে যৌক্তিক দাবিতে কাজ করতে হবে।

মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের সাবেক সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেছেন, বাংলাদেশে কোটা ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর এ পর্যন্ত তার ফলাফল মূল্যায়ন করে দেখা হয়নি। উচিত ছিল যেসব জেলা এখনো অনগ্রসর তুলনামূলক বিচারে সেসব জেলায় অন্য অগ্রসর জেলার কোটা বাতিল করে সেখানে দেয়া। তিনি জানান, বাংলাদেশে সরকারি তালিকাভূক্ত মুক্তিযাদ্ধা তিন লাখের বেশী নয়। আর তাদের পোষ্য ১৫ ১৬ লাখ। ১৬ কোটি মানুষের বিপরীতে এই সংখ্যা শতকরা ১ ভাগ। অথচ তাদের জন্য কোটা আছে ৩০ ভাগ। আলী ইমাম মজুমদার মনে করেন, মোট কোটা কখনোই ২০ ভাগের বেশী হওয়া উচিত নয়। ৮০ ভাগ নিয়োগ মেধার ভিত্তিতে না হলে দেশে মেধাবীরা একদিকে বঞ্চিত হবে অন্যদিকে প্রশাসনে মেধার সংকট আরো প্রকট হবে।

১৯৭১ সালে যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের সন্তানদের সুবিধা দেয়ার জন্যে প্রথমে এ কোটা চালু করা হয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের কোটায় যে চাকরী সেটা শুধুমাত্র যুদ্ধাহত মুক্তিযােদ্ধা এবং যারা সরকারের কাছ মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাচ্ছেন তাদের সন্তানদের জন্যে রাখা যেতে পারে বলে মত দিয়েছেন সাবেক মন্ত্রীপরিষদ সচিব আকবর আলী খান। কিন্তু যারা সচ্ছল, তাদের এই কোটা দেয়া মানে অনগ্রসর জনগোষ্ঠিকে বঞ্চিত করা। তাছাড়া কোটা মানে পুরষ্কার নয় যে নাতী-নাতনীদের পর্যন্ত এই ধারা সচ্ছলদের জন্যেও রাখতে হবে।

বর্তমানে দেশে মেধাবীদের বড় অংশ সরকারী চাকুরীতে আকর্ষণ হারানোর পরও যাঁরা আসতে চাইছেন তাদের প্রধান প্রতিবন্ধকতাটি হচ্ছে বৈষম্যমূলক কোটা পদ্ধতি। বর্তমানে বিসিএস পরীক্ষায় নিয়োগের জন্য কোটার বিন্যাস হচ্ছে শতকরা হিসেবে- মেধা ৪৫, মুক্তিযোদ্ধার পোষ্য ৩০, মহিলা ১০, জেলা ১০, উপজাতি (এ নামেই কোটাটি সংরক্ষিত আছে) ৫ এবং প্রতিবন্ধী ১ । যোগ করলে ১০১ হয় বিধায় অনুসন্ধানে জানা যায়, সেই ১ শতাংশ অন্য কোটা পূরণ না হলে তা দেয়া হয়। এসব পদের মধ্যে সনাতন ক্যাডার সার্ভিস ছাড়াও শিক্ষা, স্বাস্হ্য, প্রকৌশল, কৃষিবিজ্ঞান, প্রাণিসম্পদ ইত্যাদি রয়েছে অর্থাৎ আমরা শুধু প্রশাসন, পুলিশ, কূটনৈতিক, হিসাব ও নীরিক্ষা, শুল্ক ও কর- এসব পদেই মেধাবীদের প্রবেশ সীমিত করিনি সীমিত করেছি কলেজ শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষিবিজ্ঞানী সহ সব ক্ষেত্রেই। সাংবিধানিক পদগুলো আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ব্যতীত সব বেসামরিক চাকরিতে এ প্রতিবন্ধকতা বিরাজমান। আর এর পরিণতি কি হতে পারে তা সহজেই সবার অনুমেয়।

অপরদিকে আমরা দেখি, সামরিক বাহিনীতে অফিসার পদে নিয়োগের জন্যে ক্যাডেট বাছাই করতে মেধা ব্যতিত কোন কোটাই নেই। মেধা এবং শুধু মেধাই সেখানে অফিসার পদে নিয়োগের মাপকাঠি। তবে সৈনিক পদে নিয়োগে জেলা কোটা অনুসরণ করা হয়। নির্দ্ধিধায় বলা যায়, সেখানে মাঝারি স্তর পর্যন্ত তাদের পদোন্নতি থাকে সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত। যার কারণে এই জায়গাটাই দেশের সকল মানুষের আস্হার জায়গা।

ড. আকবর আলী খান সহ দেশের বিশিষ্ট জনের মতে কোটা কখনো চিরস্থায়ী কোন ব্যবস্হা হতে পারে না। সংসদে মহিলাদের জন্যে সংরক্ষিত যে আসন সেটা যদি ১৫ কিংবা ২০ বছরের জন্য করে পরে সেটাকে পুনর্মূল্যায়ন করা হয়, তবে ১৯৭২ সালে করা কোটা ব্যবস্হার কেন কোন মূল্যায়ন হবে না। সংবিধান যেখানে বলে কোন রকম বৈষম্য করা যাবে না, সেখানে ১৭ জেলা থাকাকালীন সময়ে চালু হওয়া এই কোটা, বর্তমানে জেলা ৬৪টি করা হলেও সেই কোটা একই রয়ে গেছে, ফলে বেশী জনসংখ্যার জেলাগুলোর মানুষ বেশী চাকরী পাচ্ছেন, যা এক ধরনের বৈষম্য। অন্যদিকে জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে উপজাতি ও প্রতিবন্ধী কোটা সংরক্ষণ করা হচ্ছে না। কোটা ব্যবস্হা ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও রাখতে হবে। তবে কোন অবস্হাতেই সেটা অর্ধেকের বেশী হতে পারে না।

দেশকে শিক্ষা, দক্ষতা ও যোগ্যতার মাপকাঠিতে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইলে মেধাবীদেরকেই বেশী পরিমানে যোগ্য স্হানে অবস্হান করার নিশ্চয়তা দিতে হবেই এটা যেমন সত্যি অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে কোটা ব্যবস্হার মাধ্যমে মূল ¯্রােতে টিকিয়ে রাখতে হবে এবং সেটা নির্দিষ্ট সময়ের মূল্যায়নের ভিত্তিতেই করতে হবে, যাতে কোটা ব্যবস্হার মূল উদ্দেশ্য সার্থক হয়।-লেখক: পরিচালক, সিসিএন ও লেখক