একজন দশর আলী মোল্লা :

41

সাইফুল ইসলাম শিশির: ৬০ দশকের শুরুর কথা বলছি। শরৎ কালের শেষে নদি-নালা, খাল- বিলের পানিতে তখন টান ধরে। মনে হয় নদি যেন বিগত যৌবনা- মরা সাপের মতো অসাড় হয়ে পড়ে আছে। জলাবদ্ধতা, মাটির পঁচা গন্ধ বাতাসে ভাসছে। ভাদ্রের কড়া রোদে শরীর চিটচিট করে। স্রোতহীন পানিতে তাল পড়ে টুপ করে। হাবুডুবু খায়- একটু পরেই তা স্থির হয়ে যায়।
এ সময়টা ভালো লাগে না। না লাগার কারণও আছে। পানি কমতে থাকে, আঁকাবাঁকা মেঠোপথ জেগে ওঠে। লোক মুখে খবর আসে স্কুল খুলেছে। শুনেই বুকের মধ্যে ধুপ করে উঠে। এক ধরনের ভয় কাজ করে। হেলাফেলা, ডুব-জল খেলে সময় পার হয়ে গেছে। বাড়ির কাজ- হাতের লেখা কিছুই তৈরী হয়নি। শশধর পণ্ডিতের অগ্নিমূর্তি তখন চোখের সামনে ভেসে উঠে।
মায়ের কথা মতো মনো বুবু আমার মাথায় তেল- সিঁথি কেটে দেয়। তখন সাজগোজ বলতে মাথায় তেল দেয়া সিঁথি করা এটুকুই। মা দুএকদিন গ্লাস ভরে দুধ খাইয়ে দিতেন। বই খাতা বগলদাবা করে আমজাদ, শিউলিদের সাথে স্কুলে যেতাম। যাবার সময় পা যেন চলত না। ফেরার পথে দুলকি তালে সবাই মিলে বাড়ি ফিরতাম। মুখে দু’মুঠো গুঁজে দিয়েই ধরে (কাটাখালে) মাছ ধরতে যেতাম।
চরপদুমপাল গ্রামের পাশ দিয়ে রাজাপুর, বহুলী, মাছুয়াকান্দি গ্রামের ৪/৫ বর্গ মাইলের পানি ধর (কাটাখাল) দিয়ে গড়াতো। মাটিতে পা রাখাই তখন কঠিন ছিল। পানি কমে- স্রোত বাড়ে – মাছ গড়ায় ঝাঁকে ঝাঁকে। অর্ধেক পানি অর্ধেক তার মাছ।
ধরের মুখে জাল, পলো, ধিয়াল, দারকি নিয়ে সপ্তাহ ব্যাপি মাছ ধরার উৎসব চলত। চারিদিকে মানুষের ভীড়। মাথার উপর কাক, বক, চিল, মাছরাঙ্গা পাখিদের উড়ে বেড়ানো, ছোঁ দিয়ে মাছ ধরার সে এক মজার দৃশ্য। ডিমওয়ালা চিংড়ি, পুঁটি, বেলে, রায়েক, পাবদা, টেংরা, বোয়াল, কাতল, ফলি, আইড় প্রভৃতি মাছ জাল, পলো, ধিয়ালে ধরা পড়তো। আমি খালুই নিয়ে অপেক্ষা করেছি, দাঁড়িয়ে সে উৎসব দেখেছি। আনন্দে আপ্লুত- আত্মহারা হয়েছি।
ভাদ্র আশ্বিন মাসে গ্রাম-গঞ্জে তখন শুধু শুঁটকি আর শুঁটকি। শুঁটকি মাছের ছড়াছড়ি। বাড়ির ভিতরে- বাহিরে, ঘরের চালে, গাছের ডালে শুঁটকি শুকানোর সেকী ধুম। রশির সাথে মাছ গেঁথে বাড়ির আঙ্গিনায় ঝুলিয়ে দিতো। মালার মত বাতাসে দোল খেত। ভনভন করে মাছি উড়তো। মাছ পচার বিটকেল গন্ধে বাড়িতে পা ফেলা যেত না।
দশা মোল্লার মা গেন্দী বিবি বাহির বাড়িতে জুবুথুবু হয়ে বসে থাকে। তার চোখের জ্যোতি কমে গেছে। ভালো করে দেখতে পায়না না। তবু পাটকাঠি নিয়ে কাক- পক্ষী তাড়ায়। শুঁটকি মাছ পাহারা দেয়। সামনে দিয়ে কেউ গেলে জিজ্ঞেস করে, “কী মাছ ধরছ? এল্লা দেহি।” খালুই এগিয়ে দিলে হাত দিয়ে ধরে- উঁকি দেয়। বেলে মাছের মতো ঘোলা চোখ তুলে বিড়বিড় করে– “দশার বাপ রাতবিরেত মাছ ধরতে যেত। খালুই ভর্তি মাছ নিয়ে বাড়ি ফিরতো। মাছ কুটে শুমার পেতামনা।” গিন্দী বিবি তার সোনালি অতিতকে হাতড়ে বেড়ায়।
অথচ দশা মোল্লা বাপের কোন গুণই পায়নি। নাম দশা মোল্লা। বাবা ডাকতেন দশর আলী বলে। কিন্তু সে দশ পর্যন্ত গুণতে জানে না। একদম বোকাসোকা মানুষ। কথা বলতে তার কথা আটকে যায়। তাকে নিয়ে গাঁয়ের মানুষ প্রায়শই হাসি ঠাট্টা করে। দশা মোল্লা সে কথা গায়ে মাখে না।
গেন্দী বিবি একবার দশা মোল্লাকে হাটে পাঠিয়েছে ছাগল বিক্রি করতে। ছাগল বিক্রি না করে বাড়ি ফিরে আসে। মাকে দুহাত দেখিয়ে বলে “মা মা ইত্তুড়ি!” আর কিছুদিন পালতে পারলে দুহাত প্রসারিত করে বলে ” ইত্তুড়ি হইবো।” কত টাকা দাম হয়েছে দশা তা বলতে পারেনা। এরপর থেকে দশা মোল্লাকে দেখলে সবাই বলত “মা – মা ইত্তুড়ি –“
দশা মোল্লা একদিন আধা সের দুধ কিনে গল্প করছে। “আজ দুধ খাইলাম– আমি খাইলাম একবাটি, নুরার মায়ে খাইলো একবাটি, নুরা খাইল একবাটি, জহির খাইলো একবাটি, মনজুরা গেদি খাইলো এক বাটি। তারপরও একবাটি বয়ে গেছে।” উপস্থিত এক রসিকজন বলে ওঠে- ওচাচা! চাচি বোধহয় আজ খালের পানি ২/১ ইঞ্চি কমায়া ফেলাইছে!”
এ সময় গ্রামে গ্রামে কলেরা- ডাইরিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা দিত। মানুষ মরে গ্রামকে গ্রাম উজাড় হয়ে যেত। সন্ধ্যা হলে দূর গ্রাম থেকে ভেসে আসতো থালা,প্লেট, ভাংগা টিন, ঘুন্টি পিটানো, ঢোলের বাড়ি, বাদ্য-বাজনার আওয়াজ। এসব বাজালে রোগ শোক মহামারি পালিয়ে যাবে। অন্ধবিশ্বাস থেকে তারা এসব করত।
ভোর না হতেই খবর আসতো কোন গ্রামে কতজন মারা গেছে। জটলা করে মানুষ এসব নিয়ে আলাপ করত। টক ফজলের ভাগ্নী জামাই আসগর আলী খবর নিয়ে আসে, তাদের হোড়গাতি গ্রামে গতরাতে এক ‘পোকে’ই মারা গেছে ১১জন।
প্রাইমারি স্কুলে এক সাথে পড়তাম। আমার বাল্যবন্ধু আইয়ুব আলী। এক সাথে ঢিল ছুড়ে আম পেড়েছি, কাদা ছিটিয়ে মাছ ধরেছি, ধুলো বালি মেখে খেলা করেছি। গতকাল এক সাথে আমরা স্কুল থেকে ফিরেছি। কথা ছিল, এবার দু’জনে মিলে কালিয়ার মেলায় যাবো। আম কাটার চাকু কিনবো, মাউথ অর্গান কিনবো। কেনা হলনা কিছুই। ভোরে উঠে শুনি “প্যাটচলা ব্যারামে” আইয়ুব আলী মারা গেছে।
আমাকে জড়িয়ে ধরে আইয়ুব আলীর মার সেকী আহাজারি। সে কথা মনে হলে এখনো মনটা ভারি হয়ে ওঠে। ছোট বেলার সুখস্মৃতির মাঝে এ যেন এক বেদনার পাহাড়। বুকের গহিনে সে পাহাড় এতটুকুও সরেনি।-লেখক: একজন সমাজকর্মী।

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রি.
লেক সার্কাস, উত্তর ধানমণ্ডি, ঢাকা।

*মতামত বিভাগে প্রকাশিত সকল লেখাই লেখকের নিজস্ব ব্যক্তিগত বক্তব্য বা মতামত।