করোনা দিনের ডায়েরী…

35

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ হালকা চাপদাঁড়ির কারণে ওকে বেশ লাগে। দেখতেও যথেষ্ট হ্যান্ডসাম। একমনে নিজের জগতে বিচরণ করা চুপচাপ এবং নম্রভদ্র টাইপের ছেলেটি ওমর ফারুক। পেশায় আর্কিটেক্ট। ক্যারিয়ারে মন্দ করছে না। দেশ থেকে উন্নত বিশ্বে এসে সবাই নিজের ক্যারিয়ারে থাকতে পারে না। ফারুক পেরেছে। কানাডায় এসে আর্কিটেকচারে উচ্চতর লেবেলে পড়াশুনা করে দিব্বি আর্কিটেক্ট হিসেবেই নিজেকেই প্রকাশ করতে পেরেছে।

করোনা ক্রান্তিকালে এই আর্কিটেক্ট ছেলেটিও বদলে গেছে। বর্তমানে সে যত না আর্কিটেক্ট, তারচেয়েও ঢের বেশী একজন সমাজ কর্মী। বেশভূষায় এবং ভাবসাবেও পাক্কা সমাজকর্মী। ভাবটা এমন যে, করোনায় ডরে না সে। আশেপাশের অনেককে নিয়েই ওর টেনশান। টেনশান আমাদেরকে নিয়েও। ভীষন টেনশান। নিজে মরি মরি, আঙ্কেলকে মরতে দেয়া যাবে না! ওর ধারণা, মাঝবয়সী এই আঙ্কেল ঘর থেকে বের হলেই করোনা খপ করে ধরবে।

ধরবে মানে, ছাই দিয়ে ধরবে। নাক দিয়ে ঢুকে ফুসফুস ছ্যাড়াবেড়া করে দেবে। তাই পণ করেছে। বাজারঘাট করার নামে আঙ্কেলকে কিছুতেই বাইরে যেতে দেবে না। আঙ্কেলও মহা তেদর। ভাল করে জানে, কিভাবে নিতে হয় আদর। তাই বুড়ো ভাবটা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। কেয়ারিং এর আতিশয্যে সারাদিন ঝিমোয় আর বিকেল হলেই অপেক্ষায় থাকে। ফারুকের অপেক্ষায়। এই বুঝি ফারুক আসছে।

ফারুক প্রায়ই আসে। কোনদিন বাজার থেকে গাদাগাদা শপিং করে নিয়ে আসে। কোনদিন রান্না করা খাবার। শাওন বাসায় বসে রেঁধে দেয় আর ফারুক নিয়ে আসে। পোটলা ভরে নিয়ে আসে। শাওন-ফারুক দম্পতির এমনি আদরমাখা সেবায় করোনাতেও মন্দ নেই। বলা যায় মহাসুখেই আছি। দিনে দুইবেলা করে খাওয়ার দিনগুলি আর নেই। পেট ভরে খেতে পারি এখন। প্রবাসের সীমিত জীবনে ভালভাবেই পার করছি বন্দিদশার ৭২ তম দিন।

বন্দিজীবন বড় অদ্ভুত। বাইরে যাবার উপায় নেই। বাইরের অবস্থাও এখনো টালমাটাল। দৈনিক আক্রান্ত আর মৃত্যুর সংখ্যা বাংলাদেশের চেয়ে অনেক অনেক বেশী। পাশের নিউইয়র্ক তো মেছাকার হয়ে গেছে। লাশের সারিতে ছেয়ে গেছে। আলহামদুলিল্লাহ! সে তুলনায় বাংলাদেশ অনেক সেফ! আল্লাহ্পাক এখনো অনেক হেফাজতে রেখেছেন দেশবাসীকে। দেশের মানুষ ভালই আছে।

বেশী ভাল আছে, তারা; যারা নিজেদের ভাল থাকা আর ভাল লাগা ছাড়া অন্যের ভাল থাকা নিয়ে মোটেই ভাবে না। তারা মহা ভাল আছে। পত্রপত্রিকা, রেডিও, টিভিতে জ্ঞান দিয়ে বেড়ানো এইসব মানুষেরা ফেসবুক পেজে যা লেখে, তা দেখলে তেমনি মনে হয়। দেশের দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের সব দায়িত্ব সরকারের ঘাড়ে দিয়ে নিজেরা ব্যক্তি জীবনে আয়েশী জীবন যাপন করে।

তেমনি একজন আয়েশী লিখেছেন, “চাইনিজ রেস্টুরেন্ট বন্ধ থাকার কারণে মেয়ের জন্মদিনে যেতে পারিনি। বাসাতেই চাইনিজ ফুড রান্না করেছিলাম। ফ্রায়েড রাইস, ফ্রায়েড চিকেন, ক্যাশ্যু নাট সালাদ। সবাই খুব তৃপ্তি করে খেয়েছে। ঠিক করেছি, আজ থেকে রোজই একটা করে নতুন আইটেম রান্না করব। আজ করব থাই স্যুপ আর ক্যাশ্যু নাট সালাদ। কোয়ারেন্টাইনের কারণে আর কিছু না হোক, অন্তত নতুন নতুন রান্না শিখছি, করছি। এটাও বিরাট লাভ। আর ওজন? সেটা কবেই বা কম ছিল?

সামাজিক ওজনের পাশাপাশি এদের দেহের ওজনও কম নয়। কোনকালে কম ছিলও না। চাপা মেরে মেরে আর খেয়ে খেয়েই এমন হয়েছে। আগেও খেত, এখনো খায়। সরকার যখন জনগণের খাদ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে অস্থির, দেশের বড় একটা অংশ যখন নিজেদের খাদ্যযোগাড় নিয়ে দিশেহারা, তখনও তারা খাচ্ছে। নতুন নতুন আইটেম রাঁধছে আর জিহ্বায় চেখে খাচ্ছে। গলা পর্যন্ত খাচ্ছে।

পাশাপাশি কেবল খাওয়া নয়, নির্লজ্জের মত সে সব ছবি পোষ্ট দিচ্ছে। যা দেখে বুভুক্ষ মানুষের গা ছমছম করে উঠছে। এভাবে হাজারো ক্ষুধার্থের সেন্টিমেন্ট বিবেচনায় না নিয়ে নিজের রাজকীয় খানাপিনার ছবি দেখিয়ে প্রমাণ করছে মনুষ্য প্রজাতির সবচেয়ে নিকৃষ্ট কিট এরা। অধমেরও অধম। অসম্ভব বিকৃত রুচীর। ধিক এসব সুশীল নামধারী বিকৃতশীলদের! ধিক তাদের শতাধিক!!-লেখক: উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা।
১৬ই মে, ২০২০