করোনা দিনের ডায়েরী…

38

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ করোনা আছে এবং করোনা থাকবে; হয়ত যাবে না খুব সহসাই। আবার গেলেও সেটা সাময়িক; ফিরে ফিরে আসবে। এমনই ভাবনায় পেয়ে বসেছে দুনিয়াশুদ্ধ অনেককেই। কেন জানি না, আমি এমন করে ভাবছি না। আশাবাদী মন আমার এভাবে ভাবায় না। ভাবায় অন্যভাবে। করোনা আছে; হয়ত থাকবেও কিছুকাল। তবে অনন্তকাল নয়। একদিন নির্মূল হবেই। সমূলে না হলেও বেশ ভাল করেই নির্মূল হবে। নিকট ভবিষ্যতেই নির্মূল হবে।

এটা আমার বিশ্বাস। নিঃশ্বাসের সাথে মিশে থাকা একান্তই ব্যক্তিগত বিশ্বাস। এমনি বিশ্বাসের ভিত্তিত্ত শক্ত। নিজেকে নিজে প্রশ্ন করলেই শক্ততার সত্যতা মেলে। বিশ্বাস আরও পোক্ত হয়। চোখটা বন্ধ করে নিজেকে প্রশ্ন করি; করোনা কি আসলেই মরণব্যাধি? একবার হলে আর রক্ষে নেই? যাকে ধরে, তাকেই শেষ করে দেয়? যেদিকে যায় সব শেষ করে দিয়ে যায়? যাকে পায়, তাকেই খায়? যেখানে পায়, সেখানে খায়? করোনায় আক্রান্ত কি ভাল হয় না? হলে, কত পারসেন্ট ভাল হয়? সব গুলোর উত্তরই আমাকে বিশ্বাসী করেছে।

না করার কোন কারণ নেই। বাংলাদেশে ৯৯% ভাল হচ্ছে। এদিকে করোনার মেডিসিন আবিস্কারের পথে। প্রতিদিন আক্রান্ত-মৃত্যু আর হতাশার কালো আঁধার পেরিয়ে মহামারী রুখতে আলোর পথ দেখাচ্ছে বিজ্ঞান। টিকা আবিষ্কারে যেমন অগ্রগতি হচ্ছে, একই সঙ্গে পুরাতন ওষুধের পরীক্ষা-নিরীক্ষায়ও মিলছে আশাব্যঞ্জক ফল। গোটা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও নানা ওষুধ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় কোন কোনটির ভাল ফল মিলছে। চিকিৎসকরা বলছেন সংক্রমণের শুরুতেই এসব ওষুধ প্রয়োগ করা গেলে বাঁচতে পারে প্রাণ।

অন্যদিকে করোনাও দূর্বল হচ্ছে দিনদিন। পৃথিবীর বেশীরভাগ দেশেই করোনা দূর্বল হয়ে গেছে। বাংলাদেশেও হচ্ছে। তবে ইদানিং আক্রান্ত এবং মৃত্যুর হার বাড়ায় এই কথাটা অনেকেই মানবে না হয়ত। কিন্তু বুঝতে হবে। বুঝতে হবে দেশে দিনদিন আক্রমণ বাড়ছে বটে তবে আক্রান্ত ব্যক্তিকে পরাস্ত করার জোর আগের মত আর তেমন নেই। অন্যদেশে মৃত্যুহার কম করেও ৬%। কিন্তু বাংলাদেশে ১% এর মত। এদেশে করোনা সবল হতে পারেনি আজও।

তবে এদেশের অনেকেই এভাবে ভাবে না। মিডিয়াও না। মিডিয়া যেকোন বিষয়ের নেতিবাচক দিকটা ফোকাস করে। ইতিবাচক দিকটি নয়। অনেকেই আছেন সারাক্ষন ব্যস্ত করোনায় সরকারের ব্যর্থতা খোঁজার কাজে। আর থাকছেন নেতিবাচক আশায়। এখন আশায় আছেন, গেল তিনমাসে ব্যর্থ না হলেও আগামী তিনমাসে নিশ্চিত ব্যর্থ হবে সরকার। ফানা ফানা হয়ে যাবে দেশ। ঘরে ঘরে লোক মরবে করোনায়।

অথচ এখন পর্যন্ত করোনা মোকাবেলায় অন্যদেশের তুলনায় অনেকটাই সফল বাংলাদেশের সরকার। করোনায় সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য খাদ্যদ্রব্যের সংকট হতে না দেয়া। কোন ঘাটতি হয়নি সারাদেশের কোথায়ও। জিনিসপত্রের দাম বাড়েনি। বোরো ফসল ঘরে তোলা গেছে। লকডাউনে পুরো দেশ থাকার পরেও সংকটে পরেনি দেশ; দেশের মানুষ। বাংলাদেশের মত একটি দরিদ্র দেশের দরিদ্র সরকারের এর চেয়ে বড় সাফল্য আর কী আছে!

তাই নেতিবাচক ভাবনায় না থেকে এখন সামনে এগুতে হবে। বুঝতে হবে, করোনা মোকাবেলায় ২য় পর্যায়ে আমরা পৌঁছেছি। ১ম পর্যায়ে ছিলাম শুধু জীবন নিয়ে; ২য় পর্যায়ে জীবনের সাথে জীবিকাও যুক্ত হয়েছে। জীবন ও জীবিকার মাঝে ভারসাম্য তৈরি, অর্থনৈতিক চাকা সচল এবং সামাজিক শৃঙ্খলা ও সুরক্ষার স্বার্থে সরকারও সাধারণ ছুটি না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শুধু বাংলাদেশ সরকার নয়, সারাবিশ্ব এখন এই কনসেপ্টেই আগাচ্ছে।

না হলে বিশ্ব অর্থনীতি ব্যর্থ হতে বাধ্য। করোনা মোকাবেলায় মনুষ্যকুলের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো এখনো পর্যন্ত এর গতিপ্রকৃতি বুঝতে না পারা। গেল ছয়মাসেও এখনো জানা গেল না, করোনা আসলে কিভাবে ছড়ায়। অন্তত এটা সঠিকভাবে জানা গেলে মানুষ নিজেকে রক্ষা করতে পারতো। খুব সহজভাবেই কিছু ব্যবস্থা নিয়ে নিজে তথা সমাজকে রক্ষা করতো। সমগ্র বিশ্বকে লকডাউন করে পুরো পৃথিবী নিস্তব্দ করে দেয়া লাগতো না। কেবলমাত্র শরীরের প্রয়োজনীয় জায়গাটুকু ঢেকে নিরাপদে চলাফেরা করলেই হতো। এভাবে বেঁচে যেত জীবন; টিকে থাকতো জীবিকা।

তা না করে বিশ্ব হেটেছে উল্টো পথে। যেভাবে রাজা হবুচন্দ্র ধুলা থেকে পা কে রক্ষা করতে জুতা না বানিয়ে পুরো রাজ্যের ধুলা পরিস্কারে নেমেছিলেন ঠিক সেভাবে। এভাবে না করে, অথাৎ ঘরবন্দি না থেকে করোনা সংক্রমণের সম্ভাব্য জায়গাগুলো কেবল ঢেকে রেখেই আমরা বাইরে বের হতে পারতাম। নিয়মিত অর্থনৈতিক কর্মকান্ড চালু রাখতে পারতাম। “স্টে হোম” না বলে বলতে পারতাম “প্রটেক্ট ইউরসেলফ”। হয়তো এভাবেই সম্ভব হতো করোনা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে অর্থনীতিকে সচল রাখার। সম্ভব হতো জীবনকে রক্ষা করে জীবিকাকেও নিরাপদে রাখার।

তবে এতদিন পারিনি বলে এখনো কেন পারবো না! পুরোপুরি না পারি, অন্তত শুরুটা তো করতে পারবো!! কোন কিছু শুরু না করে কেউ কি শেষ করতে পেরেছে কোনদিন!!!-লেখকঃ উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা।
১লা জুন, ২০২০