করোনা দিনের ডায়েরী…

15

ইঞ্জি: সরদার মো: শাহীন: ঘুম ভাঙার পর প্রথম কাজই হলো মোবাইলটায় হাত দেয়া। হাতে নিয়ে মিটমিট চোখে পিটপিট করে মোবাইল দেখি। বালিশে মাথা রেখেই দেখি। প্রথমেই দেখি টাইম। কয়’টা বাজলো! দেরী হয়ে গেলে ‘হায় আল্লাহ্’ বলে ধড়ফড় করে উঠে জোহর পড়ি। জোহরের সময় পর্যাপ্ত থাকলে উঠি না। বিছানা ছাড়ি না। আলসেমী করি। আলসেমী উপভোগের সর্বশেষ্ঠ জায়গা হলো বিছানা। বিছানায় শুয়েই জমে থাকা ম্যাসেজগুলো আগে চেক করি। ম্যাসেজের কি শেষ আছে! কত্ত ম্যাসেজ! ম্যাসেজের পাহাড় জমে যায়। নানা ধরণের ম্যাসেজ।

ম্যাসেজ কেবল আমার একার নয়, শোনিমেরও আসে। এক বালিশে মাথা রেখে বাপবেটা দুজনে পাশাপাশি শুয়ে যার যার ম্যাসেজ পড়ি। শোনিম মনে মনে পড়লেও হাসে খিটখিট করে। খিটখিট করে আমিও হাসি। তবে সব সময় না। হাসার মত ম্যাসেজ আসলেই কেবল হাসি। আজও হেসেছি একজনের ম্যাসেজে, “করোনা নিয়ে আপনার লেখা আমার ভাল লাগে। কেবল ভাল লাগে না আপনার ইয়াং সাজার চেষ্টাটা। কি দরকার মাথায় কালি মাখার। বুইড়া হইছেন, বুইড়ার মত থাকেন।”

অস্বীকার করবো না; কলিজায় কিচ করে কামড় পড়েছে। একটু বেশীই পরেছে আজ। দিনে দিনে তো আর কম বেলা হলো না। ম্যাসেজ প্রেরক আমাকে সেটাই মনে করিয়ে দিয়েছে। তবে প্রশংসাও করেছে অনেক। কেবল সে নয়; ইদানীং অনেকেই প্রশংসাসমেত উৎসাহমূলক ম্যাসেজ পাঠাচ্ছে। শব্দচয়নে ভিন্নতা থাকলেও ম্যাসেজের মূলভাবে কোন পাথক্য নেই। সবাই সিমেক ফাউন্ডেশনের কাজের খুব প্রশংসা করছে। আগেও করতো। তবে এতটা না। এখন বেশী বেশী করছে।

করোনার কঠিন দিনে সিমেক নিত্যদিন অসহায়দের দুয়ারে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছে; কাউকে দিচ্ছে কাঁচা সামগ্রী, কাউকে রান্না। নগদ টাকাও দিচ্ছে। এসবে সবাই পুলকিত, আনন্দিত। সবার ভাল লাগছে। দুরদেশে বসে এসব দেখতে আমারও ভাল লাগে। আমি নিজেও এসব কাজে বেশী সময় দিচ্ছি। মূহুর্তে মূহুর্তে সব কিছুর খবরাখবর রাখছি। রাখতে ভাল লাগে, তাই রাখছি। ভাল আমার বরাবরই লাগে। ইদানীং বেশী ভাল লাগে সিমেক ইন্সটিটিউটের ভাইস প্রিন্সিপাল শরীফের সাহসীপনায়। ভীষণ নিবেদিত প্রাণকর্মী। আল্লাহর রাস্তায় জানপ্রাণ সপে দেয়া একজন সত্যিকারের কর্মী।

শুকরিয়া আল্লাহ্ পাকের দরবারে! শুধু শরীফ নয়, সিমেক গ্রুপটাই এমনি সত্যিকারের নিবেদিত কর্মীতে ভরপুর। যার যার নিজ নিজ জায়গা থেকে যে যতটুকু পারছে প্রাণ উজাড় করে দিচ্ছে সিমেকের জন্যে। লকডাউন সিমেককে থামাতে পারেনি। লকডাউনের আগে গ্রুপের হাসপাতালটি ছাড়া আর সব ইউনিট দিনে কাজ করতো, রাতে ঘুমাতো। এখন কেউ ঘুমায় না। দিনেও ঘুমায় না, রাতেও না।

রাতে না ঘুমিয়ে আজ একজন সিমেকিয়ান ম্যাসেজ দিয়েছে, স্যার! আপনি ঈদ বোনাসও দিলেন! এক বাসায় আমরা তিনজন থাকি। কাজ করি আলাদা অফিসে। ওরা দুজনার কেউ গেল দুমাস ধরে বেতনই পাচ্ছে না। আর আপনি নিয়মিত বেতনের পাশাপাশি ঈদ বোনাসও দিলেন! আপনাকে কোনদিন দেখি নাই, স্যার! খুব দেখতে ইচ্ছে করে আপনাকে!”

আমারও খুব দেখাতে ইচ্ছে করছে ম্যাসেজটি। আব্বা থাকলে ম্যাসেজটি দেখে খুব খুশী হতেন। সাধারণ চাকুরীজীবি বাবা আমার। সরকারী চাকুরী। এরশাদের আমলেই অবসরে যান। রাষ্ট্রপতি এরশাদের উপর আব্বা খুব খুশী ছিলেন। তিনিই সর্বপ্রথম এদেশে পে-স্কেল ঘোষণা দেন এবং সরকারী চাকুরীজীবিদের জন্যে ঈদ বোনাস চালু করেন। এর আগে মানুষ জানতো ঈদ কী জিনিস! জানতো না ঈদ বোনাস কী!

ঈদবোনাস চালুর ঠিক আগের বছরের ঘটনা। টানাটানির সংসারের কর্তা হিসেবে আব্বা গেছেন ঈদ বাজার করতে। চালের দোকানদারকে বাকী পাওনার বড় অংশ পরিশোধ করে নতুন বাকীতে পোলাওয়ের চালসহ সারামাসের চাল নিয়ে আসবেন। দোকানদার টাকা নিলো বটে! কিন্তু আব্বাকে চাল দিলো না। কিছুতেই দিল না। আব্বা খুব আকুতি মিনতি করলেন। ঈদের দোহাই দিলেন। দোকানদার নাছোড়বান্দা; দেবেই না।

কাল ঈদ! আব্বা ঈদসদাই করতে পারলেন না! খালি হাতে চোখ মুছতে মুছতে বাসায় ফিরলেন। আজ বেঁচে থাকলে চোখ মুছতেন। তবে কাঁদতে কাঁদতে নয়! হাসতে হাসতে! সিমেকের সবাইকে বোনাস দেবার কথাটা শুনে খুব হাসতেন বাবা আমার! জল ছলছল চোখে হাসতে হাসতে বলতেন, “বেশ করেছিস, বাবা! কাজের কাজ করেছিস! তুইই তো দিবি। এই ঈদে তুই দিবি না, তো কে দেবে! তোর তো সব আছে। তুই ছাড়া ওদের তো আর কেউ নেইরে, বাবা!!”

আজ আমার হয়ত অনেক কিছুই আছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় সম্পদ, আমার আদর্শ; সেই বাবাই নেই! করোনার এই কঠিন দিনে তাঁকে খুব দরকার ছিল। তিনি বেশ বুঝতেন আমার সমস্যা। বুঝিয়ে বলতেও পারতেন করোনা সমস্যার কঠিন গভীরতা। বলতেন সারা পৃথিবী তথা দেশের জন্যে সমস্যার ভয়াবহতা। সিমেকের জন্যে তো বটেই। কিন্তু ভাবতে নিষেধ করতেন। বলতেন, “সমস্যা যত আছে, সমাধানও আছে। সমাধানবিহীন কোন সমস্যা এই পৃথিবীবাসীকে আল্লাহ আজো দেননি। এবারও দেননি। এবারও বেঁচে যাবো ইনশাল্লাহ!” আসলেই তো; ভাবার কী আছে! আজকের এই দিনে করোনা আমার সমস্যা!! কিন্তু সিমেকের তোমরা সবাই যে আমার সমাধান!!!-লেখক:উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা।
১৯ই মে, ২০২০