করোনাকালে দুই ফ্রন্টের লড়াই

3

তুষার কণা খোন্দকারঃ দেশের মন্ত্রী-এমপি, আমলা, রাজনীতিক, ধনিক সমাজ, প্রায় সবাই এখন গৃহবন্দি। গৃহবন্দির আগে স্বেচ্ছায় শব্দটি সচেতনভাবে এড়িয়ে গেলাম কারণ করোনা ভাইরাস ভয় দেখিয়ে তাদেরকে ঘরে আটকে দিয়েছে। গৃহবন্দি অবস্থায় তারা করোনা সমস্যা মোকাবেলায় কতটুকু চেষ্টা করছেন সেটা অবশ্য আমরা চর্মচক্ষু দিয়ে দেখতে পাচ্ছি না। কেউ কেউ ভিডিও বার্তার মাধ্যমে ‘জনসেবা’ করে যাচ্ছেন। কিন্তু তাতে করে এই প্রশ্নের মীমাংসা হয় না যে, যথেষ্ট সময় পেয়েও তারা কেন পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিলেন না।

আমরা সাধারণ মানুষ ক্ষুধা এবং করোনা এই দুই সমস্যার সাথে একযোগে যুদ্ধ করতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। আমাদের মনে কোন খেদ থাকত না যদি দেখতাম বর্তমান পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত কাটিয়ে উঠার জন্য কোন কর্মপরিকল্পনা তৈরি হচ্ছে। ভবিষ্যতের জন্য কাজ করতে দেখলেও আমাদের মনে একটা ভরসা থাকত। করোনা চিকিৎসার জন্য যেসব হাসপাতালে মানুষ ভিড় করছে, সেখানে চিকিৎসার নামে মানুষ কি পাচ্ছে- এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা কথা ও অভিযোগ ঘুরে বেড়াচ্ছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের উচিত এ ব্যাপারে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া।

করোনায় মৃত্যু ও দাফনের খবর দেখে অনেকে প্রার্থনা করছে, আল্লাহ মাবুদ, আমার হায়াত ফুরিয়ে গেলে তুমি যে কোন অসুখের অছিলায় আমাকে দুনিয়া থেকে নিয়ে যাও। কিন্তু তুমি আমাকে করোনা রোগ দিও না। আমার মৃত্যু এত মর্মান্তিক হোক তা আমি চাই না। বর্তমানে কঠিন করোনা নিদানে আমরা সবাই হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি, আমাদের বর্তমান মুক্তকচ্ছ ভবিষ্যৎ হোচটে ভরা। অবশ্য যাদের কাছে জীবনের অর্থ দিন গত পাপ ক্ষয় অর্থাৎ সারাদিন গায়ে খেটে দিনের শেষে যারা সংসারের রুটি-রুজির বন্দোবস্ত করে তাদের কাছে করোনাভীতি রীতিমত বিলাসিতা। পেটের ক্ষুধায় ধুকে ধুকে মরার চেয়ে তারা করোনার ঝুকি মাথায় নিয়ে পথে নেমেছে। সাংবাদিকরা তাদেরকে প্রশ্ন করছে, আপনি ভয়ঙ্কর করোনা রোগের খবর জানেন নিশ্চয়ই। তবুও কেন পথে বের হয়েছেন? জবাবে তারা বলছে, দিনের শেষে চাল-ডাল-তেল নুন জোটাতে হবে। সেই সাথে আছে মাসের শেষে ঘরভাড়া মেটানোর দুশ্চিন্তা।

এখন জুন মাস। সরকার বাজেট ঘোষনা করবে। আগামী বছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাত অগ্রাধিকার পাবে বলে সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানতে পারছি। করোনার ধাক্কায় স্বাস্থ্য খাতের যে জীর্ন চিত্র এখন মানুষের চোখে উদাম হয়ে গেছে তাতে স্বাস্থ্য খাতে বাড়তি বরাদ্দ দেওয়া হবে শুনে জনগণের দীর্ঘশ্বাসের দৈর্ঘ বেড়ে যাচ্ছে। মানুষ ভাবছে, প্রতি বছর বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। স্বাস্থ্য খাতের টাকা কোথায় গিয়েছে, কে খেয়েছে সে প্রশ্নের জবাব নেওয়া না হলে ওখানে টাকা বরাদ্দ দিয়ে ফায়দা কি হবে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দূর্দশা দেখে মনে হয় ওটি এখন তলাবিহীন ঝুড়ি।

