এই দেশ কার দেশ, কাদের দেশ!!!

ইঞ্জিনিয়ার সরদার মো: শাহীনঃ টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছিল সেই সকাল থেকেই। শুক্রবারের সকাল। মাঝে মাঝে খানিকটা রোদের আভা দেখা দিয়ে আবার মেঘকালো আকাশে টিপটিপ বৃষ্টি। পড়ার ধরনটাই আলাদা। কিছুক্ষন পড়ে, আবার থামে। এ যেন রোদবৃষ্টির লুকোচুরি খেলা। এমনিতেই আকাশ কালো হলে আমার মনটা খারাপ হয়। কেমন যেন ঝিমিয়ে পড়ি। হয়ত এ জন্যেই সকাল থেকেই খানিকটা ঝিমানো ভাব। আমার শোনিমও ঝিমাচ্ছে। দু’দিন আগ থেকেই ঝিমাচ্ছে। ওর ঝিমানোর কারন ভিন্ন। প্রবাসী এই আমি প্রবাসে রওনা দিলেই ওর ঝিমানো শুরু হয়। আগে এমন হতো না। যতই বড় হচ্ছে, ঝিমানোও ততই বাড়ছে। তবে এবার একটু বেশীই বেড়েছে। কী জানি, কেন বেড়েছে!
ফ্লাইট মধ্যরাত্রিতে। তবে বাসা থেকে বেরিয়েছি বেশ আগেভাগে। দু’দিন আগে বিদেশ ফেরত দেশনেত্রীকে এয়ারপোর্টে রাজনৈতিক সংবর্ধনা দিতে যেয়ে রাস্তায় যে বেড়াছেড়া লেগে গিয়েছিল সে কথা মনে রেখেই আগেভাগে বের হওয়া। কে জানে আজ আবার কার জন্যে কোন্ জট লাগে। কথায় কথায় জট। সংবর্ধনা হলে জট, বৃষ্টি হলেও জট। এর বিরুদ্ধে এত লেখালেখি হচ্ছে মিডিয়ায়। আমরাও লিখেছি। কোন কাজ হয়নি। কেউ শোনেনি। কে শোনে কার কথা!
অবশ্য তাদের শোনার কথাও না। তারা তো শোনেন না, কেবল বলেন। যা কিছু শোনার, তার পূরোটাই কেবল আমজনতার কাজ। আমজনতার বলার সুযোগ নেই। বিদেশ সফরে বিশেষ কিছু অর্জন কিংবা বিশেষ কোনো স্বীকৃতির জন্য গণসংবর্ধনা কিংবা অভ্যর্থনা অবশ্যই দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু তার জন্য জায়গা কেবল সবেধন আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টটি? মনে হচ্ছে সারা ঢাকা শহরে রাজনৈতিক সংবর্ধনা দেবার জন্যে এই একটি মাত্র এয়ারপোর্ট ছাড়া আর কোন জায়গা নেই।
সেদিন প্রধানমন্ত্রী সরকারি সফরে বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন। তাই এয়ারপোর্টে সংবর্ধনা। রাস্তা ঘাট আটকে দূপুরের পর থেকে সংবর্ধনা। এতে সৃষ্টি হয় তীব্র যানজটের। ঘন্টার পর ঘন্টা যানজটে আটকে থাকে শত শত যানবাহন। বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা, আর দক্ষিণে পূরো ঢাকা শহর। সব অলিগলি। ঘন্টার পর ঘন্টা এক জায়গায় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে শত শত গাড়ি, হাজার হাজার মানুষ। যেন দেখার কেউ নেই বড় অভাগা এই অসহায় মানুষগুলোকে। দেখার কেউ নেই পূরো ঢাকাবাসীকে!
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিদেশ থেকে চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরবেন। তাকেও জানাতে হবে সংবর্ধনা। ভাল কথা। কিন্তু সংবর্ধনার নামে প্রতিযোগীতা কেন? এক দলকে দেখিয়ে আরেক দলের জনপ্রিয়তা প্রদর্শনের লোক দেখানোর প্রতিযোগিতা কেন? মানলাম দেখাতেই হবে। ঠিক আছে দেখান। লোক দেখানো অভ্যর্থনা; লোক দেখানো শো-ডাউন দেখান। কিন্তু এয়ারপোর্টে দেখাবেন কেন?
এই সংবর্ধনায় এয়ারপোর্ট এবং এর চারপাশ অসংখ্য নেতাকর্মীর সমাগমে শ্লোগানে শ্লোগানে প্রকম্পিত হয়। মুখরিত হয় দিগ্বিদিক । সেই মুখরিত কোলাহলে চাপা পড়ে থাকে অসংখ্য মানুষের গোঙানী, অসুস্থ মানুষের ছটফটানী, কর্মব্যস্ত মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর সীমাহীন দুশ্চিন্তা। সৃষ্টি হয় লাখ মানুষের ভোগান্তির! ক্ষুধার্ত শিশু যন্ত্রনায় ছটফট করে, হাসপাতালে পৌঁছাতে না পারায় অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যেই মুমূর্ষ মানুষ মৃত্যুবরন করে! কারোর বিবেচনায় আসে না সে সব!
কে জানে আমাদের নেতা-নেত্রীরা এসব কখনো ভেবে দেখেছেন কিনা! কিংবা আদৌ ভাবার সময় পান কি না। পেলে অনুরোধ করবো দেশে ফিরে কেবল এয়ারপোর্টের বাইরে জড়ো করা হাজার হাজার মানুষের জমায়েতের দৃশ্যই নয়, একটু ভিতরের দৃশ্যও দেখবেন। ভেতর মানে সাধারণের জন্যে বরাদ্দ থাকা ফ্লাইট চেক ইন এবং ইমিগ্রেশন লাউঞ্জ। সাধারণ মানে পাসপোর্ট টিকেট ছাড়া যাদের আর কিচ্ছু থাকে না; মামা থাকে না, খালু থাকে না। বিশেষ সহযোগীতার নামে বিশেষ কারো ফোন থাকে না। আপনারা যারা বিশেষ মর্যাদার মানুষ, তাদের বহির্গমন কিংবা প্রত্যাবর্তনে এ সকল লাউঞ্জে যাবার দরকার হয় না। আপনাদের জন্যে আছে বিশেষ বরাদ্দকৃত ভিআইপি লাউঞ্জ। যেখানে সাধারণের যেতে মানা। আল্লাহর দোহাই লাগে সাধারণের জন্যে থাকা লাউঞ্জে খানিকের জন্যে হলেও একটু যাবেন, একটু দেখবেন।
অবশ্য দেখার মত মজার কোন দৃশ্য নেই সেখানে। যা আছে সবই করুণ। বলছিলাম ২০শে অক্টোবরের মধ্যরাতের কথা। রাত পৌনে একটায় ফ্লাইট। দশটার দিকেই পৌঁছে যাই। ভিতরে ঢুকে আক্কেলগুড়ম অবস্থা। চেকইন লাউঞ্জ লোকে গিজগিজ করছে। দাঁড়াবার জায়গাটুকুও নেই। সবাই উদ্বিগ্ন। সবার চোখেমুখে কেবলই জিজ্ঞাসা। এইটুকু বুঝতে পারলাম, কম্পিউটারে মহা সমস্যা। সার্ভার ক্রাশ করেছে বিধায় সব ফ্লাইটের সব চেকইন বন্ধ। কখন শুরু হবে কেউ বলতে পারে না। কারো মুখে রা নেই। সব সরকারী কর্মকর্তা হাত গুটিয়ে বসে আছেন। যেন তাদের কোন দায় নেই এতে। সব দায় যেন স্বয়ং মন্ত্রী মহোদয়ের। যেন মন্ত্রী মহোদয় নিজে এসে সার্ভার ঠিক করে দিয়ে যাবেন। যেন সব জায়গার সব কাজ মন্ত্রীর একার। অথচ তাদের ব্যর্থতাতেই আজকের সমস্যার সৃষ্টি। আন্তর্জাতিক এই বিমানবন্দরে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রীর আনাগোনা। অথচ সার্ভার ক্রাশের নামে সব স্থবির। ভাবা যায়? কোনভাবেই ভাবাও যায় না, মানাও যায় না। ফ্লাইট ছিল পৌঁনে একটার। বসবার জায়গা নেই বিধায় টানা প্রায় পাঁচঘন্টা ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে রাত তিনটার আগে আগে হাতে লেখা বোর্ডিং পাস পেলাম। তখনো সার্ভার চালু করতে পারেনি বলে হাতে লিখেই পাস ধরিয়ে দিল। যেন চন্দ্র বিজয় হলো। শুধু দুঃখ থেকে গেল এই ভেবে যে, সেই তো হাতেই লিখলেন, এত ঘন্টা পরে লিখলেন কেন?
ইমিগ্রেশনে ঢুকতে যাবো; ওখানেও অভাবনীয় কান্ড; অদ্ভুত দৃশ্য। গেটে বসে আছেন ইমিগ্রেশনের মহিলা পুলিশ। বেশ কয়েকটা প্লাষ্টিকের বালতি সামনে নিয়ে জবুথবু হয়ে বসে আছেন। যেন কলপাড়ে পানির অপেক্ষায় বসে আছেন। তাকালাম উপরে। সিলিং থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে অবিরত। ঠিক পানি নয়, যেন বৃষ্টি ঝরছে। বন্দরের বাইরে বৃষ্টি, ভেতরেও বৃষ্টি। আজকে শরীর না ভিজিয়ে এয়ারপোর্টে পৌঁছতে পেরেছিলাম, কিন্তু শরীর না ভিজিয়ে ইমিগ্রেশনে ঢুকতে পারবো বলে মনে হলো না। এদিকে পানি জমে মেঝে পিচ্ছিল হয়ে আছে। হঠাৎ করে কেউ দেখলে বোঝার উপায় নেই। আমার বুঝে উঠবার আগেই মায়ের সংগে থাকা একটা ছোট বালক না বুঝে এগুতেই ধপ্পাস্। ফ্লোরের পানিতে মেখে একাকার।
দুঃখজনক হলো, যে এয়ারপোর্টের ভেতরে এই একাকার অবস্থা, সেই এয়ারপোর্টের বাইরে রাজনৈতিক সংবর্ধনা নিতে আমাদের নেতানেত্রীদের একটুও বাঁধে না। ৩৮ বছরের আধাভাঙা বিমানবন্দরটিকে নিয়েই যাদের নেতৃত্ব দিতে হয়, তারা সংবর্ধনা নেন সেই এয়ারপোর্টের সামনেই। এটি কেবল বাংলাদেশেই সম্ভব। সব সম্ভবের দেশ বলেই সম্ভব। এটি কল্পনারও বাইরে ভিনদেশে; মানে ইউরোপ, আমেরিকা কিংবা জাপানে।
সেদিন জাপানে সাইক্লোন ছিল বলে খুব টেনশানে ছিলাম টোকিওতে সময় মত ল্যান্ড করতে পারবো কি না। বৃষ্টি মুষলধারে থাকলেও ঝড়ো হাওয়া তেমন ছিল না বলে সময় মতই নামতে পেরেছি। এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে ট্রেনে চড়ে যখন গন্তব্যে পৌঁছালাম তখনও মুষলধারে বৃষ্টি। ভাবলাম রেল ষ্টেশন থেকে বেরুতেই পারবো না আজ। কিনশিচো ষ্টেশনের দক্ষিন গেটে আসতেই দেখলাম মুষলধারে বৃষ্টির মাঝেই রেইনকোট গায়ে চড়িয়ে ক্ষমতাশীল এলাকার সাংসদ মন্ত্রী দাঁড়িয়ে ভোট চাইছেন।
পরদিন জাতীয় নির্বাচন। তাই শেষ দিনের ক্যাম্পেইন করছেন। তবে সাথে নিয়েছেন কেবল চারজন কর্মী। সব মিলিয়ে পাঁচজন মানুষ। সবাই রেইনকোট গায়ে। একজন ভোটার কিংবা সমর্থকও তাদের সাথে নেই। কেউ তাদের দিকে তাকায়ও না। সবাই ষ্টেশনের গেইট দিয়ে বেরুচ্ছে আর নিজের ব্যাগে রাখা ছাতা বের করে হনহন করে বাড়ীর পথ ধরছে। বৃষ্টি বলে মন্ত্রী বাহাদুর আজ অনেকগুলো ছাতা নিয়ে এসেছেন সুযোগ পেলেই জনগণকে দেবেন বলে। কেউ বের হলেই দৌঁড়ে এগিয়ে যাচ্ছেন নতুন ছাতা নিয়ে। কিন্তু নেবার মানুষ নেই। সবার ব্যাগেই ছাতা। তবুও দেবার চেষ্টা। জনগণের সাথে থাকার প্রানান্তকর চেষ্টা। জনগণকে যাতে কঠিন বৃষ্টিতেও ভিজে বাড়ী ফিরতে না হয় সেই চেষ্টা।
এই দৃশ্য নতুন নয়। গেল বাইশটি বছর ধরেই দেখছি। জাপানী রাজনৈতিকগণ সব সময় নিজেরা ভেজেন; জাতিকে ভেজান না। ভিজতে দেন না। ঠিক উল্টো চিত্র আমাদের দেশে। এদেশে নেতানেত্রীরা জাতিকে ভেজাবেন কিন্তু কখনোই নিজেরা ভিজবেন না। নিজেদেরকে শুকনো রেখে মানুষদের ভিজিয়ে বক্তৃতা করবেন। আর আমরাও শোনার মানুষ। মন ভরে বক্তৃতা শুনি। ভিজতে ভিজতেই শুনি। এভাবে ভিজতে ভিজতেই দিন পার করছি। জীবনও পার করবো।
কিন্তু আমরা তো এভাবে পার হতে চাইনা। এমন দেশও চাইনা। একটি সুন্দর দেশ চাই। সুশাসন এবং ন্যায় বিচারের দেশ। নাগরিকগণের অধিকার সুস্পষ্টভাবে সংরক্ষিত থাকে এমন সুরক্ষিত একটি দেশ। যে দেশে যা কিছু হবে জনগনের কল্যাণে হবে। তাই সারাক্ষণ চাই দেশটিতে পরির্বতন হোক। দেশটি আপামর জনগণের হোক। কিন্তু কোন কিছুর নামে দেশটি কেবল সরকারী কর্মকর্তা আর রাজনীতিবিদদের হোক, তা কখনোই চাই না।-লেখক: উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা।