এবারও আমন ধানের দাম পাচ্ছেন না কৃষক

9

মুন্না রায়হানঃ এবার আমন মৌসুমের শুরুতেই সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে সরকারের বিপুল পরিমাণ ধান কেনার ঘোষণায় কৃষক আশান্বিত হলেও এখন হতাশ। বর্তমানে দেশের হাট-বাজারগুলোতে যে দরে আমন বিক্রি হচ্ছে, তাতে কৃষকের উত্পাদন খরচই উঠছে না। এদিকে কৃষক নির্বাচনের প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় দেশের বেশির ভাগ এলাকায় সরকারের ধান কেনা শুরুই হয়নি। তাই বিপাকে পড়েছেন কৃষক। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, সরকার এবার আমন মৌসুমের শুরুতে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ২৬ টাকা কেজি দরে ৬ লাখ টন ধান কেনার ঘোষণা দেয়। এছাড়া মিলমালিকদের কাছ থেকে ৩৬ টাকা কেজি দরে সাড়ে ৩ লাখ টন সেদ্ধ চাল ও ৩৫ টাকা কেজি দরে ৫০ হাজার টন আতপ সংগ্রহ করা হবে। এই হিসাবে প্রতি মণ ধানের দাম পড়ে ৯৬২ টাকা (৩৭ কেজিতে ১ মণ হিসেবে)। এই দরে সরকারের কাছে কৃষক ধান বিক্রি করতে পারলে তাদের বেশ ভালো মুনাফা হতো। কিন্তু কৃষক নির্বাচনের প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় কোনো কোনো এলাকায় এক ছটাক ধানও কেনা হয়নি। অথচ গত ২০ নভেম্বর থেকে এই সংগ্রহ অভিযান শুরু হওয়ার কথা।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বর্তমানে দেশের হাট-বাজারগুলোতে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৫৭০ থেকে সর্বোচ্চ ৭০০ টাকায়। এই দরে ধান বিক্রি করে কৃষকের লোকসান হচ্ছে। কিন্তু সরকার যদি এখন পুরোদমে কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনতে পারত, তাহলে ধানের বাজারে একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়ত। আরো বেশি দামে হাট-বাজারগুলোতেই ধান বিক্রি হতো। তারা জানান, এখন কৃষকের কাছে ধান আছে, কিন্তু আর কয়েক দিন পর এই ধান তাদের হাতে থাকবে না। ধান চলে যাবে মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়াদের হাতে। কারণ প্রান্তিক কৃষকেরা মহাজনসহ বিভিন্নভাবে ঋণ নিয়ে ফসল ফলান। তারা মৌসুমের শুরুতেই ঋণ পরিশোধের জন্য ধান বিক্রি করতে বাধ্য হন। তাই তারা এখন কম দামেই তাদের হাতে থাকা ধান বিক্রি করে দিচ্ছেন।

এদিকে খাদ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ধান-চাল ক্রয় মনিটরিং করতে মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে। টিমগুলো সারাদেশে ধান-চাল সংগ্রহ ও বাজারদর মনিটরিং করছে। কোনো অনিয়ম পেলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দিনাজপুর থেকে আমাদের স্টাফ রিপোর্টার মো. মতিউর রহমান জানান, বর্তমান বাজারদরে কৃষক ধান বিক্রি করে উত্পাদন খরচই তুলতে পারছেন না। বিশেষ করে মোটা জাতের ধান আবাদ করে লোকসান গুনছেন কৃষক। চলতি আমন মৌসুমের ধান কাটা প্রায় শেষের দিকে চলে এলেও এই জেলায় পুরোদমে আমন সংগ্রহ অভিযান শুরু করতে পারেনি খাদ্য বিভাগ।

দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার ঝলঝলি গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম জানান, তিনি এবার আমন মৌসুমে চার বিঘা জমিতে গুটি স্বর্ণা জাতের ধান আবাদ করেছেন। প্রতি বিঘা জমিতে ধান আবাদ করতে সব মিলিয়ে তার খরচ হয়েছে ১৫ হাজার ১০০ টাকা। প্রতি বিঘা জমিতে ধান পেয়েছেন ২২ মণ। বাজারে প্রতি মণ ধান বিক্রি করেছেন ৫৭৫ থেকে ৬০০ টাকায়। এতে এক বিঘা জমির ধান বিক্রি করে গড়ে তিনি পেয়েছেন ১৩ হাজার টাকা। এই হিসাবে এক বিঘা জমিতে ধান আবাদ করতে গিয়ে তাকে লোকসান গুনতে হয়েছে গড়ে ২ হাজার টাকা।

নশিপুর ফার্মহাটে ধানের ক্রেতা বিভাকর বসাক জানান, সরকারি আমন সংগ্রহ অভিযানে খাদ্য বিভাগ এখনো সংগ্রহ অভিযান শুরু না করায় বাজারে ধানের সরবরাহ বেড়েছে। সেই তুলনায় ক্রেতা নেই।

জেলা খাদ্যনিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ আশ্রাফুজ্জামান জানান, দিনাজপুর জেলায় মোট ২৮ হাজার মেট্রিক টন ধান ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কয়েকটি উপজেলায় এ পর্যন্ত ৪ হাজার ৭০০ টন ধান ক্রয় করা হয়েছে। এছাড়া চাল সংগ্রহের জন্য আগামী রোববার থেকে মিলমালিকদের সঙ্গে চুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে তিনি জানান।

দিনাজপুর জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সভাপতি মোসাদ্দেক হুসেন জানান, সরকারের কাছে ধান সরবরাহ করবে সরাসরি কৃষকরা, আর চাল সরবরাহ করবে মিল মালিকরা। কিন্তু এখনো চাল সংগ্রহ শুরু হয়নি। কোনো মিল মালিক কতটুকু চাল সরবরাহ করতে পারবে, তা নির্ধারণ না হওয়ায় মিল মালিকরা বাজারে ধান কিনতে পারছেন না। ধান ও চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা একসঙ্গে আসলে এর প্রভাব বাজারে পড়ত। তাহলেই বাজারে ধানের দাম বেড়ে যেত বলে জানান তিনি।

রায়গঞ্জ(সিরাজগঞ্জ)সংবাদদাতা দীপক কুমার কর জানান, আমন মৌসুমের ধান কাটা প্রায় শেষের দিকে। ফলনও ভালো। কিন্তু ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকের মুখে হাসি নেই। কৃষকরা জানান, এবার ধানের দাম গত আমন মৌসুমের চেয়েও মণ প্রতি ৩০ থেকে ৪০ টাকা কম। বর্তমানে রায়গঞ্জের হাটবাজারে প্রতি মণ মোটা গুটি স্বর্ণা ৫৭০ থেকে ৫৯০ টাকা, চিকন স্বর্ণা ৫-৬৫০ থেকে ৬৭০ টাকা, ব্রি ৪৯-৬৭০ থেকে ৭০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক নাজমুল করিম বলেন, রায়গঞ্জে পৌরসভার এলাকার কৃষক নির্বাচন করা হয়েছে। এবং সেখান থেকে ৩২ টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। কিন্তু উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে এখনো কৃষক নির্বাচন সম্পন্ন হয়নি। কৃষক নির্বাচন করা হলেই পুরোদমে ধান সংগ্রহ করা হবে।

বগুড়া অফিস থেকে স্টাফ রিপোর্টার মিলন রহমান জানান, বগুড়া জেলায় ধান মাড়া কাটা শেষ হলেও হাটবাজারে ধানের দাম কম থাকায় কৃষক হতাশ হয়ে পড়েছে। বগুড়া জেলার ধানের বড়ো হাট রনবাঘা, ওমরপুর, ধাপেরহাট ও আদমদীঘির হাটের পাশাপাশি শেরপুর ও মির্জাপুর হাটে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থানীয় বাজারে ৪৯ জাতের ধান প্রতি মণ ৬৩০ থেকে ৬৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কয়েকজন কৃষক অভিযোগ করেন, বাজারের চেয়ে বেশি লাভ পাওয়ায় স্থানীয় প্রভাবশালী মহল কৃষকের কাছ থেকে কম দামে ধান কিনে নিচ্ছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে ৫৮ লাখ ৯৪ হাজার হেক্টর জমিতে আমন আবাদ হয়েছে। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে বেশি আবাদ হয়েছে। উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ কোটি ৪০ লাখ টন। আশা করা হচ্ছে—আমন উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে।

চলতি বছরের শুরুতে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিবিষয়ক সংস্থা ইউএসডিএ বলেছে, বিশ্বে এ বছর ধানের উত্পাদন সবচেয়ে বেড়েছে বাংলাদেশে। বিশ্বব্যাংক বলেছে, পরপর কয়েক বছর ধানের বাম্পার ফলনের ফলে কৃষিতে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। কিন্তু কৃষকের জীবনমানের কোনো উন্নতি নেই। তাদের ভাগ্য বদলাচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, কৃষক যাতে ধানের ন্যায্যমূল্য পায় সেজন্য আমরা বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছি। এবার আমন মৌসুমে সর্বোচ্চ ৬ লাখ টন ধান কেনা হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, লটারীর মাধ্যমে কৃষক নির্বাচন করে এই ধান কেনা হচ্ছে। এতে মধ্যস্বত্বভোগী, ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্য কমে যাবে। এখনো বিভিন্ন জায়গায় কৃষক নির্বাচন না হওয়া প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী বলেন, এত দিনে কৃষক নির্বাচন হয়ে যাওয়ার কথা। কোন কোন জায়গায় হয়নি এ ব্যাপারে আমি এখনই খোঁজ নিচ্ছি।-ইত্তেফাক