একটি চমৎকার সকালের প্রত্যাশায়!!

26

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ জীবন মানেই অনুভূতি; দুঃখ, কষ্ট আর আনন্দ পাবার চরম এবং পরম অনুভূতি। দিন দিন বয়স বাড়ছে বলে কিনা জানি না, আজকাল নানান কাজে নানান ধরণের অনুভূতি পাই; বেশ ঘন ঘন পাই। ঘন ঘন কষ্ট পাই, আবার আনন্দও পাই। তবে কষ্ট যেমন তেমন, আনন্দ পাবার অনুভূতিটা আর আগের মত নেই। আমুল বদলে গেছে। খুব লক্ষ্য করছি, ইদানিং পার্থিব সব আনন্দকে ম্লান করে দেয় আমার শোনিমের কাছে ফিরে যাবার গভীর আনন্দটা।
গোধূলী বেলায় সব পাখি যেমনি ঘরে ফিরে, ঠিক তেমনি আমিও ফিরি। পাখির মত কিচির মিচির করে নয়, নীরবে চুপিচুপি ফিরি। তবে প্রতি সন্ধ্যায় না। কিছুদিন বিরতি দিয়ে দিয়ে ফিরি। এ কারণেই জীবনের কঠিন বাস্তবতায় বর্তমানে শোনিমের সাথে টানা থাকা হয় না। মাঝেমাঝে আসা যাওয়া হয় কেবল। ক’দিন একসাথে থেকে আবার ক’দিন আলাদা থাকি। অনেকটা প্রতিদিনকার বিদ্যুতের লোডশেডিং এর মত। আসি আর যাই। বিষয়টি খুবই বিব্রতকর। বেশ কষ্টকরও বটে।
অবশ্য প্রবাসীদের কষ্টটাই এমন। প্রবাসী পরিবারের চিত্রটাই এমন। ২৫টা বছর তো প্রবাসেই কাটিয়ে দিলাম। জীবনের প্রায় অর্ধেকটা সময়! এতটা সময় ধরে প্রবাসী হয়ে কিছু যে করতে পারিনি তা নয়। নিজের জন্যে যেমনি কিছু করতে পেরেছি, দেশের জন্যেও করার চেষ্টা করেছি অবিরত। কতটুকু পেরেছি জানিনা। তবে চেষ্টা করে চলেছি অবিরাম। বিনিময়ে দেশের কাছে কিচ্ছু চাইনি। আদরও চাইনি, অনাদরও চাইনি। চাইনি বলেই হয়ত আদর পাইনি। চাইলেও পেতাম না নিশ্চিত। তবে না চাইলেও অনাদর আর অবহেলা পেয়ে যাচ্ছি নিত্যদিন। কথাটি শুধু আমার বেলায় নয়, সব প্রবাসীর বেলায়ই প্রযোজ্য।
প্রবাসীদের কোন ক্যাডারে বা কাতারে ফেলে মূল্যায়ন করার কোন প্ল্যাটফরম আজো দেশে তৈরী হয়নি। ঘাটে ঘাটে তাদেরকে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। যেনতেন নয়, মাঝেমধ্যে ইজ্জত নিয়েও টান দেয়। শিক্ষাদীক্ষা, টাকা পয়সা থাকার পরেও বিয়ে করতে পারে না। এক সময় প্রবাসী ছেলেদের বিয়েতে ভাল ডিমান্ড ছিল। এখন সেটিও নেই। বরং উল্টো হয়েছে। প্রবাসী শুনলে ঘটকের মাথায় বাজ পড়ে; কথা ঘুরিয়ে নেয়। আবার কেবল অভিভাবক নয়, মেয়েরাও আগের মত প্রবাসী ছেলেদের গ্রহন করে না। অযাচিতভাবে সন্দেহ করে; “বিদেশী পোলা! কী করে না করে কেডায় জানে!”
আমার কপাল ভাল এই ধরণের সন্দেহ যুগের আগমনের আগেই শোনিমের আম্মুর সাথে আমার গাটছড়াটা বাঁধা হয়ে যায়। বর্তমান প্রজন্মে জন্ম নিয়ে প্রবাসী হলে কপালে খুব দূর্ভোগ ছিল। এখনও দূর্ভোগ আছে, তবে অন্য জায়গায়। একবার ব্যাংকে গেলাম কিছু টাকা লোন নেবার জন্যে। যে ব্যাংকে গেলাম ওখানে আমি পরিচিত। মোটামুটি ভালই পরিচিত। গেলে সালামও দেয়, বসতেও দেয়। দেবে না কেন? বিদেশ থেকে যা কিছু অর্জন সবই পাঠিয়েছি এই ব্যাংকের একাউন্টে। অথচ ঐ সালাম আর চেয়ার দেয়া পর্যন্তই। আর কিছু দিতে পারেনি।
খুব ঠেকেই লোনটা চেয়েছিলাম। যেই না চাইলাম অমনি মুখ শুকনা করে ফেললো। সরাসরি তো আর না করতে পারে না। তাই নানাভাবে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে না করে দেবার মতলব আটলো; পথ খুঁজলো। আসলে পথ তো খোঁজা লাগে না। সব সময় রেডিই থাকে। ক’দিন ঘুরিয়ে আমাকেও সেই রেডিমেড পথ দেখিয়ে দিল। মানে, না করে দিল। কিন্তু ব্যাখ্যাটা দিল খুবই রসালো করে। “স্যার! ফাইলটা এপ্র“ভ হয়েই গিয়েছিল। জাস্ট বড় স্যারের ফাইনাল সাইনটা নিতে যাবো, অমনি বাগড়া পড়লো। কপাল খারাপ হলে যা হয় আর কি, স্যার! একেবারে ফাইনাল হয়ে যাওয়া ফাইলটা হলো না।”
ঘটনা আসলে তা নয়। ফাইলটা এপ্র“ভ করা পর্যন্ত যায়ওনি। যায়নি এই কারণে যে আমার গায়ে প্রবাসীর তকমা। যে তকমা মাখিয়ে আমি মোটামুটি গর্ব করে চলাফেরা করতাম, সেই তকমাই আমাকে অযোগ্য করে দিল। মানে, ডিসকোয়ালিফাইড। আমি প্রবাসী। চালচুলার সঠিক খবর জানার উপায় নেই; তাই আমি অযোগ্য। আমার কোন ভিত্তি নেই, স্থায়ীত্ব নেই। ঠিকানা বিহীন এই আমি কখন দেশ থেকে ভেগে যাই কে জানে।
লোন দেবার জন্যে তাদের দরকার যারা দেশে থাকে এবং খেলাপী হয়েও ভাগে না। তাদের ভাগার প্রয়োজন পড়ে না। তারা লজ্জাশরমের বালাই না থাকা বড়বড় রুইকাতলা। ঘুষ খেয়ে কিংবা লুটপাট করেও বহাল তবিয়তে দেশেই থাকে। বড় মুখ করেই থাকে। কথাও বলে বড় বড়। জীবনেও দেশকে কোনদিন কিছু দিয়েছে বলে দেখাতে পারবে না। দেবে কখন? নিতে নিতেই তো জীবন শেষ । প্রবাসীরা কখনোই নেয় না। যতটুকু পারে কেবল দেয়।
প্রবাস থেকে ডলার পাঠিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দিনে দিনে বাড়িয়ে দেয়। তবুও তারা অবহেলিত হয়, অপমানিত হয়। মূল্যায়িত হয় না। হয় অবমূল্যায়িত। ঢাকা এয়ারপোর্ট ইমিগ্রেশনে বহুবার এমনভাবে অবমূল্যায়িত হয়েছি। বছর দশেক আগের কথা। ঘন ঘন জাপানীজদের নিয়ে দেশে আসতাম। পেটের তাগিদেই আসতাম। ইনভেষ্টমেন্ট কিংবা জয়েন্ট ভেনচার করানোর চেষ্টা করতাম। তাই বেশী বেশী আসতে হতো দেশে। পাসপোর্টটা হাতে নিয়েই ইমিগ্রেশন অফিসার একটা আর্টিফিসিয়াল মুড নিতেন। এদিক ওদিক তাকিয়ে খুবই তাচ্ছিল্যভরা কন্ঠে বলতেন, “এত ঘন ঘন দেশে আসেন? আর ক’দিন থেকেই চলে যান? এত ফুরুৎফারুতের মতলবটা কি? আসলে কী করেন আপনি?”
এভাবে নিত্যদিন এয়ারপোর্টে হয়রানীর শিকার হচ্ছে প্রবাসীরা। দেশে আসতে কিংবা যেতে কতভাবে যে তারা হেনস্থার শিকার হচ্ছে তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানে। তারপরও তারা দেশের মায়া কাটাতে পারে না। শেকড়ের টান কি চাইলেই কাটানো যায়! হয়ত এ জন্যেই দেশকে প্রচন্ড ফিল করে; ভালবাসে। বিদেশ বিভূঁইয়ে কষ্ট করে পড়ে থেকেও দু’জন বাঙালী এক হলেই একদুই কথার পরে দেশের কথা বলে। দেশের ভাল খবরে তারা যেমনি আপ্লুত হয়; নানা দূর্ভোগের গল্প তেমনি তাদেরকে হতাশ করে, ব্যথিত করে।
আসসোস করা ছাড়া দূর প্রবাসে বসে তারা কিছু করতে না পারলেও অন্তত দেশে থাকা মুখোশধারী ইতরদের মত ইতরামী করে না। তারা পেঁয়াজ মজুদ করে না। মানুষের জীবনকে জিম্মি করে লবন বা চালের মত নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়াবার চেষ্টা করে না। খাদ্যে ফরমালিন মিশায় না। কাটে না ছেলেধরার নামে মানুষের মাথা। গুজব ছড়ায় না, হ্যাকিংও করে না। আবার ক্যাসিনোও খেলে না। কিংবা দেশের বড়বড় প্রজেক্ট বন্ধের জন্যে ষড়যন্ত্রের খেলায়ও মাতে না।
তারা শুধু মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিনরাত পরিশ্রম করে। অমানুষিক পরিশ্রম। এসব করে যা কিছু আয় হয় তার প্রায় পুরোটাই দেশে থাকা পরিবারকে পাঠিয়ে দেয়। যাতে করে পরিবার বাঁচে; দেশও বাঁচে। কিন্তু তারা ভালভাবে বাঁচতে পারে না। তারা দিন শেষে ঘরে ফিরে দেশের প্রিয়জনদের ফোন দিয়ে খোঁজ খবর নিয়ে নিয়েই জীবন পার করে দেয়। এতকিছুর পরও সরকার তাদেরকে স্বীকৃতি দেয় না।
সরকার ফি বছর ভাল কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ গুণীজনদের পদক দেয়। তবে কখনোই প্রবাসীকে দেয় না। ভাবখানা এমন যে এই শ্রেণীতে আবার গুণীজন হয় কেমন করে। এইদেশে পদক পাবার জন্যে শুধু মাত্র কবি, সাহিত্যিক কিংবা বুদ্ধিজীবি হওয়া লাগে। আর লাগে ভাল খেলোয়ার হওয়া। ভাল ছাত্র কিংবা ভাল ব্যবসায়ী হলে কোনভাবেই পদক পাওয়া যায় না। সৎ এবং পরিশ্রমী সরকারী কিংবা বেসরকারী চাকুরে হয়ে জীবন পার করা মানুষটি কোনভাবেই সরকারী পদকের স্বপ্ন দেখে না।
আর প্রবাসীদের তো স্বপ্ন দেখার সাহসই নেই। সাহস শেষ হয়েছে দেশের এয়ারপোর্টে; দেশ থেকে যেতে আর আসতে এয়ারপোর্টওয়ালাদের যাতা খেতে খেতে। সব সাহসই শেষ। আছে কেবল কষ্ট পাবার ক্ষমতা। হয়ত এজন্যই দুনিয়ার সব কষ্ট নিয়ে প্রবাসীরা দিন আর মাস শেষ করে। শেষ করে বছর। আসে নতুন বছরের নতুন দিন। দেশের মানুষ তাদের কথা ভাবলো কিনা এটা তারা মাথায় রাখে না। সকাল সকাল ঘুম থেকে জেগে সব জীর্ণতা ফেলে একটা চমৎকার নতুন দিনের প্রত্যাশায় খালি পেটে আর হাসি মুখেই দেশে ফোন করে প্রিয়জনকে বলে, “বছরের প্রথমদিন তোমরা কেমন আছো! খেয়েছো তো? আমি খেয়েছি! ভাল আছি, অনেক ভাল! তোমরা ভাল থেকো!! শুভ নববর্ষ!!!”-লেখকঃ উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা।