কমরেড অমল সেনের ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকী ঢাকায় শ্রদ্ধা নিবেদন, কাল থেকে এগারখানে দুই দিনব্যাপী স্মরণমেলা

যুগবার্তা ডেস্কঃ ১৭ জানুয়ারি ২০১৬ উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা পুরুষ, ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের নেতা, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কমরেড অমল সেনের ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। কমরেড অমল সেন ব্রিটিশ ভারতে ১৯১৪ সালে বর্তমানের নড়াইল জেলার আফরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। নবম শ্রেণীর ছাত্র থাকাবস্থায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামে যুক্ত হয়ে ‘অনুশীলন’ সমিতির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। ১৯৩৩ সনে খুলনার বিএল কলেজে রসায়ন শাস্ত্রে পড়া অবস্থায় অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন এবং ঐ বছরই এই অঞ্চলের জমিদারদের বিরুদ্ধে কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। নিজের পিতার জমিদারির বিরুদ্ধে কৃষক আন্দোলন তাঁকে আরো পরিচিত করে তোলে। ধারাবাহিকভাবেই ঐ অঞ্চলে আন্দোলন চলতে থাকে। ১৯৩৫ সনে তিনি অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৪৬ এর ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের কিংবদন্তী পুরুষ পরিচিতি লাভ করেন সকলের ‘বাবুদা’ হিসেবে। ১৯৪৮ সনে যশোর পার্টির সম্পাদক নিযুক্ত হন। সদ্য ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পর পাকিস্তানী মুসলিম লীগ সরকারের রোষানলে পড়েন এবং ১৯৫৬ সন পর্যন্ত কারারুদ্ধ থাকেন। দুই বছরের জন্য বাইরে থাকলেও আবারো ১৯৫৮ সনে গ্রেফতার হয়ে ১৯৬৯ সন পর্যন্ত জেলে আটক থাকেন তিনি। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় মুক্তি লাভ করলেও আবারও তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৭১ এর মার্চ মাসে জনগণ জেল ভেঙ্গে তাঁকে মুক্ত করেন। আজীবন বিপ্লবী, অকৃতদার, নিঃস্বার্থ বিপ্লবী কমরেড অমল সেন ১৯৭১ এ জেলমুক্ত হয়ে ভারতে চলে যান এবং তখন বিভ্রান্ত বাম আন্দোলনের কর্মীদের সংগঠিত করতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ করতে ‘খোলা চিঠি’ দিয়ে আহ্বান জানান। ভারতে বসেই তিনি এদেশের বিপ্লবীদের ঐক্যবদ্ধ করার অব্যাহত প্রচেষ্টা চালান এবং ‘কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের সমন্বয় কমিটি’ গড়ে তোলেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সনে পিকিং-মস্কো ধারার বিপরীতে লেনিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলেন এবং তার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। কমরেড অমল সেনের হাতে গড়া লেনিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টি পরবর্তীতে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি নাম ধারণ করে। তিনি ওয়ার্কার্স পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেন। কমরেড অমল সেন ২০০৩ সালে ৮৯ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। রাজনৈতিক জীবনে কমরেড অমল সেন তাঁর সময়ে বাম-ডান বিচ্যুতির বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট কর্মীদের সমাজ বিপ্লবের দিশা দেখিয়েছেন তাঁর ‘জনগণের বিকল্প শক্তি’ নামক চিন্তাসূত্র দিয়ে। সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের পূর্বেই ১৯৭৭ সনে তিনি তাঁর মূল্যবান চিন্তা নিয়ে প্রবন্ধ লেখেন ‘বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সমস্যা প্রসঙ্গে’। পরবর্তীতে সেই চিন্তার অনেক যথার্থতাও খুঁজে পাওয়া যায়। কমিউনিস্ট পার্টি এবং জীবনবোধের অনুশীলনে ‘কমিউনিস্ট জীবন ও আচরণ রীতি প্রসঙ্গে’ বইটি এদেশের কমিউনিস্টদের জন্য একটি অবশ্যপাঠ্য পুস্তক। ‘নড়াইল তেভাগা আন্দোলনের সমীক্ষা’ নামক প্রবন্ধেও তেভাগা আন্দোলনের মর্মবস্তু তুলে ধরেছেন।
কমরেড অমল সেন এর ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। প্রথম দিনে আজ ১৬ জানুয়ারি ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে শহীদ রাসেল মঞ্চে তাঁর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্যদিয়ে দিনের কর্মসূচি শুরু হয়। কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন পার্টির সভাপতি কমরেড রাশেদ খান মেনন, পলিটব্যুরো সদস্য কমরেড আনিসুর রহমান মল্লিক, মাহমুদুল হাসান মানিক, নুর আহমদ বকুল, হাজেরা সুলতানা, কামরূল আহসান প্রমুখ।

এরপর ১৪ দলের সমন্বয়ক, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের নেতৃত্বে ১৪ দলের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী কমরেড রাশেদ খান মেনন, সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়–য়া, ন্যাপের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন, গণআজাদী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস কে শিকদার, বাসদের আহ্বায়ক রেজাউর রশীদ খান প্রমুখ।
শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সাবেক শিল্পমন্ত্রী ও বাংলাদেশের সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়–য়া, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পংকজ ভট্টাচার্য্য, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বিএসডি) আহ্বায়ক কমরেড রেজাউর রশীদ খান, ন্যাপের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সালেহ আহমেদ, গণতন্ত্রী পার্টির ঢাকা মহানগর সভাপতি ডা. আব্দুল গণি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) ঢাকা মহানগর সদস্য সচিব জুলফিকার আলী, সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদ বিরোধী মঞ্চের পক্ষে কাজী সালমা সুলতানা, দীপায়ন খীসা, কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক মেয়র নুরুল আফসার প্রমুখ।
এছাড়াও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির ঢাকা মহানগর, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, কুষ্টিয়া, ময়মনসিংহ জেলা শাখা, আইনজীবী সেল, অফিস কমিটি, কুমিল্লার লাকসাম উপজেলা শাখা, ঢাকা মহানগরের মুগদা, মতিঝিল থানা শাখা, জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশন বাংলাদেশ ও জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশন ঐক্য প্রক্রিয়া, জাতীয় কৃষক সমিতি, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন, বাংলাদেশ নারী মুক্তি সংসদ, বাংলাদেশ যুব মৈত্রী, বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী, বাংলাদেশ গণশিল্পী সংস্থা, সাপ্তাহিক নতুন কথা, জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন, বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারি ফেডারেশন, জাতীয় গার্হস্থ্য নারী শ্রমিক ইউনিয়ন, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রণ্ট, যুব মৈত্রী ঢাকা মহানগর দক্ষিণ, ঢাকা মহানগর উত্তর, ছাত্র মৈত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মহানগর প্রভৃতি সংগঠন শ্রদ্ধা নিবেদন করে।
অনুষ্ঠানে কমরেড অমল সেনের রচিত কবিতা পাঠ করেন মইনউদ্দিন চিস্তি, মাসুদ মাযহার ও ইয়াতুননেসা রুমা। শেষে গণশিল্পী সংস্থার শিল্পীদের নেতৃত্বে সম্মিলিত কণ্ঠে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়।
আগামীকাল থেকে বাকড়ীতে দুই দিনের স্মরণ মেলা
কমরেড অমল সেনের ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে কমরেড অমল সেন স্মৃতিরক্ষা কমিটির উদ্যোগে যশোর-নড়াইলের সীমান্তবর্তী এগারখানের বাকড়ী গ্রামে আগামীকাল ১৭ জানুয়ারি থেকে দুইদিনের স্মরণমেলা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে কমরেড অমল সেনের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, স্মরণ সমাবেশ, কৃষক সমাবেশ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, লোকজ মেলাসহ বিভিন্ন আয়োজন থাকবে। স্মরণমেলায় বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড ফজলে হোসেন বাদশা সহ জাতীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থাকবেন।