করোনাকালে চিকিৎসায় বেহাল দশা

2

মিজান মালিকঃ দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে গুরুতর অসুস্থ রোগী জরুরি চিকিৎসা নিতে গিয়ে চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অনেক হাসপাতালে রোগী ভর্তিই করছে না। ফলে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরতে ঘুরতে রোগীর মৃত্যর ঘটনা ঘটছে।

এ ধরনের অনেক ঘটনা গণমাধ্যমে এলেও কর্তৃপক্ষ চিকিৎসার বিষয়টি আমলেই নিচ্ছে না। সারা বছর বেসরকারি হাসপাতাল রোগীর কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ আদায় করলেও এখন আর সেই রোগীকেই চিনছে না। অথচ দেশে করোনা রোগীর শনাক্ত হওয়ার পর শুরুতেই বলা হয়েছিল, কোভিড ও নন-কোভিড রোগীদের জন্য অবশ্যই চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। যাতে কেউ চিকিৎসা বঞ্চিত না হয়। কিন্তু বাস্তবতা অত্যন্ত করুণ। দেশে গত ৮ মার্চ প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর থেকে একের পর এক অসুস্থ রোগী বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে। একটু চিকিৎসার জন্য প্রতিনিয়ত শত অনুনয় করেও হাসপাতালে ভর্তি হতে পারছে না অসংখ্য রোগী।

ভুক্তভোগীদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে ও খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়, মার্চের ২০ তারিখের পর থেকে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলো তাদের চরিত্র বদলাতে থাকে। ওই মাসে করোনার কিছু রোগী সেবা পেলেও এপ্রিল থেকে শুরু হয় দ্বিমুখী আচরণ। করোনা উপসর্গ নিয়ে কেউ ভর্তি বা আউটডোর চিকিৎসা নিতে চাইলে সরাসরি ফিরিয়ে দেয়া হয়। শুধু করোনা উপসর্গ নয়, হার্টঅ্যাটাক বা স্ট্রোক করা রোগী নিয়ে স্বজনরা হাসপাতালে গেলে তাদেরও ভর্তি নিচ্ছে না।

নিত্যানন্দ বর (৫০)। হাইকোর্টের একজন বিচারপতির আত্মীয়। করোনা উপসর্গ নিয়ে রোববার রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির জন্য তাকে নেয়া হয়। সূত্র জানায়, রাতে ওই বিচারপতি তার আত্মীয়র চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে নিজেও যোগাযোগ করেন। কিন্তু কারও কাছ থেকে তেমন কোনো সাড়া পাননি। তিনি রাত আড়াইটার দিকে সিনিয়র সাংবাদিককে ফোন করে তার সহায়তা চান।

ওই সাংবাদিক বলেন, রাত তিনটা পর্যন্ত বিচারপতি তার নিজের পরিচয় দিয়ে এবং আমি আমার নিজস্ব জানাশোনার মাধ্যমে চেষ্টা করি। একা ঘণ্টা চেষ্টার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তির সুযোগ হয় নিত্যানন্দ বরের। এরপর রোগীকে পাঠিয়ে দেয়া হয় নতুন ভবনের এক ওয়ার্ডে। কিন্তু রোগীকে ওয়ার্ডে নেয়ার লোক নেই। রোগী জরুরি বিভাগে পড়ে থেকে অক্সিজেনের অভাবে ছটফট করতে থাকে।

অবস্থা বেগতিক দেখে রোগীর ছেলে কৌশিক এবং তাদের সঙ্গে থাকা অন্য একজন বরকে ওয়ার্ডে নিয়ে যান। কিন্তু কোনো ডাক্তার বা নার্স রোগীকে দেখতে আসেনি। তিনি পাননি অক্সিজেন সাপোর্ট। এক ওয়ার্ড থেকে আরেক ওয়ার্ড এভাবে ঘুরতে ঘুরতে ট্রলিতে রোগীর দেহটা নিথর হয়ে যায়। রোগীকে মৃত ঘোষণার জন্য কেউ আসেনি। অনেক অনুরোধের পর ভোর সাড়ে ৫টায় একজন ডাক্তার রোগীকে মৃত ঘোষণা করেন। বিনা চিকিৎসায় মারা যান বর।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের এক পরিচালক বলেন, তার বড় ভাই কয়েকদিন আগে স্ট্রোক করে। তারা থাকেন চট্টগ্রামে। রোগীকে ভর্তির জন্য এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতাল। এভাবে সারারাত ৮টি হাসপাতালে ভর্তির চেষ্টা করেছেন। অনেক অনুনয় বিনয় করেছেন। কিন্তু কেউ ভর্তি নেয়নি। সকালের দিকে তার ভাই মারা যান। কেন তাকে ভর্তি নেয়নি- এমন প্রশ্নে ওই কর্মকর্তা জানান, হাসপাতালের লোকজনের ধারণা ছিল আমার ভাই করোনা রোগী।

আমরা হয়তো তাদের বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছি। তিনি করোনা রোগী নন। তা না হলে কেন চিকিৎসায় এই অবহেলা করা হল। তিনি নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে। এভাবে একটা সেক্টর চলতে পারে না। সারা বছর সরকারি হাসপাতালে কেনাকাটার নামে লোপাট হয়েছে। আর বেসরকারি হাসপাতাল রোগীর পরীক্ষা নিরীক্ষা ও ভর্তির পর রোগীকে জিম্মি করে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। এখন তারা মুখ ফিরিয়ে নিলে ব্যবস্থা নেয়া দরকার।

রাজধানীর পান্থপথে বিআরবি হাসপাতালের আইসিও বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডা. সাজ্জাদুর রহমানের করোনা উপসর্গ দেখা দিলে নিজের হাসপাতালেই চিকিৎসার সুযোগ পাননি। অনেক চেষ্টা তদবির করে তিনি ঢাকা মেডিকেলের আইসিইউতে ভর্তির সুযোগ পান। ওই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে আইসিইউ সাপোর্ট না পেয়ে মারা যান যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা ও একজন পীরের স্ত্রী সামিরা জাবেরী। ৩০ মে রাত ১০টার দিকে সামিরা করোনা উপসর্গ-শ্বাসকষ্ট নিয়ে ওই হাসপাতালে ভর্তি হন। আইসিইউ বিভাগে ২০টি ভেন্টিলেটরের মধ্যে বেশিরভাগ খালি পড়ে আছে। অভিজ্ঞ চিকিৎসক সংকটের অজুহাতে তাকে অক্সিজেন সাপোর্ট দেয়া হয়নি। এ বিভাগের এনেসথেসিয়া চিকিৎসকও অপারগতা প্রকাশ করেন। ওই রাতেই চিকিৎসা না পেয়ে সামিরা জাবেরী মারা যান।

এক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক একজন পরিচিত চিকিৎসকের ফোন ও কষ্টের কথা পোস্টে তুলে ধরে জানান, ‘একজন পরিচিত চিকিৎসক ফোন করলেন। বললেন, তার পরিচিত একজন গর্ভবতী নারী করোনায় আক্রান্ত। গত রাতে ইউনাইটেড, এভারকেয়ারসহ সব পাঁচ তারকা হাসপাতাল ঘুরে ভর্তি হতে পারেনি। সকালে যান অন্য হাসপাতালে। চিকিৎসক নিজের অসহায় অবস্থার কথা বলছিলেন বারবার। ইচ্ছা থাকলেও সেই নারীকে নিজের হাসপাতালে ভর্তি করাতে পারেননি।’

আরেক চিকিৎসক খাইরুল ইসলাম তার কষ্টের কথা তুলে ধরে বলেন, “ঝিনুকে মুক্তা হলে চুপ হয়ে যায়, মুখ খোলে না। ঝিনুকে মুক্তা হলে চুপ হয়, আমরা অসহায় হলে চুপ হয়ে যাই।’

সারা বছর ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসা নেন এমন একজন রোগী স্ট্রোক করলে কয়েকদিন আগে ওই হাসপাতালে নিয়ে যান স্বজনেরা। জরুরি বিভাগে নেয়ার পর তার শরীরের তাপমাত্রা ও প্রেসার মাপা হয়। তাপমাত্রা ছিল স্বাভাবিক। এরপর রোগীকে কেবিনে ভর্তি করা হয়। পরদিন সকালে রোগীর শরীরের তাপমাত্রা বেশি হয়। এরপর তার কোভিড স্যাম্পল নেয়া হয়। ৪-৫ ঘণ্টা পর এসে মৌখিকভাবে জানানো হয়, রোগী পজেটিভ। তাই হাসপাতাল ছাড়তে হবে।

তখন রাত হয়ে গেছে। নিরুপায় হয়ে যান স্বজনেরা। তারা ৭৫ হাজার টাকা বিল পরিশোধ করে হাসপাতাল থেকে রোগী নিয়ে আসেন। বাসায় আনার পর তার কোভিড স্যাম্পল আবারও পরীক্ষা করা হলে নেগেটিভ রিপোর্ট আসে। রোগীর একজন স্বজন বলেন, ৫ ঘণ্টার মধ্যে তারা কী টেস্ট রিপোর্ট দিলেন বুঝলাম না। যদি রোগীর করোনা শনাক্তও হয়, আমরা নিজেরা কেবিনেই থেকে চিকিৎসা নিতাম। সেই সুযোগটিও দেয়া হয়নি। বাসায় চিকিৎসাধীন ওই রোগীর অবস্থা এখন একটু ভালো।

এমন বাস্তবতায় সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে আরও দায়িত্বশীল ও মানবিক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তা না হলে চিকিৎসা ব্যবস্থা একেবারে ভেঙে পড়বে। আর এর দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে। তারা বলেন, কোভিড রোগীরও চিকিৎসা দেয়া সম্ভব। যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে নিজের সুরক্ষা নিশ্চিত করে বিদেশেও চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে চারজন ভিআইপি সম্প্রতি থাইল্যান্ডে চিকিৎসার জন্য গিয়েছেন। তাদের তো সেই দেশের হাসপাতাল ফিরিয়ে দেয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান বলেন, আমি মনে করি রোগীর আগে ইমার্জেন্সি ট্রিটমেন্ট দরকার। এ অবস্থায় কোনো রোগীর করোনা উপসর্গ থাকলে তাকে কোভিড চিকিৎসার ব্যবস্থা করা উচিত। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন-বিএমএ সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বলেন, হাসপাতালে রোগীরা চিকিৎসা পাচ্ছে না- এমনটি মোটেও ঠিক হচ্ছে না কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

আইইডিসিআরের পরামর্শক প্রফেসর ডা, মোস্তাক হোসেন বলেন, করোনাভীতির কারণে রোগী ভর্তি নিতে চায় না কোনো কোনো হাসপাতাল। আমি মনে করি, ডাক্তারদের সুরক্ষার জন্য তারা এমনটি করছে। তবে রোগীকে ফিরিয়ে না দিয়ে ভর্তির পরও করোনা টেস্ট করতে পারে এবং চিকিৎসা দিতে পারে।যুগান্তর