একজন কমিউনিস্ট-বিপ্লবীর স্মরণে

13

সাইফুল ইসলাম শিশিরঃ’৮০ দশকের শুরুর কথা বলছি। এদেশে কমিউনিস্ট আন্দোনের অমিততেজা সাহসী পুরুষ আল্লা নেওয়াজ খাইরু। নেতৃত্বের দৃঢ়তা, যোগ্যতা, সম্ভাবনার এক দ্যুতি ছড়িয়ে তিনি অকালে ঝরে গেলেন। কমিউনিস্ট বন্ধুরা হারালো তাদের প্রিয় সহযোদ্ধাকে। দেশ হারালো এক অপার সম্ভাবনাময় নেতাকে।

তাঁর স্মরণ সভা হবে পৈত্রিক নিবাস রাজবাড়িতে। ঢাকা থেকে জনাব ফজলে হোসেন বাদশাহ, ড. মেসবাহ কামাল ও আমি স্মরণ সভায় যোগদানের জন্য সেখানে গিয়ে পৌঁছাই। রাজবাড়ি বাম ঘরণার রাজনীতি প্রভাবিত অঞ্চল। কমরেড খাইরুর মৃত্যুতে সারা এলাকা তখনও শোকে মুহ্যমান।

বিকেলবেলা স্কুল মাঠে স্মরণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সাধারণ মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি দেখে আমি বিমোহিত হই- উজ্জীবিত হই। সেদিন খাইরু ভাইয়ের প্রতি শ্রদ্ধা ভরে আবেগময় বক্তব্য রেখেছিলাম। যা এখনো মনে পড়ে। সন্ধ্যার পর স্কুল হলরুমে নির্ধারিত পার্টি মেম্বরদের নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক বসে। আমি তাদের পার্টি মেম্বর নই। বিধায় পাশের রুমে বসে অপেক্ষা করতে থাকি। কৃষ্ণপক্ষ- নিকষ কালো অন্ধকার। মফস্বল শহর! সন্ধ্যা না হতেই ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যায়। নিস্তব্ধ চারিদিক কোন সাড়াশব্দ নেই।

এক যুবক এসে আস্তে করে বললো, চেয়ার নিয়ে বারান্দায় বসুন। একটু পরেই পার্টির পক্ষ থেকে কমরেড খায়রুর প্রতি জেনারেল স্যালুট জানানো হবে। আমি যেন এই মাহেন্দ্রক্ষণের প্রতিক্ষায় ছিলাম।

কমরেড বিমল বিশ্বাস, কমরেড ওহিদূর রহমান, কমরেড ফজলে হোসেন বাদশা মাঠের মধ্যে গিয়ে দাঁড়ালেন। দূর থেকে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়। ৭০ থেকে ৮০ জনের একটি দল মার্চপাস্ট করতে করতে মাঠের মধ্যে প্রবেশ করে।

হঠাৎ অন্ধকার ভেদকরে ওহিদুর রহমানের জলদগম্ভীর কণ্ঠ ভেসে আসে। তিনি কমরেডদের শপথ বাক্য পাঠ করান। ক. খাইরুর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। মার্চপাস্ট ও জেনারেল স্যালুট জানিয়ে দল মাঠ ত্যাগ করতে থাকে। তখক্ষণে পূর্বাকাশে চাঁদ উঁকি দিচ্ছে।

কাকজ্যোৎস্নায় শুধু কালো ছায়ার মতো দেখা যাচ্ছিল। কমরেডগণ সমস্বরে বলে উঠলেন, বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক! কমরেড খাইরু অমর হোক!! গগণবিদারী শ্লোগানে প্রকম্পিত হয় চারিদিক। তখন — স্পন্দিত বক্ষে মনে হয় আমিই লেনিন।

কমরেড ওহিদুর রহমান একদিন শের ই বাংলা হলে এমদাদুল হক আন্টুর রুমে বসে আমাদের সাথে কথা বলছিলেন। আন্টু তখন শেরে বাংলা হল ছাত্র সংসদের ভিপি ও জনপ্রিয় ছাত্র নেতা। ‘৮১ সালে বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সম্মেলন। সম্মেলনে প্রধান অতিথি কাকে করা যায় তা নিয়ে রাকসু ভবনে মিটিং ছিল সেদিন। হাজী মোঃ দানেশকে প্রধান অতিথি করার ব্যাপারে আমাকে এবং আন্টুকে ভূমিকা রাখতে বলেন। আন্টু হঠাৎ করেই ওহিদ ভাইকে বলে ফেলে ” এই সম্মেলন ছাত্রমৈত্রীর। তারা কাকে প্রধান অতিথি করবে না করবে সেটা তাদের ব্যাপার। আপনারা মাথা ঘামাতে আসেন কেন? চিরকুট পলেটিক্স এখন অচল”। আমি দারুণ বিব্রত বোধ করি। আন্টুকে থামিয়ে দেই। ওহিদ ভাইকে রেখে আমরা রাকসু ভবনে চলে আসি।

ওহিদুর ভাই দারুণ আবেগী- বিপ্লবী মানুষ। তিনি একবার আমাকে কমিউনিস্ট অধ্যুষিত মুক্তাঞ্চল দেখাতে নিয়ে যান। আত্রাই, ধামরহাট, নিয়ামতপুর, বাঘমারা, মান্দা,পোরসা, মোহনপুর — স্বাধীনতাত্তোর কালে বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা তাদের প্রাধান্য বিস্তার করে। যা নকশাল নামে অধিক পরিচিত ছিল। ভূস্বামী- জোতদাররা তখন গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসে। আইন শৃংখলা বাহিনী কোন ঠাসা হয়ে পড়ে। পারতো পক্ষে তারা গ্রামাঞ্চলে যেতনা।

রাজশাহী থেকে ট্রেনে চেপে আহসানগঞ্জ রেল স্টেশনে এসে নামলাম। এক যুবক আমাকে দেখে এগিয়ে এলো। বর্ণনা মতে ঠিক- – আমার গাইড খোকন। সে বলল পায়েচলা বহুদূর যেতে হবে। পথে তেমন কোন খাবার ব্যবস্থা নেই। এখানেই দু’মুঠো খেয়ে নেয়া ভালো। স্টেশনের পাশে বটতলায় ছাপড়ার নিচে খাবার হোটেল। পাশে তরকারির খোসা, মাছের আঁশ, ভাতের ফেন পড়ে আছে। মাছি উড়ছে। অদূরে একটি নেড়ি কুকুর শুয়ে। দেখে খাবার রুচি হয়না। আর কোন খাবার হোটেলও নেই। অগত্যা মধুসূদন।

বাঁশের মাচানের উপর রাখা গামলায় আইড় মাছের বড় বড় চাকা। লাল মরিচের টকটকে ঝোলের উপর তেল ভাসছে। দেখে লোভ সামলানো দায়। জগের পানিতে হাত ধুয়ে নিলাম। আউশ চালের মোটা ভাত আর আইড় মাছের সালুন। বহুদিন পর খাচ্ছি। যেন অমৃতসম।

সূর্য তখন মধ্য গগনে। হেটে রওনা হলাম। আশ্বিন- কার্তিক মাস। পায়ে চলা উঁচুনিচু মেঠো পথ। বিলের পানি তখন নেমে যাচ্ছে। জাল- জেলে নৌকা, বরশি যত্রতত্র চোখে পড়ছে। শুটকি মাছের আঁশটে গন্ধ নাকে এসে লাগছে। হাটঁছি তো হাঁটছি, পথ যেন কিছুতেই ফুরায় না। অনেক দূরে দূরে গ্রাম। সূর্য ডোবার আগে আগে আমরা পৌঁছে গেলাম দীঘলকান্দি গ্রামে।

ইতোমধ্যেই ওহিদুর ভাই দীঘলকান্দি এসে পৌঁছেছেন। আমাদের বাড়ির ভিতরে নিয়ে গেলেন। উঠানে বসতে দিলেন। ঘর মাত্র দেড়খানা কিন্তু উঠানটা বেশ বড়। টুরিতে করে গুড়মুড়ি, জগ ভর্তি পানি নিয়ে এলেন দেলবার মিয়া। তিনি একজন প্রান্তিক কৃষক। নিজের যৎসামান্য জমিজমা আছে তার সাথে অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করেন। পরে জেনেছি দেলবার মিয়া এবং তাঁর স্ত্রী দুজনই পার্টি মেম্বর। মর্জিনা বেগম টিনের মগে গুড় তেজপাতার লাল চা নিয়ে এলেন। গুড়মুড়ি দিয়ে আপ্যায়ন নিমিষের মধ্যে সকল ক্লান্তি দুর হয়ে গেল।

সাঁঝ রাতে চারিদিক থেকে কুপিবাতি- পাটশোলা জ্বালিয়ে কৃষক সমিতির লোকেরা দেলবার মিয়ার ভিটাতে এসে জমা হতে থাকে। মুহূর্তের মধ্যে উঠান ভরে যায়। অধিকাংশই ভূমিহীন দিন মজুর, কিষাণ- কিষাণী, ক্ষুদ্র চাষি। চট -খড়ের বিচালিতে সবাই বসে যায়।

আনুষ্ঠানিক ভাবে সভা শুরু হলে কমরেড ওহিদুর রহমান ঘোষণা দেন ” আমাদের মধ্যে এক সাথি এসেছেন। তিনি আপনাদের লড়াই- সংগ্রাম- সফলতার কথা শুনেছেন। আজ স্বচক্ষে দেখতে এসেছেন।” বিপুল করতালির মধ্য দিয়ে তারা আমাকে স্বাগত জানায়। তাদের পার্টির একটি প্রচার পত্র সভায় পড়ে শোনান হয়। কমরেড ওহিদুর রহমান তাঁর ভরাট গলায় প্রচার পত্রের মর্মার্থ ব্যাখ্যা করলেন। সবাই খুব আগ্রহ ভরে শুনছেন। শেষে প্রশ্ন করলেন, আমাদের প্রধান শত্রু কারা? ১৮-২০ বছরের এক যুবক দাঁড়িয়ে বললো, সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ, পুঁজিবাদ, জোতদার, মহাজন এরাই আমাদের শত্রু। এদের বিরুদ্ধেই আমাদের লড়াই- সংগ্রাম।

শ্লোগান দিতে দিতে সবাই ফিরে যাচ্ছে– দূর থেকে ভেসে আসছে ‘জয় সর্বহারা! বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক।’ আমি আপ্লুত হই- উজ্জীবিত হই। দীঘলকান্দির মত পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর এক আলোকপ্রাপ্ত অংশ- কৃষকের মুখে শুনি সেই অগ্নিযুগের কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের শ্লোগান– ইনকিলাব জিন্দাবাদ!

দীঘলকান্দি এসে মর্জিনাদের দেখে কমরেড সিরাজ সিকদার’র একটি কবিতার কথা মনে পড়ল।
“পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামছে এক মুরং মেয়ে
কি নিটোল স্বাস্থ্যবতী!
কবে তার কাঁধে শোভাপাবে রাইফেল একখানি।”-লেখকঃ একজন সমাজকর্মী।
১৫ জুলাই, ২০২০ খ্রি.
লেক সার্কাস, ঢাকা।