ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ…

82

ইঞ্জি: সরদার মো: শাহীনঃ দিন দিন বয়স বাড়ছে আমার। বিষয়টি সত্যি। কিন্তু বিশেষ কোন সময় বা দিন আসলে এই সত্যিটাকে সত্যি মনে হয় না। মনে হয়, যেমন ছিলাম তেমনই তো আছি; এক রকমই আছি। সময়ের সাথে সাথে মন সব সময় আগায় না; আগাতে পারে না। একই জায়গায় থাকে। শেষ রমজানের সন্ধ্যা বা চাঁদ রাত তেমনি একটি বিশেষ সময় আমার জন্যে। যেখানে মন আমার ছেলেবেলার আমি’র মত আচরণ করে। যেখানেই থাকি ইফতারের পর পরই চাঁদের খবর নেই। আর কান পেতে রাখি রেডিও বা টিভির দিকে। এই বুঝি বেজে উঠবে সেই অমর সুরের গীত সংগীত! ঈদের সংগীত; “ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ……”
কী যে ভাল লাগে গানটা শুনতে! যতই শুনি ততই ভাল লাগে। ঈদের আসল ফিলিংস এই গানের মাঝেই যেন লুকিয়ে থাকে। ছেলেবেলার ঈদের যত আনন্দ ছিল সে সব উপচে পড়ে এই গানের সুরে। আমি বার বার শুনি। চ্যানেল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে শুনি। শুনতে ইচ্ছে করে। শুনতে শুনতে এক সময় নিজে নিজে গেয়েও উঠি। উঠলে কি হবে? আমার ভাঙা গলায় সুরতো উঠে না। ওঠার কথাও না। তবুও ওঠাবার চেষ্টা করি। আমার শোনিমের চেষ্টা করতে হয় না। ও এমনিতেই গায়। গলাটা বেশ ভাল। ওর গলার উপর ভরসা করে বাপ-বেটা দুজনে মিলে গলা মিলাই, “তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ….”
মুসলমানদের অন্যতম ধর্মীয় ও আনন্দের এই উৎসব নিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত কালজয়ী গান এটি। গানটি এখন আর সাধারণ গান হিসেবে নেই; ঈদুল ফিতর সংগীত হিসেবেই সব মহলে সমাদৃত। কবি নজরুল গানটি লিখে নিজেই সুরারূপ করেন বহু বছর আগে; সেই ১৯৩১ সালে। লেখার চারদিন পর তখনকার জনপ্রিয় শিল্পী আব্বাস উদ্দিনের গলায় গানটি রেকর্ড করান এবং ঠিক দুইমাস পর ঈদের আগে আগে এই রেকর্ড বাজারে আসে। বছর গড়িয়ে তখন ফেব্রুয়ারী ১৯৩২। বলা বাহুল্য যে, সেই সময়ে গানটি প্রচন্ড জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
আজকে এত বছর পরেও গানটির জনপ্রিয়তা কমেনি এতটুকুও; বরং বেড়েছে। বলা যায় কালকে উত্তীর্ণ করে কালজয়ী হয়েছে। গানটি বেজে উঠলে স্মৃতি আমাকে খুব বিমোহিত করে; তাড়া করে নিয়ে যায় ছেলেবেলায়। মনে হয় এই তো সেদিনকার কথা। গোধুলী বেলায় সবাই পশ্চিম আকাশের পানে তাকিয়ে। সারা আকাশ তন্নতন্ন করে খুঁজছি সরু বাঁকা চাঁদ দেখার আশায়। কে আগে দেখতে পারবে এই নিয়ে সে কী দাপাদাপি! দেখা মাত্রই সবাই হাত জাগিয়ে সালাম দিতাম। বড়রা দিত; দেখাদেখি ছোটারাও দিতাম। চাঁদরাতের সন্ধ্যা থেকেই নাছিম ভাইয়া বিশাল আয়োজন নিয়ে বসতেন ঘরের মাঝে। বড় টেবিল ফেলা হতো; আনা হতো অনেক কয়লা। এত্ত এত্ত কাপড়ে হালকা পানির ছিটে দিয়ে স্তুপ করা হতো। কয়লার ইস্ত্রি দিয়ে বাসার সবার কাপড় ইস্ত্রি করবেন তাই এত আয়োজন। ঈদের দিন খুব ভোরে দল বেঁধে পুকুরে নামতাম গোসল করতে। শীতের দিন হলে কষ্ট হতো। তবুও বসে থাকতাম না। বড় ভাইয়া ৫৭০ সাবান গায়ে মেখে গোসল করাতেন। এটা খুবই জনপ্রিয় একটি সাবান ছিল তখনকার দিনে। গায়েও মাখা যায়, কাপড়ও কাঁচা যায়। তবে কালেভদ্রে কসকো সাবানও পেতাম। কসকো ছিল জাতের সাবান। সব সময় জুটতো না।
ঈদে সারাদিন এ বাড়ী ও বাড়ী ঘুরে বেড়াতাম। সে কী বেড়ানোর আনন্দ! ঈদের আনন্দ! একটু বড় হবার পরে ঈদের আনন্দ ঘোরাফেরায় নয়, টিভি দেখাতে গিয়ে ঠেকে। তখন এত চ্যানেল ছিল না; কেবল বিটিভি ছিল। সন্ধ্যা হলেই টিভির সামনে বসতাম। বাড়ীর মেয়েছেলেরাও আগে ভাগে কাজকর্ম গুছিয়ে ফেলতো যেন নির্বিঘ্নে টিভি দেখতে পারে। বিশেষ করে আনন্দ মেলা আর ঈদের বিশেষ নাটক দেখার জন্য সবাই হা হয়ে বসে থাকতাম। ঈদের পরদিন থাকতো পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি। সারা বছর অপেক্ষায় থাকতাম দুই ঈদের দুটি বাংলা ছবি টিভিতে দেখার জন্যে।
এখন অবস্থার মেলা উন্নতি হয়েছে। দিন বদলেছে; বদলেছে সিস্টেম। আর সাথে বদলেছে মানুষের মন। যে মন বদলে দিয়েছে ঈদের আদি আমেজ। মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নবিত্তে এখনও ঈদের আমেজ কিছুটা থাকলেও উচ্চ বিত্তে ঈদ নেই বললেই চলে। তাদের সারা বছর জুড়েই ঈদ। আর বছর জুড়েই কেনাকাটা। উচ্চবিত্তের কাছে ঈদ মানেই ভ্রমণ; দেশ বিদেশে ভ্রমণ। ঈদ মানেই ড্রাইভ; সদলবলে লং ড্রাইভ।মূলত রমজানে এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঠিক কী লক্ষ্য নিয়ে ঈদ আমাদের মাঝে আসে কিংবা ঈদের শিক্ষাই বা কি, তা আমরা অন্তরে ধারন করতে পারি না। আমাদের অন্তর বড়ই আজব। আনন্দ হবে মাস জুড়ে সিয়াম সাধনা করতে পারার আনন্দ, গুনাহ মাফের আনন্দ; নিষ্পাপ হবার আনন্দ। আনন্দ হবে এদিন থেকে সঠিক পথে চলার আনন্দ। ভুলভ্রান্তি এড়িয়ে চলার আনন্দ। আনন্দ হবে মনকে সত্যিকারের মানুষের মন বানাবার আনন্দ। উদার এবং বড় মন বানাবার আনন্দ।
বলতে দ্বীধা নেই, ঈদ থেকে এই সব শিক্ষা আমরা নিতে পারি না। মনকে বড় করতে পারিনা। মন বড় জটিল এক জিনিস। বড় হিসেবী, বড় স্বার্থপর। আল্লাহ ফিতরা দিতে বলেছেন, তাই আমরা ফিতরা দেই। তবে গুণে গুণে দেই। পারতপক্ষে একটি টাকাও বেশী দেই না। আল্লাহর প্রতি খুশী হয়ে বখশিস দেই না। কিন্তু রেস্টুরেন্টে খেয়ে বেয়ারার উপর খুশী হয়ে ঠিকই বখশিস দেই। সালাদে একটু পিয়াজ বা কাঁচা মরিচ বেশী পেলেই বখশিস দেই। অন্যদিকে রিক্সাওয়ালাকে পাঁচটি টাকা বেশী দিতে গিয়ে হিসেব করি। একটু বিটলা ধরনের তেড়া কথা বলা রিক্সাওয়ালা হলে মেজাজ গরম করে চড় থাপ্পড়ও দেই। কী বিচিত্র মন আমাদের!
মন আমাদের সব সময়ই বিচিত্র। ক্ষমা চেয়েই বলছি, রাস্তায় হেঁটে যাওয়া যুবতী মেয়েকে দেখলে মাল মনে হয়। আবার পাশবিক নির্যাতনে এদেরই কেউ দুঃখজনক ভাবে মরে গেলে আমরা সবাই ভাই সেজে বসি। লক্ষ লক্ষ আপন ভাই! ভাইদের লাফালাফিতে দেশ ছেয়ে যায়। সকল ভাইদের সে কী মায়াকান্না। নানান কথা বলে নির্যাতককে তুলোধূনো করে শেষমেষ সরকারকে গালিগালাজ করে। আসলে মরা তনুর ভাইয়ের অভাব নেই এদেশে। অভাব কেবল বেঁচে থাকা তনুদের!
অভাব আসলে প্রকৃত মনের। বড় অধিকার প্রবণ আমাদের মন। সিটিং সার্ভিস বাসে সিট না থাকলেও ধাক্কা মেরে জোর করে উঠে পড়ি। কিছুক্ষণ পর কোন মতে নিজের একটা সিট ব্যবস্থা হলেই ভোল পাল্টে নীতিবান সাজি; নীতিকথা বলি। কঠিন জ্ঞান দেই যেন একটি লোককেও আর না উঠায়। গেইটলক করার জন্যে হেলপারকে ধমকাধমকি করি। ড্রাইভারকে মারতেও যাই। এটা আসলে স্রেফ ভন্ডামী।
ভন্ডামীর একটি বিশেষ উদাহরণ হলো শীতবস্ত্র বিতরণ। আমরা শীতকালে বস্ত্রহীনের জন্যে শীতবস্ত্র পাঠাই। অথচ ঘরের ফ্লোরে শোয়া কাজের ছেলেটা হালকা বস্ত্রে ঘুমায়। ঈদ আসে ধনীগরীবের ভেদাভেদ দূর করার জন্যে; শ্রেণীবৈষম্য ভুলিয়ে দেবার জন্যে। কিন্তু উল্টো আমরা জাগিয়ে দেই। শপিং এ যেয়ে পোশাক কেনার হিড়িক দেখলে তেমনটাই মনে হয়। কার চেয়ে কে কত দামী পোশাক কিনতে পারি সেই প্রতিযোগীতায় নামি। বিষয়টি বোঝার জন্যে ঈদের জামাতই যথেষ্ট। নামাজীর পাঞ্জাবীর ধরন এবং গলার গড়নই তা বুঝিয়ে দেয়। ঈদের জামাত হয় ধনীগরীবের ভেদাভেদ ভুলিয়ে এক মাঠে শরীক করে সবাইকে এক কাতারে আনার জন্যে। অথচ মাঠটি শেষমেষ আকর্ষনীয় নতুন পোশাকের প্রদর্শনীর হাট ছাড়া আর কিছুই হয়না।
প্রদর্শনীর জন্যে নয়, এবারের ঈদ হোক, ধনী গরীব ভেদাভেদ ভুলে কোলাকুলি করে সবাইকে মন থেকে বুকে জড়িয়ে নেবার ঈদ। সত্যিকারের ভালবাসায় আসমানী তাগিদে নিজেকে বিলিয়ে দেবার ঈদ। ঈদের মহিমায় আত্মা হোক শুদ্ধ, সর্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হোক ন্যায় বিচার। প্রতিজ্ঞা হোক, এবারের ঈদে কেবল নিজে হাসবো না; অসহায়ের মুখে হাসি ফোটানোর জন্যে চেষ্টা করবো! চেষ্টা করবো সবাই মিলে সমাজের সবার জন্যে ঈদকে সত্যিকারের আনন্দের দিন বানাতে!! ঈদ মোবারক!!!-লেখক: উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা