উল্টো পথে চলি মোরা, উল্টো পথে হাটি কে বা জানে কোনটি ভুুল আর কোনটি তবে খাঁটি!!

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ জাপানে এলেই আমাকে রোগে পায়। অন্য দেশে গেলেও পায়; তবে বেশী পায় এই দেশে এলে। রোগটা হলো দেখা দেখির। যখন যাই দেখি খুটিয়ে খুটিয়ে দেখি। কেবল চোখ দিয়ে নয়; হৃদয় দিয়ে মন ভরে দেখি। আর দেখে ভাল লাগলেই মন চায় নিজ দেশে নিয়ে আসি। ব্যাগে ভরে তো আর আনা যায় না। তাই মন ভরেই আনি। তবে মন তো আর সরকারী খাদ্য গোডাউন নয় যে ইচ্ছেমত দিনের পর দিন সে সব রেখে দেয়া যায়। মন হলো দারুন ভুলো; ষ্টোরেজ করতে না করতেই ডিলিট হয়ে যায়। তাই সবাইকে শেয়ার করার জন্যে এই কলামটিকেই বেছে নেই; আর পাঠকের কান করি ঝালাপালা। পাঠক নেহাতই ভাল মানুষ; তাই পড়ে! পড়তে ইচ্ছে না করলেও পড়ে।
যেমন করতে ইচ্ছে না করলেও আমরা অনেক কিছুই করি। ভোটের সময় ভোট দিতে মন চায় অমুককে। অথচ দিতে পারি না; দেই তমুককে। মুরুব্বী বা সমাজের মাথা বলেছেন তমুককে দিতে; তাই দেই। নিজের ইচ্ছা অনিচ্ছার দাম এখানে দেই না; দিতে পারি না। গাওগেরামে শত শত মানুষের ভোট নিয়ন্ত্রন করে এক বা একাধিক নেতা। নিজেদের ইচ্ছের কোন মূল্য এখানে থাকে না। তাদের ইচ্ছেতেই বাকীদের চলতে হয়। জাপানে নেতারা বিশ্বাস করে জনগনই সকল ক্ষমতার উৎস। তাই ভোটের আগে তারা জনগনকেই মূল্যায়ন করে ভোট আদায় করে; ভোট এলেই ভোট ম্যাকানিজমের ধান্ধা করে না।
ধান্ধা করে বাংলাদেশের নেতারা কেবল মুখেই বলে, জনগনই সকল ক্ষমতার উৎস। কিন্তু বাস্তবে এই ক্ষমতার উৎসের ম্যান্ডেট নেবার সময় এলেই সব দল গাইগুই শুরু করে। কোন পক্ষই জনগনের উপর আস্থা রাখতে পারে না। আস্থা রাখার মত কাজ করলে না আস্থা থাকবে! সব পক্ষই ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং এর উপর ভরসা করে। শেষ খেলা খেলে ভোটের আগের রাতে। সে রাতে কী যে হয় তা কেবল ঐ রাতের খেলোয়াড়রাই জানে। আর ভোটের দিন? সে সব এখন পাড়ার ছেলেপুলেরাও জানে; ঘরের মা বোনেরাও বোঝে। এসব করে তারা প্রমান করে জনগন নয়, মাতব্বর বা নেতারাই সকল ক্ষমতার উৎস। কেবল মুখে বলে না।
মুখে বলে, ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ। কিন্তু প্রতিটি কার্য্যক্ষেত্রে প্রমান করে ছাড়ে দেশের চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে ব্যক্তি। এদেশে যত আন্দোলন হয় দেশের জন্যে, জনগনের জন্যে; তার চেয়ে ঢের বেশী হয় কোন ব্যক্তি বিশেষ বা তার পরিবারের জন্যে। বাংলাদেশে সরকার জনগনের স্বার্থবিরোধী যত কাজ করুক, ভুল করুক বা অন্যায় করুক, দেখবেন বিরোধী দল চুপ; তেমন নড়েচড়ে না। কিন্তু যেই না তার নেতা বা নেতার পরিবারের উপর আঘাত আসে অমনি মহাপ্রলয় বাঁধিয়ে বসে। এ ব্যাপারে সরকারও কোন অংশে কম যায় না। ভাল একটি নির্বাচনের জন্যে পূরো সরকার পদত্যাগে রাজী; কেবল সরকার প্রধান ছাড়া! এখানটায় আসলেই বোঝা যায় কার চেয়ে কে বড়!
আগেকার দিনে দেখতাম সরকার বিরোধী আন্দোলন হতো; তুমুল আন্দোলন। হঠাৎ পুলিশের গুলিতে বা অন্য কোনভাবে যেই না দু’একজন আন্দোলনকারী মারা যেত অমনি আন্দোলন তুঙ্গে। আন্দোলনকারীর মৃত্যুতে লাখ লাখ জনগন প্রতিবাদ মূখর হতো; আর সরকার পড়তো কঠিন রকমের বেকায়দায়। আন্দোলনে আগে দলের লোক মারা যেত, জনগন দুঃখ পেত। এখন আন্দোলনে জনগন মারা যায়। দল সুখ পায়; আনন্দে তৃপ্তির ঢেকুর তোলে। ফল যা হবার তাই হয়; আন্দোলন মাঠে মারা যায়।
আন্দোলনের মাঠে এক কিসিমের নারীবাদী আছেন যারা নানা ধরনের নারীমুক্তি আন্দোলন নিয়ে মাঠ গরম রাখেন; মিছিল মিটিং করে পত্রিকায় নিউজ হন। বাস্তবে তারা নারীদের অধিকার আদায় করতে না পারলেও জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসন আদায় করে ছাড়েন। নারীদের অধিকার নিয়ে সর্বদা সোচ্চার থাকা এই সব নারীনেত্রীর খুব কাছে না গেলে তাদেরকে চেনা যায় না। তারা ঘরে এক, আর বাইরে আরেক। তাদের সকল আন্দোলন কেবল নিজগৃহ ব্যতিরেকে। নিজ গৃহে তারা কঠিন নির্মম; নির্দয়। তাদের আন্দোলনের সুফল তাদেরই অধস্তন নারীগন কখনোই পায় না। নেত্রীর আসল চরিত্র তাদের ঘরের পুত্রবধূ কিংবা কাজের বুয়া হাড়ে হাড়ে টের পায়।
টের পায় ঘরের চাকর চাকরানীও। বিদেশে এসব কর্মীদেরকে বলে হোম হেলপার। তবে বৃটিশরা আমাদেরকে শিখিয়ে গেছে সার্ভেন্ট বলতে। তাই হরহামেশা তাদেরকে চাকর বলেই পরিচয় দেই; তুই তোকারী করি। প্রাচীন যুগে দাসদাসীদেরকে যেভাবে ব্যবহার করতো, পারলে অনেকটা সেভাবেই আমরা ব্যবহারের চেষ্টায় থাকি। কিন্তু এই ব্রিটিশরা যাদেরকে পাবলিক সার্ভেন্ট বলে গেছে, মানে সরকারী কর্মকর্তা বা কর্মচারী; তাদেরকে আমরা চাকরতো ভাবিই না, উল্টো তাদেরকে স্যার ডাকতে ডাকতে মুখে ফ্যানা তুলে ফেলি। তারাও স্যার ডাক শোনার জন্যে গদগদ হয়ে চেয়ারে পিঠ হেলান দিয়ে বসে থাকেন। অথচ তাদের বসে থাকা উচিত নয়। উল্টো আমাদেরকেই স্যার ডাকা উচিত। এটা বাধ্যতামূলকই হওয়া উচিত।
এদেশের মানুষেরা যা করা বাধ্যতামূলক নয় তা করতেই কেন যেন বেশী স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন। বাধ্যতামূলক পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের জামাতে মসজিদ প্রায় খালি। কিন্তু ওয়াজিব বা সুন্নত নামাজের জামাতে লোকে লোকারণ্য; তিল ধারনের ঠাঁই নেই। জানাজার নামাজ, তারাবির নামাজ, ঈদের নামাজ অতীব গুরুত্বপূর্ণ এবং দামী এবাদত। কিন্তু একটিও ফরজ নয়; ওয়াজিব বা সুন্নত। অথচ এই সকল নামাজে শরীক হবার জন্যে মানুষের কতই না জানপ্রান চেষ্টা। তবে এই পর্যন্ত ঠিকই ছিল। আল্লাহপাককে খুশী করার জন্যে এমন এবাদতে শরীক হওয়া অতীব পূণ্যেরও। কিন্তু এর চেয়েও বাধ্যতামূলক দৈনিক পাঁচওয়াক্ত ফরজ নামাজ। এসবের জামাত সমূহ যখন আল্লাহপাক প্রায় খালি দেখেন তখন কী অবস্থা হয়! ফরজকে তরক করে ওয়াজিব নিয়ে এত মাতামাতি কি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়?
কেবল মাত্র কোরবানী নামে আরেকটি ওয়াজিব আদায় পর্ব কেবল গেল । কত মাতামাতিই না হলো এই ওয়াজিব আদায় নিয়ে। কোথায় কোরবানীর হাট বসবে, কত টাকায় হাটের নিলাম হবে, কোন্ কোন্ নেতা নিলামে হাট পাবে, কে কয়টা পশু কিনবে, কেমন পশু কিনবে, পশুর গোশত কেমন হবে, ইত্যাদি কত কী! যদি এমন হতো যে কোরবানী ওয়াজিব নয়, ফরজ; কিন্তু কোরবানীদাতা এর গোশ্ত খেতে পারবে না তাহলে কেমন হতো? এত এত বিশাল কোরবানীর হাট কি বসতো?
বসতো বলে মনে হয় না। যাকাত দেয়া তো ওয়াজিব নয়; ফরজ। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি। কিন্তু যাকাত দেবার সময় দেশজুড়ে কোন মাতামাতি দেখি না। যাকাতের মাঠ থাকে না, হাট বসে না। লক্ষ লক্ষ কোরবানী দাতাকে চেনা যায়, দুচারজন ছাড়া আর কোন যাকাত দাতাকে চেনা যায় না। ঘরেবাইরে কোরবানী নিয়ে আলোচনা হয়, যাকাত নিয়ে হয় না! মাসজুড়ে পত্রিকার পাতা ভরে থাকে কোরবানীর হাটের খবর; কোটি কোটি টাকা বানিজ্যের খবর। যাকাতে তেমন লেনদেন হয়ও না; তাই পত্রিকার পাতা জুড়ে খবরও থাকে না।
অবশ্য একেবারেই যাকাত নিয়ে খবর থাকে না সেটাও ঠিক নয়; খবর থাকে। এবারও ছিল; ময়মনসিংহ শহরে যাকাতের নামে নিম্মমানের কাপড় নিতে এসে পদদলিত হয়ে ৫০ জনের নির্মম মৃত্যু! তবে এখানে একটি মিলও আছে; দুজায়গাতেই জান কোরবান করার একটি সাদৃশ্য আছে। পার্থক্য কেবল এই যে কোরবানীতে জান দেয় পশু, আর যাকাতে দেয় মানুষ! এভাবে আর কতকাল!! -লেখকঃ উপেদেষ্টা সম্পাদক,যুগবার্তা