ইতিহাসে চিরভাস্বর মাসিমা বেঁচে থাকবেন জন্ম থেকে জন্মান্তর

14

আহমেদ জালাল : মনোরমা বসু, ‘মাসিমা’। তিনি বেঁচে আছেন সমাজবদলের সংগ্রামী কর্মকাণ্ডে, আছেন তারুণ্যদীপ্ত মিছিলের অগ্রভাগে প্রেরণার অফুরন্ত উৎস হয়ে। জন্ম থেকে জন্মান্তর বেঁচে থাকবেন তিনি মানুষের হৃদয়ের মনি কোঠায়। মৃত্যুতেই যে থেমে থাকে না জীবন। পুঁজিবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সাম্যবাদী আদর্শের নতুন এক বিশ্ব প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে কমরেড মাসিমা হচ্ছেন অনন্য এক প্রতীক। বিরল ব্যক্তিত্বের অধিকারী, দৃঢ়চেতা, পরোপকারী এবং আদর্শনিষ্ঠ মনোরমা বসুর সমগ্র জীবন ছিল দেশপ্রেমে নিবেদিত। তিনি ছিলেন যে-কোনো অন্যায় অত্যাচার ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সোচ্চারকণ্ঠ। মানবতার স্বার্থে তিনি কাজ করে গেছেন আজীবন। তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে। তিনি ইতিহাসে চিরভাস্বর। তাঁর অবদান,চিরঅম্লান। তাঁর জীবদ্দশাতেই সত্যেন সেনের মনোরমা মাসীমা গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। সংগ্রামী জীবনের সংগ্রামী মাসিমা আজ অনেকের কাছেই অপরিচিত, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে। তবে তিনি কখনোই কালের গর্ভে হারিয়ে যাবেন না। অবশ্য সমাজবদলের সংগ্রামীরা তাঁর কর্মময় জীবন স্মরন করে আসছেন।
প্রখ্যাত শ্রমিক নেতা রাজনীতিক এ্যাড. একে আজাদ বলেন, মনোরমা বসু মাসিমা স্মৃতি ট্রাস্ট ও বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এর উদ্যোগে ২১ নভেম্বর শনিবার বিকেলে মনোরমা বসু মাসিমার সংগ্রামী জীবনের স্মৃতিচারণে মাতৃমন্দির স্কুলে এক স্মরন সভার আয়োজন করা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিবছরই তাঁর কর্মময় জীবন নিয়ে স্মরন সভার আয়োজন করা হয়ে থাকে।
দেশপ্রেমী সমাজসেবক এবং স্বদেশি আন্দোলন ও সাম্যবাদী আন্দোলনের লড়াকু নেতা মনোরমা বসু মাসিমা নারীমুক্তির আন্দোলনকে তাঁর শ্রম-মেধা-প্রজ্ঞা ও সময় দিয়ে বেগবান করে তোলেন। তাঁর নেতৃত্বেই বরিশালে ‘মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি’ গড়ে উঠে এবং তিনি এ সংগঠনটির সম্পাদক হন। এ সংগঠনের মাধ্যমে কমরেড মনোরমা বসু মাসিমা ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে মহিলাদের নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি নারীসমাজকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করেন। অনাথ ও দুঃস্থ মহিলাদের,বিশেষ করে বিধবা ও কুমারী মেয়েদের আশ্রয়দানের জন্য বরিশালের কাউনিয়ায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘মাতৃমন্দির আশ্রম’। মাতৃমন্দির হয়ে উঠে নারী শিক্ষাকেন্দ্র ও সেবাশ্রম; যা এখন বরিশাল নগরীর মাতৃমন্দির সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে। আজীবন তিনি এ মাতৃমন্দির আশ্রমটি পরিচালনা করেছেন। ১৯২১-২২ সালে ‘চরকা ধরো/ খদ্দর পরো’ আন্দোলনে গ্রামে গ্রামে নারীদের তিনি চরকা কাটার কাজ শেখাতেন। ১৯৩০ সালে আইন অমান্য আন্দোলনে স্থানীয় নারীদের নিয়ে কাজ করেন তৃণমূল পর্যায়ে। ১৯৩২ সালে আইন অমান্য আন্দোলনে জড়িত থাকার অভিযোগে তিনি প্রথম কারাবরণ করেন। নিয়মিত আন্দোলন-সংগ্রামের এক পর্যায়ে চল্লিশের দশকের শুরুর দিকে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। নৈতিক কারণে তিনি কয়েকবার কারাবরণ করেন, আত্মগোপনেও তাঁকে থাকতে হয়েছে। অনেক কষ্ট স্বীকার করেছেন; তবুও কখনো হাল ছেড়ে দেননি, আদর্শের প্রশ্নে মাথা নত করেননি। আজীবন আদর্শ ধারণ ও লালন করেই কাজ করে গেছেন সাহসিকতার সাথে।
মনোরমা বসু বরিশাল জেলার বানারীপাড়া উপজেলার নরোত্তমপুর গ্রামে ১৮৯৭ সালের ১৮ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মাতা প্রমোদ সুন্দরী ও পিতা নীলকণ্ঠ রায়। জন্মস্থানের অনুকূল পরিবেশ মনোরমা বসুকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে। তাই, মাত্র এগারো বছর বয়সে ক্ষুদিরামের আত্মত্যাগে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন। চৌদ্দ বছর বয়সে বরিশালের বাঁকাই গ্রামের জমিদার চিন্তাহরণ বসুর সাথে তাঁর বিয়ে হয়। প্রগতিবাদী স্বামীর প্রত্যক্ষ সমর্থন ও সহযোগিতায় তিনি স্বদেশি আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। জমিদার বাড়ির রক্ষণশীলতা ও বিধিনিষেধ অতিক্রম করে তিনি মুক্ত জীবনে প্রবেশ করেন। একপর্যায়ে তিনি জমিদার বাড়ি ছেড়ে বরিশালে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাঁর নেতৃত্বে স্বদেশি আন্দোলনে মহিলাদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। শুধু বরিশাল শহরেই নয়, সমগ্র বরিশাল অঞ্চল জুড়েই ব্যাপক সংখ্যক নারীদের তিনি সংগঠিত করে নারী অধিকার আদায়ে তীব্র আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে তুলেছিলেন। ১৯৪৩-৪৪ সালে দুর্ভিক্ষ ও মহামারির সময় লঙ্গরখানা, চিকিৎসালয় ও উদ্ধার আশ্রম স্থাপন এবং পুনর্বাসন কাজে কমরেড মনোরমা সর্বক্ষণিক স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। শুধু বরিশাল শহরেই ১৪ টা লংগরখানা খোলা হয়। বাড়ি বাড়ি ঘুরে খাদ্য, বস্ত্র ও অন্যান্য সামগ্রী সংগ্রহ করে তা সেইসব লংগরখানায় বিলিয়ে দিতেন। মেডিকেল টিম পরিচালনা করে বাঁচিয়ে তুলেন হাজারো দুস্থ মানুষকে।
বরিশাল জেলার বিভিন্ন নারী আন্দোলন, ছাত্র আন্দোলন, সমাজসেবামূলক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তিনি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক নতুন শাসকদের শাসন ও শোষণ জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। এ সময় যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত নিজ মেয়ে বাসনার মৃত্যুর মাত্র ১৮ দিনের মাথায় ১৯৪৮ সালে বরিশালের খাদ্য-আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার কারণে তিনি এক বছর সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করেন এবং সেইসঙ্গে জননিরাপত্তা আইনে আরও তিন বছর কারাভোগ করেন। শেষ দুই বছর মনোরমা বসু ছিলেন রাজশাহী জেলে। সেই জেলে তাঁর সঙ্গে বন্দি ছিলেন কমরেড নলিনী দাস, ইলা মিত্র, ভানু চ্যাটার্জি, অপর্ণা, অমিত, সুজাতা। রাজশাহীর আগে মনোরমা বসু কিছুদিন কাটিয়েছেন সিলেট জেলে। সিলেট জেলে তাঁর সহবন্দিদের মধ্যে ছিলেন অপর্ণা পাল চৌধুরী, অমিতা পাল চৌধুরী, সুষমা দে প্রমুখ। জেলে বসেও তিনি সংগঠন গড়েছেন আর একের পর এক কবিতা লিখেছেন। কয়েদিদের জন্য লেখাপড়ার ব্যবস্থা করেছেন। জেলে বসে চলতো পার্টি শিক্ষা, নারী অধিকারের শিক্ষা, অধিকার আদায়ের শিক্ষা; চলতো নানা রকম হাতের কাজের শিক্ষা। ১৯৫২ সালের ২৫ এপ্রিল তিনি মুক্তি পান। ১৯৫৪ সালের ১০ মে তাঁর স্বামী চিন্তাহরণ বসুর মৃত্যু হয়।
স্বামীর মৃত্যুর কিছু দিনের মধ্যেই গভর্ণরের শাসনের কারণে তদানীন্তন পূর্ববাংলায় রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়। প্রদেশব্যাপী আবার শুরু হয় ব্যাপক ধরপাকড়। অন্য অনেকের সঙ্গে মনোরমা বসুর নামেও জারি করা হয় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। তিনি তখন আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন এবং সেই অবস্থার মধ্যেই কমিউনিস্ট পার্টি ও অন্যান্য গণসংগঠনের কাজকর্ম চালিয়ে যেতে থাকেন। ১৯৫৬ সালে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রত্যাহার করা হলে বরিশালে ফিরে আসেন তিনি। আত্মগোপন অবস্থা থেকে আত্মপ্রকাশের পর ‘মাতৃমন্দির আশ্রম’-এর কাজে ব্যস্ত থাকেন কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ার কারণে। পরবর্তীতে তিনি গড়ে তোলেন আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয়, পল্লি কল্যাণ অমৃত পাঠাগার ও শিশুদের জন্য মুকুল মিলন খেলাঘর। ১৯৬২ ও ৬৪’র স্বৈরাচার আইয়ুববিরোধী গণআন্দোলন এবং ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে মহিলাদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রেও মাসিমা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৪ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে এর প্রতিরোধেও এগিয়ে আসেন তিনি। ১৯৭০-এ ব্যাপক বন্যা হলে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে মানুষের কাছ থেকে সাহায্য সংগ্রহ করে, বন্যায় বিপর্যস্ত বিভিন্ন জেলার দূর্গত মানুষের কাছে তা বিলিয়ে দিয়েছেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামেও তাঁর ছিল অগ্রণী ভূমিকা। ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করে আবার পার্টি সংগঠনের কাজে সক্রিয়ভাবে যোগ দেন। পার্টির কমিউন হিসেবে মাতৃমন্দিরে দায়িত্বপালন শুরু করেন। নলিনী দাস, মুকুল সেনসহ বেশ কয়েকজন পার্টি-নেতার দেখাশোনার ভার গ্রহণ করেন তিনি।
কমরেড মনোরমা ‘বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, বরিশাল জেলা শাখা’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নারীমুক্তি আন্দোলনকে আরো গতিশীল করে তুলেন এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি এ পরিষদের সহ-সভাপতি ছিলেন। ’৭৪ এর দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় মাসিমা অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দেন। এরইমধ্যে ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সম্মেলনে যোগ দিতে তিনি আন্দামান যান। সোভিয়েত নারী কমিটির আহ্বানে সোভিয়েত ইউনিয়নেও যান। ’৭৫ এর পট পরিবর্তনের পর তিনি পার্টির নির্দেশে আবারো আত্মগোপনে যান এবং আত্মগোপনে থেকেই খেলাঘর, উদীচী, ছাত্র ইউনিয়ন, মহিলা পরিষদকে আরো শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। নারী জাগরণের অন্যতম পুরোধা, মহিয়সী নারী কমরেড মনোরমা বসু মাসিমা তাঁর কর্মবহুল সংগ্রামী জীবনের অবসান ঘটিয়ে ১৯৮৬ সালের ১৬ অক্টোবর না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। মাসিমার চিরঅম্লান অবদানে ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন।-লেখক : নির্বাহী সম্পাদক ও বার্তা প্রধান, ৭১’র মুখপত্র ’ দৈনিক বিপ্লবী বাংলাদেশ’।
Mail : ahmedjalalbsl@gmail.com

*মতামত বিভাগে প্রকাশিত সকল লেখাই লেখকের নিজস্ব ব্যক্তিগত বক্তব্য বা মতামত।