এমন করে আর কখনো এত মন খারাপ হয়নি!!!

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ ২৮শে রমজানের রাত; মনটা খুবই খারাপ হবার রাত! অবশ্য বাংলাদেশে তখন ২৭শে রমজানের রাতের শুরু। হেরেম শরীফ, মানে পবিত্র কাবা ঘর থেকে ফজরের নামাজ শেষে হেঁটে হেঁটে ফিরছিলাম বাসার দিকে। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নীচের দিকে নামছি। হাজার হাজার হাজীগনের পদচারনায় মুখরিত পবিত্র মক্কা নগরী। বিভিন্ন চেহারার বিভিন্ন জাতের মুসলিম জড়ো হয়েছেন এই মক্কায়। কেউ যাচ্ছেন কাবার দিকে, কেউবা কাবা থেকে বের হয়ে আসছেন। ঠিক এমনি সময়ে দাম্মাম থেকে মামাতো ভাই আরিফের ফোন। জানালো ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান আক্রান্ত হয়েছে! বহু বিদেশী আটকা পড়েছে!!
এর পরের কাহিনী সবার জানা। অনেক বিদেশীর সাথে ৭জন জাপানীজের নিহত হওয়া নিয়ে সারা জাপানে তখন তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে। ফোনের পরে ফোন আসা শুরু করলো জাপান থেকে। আমি ছোটখাট ব্যবসায়ী। যা কিছু ব্যবসা তার অধিকাংশই জাপানীজদের নিয়ে। একটির পর একটি ব্যবসা বন্ধ হতে থাকলো। ফোন দিয়ে একের পর এক ফ্লাইট বাতিল করতে লাগলো ওরা। আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়! বরাবর আল−াহ পাকের পবিত্র ঘরের কাছে এলে মনে শান্তিময় স্থিরতা বিরাজ করতো। এবার খুব অস্থির হয়ে উঠলো মন আমার।
সবার ফোনের ভাষার ধরন একই রকম; একই অভিযোগ। সব অভিযোগের পাহাড় আমার তথা আমার দেশের বিরুদ্ধে। অবস্থা এমন, যেন গুলশানে নিরাপরাধ সব জাপানীজদের আমি নিজ হাতে মেরে ফেলেছি। দীর্ঘ ২১টি বছর ধরে তিলতিল করে ওদের কাছে বাংলাদেশের যে ইমেজ ব্যক্তিগতভাবে আমি তৈরী করেছিলাম, তা একরাতের মাত্র কয়েকঘন্টার অপারেশনে ধূলায় লুন্ঠিত হয়ে গেল। যে মানুষগুলোকে বছরের পর বছর ধরে আমি যেভাবে চিনি, সেই অতিচেনা জাপানী ব্যবসায়ী বন্ধুগন মাত্র একরাতেই বড় অচেনা হয়ে গেল। ওদের কাছে আমার দেশ পরিচিতি পেল সন্ত্রাসী দেশ হিসেবে; আমি পরিচিতি পেলাম সন্ত্রাসী হিসেবে।
এটুকু মেনেও নিয়েছিলাম। ঘটনা যেহেতু ঘটেছে তার দায়ভার কিছুটা হলেও তো নিতে হবে।আমরা একেকজন প্রবাসী তো দেশের একেকজন অ্যাম্বাসেডরও। তবে সব অভিযোগ মেনে নিলেও কেবল মানতে পারিনি আমার ইসলামকে সন্ত্রাসী হিসেবে মেনে নেয়াটা। বিশ্বের টিভি চ্যানেলগুলোর প্রায় প্রতিটিতে ঘটনার বিবরন দিচ্ছিল ইসলামিক টেরোরিজম হিসেবে। মনে বড় ব্যথা হয়, শান্তির ধর্ম ইসলামকে যখন বিশ্ববাসী অশান্তির ধর্ম হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ পায়! খুব ব্যথা হয়!!
মক্কার বাসায় টিভি খুলে বসে আছি। রোজ কাবা ঘর থেকে বাসায় ফিরে একটাই কাজ দেশের চ্যানেল খুলে বসে থেকে খবরাখবর নেয়া। গুলশানের রেশ কাটতে না কাটতেই পরদিন খোদ সৌদি আরব আক্রান্ত হলো। এক সাথে তিন জায়গায় (জেদ্দা, মদিনা এবং কাতাফ) আত্মঘাতী হামলা হলো। ৪জন ঘটনাস্থলেই নিহত। বাদ রইল কেবল মক্কা। কাবা শরীফকে কঠিন নিরাপত্তা বলয়ে ঢেকে ফেলা হলো। আমার তখনও কাবা ঘরে বিদায়ী তাওয়াফ করা বাকী। পায়ে কাঁপুনী ধরে গেল আমার।
ঈদের আগের দিন বিকেলে ঢাকায় ফিরে এলাম মাত্র কয়েক ঘন্টার জন্যে। আমার শোনিম গুছগাছ করে তৈরী হয়ে আছে জাপান যাবে বলে। ওই রাতেই ওদের ফ্লাইট। ও খুব আনন্দে আছে। প্রতি বছর ফাইনাল পরীক্ষা শেষে ও ভেকেশনে যায় ওই দেশে। ছোট মানুষ শোনিম; আতঙ্কের ছাপ ওর মাঝে নেই। কিছু বোঝার বয়স ওর এখনো হয়নি। কিন্তু বাসার বাকীদের কারো মাঝে আনন্দ নেই। সবাই টিভি দেখছে। অকস্মাৎ খবর দেখালো ইন্দোনেশিয়া আক্রান্ত হয়েছে।
এবার কী করবে জাপানী ব্যবসায়ী মহল? ইন্দোনেশিয়াতে ওদের প্রচুর বিনিয়োগ আছে। চাইলেই কি বাংলাদেশের মত একের পর এক ফ্লাইট বাতিল করতে পারবে? চাইলেই কি এক কথায় সব বিনিয়োগ গুটিয়ে দেশে ফিরে যেতে পারবে? বাংলাদেশে আক্রমন হলে গেল গেল রবপড়ে যায়। পাশ্চাত্যের কয়েকটি দেশ আতঙ্কের মাঝে ঘি ঢেলে মুচকী হাসি দিয়ে আতঙ্ককে আরো রাঙিয়ে তোলে। ঢাকার কয়েকটি বিশেষ দেশের দূতাবাস দৌঁড়ঝাপ শুরু করে দেয়। সিএনএন টিভি তো তাদের নির্ধারিত প্রোগ্রাম বাতিল করে গুলশানের ঘটনা লাইভ দেখাতে শুরু করে। কেবল লাইভ দেখায় না ফ্রান্সে, জার্মানীতে কিংবা আমেরিকায়। ওখানে হামলা হলে চুপচাপ। যেন ওসব সন্ত্রাসীদের ফোটানো বোমা বা গুলির আওয়াজ নয়; বিয়ে বাড়ীতে ফোটানো পটকার শব্দ।
গুলশানের ঘটনায় প্রথমত সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হলো বাংলাদেশের গার্মেন্টস এবং আইটি শিল্প। দুটোই রফতানীমুখী শিল্প। এরপর পর্যটন খাত। বিদেশী পর্যটক এখন নেই বললেই চলে। একান্ত না ঠেকলে কেউ এখন বাংলাদেশমুখী হয় না। পাশাপাশি ধ্বস নামলো বিদেশী বিনিয়োগে। যারা বিনিয়োগের চুড়ান্ত পর্যায়ে ছিলেন তারা প্রায় প্রত্যেকেই হাত গুটিয়ে নিলেন। তিনমাসের জ্বালাও পোড়াওয়ে দেশের যে ক্ষতি না হয়েছে; এক রাতের ঘটনায় ক্ষতি হয়েছে তার চেয়ে অনেক অনেক বেশী।
এসব কারনে আমরা যারা প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি তারা এর মর্মজ্বালা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। এই জ্বালাও সহ্য করা যায়। কিন্তু উদ্ভুত পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন যন্ত্র যে জ্বালা দেয়া শুরু করেছে তা সহ্য করা যায় না মোটেও। নিরাপত্তার অজুহাতে বিভিন্ন সংস্থা নোটিশ করতে শুরু করলো। মাত্র সাতদিনের মধ্যে আবাসিক এলাকায় থাকা সব প্রতিষ্ঠান অন্যত্র সরিয়ে নিতে হবে। এও কি সম্ভব? মানলাম সরে যাবে; কিন্তু যাবে কোথায়? এসব প্রতিষ্ঠান করার মত রাজউকের দেয়া কোন স্থান কি আদৌ আছে? আর থাকলেও সাতদিনে কি সেটা সম্ভব? সরিয়ে নেবার খরচাপাতি কে দেবে? এ তো মরার উপর খাড়ার ঘাঁ। আতঙ্কে এমনিতেই ব্যবসা বানিজ্য লাটে উঠেছে। বিদেশী ক্লাইন্ট সরে যাচ্ছে। এর উপর সরকার যা বলছে তাতে করে ব্যবসায়ীদের সুইসাইডকরা ছাড়া আর তো কোন গত্যন্তর নেই।
এদিকে সব ব্যাংকগুলোকে ডেকে সরকার বলে দিয়েছে বিদেশী রেমিটেন্সের উপর নজরদারী বাড়াতে। শুনতে কিন্তু খারাপ শোনায় না। সরকার চাইছে জঙ্গী কর্মকান্ডে যেন বিদেশ থেকে আর্থিক সহযোগীতা কেউ করতে না পারে। কিন্তু নজরদারীর নামে এই দেশে যা হবে তাতো আর কিছুই না; কেবল হয়রানী। নিরীহ গার্মেন্টস কিংবা আইটি ব্যবসায়ী এবং অতি নিরেট প্রবাসীদের হয়রানী করা ছাড়া আর কী হবে! কোন কিছুতে এ দেশীয় প্রশাসনযন্ত্র নজরদারী করার অনুমতি পেলে কত ধরনের বাড়াবাড়ি আর হয়রানী করতে পারে তা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আরেকবার ভাবার অনুরোধ করলাম।
দেশে বড় অঘটন ঘটেছে। এটা বড় সমস্যা সন্দেহ নেই। কিন্তু এতে বিদেশীদের কি? ওরা না হয় অন্য দেশে চলে যাবে। এতে করে সমস্যা সরকারের; সরকার মহা মসিবতে আছে। তবে কোন সরকারী লোক মসিবতে নেই। তারা তো বেতন ভাতা ঠিকই পাবে। সমস্যা কেবল আমার মত মানুষদের। কারন আমরা তো আমজনতা। আমজনতার জন্মই হয়েছে সমস্যায় ভোগার জন্যে; সমস্যায় ফেলে কাউকে ভোগাবার জন্যে নয়।
এসব আবোলতাবল ভাবতে ভাবতেই রাত পার হয়ে যায়। রাতের ফ্লাইটে একটুও ঘুমাইনি। লক্ষ্য করলাম পাশের সিটে মায়ের কোলে মাথা রেখে শোনিম নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। কোন কিছু নিয়ে দুশ্চিন্তা করার বয়স তো শোনিমের এখনো হয়নি। ক্যাপ্টেনের ঘোষনায় শোনিমের ঘুম ভাঙল। হন্তদন্ত হয়ে সিটে বসে জানালা মেলে আকাশ থেকে সিঙ্গাপুর দেখার চেষ্টা করে শোনিম। রাতের অন্ধকার আকাশ থেকে নীচের আলো ঝলমল সিঙ্গাপুরকে অপূর্ব লাগে। শোনিম দেখছে আর বারবার আমায় দেখতে বলছে।
কিন্তু আমার যে আজ মন নেই ওদিকে! ক’দিনের ভারাক্রান্ত মনে আশপাশে যা দেখি সব কিছুই ঝাপসা লাগে। আলো ঝলমল কোনকিছুই আর পরিস্কার দেখি না। আগে অন্ধকারে আলো দেখতে পেতাম। এখন আলোর মাঝেও কেবলই অন্ধকার দেখি। বাংলার ভাগ্যাকাশেও অমানিশার ঘোর অন্ধকার! কেবলই নিশিকালো গুমোট অন্ধকার!! কোথায়ও আশার আলোর লেশ মাত্র নেই!!!-লেখকঃ উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা