কূটনীতির দূত, রাজনীতির ভূত! পলিটিশিয়ান ব্যারিষ্টার মওদুদ!!

ইঞ্জি: সরদার মো: শাহীনঃ আমার শোনিমকে নিয়ে টোকিওতে এসেছি দু’দিন হলো। লম্বা জার্নিতে এমনিতেই সবাই ক্লান্ত। জেটলেগের কারনে চোখে রাজ্যের ঘুম। রাতে ঘুম, দিনে ঘুম। তবুও ঘুম শেষ হয় না। এর মাঝেও ঢাকায় লেখা পাঠাতে হবে। ছেলেরা তাড়া করছে। এদিকে ক্লান্ত মনে বিষয়বস্তুর সংকটেও আছি। মাঝে মাঝে এমন হয়। বিষয়বস্তুর সংকট হয়। কম্পিউটারে ফাইল ওপেন করে বসে থাকি। সময় গড়িয়ে যায়। বিভিন্ন সাইটে এটা সেটা দেখা হয়। কিন্তু একটা শব্দও লেখা হয় না।
অগত্যা দেশের রাজনীতি নিয়ে লিখতে বসেছি। যখনই আমি বিষয়বস্তুর সংকটে ভুগি, তখনই না পারতে রাজনীতি নিয়ে লিখি। জোড়াতালি দিয়ে কিছু একটা লিখে চালিয়ে দেই। এমনিতে লিখি না; লিখতে ইচ্ছেও করে না। রাজনীতিতে ইদানীং তেমন হট আইটেমও নেই, যা নিয়ে লেখা যায়। কী আর করা! সদ্য পুরোনো হওয়া একটি টপিকস আছে মওদুদ আহমেদকে নিয়ে। ঠিক তাঁকে নিয়ে নয়; তাঁর বাড়ী ছাড়া করার ঘটনা নিয়ে। পুরো দেশবাসী ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেছে। প্রশাসনের লোকজন এসে বাড়ীর মালামাল বাইরে বের করে দিচ্ছে। পাশে মওদুদ সাহেব আইনজীবির পোশাকে দুহাত একসাথে করে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছেন।
অবশ্য সে দৃশ্য এখন পুরোনো। তবে ছবিটি কোনকালেও পুরোনো হবে না। বহুবার, বহু কারনে ছবিটি মিডিয়াতে ঘুরে ফিরে আসবে। বাড়ী যায় যাক; কিন্তু মিডিয়াকে এমন চমৎকার একটি ছবি তোলার সুযোগ মওদুদ আহমেদ কেন করে দিলেন তা আমার মাথায় আসে না। তাঁর তো এ কাজ করার কথা না। তিনি তো চিকন বুদ্ধির লোক। কথা বলেন চিবিয়ে চিবিয়ে। মুচকী মুচকী হাসির একটা আভা থাকে মুখে। যা বলেন আস্তে আস্তে বলেন; সত্য মিথ্যা মিলিয়ে বলেন। ঢাহা মিথ্যেটাকেও সাজিয়ে গুছিয়ে এমনভাবে বলেন; যে কেউই সত্যি মনে করে।
আজকে তিনি সত্যি সত্যি বাড়ী ছাড়া। দেশবাসীর সহানুভূতি নেবার জন্যে অনেক চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ক্ষমতায় থাকতে এই চিকন বুদ্ধির জোরে অনেককেই বাড়ী ছাড়া করেছেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা খালেদ মোশাররফ। একাত্তরের রণাঙ্গনে মাথার খুলি উড়তে উড়তে বেঁচে যাওয়া বীর। খালেদ মোশাররফের পরিবার তাঁর চিকন বুদ্ধির স্বীকার হয়ে বাড়ী ছাড়া হয়েছে। মেয়ে মাহজাবীন খালেদের জবানীতে শোনলেই বিষয়টি পরিস্কার হবে। “২০০৫ সালে মওদুদের ফর্মূলায় খালেদা জিয়ার বোনের ছেলে মাইক্রোবাসে গুন্ডা ভাড়া করে এসে বাড়ি খালি করার জন্য আমার মাকে হুমকি দেন। হুমকি দিয়েই ক্ষান্ত হননি, আমাদের সে বাড়ি থেকে অবৈধভাবে বের করে দিয়েছিলেন। না, কোনো আদালতের আদেশে নয়; সম্পূর্ণ গুন্ডামি করে আমাদের বাড়ি দখল করে নেন।”
শহীদ সুরকার আলতাফ মাহমুদের পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু সরকারের দেওয়া বাড়ি থেকে। সে অবৈধ উচ্ছেদের নেপথ্যে থাকা মওদুদের স্মিত হাসি আজ সময়ের বিচারে ধরা খেয়েছে। তিনি অন্যদের উচ্ছেদে যেমনি পারদর্শী, তেমনি অন্যের সম্পদ দখলে রাখতেও পটু। যে বাড়ী থেকে অবৈধ দখলদার হিসেবে সদ্য উচ্ছেদ হলেন, সেটা দখলে রাখার জন্যে যা কিছু করার সব করেছেন। ইতোমধ্যে খবর বেরিয়েছে মতিঝিলে টয়োটা ভবনে তার যে অফিস, বিগত ত্রিশ বছরে তিনি নাকি ভাড়াই দেননি। তার মালিকও ভয়ে চুপ। মন্ত্রী-নেতা-কাম-ব্যারিস্টার কখন কী প্যাঁচ লাগিয়ে দেন কে জানে!
অবশ্য খবরটি সত্যি কি মিথ্যে জানি না। তবে এটা জানি যে, অজস্র ঘটনা আছে যেখানে মওদুদ আহমেদকে অনায়াসে নাটের গুরু হিসেবে চিহ্নিত করা চলে। মনে পড়ছে ১৯৯০ এর ডিসেম্বরের কথা। এরশাদের গদি তখন টলটলায়মান হলেও ঠিক কবে তার পতন হবে কেউ জানতো না। ৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ছয়টার খবর দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার। এরশাদের খুব কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন দুজন নেতা; একজন প্রয়াত কাজী জাফর আহমেদ, আরেকজন মওদুদ আহমেদ। এক পর্যায়ে মওদুদ এরশাদের বুকে হাত বুলিয়ে সান্তনা দেন। তখনও তার মুখে প্রশান্তির স্মিত হাসি। কারণ তিনি জানতেন, এসবে তার মাথার একটি চুলও ছেঁড়া যাবে না। নিজের চিকনা বুদ্ধির উপর তাঁর অগাধ আস্থা!
তাঁর এই আস্থা রাজনীতিতে তাঁকে অনেক উপরে উঠিয়েছে। কিন্তু জনপ্রিয়তা দিতে পারেনি। নিজ এলাকায় প্রত্যাখ্যাত হয়ে তিনি দুই বার বাইরে থেকে নির্বাচন করে সংসদে গিয়েছেন। একবার এরশাদের ছেড়ে দেয়া আসনে রংপুর থেকে, অন্যবার খালেদার ছেড়ে দেয়া আসনে বগুড়া থেকে। তবে যেভাবেই হোক, এমপি-মন্ত্রী তো ভাল; প্রধানমন্ত্রীও হয়েছেন। অনেক কম বয়সে হয়েছেন উপরাষ্ট্রপতি। আর মাত্র একটি ধাপ পেরুলেই রাষ্ট্রপতি। দেশের সর্বোচ্চ পদ। এত কিছু অর্জনের পরেও আরো পাওয়ার মোহ তাঁকে সব সময়ই নির্লজ্জ করে রেখেছে। না হলে পরবর্তীতে খালেদা সরকারের মন্ত্রীত্বের লোভ তিনি সামাল দিতে পারতেন। কত বড় নির্লজ্জ হলে একজন মানুষ দেশের প্রধানমন্ত্রী ও উপরাষ্ট্রপতি হবার পর অন্য দলের মন্ত্রীসভায় সামান্য মন্ত্রী হতে দ্বিধা করেন না ভাবতে পারেন?
ভাবা কঠিন। এই মানুষটি কার বন্ধু আর কার দুশমন এটা আসলেই ভাবা কঠিন। আমরা কেউ যেমনি জানি না, তিনি নিজেও বোধকরি জানেন না। কেবল জানেন নিজের স্বার্থ আর ক্ষমতার স্বাদের কথা। একদিন খালেদা জিয়ার প্রচন্ড বিশ^স্ত হিসেবে রাজপথ কাঁপিয়ে একটানা তিনদিন এরশাদ বিরোধী মিটিং মিছিল করে পরদিন সন্ধ্যায় মিটিমিটি চেহারায় এরশাদের মন্ত্রীসভায় শপথ নিয়েছেন। সময়ের বিবর্তনে সেই এরশাদকে রাস্তায় ফেলে ফিরে গেছেন আবার খালেদার কাছে। সেই একই মিটিমিটি চেহারায়। মুখে হাসি হাসি ভাব আর চিবিয়ে চিবিয়ে তাঁর কর্মের পক্ষে সাফাই।
তবে সাফাই যতই করুন, যার কাছেই গেছেন, তাঁকে না পঁচিয়ে শান্ত হননি। এরশাদের পতন পর্যন্ত তাঁরটা চেটেপুটে খেয়ে শান্ত হয়েছেন। পরে এপথে ওপথে ঘুরে ফিরে বিএনপির সুুদিনে খালেদার কাছে ফিরে গেছেন। এবং সুযোগ পেলে সব সময় যা করেন, এবারও তাই করেছেন। নিজের আখের গুছিয়েছেন এবং দলের পতন তরান্বিত করেছেন। বিএনপিকে পুনরায় ক্ষমতায় আনার গোপন ফর্মূলা দিয়ে বিচারপতিদের চাকুরীর বয়স বৃদ্ধি করে দিলেন যাতে করে বিএনপি তার পছন্দের সাবেক প্রধান বিচারপতিকে তত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে পায়। বলা বাহুল্য মওদুদ আহমেদের এই একটি কর্মই ২০০৬ সালে বিএনপির পতন ডেকে আনে। এবং গেল এগারোটি বছর ধরে বিএনপি আজো ক্ষমতার বাইরে অবস্থান করছে। লোকে বলে খালেদা জিয়ার ক্যান্টনমেন্টের বাড়ীটিও হাত ছাড়া হয়েছে এই মওদুদের ভ্রান্ত কুটকৌশলেই।
এই জীবনে অনেক ভ্রান্ত কুটকৌশল তিনি নিলেও একটি জায়গায় পাকা কৌশলী তিনি। তিনি সবচেয়ে বড় কৌশলী তাঁর লেখায়। মুখের বচনে আওয়ামী তথা মুজিব বিদ্বেষী, অথচ বই লেখায় সুকৌশলে মুজিব প্রেমী। লেখায় তিনি সুযোগ পেলেই বঙ্গবন্ধুর গুণকীর্তন করেন অথচ মুখ চিবানো বক্তৃতায় ভুলেও সেদিকে হাঁটেন না। করেন বিএনপি; অথচ লেখায় বাঁশও দেন বিএনপিকেই। বিশেষ করে জিয়া এবং তাঁর পরিবারকে বাঁশ দেবার সুযোগ থাকলে কখনোই হাত ছাড়া করেন না। কাজটি তিনি বেশ কয়েকবার করেছেন।
মনে হয় তিনি বুঝেশুনেই এসব করেন। আমার ধারনা, তাঁর এই বুদ্ধিটা কাজে লাগাবেন মৃত্যুর পর। মৃত্যুর পরেও তিনি প্রমাণ করে দেবেন তিনি আসলেই চিকন বুদ্ধির মানুষ। মানুষ তাঁর জীবিতকালীন সকল নীতিহীনতার কথা সময়ের বিবর্তনে এক সময় ভুলে যাবে। চোখের সামনে পরে থাকবে কেবল তার লেখা কিছু বই। যেখানে তার জবানীতে মানুষ সততা খুঁজে পাবে। তিনি ভাল করেই জানেন তাঁর জীবন ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু লেখা চিরস্থায়ী না হলেও দীর্ঘস্থায়ী। এই দীর্ঘস্থায়ী লেখকসত্বা তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে দীর্ঘদিন।
তবে তাঁর শশুরের মত করে নয়। তাঁর শশুর সাহেবও লেখক ছিলেন। অত্যন্ত নামিদামী বিখ্যাত লেখক পল্লী কবি জসিম উদ্দীন! বেঁচে থাকলে অসম্ভব গুণী এই মানুষটি খুব কষ্ট পেতেন। কাজে, কথায় এবং লেখায় তাঁর মেয়ে জামাইয়ের এমন বিপরীতমুখী ভূমিকা দেখলে তিনি কেবল কষ্ট নয়, লজ্জাও পেতেন!! ভীষন লজ্জা পেতেন!!-লেখক: উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা