উবানের ভাষায় তোফায়েল আহমেদ জন্মগতভাবেই অকৃত্রিম

13

সোহেল সানি: “তোফায়েল আহমেদ। তাঁর কারিশমা হচ্ছে, জন্মগতভাবে তিনি অকৃত্রিম এবং রাজনৈতিক কাজে কঠিন পরিশ্রমী। কাজ করেছেন শেখ মুজিবের অনুচর হয়ে। তাঁর পত্নী এবং অন্যান্য ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন তখন বাংলাদেশে। আমি তাঁদেরকে নিয়ে আসার একটি পরিকল্পনা দিলাম। জবাবে তিনি বললেন, ‘আল্লাহর হাতে তাদের নিরাপত্তার ভার ছেড়ে দেই না কেন আমরা? লাখো লাখো বাঙালি একই রকমের বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। সবাই তো আসতে পারে না।’
মুজিব বাহিনীর সংগঠক মেজর জেনারেল এস এস উবান ” ফ্যানটমস অব চিটাগংঃ দ্য ফিপথ আর্মি ইন বাংলাদেশ” গ্রন্থে উনসত্তুরের গণ-অভ্যুত্থানের মহানায়ক তোফায়েল আহমেদ সম্পর্কে উপরোক্ত অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন।
তোফায়েল আহমেদের আজ জন্ম দিন। ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর বরিশালের ভোলায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৪ সালে বরিশাল বি এম কলেজ থেকে বিএসসি এবং ১৯৬৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি পাস করেন।
তোফায়েল আহমেদের জীবনের বড় প্রাপ্তি, তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব ছিলেন। ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেয়ার মাধ্যমে তোফায়েল আহমেদ রাজনীতির এক জীবন্ত কিংবদন্তি হয়ে আ ভোলাতে এতটাই জনপ্রিয় যে সর্ব গ্রহণযোগ্য ‘৯১ ও ৯৬ এর নির্বাচনে দুটি আসনে জয় লাভ করেন। ১৯৭০ সালের ৩ জুন আওয়ামী লীগে যোগ দান করে ‘৭০ সালের নির্বাচনেই পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়া তোফায়েলের ছাত্রলীগের মাধ্যমে রাজনীতিতে হাতেখড়ি ১৯৬২ সালে।
১৯৬৯ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের ২১ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ডাকসু’ ভবন থেকে ১১ দফার ভিত্তিতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আত্মপ্রকাশ করে। ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত সংগ্রাম পরিষদের নেতারা হলেন, পূর্বপাকিস্তান ছাত্রলীগের সভাপতি আব্দুর রউফ, সাধারণ সম্পাদক খালেদ মোহাম্মদ আলী, পূর্বপাকিস্তান ছাত্রইউনিয়নের সভাপতি সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক, সাধারণ সম্পাদক সামসুদ্দোহা, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মোস্তফা জামাল হায়দার, সহ সম্পাদিকা দীপা দত্ত। ‘৬৯ সালের ১৭ জানুয়ারি ১১ দফা ভিত্তিক আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা হলে ‘এন এস এফ’ এর একটি বিদ্রোহী গ্রুপ মাহবুবুল হক দোলন ও ডাকসু জিএস নাজিম কামরান চৌধুরীর নেতৃত্বে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে যোগ দেয়। ৮১ দিনের অপ্রতিরোধ্য আন্দোলন গণঅভ্যুত্থান ঘটলে ২৫ মার্চ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইউব খান পদচ্যুত হন। সেই আন্দোলনে ২০ জানুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের মূল ফটকের সামনে থেকে মিছিল অতিক্রমকালে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ছাত্রইউনিয়নের আসাদুজ্জামান আসাদ, ২৪ জানুয়ারি ঢাকার নবকুমার ইনস্টিটিউটের ছাত্র মতিউর রহমান, ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা সেনানিবাসে সার্জেন্ট জহুরুল হককে, ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ডঃ শামসুজ্জোহাকে হত্যা করা হয়। এ ছাড়াও নিহত হন আনোয়ার রুস্তুম, মিলন ও আলমগীর। সার্জেন্ট ফজলুল হক গুলিবিদ্ধ হলেও প্রাণে বেঁচে যান।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিশেষ ট্রাইবুনালের চেয়ারম্যান এস এ রহমান, কেন্দ্রীয় তথ্য মন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন, প্রাদেশিক যোগাযোগ মন্ত্রী সুলতান আহমদ, প্রাদেশিক পূর্ত মন্ত্রী মং সু প্রু এবং কনভেনশন মুসলিম লীগের সভাপতি নওয়াব হাসান আসকারীর বাসভবন জ্বালিয়ে দেয়।
দেশ জুড়ে শ্লোগান উঠে ‘জহুরের রক্ত – স্বাধীনতার মন্ত্র’, পিন্ডি না ঢাকা – ঢাকা, ঢাকা’, তোমার আমার ঠিকানা – পদ্মা মেঘনা যমুনা’ কুর্মিটোলা ভাঙ্গবো – শেখ মুজিবকে আনবো’ ইত্যাদি।
১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তি লাভ করেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি রমনা রেসকোর্স ময়দানে অভ্যুত্থানের মহানায়ক তোফায়েল আহমেদ বিশাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। ওদিনে সকালে তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে ছাত্র নেতারা শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করে বলেন, মঞ্চ থেকে তিনি যেন জয়বাংলা শ্লোগানটি দেন এবং আহুত গোলটেবিল বৈঠকে যোগদান না করেন।
শেখ মুজিব সেদিন বলেন, আমার নেতা সোহরাওয়ার্দী সাহেব শিখিয়েছেন- জনগণের নেতা হতে চাইলে জনগণ কী চায় সেটা বোঝার চেষ্টা করবে, জনগণ যা চায় তাই করবে, জনগণ যা শুনতে চায় তাই বলবে, এবং আমি আমার নেতার কথা মতোই চলবো। শেখ মুজিবের সরল সহজ খোলামেলা কথাগুলোর ভেতরেই ছাত্রনেতারা তাদের করণীয় দিকনির্দেশনা পেয়ে যান। ১৯৭০ সালের কেন্দ্রীয় সম্মেলনে তোফায়েল আহমেদ সভাপতি ও আসম আব্দুর রব সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। নূরে আলম সিদ্দিকী সভাপতি পদের দাবি করলে প্রস্তাব করা হয় তোফায়েল আহমেদ সভাপতি এবং কারামুক্ত নেতা নূরে আলম সিদ্দিকী সাধারণ সম্পাদক করার। কিন্তু নূরে আলম সিদ্দিকী রাজী না হওয়ায় আসম আব্দুর রব সাধারণ সম্পাদক হন। সভাপতি পদের আরেক দাবিদার আল মুজাহিদী ও আব্দুল মান্নান খানকে নিয়ে পাল্টা ‘বাংলা ছাত্রলীগ’ গঠন করেন।
সিরাজুল আলম খান ইকবাল হলের মাঠে বসিয়ে তোফায়েল আহমেদকে বক্তৃতা শেখার তালিম দিতেন। তোফায়েল আহমেদ একেক জন নেতার ফাঁকে ফাঁকে বক্তৃতা করে ফেলতেন। ধীরে ধীরে তাঁর বক্তৃতা মানুষকে আকৃষ্ট করতে থাকে। এরপর পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে মানুষ তোফায়েল আহমেদের বক্তৃতা শোনার জন্যই সভার শেষ পর্যন্ত আগ্রহভরে বসে থাকতো।

মুক্তিযুদ্ধকালীন অশুভ তৎপরতা নির্মূলে একটি নিশ্ছিদ্র প্রস্তাবের আলোকে
একদল উৎসর্গীকৃত প্রাণ তরুণ নেতৃত্বে গঠিত হয় মুজিব বাহিনী। সেই নেতৃত্বভার গ্রহণ করেন শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ। মুজিবের প্রতি প্রগাঢ় আনুগত্য এবং যুদ্ধের লক্ষ্য সম্পর্কে প্রচন্ডভাবে প্রেরণাদীপ্ত অকুতোভয় এই চতুষ্টয়ের মধ্যে তোফায়েল আহমেদ ছাত্রলীগের সভাপতি ও বাকী ত্রিরত্ন সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। উবানের মতে এঁরা শেখ মুজিবের প্রতি নিবেদিত প্রাণ।
তোফায়েল আহমেদ বলেন, স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের চূড়ান্ত রূপ হলো বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স – বিএলএফ। পরে যার নাম হলো মুজিব বাহিনী।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার জন্য যুব-ছাত্র সমাজকে সংগঠিত করতে চারজনের ওপর দায়িত্ব ন্যস্ত করেন।-লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

*মতামত বিভাগে প্রকাশিত সকল লেখাই লেখকের নিজস্ব ব্যক্তিগত বক্তব্য বা মতামত।