ওরা ভাগ্যবান! সব দিক দিয়েই ভাগ্যবান!!

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ অসুস্থ হাফিজ ভাইকে দেখার জন্যে কোলকাতায় পৌঁছেই ফোন দিয়েছি। পাইনি। বারবার চেষ্টা করেও পাইনি! ফোনটা বন্ধ পেয়েছি। অকস্মাৎ চিন্তা বেড়ে গেল। হাবিজাবি ভাবা শুরু করলাম। মানুষের এই এক স্বভাব। হাবিজাবি ভাবতে দেরী করে না। দেশে যোগাযোগ করে জানলাম তিনি কোলকাতায় নেই। বীর মুক্তিযোদ্ধা হাফিজ ভাই। আমার প্রিয় মানুষদের একজন। ঢাকায় আমার হাসপাতালেই তাঁর রোগটি ধরা পড়ে। মরনব্যাধি; বড়ই কঠিন রোগ! কিন্তু ঘটনাক্রমে দেখা হয়নি আমার সাথে। প্রবাস জীবনের কারনেই ব্যাটে বলে মিলাতে পারিনি।
তবে এবার মিলে গেল। ওনার কোলকাতায় যাবার ক’দিন বাদেই পারিবারিক কাজে আমাকেও যেতে হয়। তাই ভাবলাম প্রথম দিনেই দেখে আসবো ওনাকে। অথচ ফোন বন্ধ। যোগাযোগের আর কোন উপায় নেই। ভেবেছিলাম আমার শোনিমকে সাথে নিয়েই তাঁকে দেখতে যাবো। কিন্তু দূর্ভাগ্য! দেখতে পারিনি! আমাদের যাবার একদিন আগেই তিনি ফিরে আসেন। নিজের হাতে যুদ্ধ করে স্বাধীন করা প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে ফিরে আসেন!
তাঁর ফিরে আসাটা মোটেই সুখকর ছিল না। ওখানে থাকা না থাকা একই ব্যাপার। কোলকাতার ডাক্তারদের তেমন কিছুই করার ছিল না। একেবারেই লাস্ট স্টেজ। তাই নিয়মিত কিছু মেডিসিন আর কেমো দেয়া ছাড়া চিকিৎসার আর কোন সুযোগ ছিল না। রোগটিই এমন। হঠাৎ করেই ধরা পড়ে। বলা যায় একেবারে শেষ স্টেজে এসেই ধরা পড়ে। হাফিজ ভাইয়ের ক্ষেত্রেও তাই হলো। তিনি চলে গেলেন ২২শে জানুয়ারী! সবাইকে ছেড়ে চির জীবনের জন্যে চলে গেলেন! বড় কষ্ট পেয়ে এবং সবাইকে কষ্ট দিয়ে চলে গেলেন!
রোগটি সাংঘাতিক কষ্টের। শুধু মরনব্যাধিই নয়। কোন রোগই সুখকর নয়। কতভাবে কত রোগে দেশের মানুষ হাফিজ ভাইয়ের মতই যন্ত্রনা ভোগ করছে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়। ইদানীং হঠাৎ হঠাৎ খুব কাছের মানুষদের কঠিন কঠিন রোগে পড়তে শুনি। যেমন তেমন কঠিন নয়, শক্ত কঠিন। বলা নেই, কওয়া নেই, হুটহাট করে পড়ে যান তারা! দিব্বি ভাল মানুষটি হুট করে একদিন বিছানায় পড়ে যান। ভীষন কষ্টদায়ক পীড়া নিয়ে তাঁরা চির জীবনের জন্যে চলে যান!
এমনি খুব কঠিন না হলেও সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে হুমায়ুনের অপারেশনের কথা শুনলাম। নারায়ণগঞ্জের হুমায়ুন আমার কাছের একজন। স্নেহের অনুজ; মহসিনের ছোট ভাই। রক্তের সম্পর্ক না হলেও আত্মার সম্পর্কের আত্মীয়। খুবই কাছের আত্মীয়। ছেলেবেলার অনেক স্মৃতি আছে ওর সংগে, ওদের সংগে।
ধলা বাজারে কত রাত একসাথে ঘুমিয়েছি তা গুণে শেষ করা যাবে না! খুবই পরিশ্রমী এবং পোড় খাওয়া ছোট ভাই আমার ছাত্রজীবনে অত্যন্ত মেধাবী ছিল। কিন্তু জীবনের কঠিন বাস্তবতায় মেধাকে তেমন কাজে লাগাতে পারেনি। ছোট্ট এই জীবনে এই পর্যন্ত এসেছে প্রচুর কাঠখড় পুড়িয়ে। কোন কাজকেই কখনো ছোট মনে করেনি। তাই জেদ আর অধ্যবসায় উপরে তুলে এনেছে ওকে। শিল্পপতি বানিয়েছে। কিন্তু দায়িত্বহীন বানায়নি। প্রচন্ড দায়িত্বশীল সবার প্রতি। মায়ের প্রতি, ভাইদের প্রতি; দায়িত্ব তাদের সন্তানদের প্রতিও। কোথায় হুমায়ুন নেই! সব জায়গায় হুমায়ুন। যেখানেই কারো সমস্যা, সেখানেই হুমায়ুন। হুমায়ুনকে বিশেষভাবে ভাল লাগার মোদ্দা কারন এটাই।
আমি ওর ভক্তও। ওর অজান্তেই আমি ওর ভক্ত। আমার প্রিয় এই মানুষটির কষ্টের সময় হাসপাতালে না যেয়ে থাকতে পারলাম না। ঢাকার নামকরা হাসপাতাল। হুমায়ুন শুয়ে আছে। একটা শক্ত সামর্থ্য মানুষের অসহায়ের মত শুয়ে থাকার দৃশ্যের চেয়ে কষ্টের দৃশ্য আর কী আছে। যতটুকু জানলাম বিষয়টি তেমন জটিল নয়। কিন্তু অপারেশনটি ছিল জটিল। ডাক্তারের পরামর্শ, একটা অপারেশনেই সব ঠিক হয়ে যাবে। একমাসও লাগবে না পূরোপুরি সুস্থ্য হতে।
আজ পাঁচমাস হতে চললো, হুমায়ুন এখনো পূরোপুরি সুস্থ্য হয়নি! বেশীর ভাগ সময় বেড এ শুয়ে ঘরের ছাদের দিকে তাকিয়ে নিঃশ্বাস ফেলা ছাড়া ওর এখন তেমন কোন কাজ নেই। আশা আছে, তবে আফসোসও আছে। কেন ভারত থেকে চিকিৎসা নিল না সেই আফসোস। অবুঝ মনের ভাবনা; হয়ত ভারতে চিকিৎসা নিলে এমনটা হতো না। হুমায়ুনের মত দিনকে দিন বাংলাদেশের মানুষের কাছে ভারত অনেক কাজেই বেশ প্রয়োজনীয় দেশ হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে চিকিৎসার কাজে। সবাই চিকিৎসার জন্যে ভারত যায়। দল বেঁধে কথায় কথায় যায়। যাবার কারনও আছে। চিকিৎসায় ওরা অনেক দূর এগিয়েছে। রোগীকে আর যাই করুক, হেনস্থা করে না।
বরং সুপরামর্শ দেয়। মানষিকভাবে সাহস দেয়। মন মানষিকতায় আসলেই ওরা বেশ এগিয়েছে। নিজের স্বার্থ যেমনি বোঝে, পাশাপাশি দেশের স্বার্থও বোঝে। তাই এগিয়েছে। কেবল চিকিৎসায় নয়, শিক্ষা এবং বিজ্ঞানে এগিয়েছে ভারত। আগায়নি কোথায়? এগিয়েছে রাস্তাঘাট এবং অবকাঠামোতেও। কেবল ভারতবাসীই নয়, এসব কাজে প্রকৃতি নিজেও সব সময় ভারতের পক্ষে থেকেছে। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারনেই থেকেছে। ভাগ্যলক্ষ্মী বরাবরই ভারতের জন্যে সুপ্রসন্ন ছিল।
সেবার দিল্লী থেকে আজমীর যাবার পথে সুযোগ হয়েছিল ভারতকে সামান্য হলেও একটু খোলাচোখে দেখার। ট্রেন জার্নি। দিল্লী টু কোলকাতা। রাতভর জার্নির পর ভোরের জার্নি। কুটকুটে ঘন কুয়াশা কেটে যাবার পর চারদিক দৃশ্যমান হচ্ছিল একটু একটু করে। ডোবা বা জলাশয় নাই বললেই চলে। নদীও তেমন চোখে পড়েনি। সবই উঁচু ভূমি। মাইলের পর মাইল উঁচু ভূমি। নতুন রাস্তার কাজ চোখে পড়ছিল। মাটি কেটে কেটে সরিয়ে রাস্তার কাজ হচ্ছে। ছোট রাস্তা, বড় রাস্তা, হাইওয়ে। সবই হচ্ছে।
কত সহজ উন্নয়ন কাজ করা। মাটি ভরাটের ঝামেলা নেই, কালভার্ট কিংবা ব্রিজ করার দরকার নেই। কেবল মাটি কেটে কেটে সরিয়ে রাস্তার কাজ শুরু। আর দূর্ভাগ্য বাংলাদেশের। চারদিকে কেবল পানি আর পানি। রাস্তাঘাট যাই করি না কেন, মাটি সরাবো দূরের কথা, দূর থেকে মাটি এনে ভরাট করে রাস্তা করতে হয়। আবার দু’পাশের পানি আসাযাওয়ার জন্যে কালভার্ট কিংবা ব্রিজও করতে হয়। এতে অর্থ এবং সময় দুটোই ব্যয় হয়। এক্ষেত্রে ভারতে এসবের কিছুই লাগে না। ওরা ভাগ্যবান।
ওরা সব দিক দিয়েই ভাগ্যবান। ব্রিটিশরা রাজত্ব করেছে পৌঁনে দু’শ বছর। দিল্লীকে রাজধানী করেনি। রাজধানী ঢাকাকে করলে ঢাকার অবস্থাও এমন হতো না। করেছে কোলকাতাকে। তাই কোলকাতা সেজেছে ব্রিটিশদের হাতে। শহরের মাঝে হাওড়ায় পদ্মা ব্রীজ করেছে ব্রিটিশরা। শত বছরের কাছাকাছি তার বয়স। অথচ তখনই এটা করেছে ছয় লেনের। আর আমরা শত বছর পরে পদ্মায় ব্রীজ করছি চারলেনের। শুনছি মাওয়ার ওপারে নতুন এয়ারপোর্টও হবে। তখন কি পারবে চারলেনের এই ব্রীজ সব সামাল দিতে? পারবে না।
ওদের সাথে আমাদের ভাবনাগত পার্থক্য এখানেই। সবকিছুতেই পিছিয়ে থাকা যেন আমাদের মজ্জাগত। কথায় এগিয়ে, কর্মে পিছিয়ে, আর ভাবনায় পেঁচিয়ে পড়ার জন্যে জাতি হিসেবে আমাদের তুলনা নেই। আমরা কথা বলি বেশী, কিন্তু বুঝি কম। তবে ভাব ধরি। বোঝার ভাব ধরি। ভাবখানা এমন ধরি যে, বুঝিনা এমন কিছু নেই। ব্যাপারটি উল্টো হবার দরকার ছিল।
কোলকাতার বড় বড় রাস্তার কথাই ধরুন। শহরের মাঝে আনাচে কানাচে ছয়লেনের রাস্তার অভাব নেই। আটলেন বা আরো বেশী চওড়া রাস্তা যত্রতত্র। ওরা যখন সাধারণ রাস্তা চারলেনে করে আমরা তখন বারো ফুটের রাস্তার প্ল্যানে ব্যস্ত। ওদের চারলেনের রাস্তার উদ্বোধনে পৌর কমিশনার যায়। আমাদের লাগে প্রধানমন্ত্রীকে। ব্যবধানটা বোঝার জন্যে স্রেফ এইটুকুই যথেষ্ঠ।
সময় হয়েছে আমাদের ঘুরে দাঁড়াবার। আর কতদিন পিছিয়ে থাকবো? কী নেই আমাদের! আমাদের প্রায় সব আছে। নেই কেবল সময় মত সঠিক পরিকল্পনা। যেটুকুও আছে, সবই ভাঙা ভাঙা। সঠিক মাস্টারপ্ল্যান নেই। কেবল প্রকৃত মেধাবীদের দিয়ে সুন্দর এবং সুষ্ঠ পরিকল্পনার অভাবে আমরা সবকিছুতে পিছিয়ে আছি। এই সঠিক পরিকল্পনাই পারে আমাদেরকে ঘুরে দাঁড় করাতে। জাতি হিসেবে আমরা ঘুরে দাঁড়াতে চাই।
শিক্ষা, বিজ্ঞান কিংবা চিকিৎসা সবকিছুতেই ঘুরে দাঁড়াতে চাই। কোন কিছুর জন্যেই আমরা ভিন্ন কোন দেশে যেতে চাই না। জন্মেছি এদেশে, মরতেও চাই এদেশেই। ভয় পেয়ে কোন লাভ নেই। বাঁচার পথ খোঁজতে হবে। প্রতিদিন ভোরে আফ্রিকায় একটি সিংহ উঠে, সে জানে সবচেয়ে দুর্বল হরিণের চেয়ে দ্রুত দৌঁড়াতে হবে তাকে; নইলে অনাহারে মরতে হবে। আবার প্রতিদিন ভোরে আফ্রিকায় একটি হরিণেরও ঘুম ভাঙে। সেও জানে, দ্রুততম সিংহের চেয়েও জোড়ে দৌঁড়াতে হবে তাকে নইলে সিংহের হাতে মরতে হবে।
বাঙালী হরিণ, না সিংহ; তাতে কিচ্ছু যায় আসে না। কথা একটাই, দৌঁড়াতে হবে; ভালভাবে বেঁচে থাকার জন্য দৌঁড়াতে হবে। দৌঁড়াতে হবে শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবার জন্যে। কোনভাবেই ভিনদেশের কাছ থেকে দয়া কিংবা অনুগ্রহ পাবার জন্যে নয়।-লেখক: উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা।