কেঁচো খুঁড়তে সাপের খামার

9

ভাস্কর রাসাঃ পরীক্ষা শব্দটি সভ্যতার শুরু থেকে আজ অবধি আমরা ব্যবহার করে আসছি আমাদের প্রয়োজনে। সব সময়ে সব দেশে পরীক্ষা শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্যার আইজাক নিউটন প্রশ্ন উপস্থাপন করেছিলেন- আপেল কেন মাটিতে পড়ে। এই কেনর উত্তর খুঁজতে তাকে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে হয়েছে। বিভিন্ন দিকে জীবনের বহু ক্ষেত্রে পরীক্ষার প্রয়োজন অপরিহার্য। পরীক্ষা বিষয়ে সরলীকরণ করে বলা যায় যে, বিষয়ের মান যাচাই পদ্ধতিই হচ্ছে পরীক্ষা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিষয়ের অবস্থান নির্ধারণ করতে পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। আবার শিক্ষা ক্ষেত্রে পরীক্ষা হচ্ছে অধ্যয়নের মূল্যায়ন করা। পরীক্ষা করে আমরা বিষয় সম্পর্কে নিশ্চিত হই। আদিকাল থেকে বহু ধরনের পরীক্ষা পৃথিবীতে বিদ্যমান। মিসাইল পরীক্ষা, ঈশ্বরকণার অবস্থান পরীক্ষা, জেনম পরীক্ষা, মহাকাশ গবেষণার পরীক্ষা, অপরাধ পরীক্ষা ইত্যাদি আধুনিকতা বিকাশের প্রয়োজনে সময়ের প্রবাহে এসব পরীক্ষা সম্পৃক্ত হচ্ছে। যে কোনো বিষয়ে পরীক্ষার ওপর নির্ভর করে তার পরবর্তী পদক্ষেপ কী করতে হবে। এ রকম একটি পরীক্ষা চলছে বিশ্বব্যাপী করোনার আঘাত প্রতিহত করতে ওষুধ আবিস্কারের ক্ষেত্রে, এ জন্য চলছে বহুমাত্রিক পরীক্ষা। আবার করোনায় ব্যক্তি আক্রান্ত হয়েছে কিনা সেটি নিশ্চিত হতে দুনিয়াজুড়ে চলছে করোনা পরীক্ষা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশসহ বাংলাদেশেও সরকারের পাশাপাশি সরকার অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানে বেসরকারিভাবে করোনা পরীক্ষা চলছে। বাংলাদেশে করোনা পরীক্ষার নামে সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোতে চলছে যারপরনাই দুর্নীতি।

এ ধরনের অনেক কেন্দ্র থেকে করোনা পরীক্ষা না করেই হাজার হাজার পরীক্ষার মনগড়া রিপোর্ট দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে ধরাও পড়েছে অনেকে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে বিচারের কাঠগড়ায় অপরাধীদের তোলা হচ্ছে। এসব প্রতারকের মধ্যে দু’জন প্রতারক আলোচনায় এসেছে- প্রতারক মোহাম্মদ সাহেদ ও ডা. সাবরিনা। করোনা প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট যা-ই হোক, এই সাহেদ ও সাবরিনা হচ্ছে মানুষরূপী ‘করোনা’।

জীবাণু করোনা মানুষকে যতটা না ক্ষতি করছে, তারচেয়ে এই মানুষরূপী করোনা আরও ভয়ংকর। আক্রমণকারী করোনা যেমন ছোঁয়াচে ব্যাধি, তারচেয়ে অনেক বেশি ছোঁয়াচে এই মানুষরূপী ভাইরাস। তাদের প্রতারণার ভাইরাস ইতোমধ্যে সমাজের বহু স্তরে প্রবেশ করেছে এবং আরও বহু মানুষকে সংক্রমিত করছে। এসব মানুষরূপী করোনার মূল উৎপাটন না করতে পারলে বাংলাদেশ আরও পিছিয়ে পড়বে। এদের প্রতিহত করতে সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে, প্রয়োজনে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। নয়তো বর্বর পিশাচের দল বিশাল জনগোষ্ঠীকে সংক্রমিত করে ফেলবে। মানব পাচারকারী গোত্রীয় করোনা বা নারী পাচারকারী, অর্থ পাচারকারী ও সরকারি সম্পদ লুণ্ঠনকারী করোনায় ছেয়ে গেছে দেশ। হয়তো অল্প কিছুদিনের মধ্যে আক্রমণকারী করোনা পরাস্ত করতে ওষুধ আসবে বাজারে। কিন্তু এসব মানুষ নামের করোনাকে পরাস্ত করতে কঠিন আইনি ব্যবস্থা লাগবে।

সরকারিভাবে করোনা পরীক্ষা করার জন্য যেসব হাসপাতালকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে অনেক হাসপাতালের বিষয়ে জাতীয় প্রচার মাধ্যমে আতঙ্কিত হওয়ার মতো খবর বেরিয়ে আসছে। কেঁচো খুঁড়তে সাপ নয়, এ যেন সাপের খামার বেরিয়ে আসছে। আর স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা একে অপরের ঘাড়ে দোষ চাপাতে ব্যস্ত। এসব খবর এখন দেশ ছাড়িয়ে বিদেশের প্রচার মাধ্যমেও প্রচারিত হচ্ছে। যা দেশের জন্য অপমানজনক। সরকারের ভেতরে যেসব দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তা আছেন, তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি জনগণের দাবি। সেদিন স্বাস্থ্য বিভাগের বেহাল অনিয়ম টেলিভিশনে প্রতিবেদন দেখছিলাম, সেখানে তথ্য পেলাম, দেশে মোট ১৫ হাজার হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার আছে, তার মধ্যে ১০ হাজারেরই কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই। ভেবে দেখুন কী ভয়াবহ চিত্র। প্রথমত, এই ১০ হাজার অবৈধ প্রতিষ্ঠানকে অল্প সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় আনা জরুরি। এসব প্রতিষ্ঠানে কী পরিমাণ ভুয়া ব্যক্তি চিকিৎসা সেবা দিত তারও তো কোনো হিসাব নেই।

স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ক্ষেত্রে চলছে সীমাহীন স্বেচ্ছাচারিতা। মানুষের জীবন নিয়ে চলছে ভয়াবহ প্রতারণা। সেদিন পত্রিকায় দেখলাম র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের হাতে ধরা পড়েছে লাজ ফার্মার কাকরাইলের দোকানে লাখ লাখ টাকার মেয়াদোত্তীর্ণ ও নকল ওষুধ। খুঁজলে দেখা যাবে এ রকম হাজার হাজার সাহেদ-সাবরিনা, লাজ ফার্মা সারাদেশে শক্ত অবস্থান গেড়ে বসে পড়েছে। কঠোর আইনি ব্যবস্থায় এদের দমন করতে না পারলে এরা আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। আজ করোনার কারণে স্বাস্থ্য বিভাগের চিত্রটি সামনে এসেছে। এ রকম মারাত্মক কাণ্ড অন্যসব মন্ত্রণালয়েও হচ্ছে কিনা আমরা সাধারণ মানুষ তা জানি না। দেশের এত বড় নামি হাসপাতাল, সেখানে শুধু করোনা বিভাগেই আগুন লাগে এবং রোগী পুড়ে মারা যায়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে আজ মানুষ পুড়ে মারা যাচ্ছে। এদের কঠোর শাস্তি দিয়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। এই বিশাল সংখ্যক অবৈধ হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার সারাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। অবশ্য আশার সংবাদ হচ্ছে- ইতোমধ্যে এসব অবৈধ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জোরালো অভিযান শুরু করেছে। এই অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে যতদিন পর্যন্ত এদের নির্মূল করা না যায়।

বিদেশে গেলে সেসব দেশের নাগরিকদের সুস্বাস্থ্য দেখে ভালো লাগে আর নিজের দেশের নাগরিকদের দেখি ভগ্নস্বাস্থ্য ও জরা-ব্যাধিতে আক্রান্ত অধিকাংশই। এর অন্যতম কারণ হতে পারে- এসব অবৈধ হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার আর ভেজাল খাদ্যপণ্য। সাধারণ মানুষ সারাদিন পরিশ্রম করে যে অর্থ আয় করে, তা দিয়ে ক্রয় করে ভেজাল খাদ্যপণ্য। এসব ভেজাল খাবার খেয়ে জনগণ অসুস্থ হয়ে অবৈধ হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দ্বারস্থ হয়। তাদের ভাগ্যে জোটে কষ্টের পয়সার বিনিময়ে ভুয়া চিকিৎসা। কী অমানবিক? এর ফলে জনগণ আরও রোগাক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। এখন বাংলাদেশের নব্য ধনীরা শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠা করা থেকে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় বেশি আগ্রহী। কারণ, এখন দেশ অসুখবিসুখের খনিতে পরিণত হয়েছে। মানুষের জীবন-মৃত্যুর প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়া চলবে না। তবে বিশ্বব্যাপী এখন বনৌষধি চিকিৎসা বেশ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। আধুনিক বিশ্বের অনেক দেশে এসব হারবাল মেডিসিন উঁচুদরে বিক্রি হচ্ছে। তার ঢেউ বাংলাদেশেও এসেছে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের হারবাল মেডিসিন গবেষণার ক্ষেত্রে সরকারিভাবে কোনো বড় উদ্যোগ এখন পর্যন্ত পরিলক্ষিত হয়নি। হারবাল মেডিসিন গবেষণা ও বিস্তারে সরকারি উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি। আমাদের দেশে হারবাল মেডিসিনের কাঁচামাল রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে। এসব ঔষধি গুণসম্পন্ন লতাগুল্ম ও বৃক্ষ বাংলার পথেঘাটে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। তার একটি উদাহরণ হচ্ছে- এই শহরের আনাচে-কানাচে দেখতে পাই নয়নতারা ফুল। বেগুনি রঙের চার পাপড়ির ফুল নয়নতারা, পাতাগুলো ঘন সবুজ ও গোলাকার। এই নয়নতারা ফুল থেকে মরণব্যাধি লিউকোমিয়ার ওষুধ তৈরি হচ্ছে এবং বাজারে পাওয়াও যাচ্ছে। আদিকাল থেকে অর্জুন গাছের ছাল হৃদরোগসহ বেশ কয়েক ধরনের অসুখ নিরাময়ে কাজ করে আসছে। তাই প্রায় সব অর্জুন গাছেরই বেশ কিছু অংশের ছাল থাকে না। জনগণ তা ব্যবহারের জন্য নিয়ে যায়। বনৌষধি চিকিৎসা প্রাচীনকাল থেকে এদেশে জনপ্রিয়। তাই আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে হবে চিরচেনা বনৌষধি চিকিৎসাকে।

ভাস্কর্য শিল্পী(সূত্র:সমকাল)