স্বাস্থ্য সেবার উন্নয়ন ও বিকাশ কি কেবল বড় সাইজের কিছু দালান তোলার মধ্যেই সীমিত? স্বাস্থ্য সেবার নামে দেশের যেখানে সেখানে সরকারি-বেসরকারি আলীশান দালান আর তার গায়ে অমুক হাসপাতাল তমুক হাসপাতালের চকচকে সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখে পাবনা অঞ্চলের গ্রাম্য গীত মনে পড়ছে। বিয়ের আসরে মেয়েরা দল বেঁধে গীত গায়, ‘দালান দেখে দিছিস বিয়ে, খা গিয়ে মা তোর দালান ধুয়ে, যাগে মা তোর জামাই বাড়ি, আমি যাব না।’ বকপক্ষির ডানার মত ধবধবে সাদা রঙের সুবিশাল দালানকোঠার বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখে এতদিন মুগ্ধ হয়েছি। হাসপাতাল নামের দালানগুলোর ভিতরে কি আছে না আছে সেটি জানার চেষ্টা করিনি। আমাদের চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দেওয়ার জন্য কি হাসপাতালের নামে বড় বড় দালান কোঠা বানিয়ে তাতে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে? দালানের ভিতরে স্বাস্থ্য সেবার কোন উপকরণ, স্বাস্থ্য সেবা দেওয়ার উপযুক্ত লোকবল কোন কিছু যেখানে উপস্থিত নাই সেই দালান কোঠা নিয়ে আমরা কি গীত গাইতে পারি ?

দুনিয়াজুড়ে করোনার থাবায় অনেক দেশের মত আমাদের দেশেও চিকিৎসা এবং অর্থনীতি যখন যুগলবন্দি হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম, তখন সবার মনে সারাক্ষণ ভয়ের আনাগোনা। আমাদের মনে ভয় করোনা যদি আমাকে ধরে কাবু করে ফেলে তাহলে চিকিৎসার জন্য কোথায় যাব! করোনা যদি আমার নাগাল নাই পায় তবুও অন্যান্য রোগভোগের ভয়তো থাকেই। ভাবনা হয়, সাধারণ কিংবা কঠিন কোন অসুখ বেধে গেলে আমাদের মত সাধারন মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার উপায় কি!

করোনার ভয়ে ভীত মনের এমন বেগতিক দশা নিয়েও দেশের সরকারি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল খুলতে হয় খবর পেতে। তখন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মাঝে মাঝে ভিডিও বার্তায় জনগনের উদ্দেশ্যে কী বলেন, আমরা সে কথা একবারেই বুঝতে পারি না। আমরা করোনা সংকটে এমনিতেই মানসিক যন্ত্রনায় আছি। স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে দেখলে ভরসা হারিয়ে আরও বেদিশা বোধ করি।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলো করোনায় মৃত্যুর মিছিলের মধ্যে লকডাউন শিথিল করার পরিকল্পনা করছে এবং পর্যায়ক্রমে সেটি বাস্তবায়ন করতে শুরু করেছে। করোনা রোগের ভ্যাকসিন এবং করোনা চিকিৎসায় কার্যকর ওষুধ পেতে দুনিয়াকে আরও কতদিন অপেক্ষা করতে হবে সে সম্পর্কে আমরা সবাই এখনও অন্ধকারে। লকডাউন দিয়ে সাময়িক সময়ের জন্য করোনার বিস্তার ঠেকিয়ে রাখা গেলেও বাংলাদেশের মত গরিব দেশ লকডাউনের বিলাসিতা বেশিদিন চালিয়ে যেতে পারবে না এই বাস্তবতা আমাদেরকে মানতে হবে।

ক্ষুধা এবং করোনা এই দুটি ভয়ঙ্কর শত্রুর সাথে লড়াই করার সক্ষমতার উপর আমাদের অস্তিত্ব নির্ভর করছে। করোনা এবং ক্ষুধার বিরুদ্ধে জিততে হলে বিভেদ ভুলে সৎ এবং যোগ্য মানুষদেরকে একজোট হতে হবে। সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ একা করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করে জয়ী হবে সেটা বিশ্বাস করতে পারি না। বরং বিশ্বাস করি, সরকারের সব বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ এবং গণমানুষের সচেতনতা এক পাত্রে এসে মিললে করোনাকে হারিয়ে দিয়ে আমরা দেশের অর্থনীতির চাকা সচল করতে পারব।লেখক: কথাসাহিত্যিক ( সূত্রঃ সমকাল)