আসুন না বদলে যাই, বদলে দেই!!!

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ মাঝে মাঝে মনের উপর কী যেন ভর করে! মনের কোনে হাল্কা অস্থিরতা টের পাই। মনটা ভাল কি মন্দ বোঝার উপায় থাকে না। হাঁটতে চলতে একটা ঝিমুনি ভাব পরিলক্ষিত হয়। চারদিকের পরিবেশ কেমন যেন খাপছাড়া খাপছাড়া মনে হয়। মনে হয় কোথায় যেন, কেমন যেন কষ্ট কষ্ট ভাব। অক্টোবরের শেষের দিককার কথা; নানা কারনে মনটা আমার এমনিতেও কষ্টে ভরা। মন যখন ভাল থাকে না, তখন পরিবেশও টের পায়; আশপাশে ভাল কোন কিছুই চোখে পড়ে না। যা দেখি সবই অসঙ্গতিতে ভরপুর থাকে। মনের ঝিমুনিটা এতে করে আরো বেড়ে যায়।
তেমনি একটা ঝিমুনি ভাব নিয়ে জোহরের নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বেড়িয়ে আমার শোনিমকে আনতে স্কুলে যাচ্ছি। রাস্তায় বেশ জটলা মনে হলো। অনেক লোকের সমাগম। গাড়ী আর সামনে যাবে না; ঘোরাতে হলো। অন্যদিন এমনটা হয় না। জানলাম জেএসসি পরীক্ষা শুরু হয়েছে। সামনেই পরীক্ষার সেন্টার। তাই এত কড়াকড়ি, এত লোকের আনাগোনা; এত পুলিশ প্রহরা। পরীক্ষা হলে পুলিশ! ছোট বেলা থেকেই এই দেশে দেখে আসছি। দেখতে দেখতে সয়ে গেছে। কিন্তু কেন? পুলিশ কেন থাকবে পরীক্ষা কেন্দ্রে?
কেন্দ্রে শিক্ষকগন পরীক্ষা নেয়, শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দেয় আর অভিভাবকবৃন্দ বাইরে দাঁড়িয়ে এই দেয়া নেয়া দেখে। এই তো? এখানে পুলিশ লাগবে কেন? পুলিশ লাগে যেখানে অপরাধ সংঘটিত হয় বা হতে পারে সে সব জায়গায়। পরীক্ষা কেন্দ্র তো স্কুল কলেজে হয়। এসব তো পবিত্র জায়গা; পরীক্ষা পবিত্র কাজ। পবিত্র কাজে অভিভাবকই বা থাকবে কেন আর পুলিশই বা লাগবে কেন? পুলিশ লাগে চোর ডাকাত সামলাতে। পরীক্ষা সামলাতে পুলিশ লাগবে কেন? এখানে চারটি পক্ষ। তবে শুনতে খারাপ শোনালেও এটা সত্যি যে, সুযোগ পেলে চারপক্ষই পরীক্ষায় অন্যায় বা অসাধুতা করে। এ চারপক্ষ মিলেই তো আমাদের পূরো জাতি। তাহলে জাতি হিসেবে আমরা কি অসভ্য, অসাধু? খাসিলত তো তাই বলে। ব্যাপারটি কি আমরা এভাবে কখনো ভেবে দেখেছি? হয়ত ভাবিনি। ভাবলে যুগ যুগ ধরে এই অসভ্যতা আমরা করতাম না। কিংবা চোখের সামনে জাতিগত এমন অসভ্যতা দেখে জেগে উঠতাম। সভা, সেমিনার কিংবা মিটিং মিছিল করে জাতিকে সচেতন করে তুলতাম। কথায় কথায় অন্যের সমালোচনা না করে যেভাবেই হোক আমরা নিজেরা শোধরাতাম বা বদলে যাবার চেষ্টা করতাম।
আজকে চেষ্টা করছি মনটাকে বদলাতে; মানে ভাল করতে। মনটা খারাপ বলেই এতসব আবোল তাবোল ভাবছি। মনটাকে খারাপ করে দিয়েছেন বাহার ভাইয়া। তার কাজই হলো ফোন করে করে সবার আগে খারাপ খবরগুলো আমাকে বাইপাস করা। সাংঘাতিক রকমের সামাজিক এই মানুষটি সারাক্ষন সমাজ নিয়েই পড়ে থাকেন। নিজের ভাই বলে বলছি না; তিনি আসলেই এমন। কারো কোন ডাক পেলেই হলো; না নেই। সমাজে যাদেরকে নিয়ে চলেন সকলের সুখে কিংবা দুঃখে পাশে থাকবেনই। রাত ঠিক ন’টা কেবল বেজেছে। এক আপনজনের বাসায় আমরা কেবল একটি ঘরোয়া মিটিং এ বসেছি। ভাইয়ার ফোন। জানালেন শওকত ভাইয়ের তিন বছরের ছোট্ট মেয়েটি মাত্র মারা গেছে।
মৃত্যুর খবর ইদানীং হরহামেশাই পাই। প্রিয় পাঠক, শওকত ভাইয়ের কথা আপনাদের মনে আছে কি? এই কলামেই গেল চারমাস আগে তার অকস্মাৎ অকাল মৃত্যুর কথা লিখেছিলাম। গেল রোজার ঈদের দিন সকালে শওকত ভাই মারা যান। আমরা কাছের মানুষেরা সেদিন স্তব্দ হয়ে গিয়েছিলাম। তার তিন কন্যার সবচেয়ে ছোট কন্যার মৃত্যুর সংবাদটিও আমাদের সবাইকে স্তব্দ করে দিল। অবশ্য মৃত্যুটি অকস্মাৎ ছিল না। একেবারেই অনাকাঙ্খিত, তবে অনুমেয় ছিল। মরনব্যাধি ক্যান্সার বাসা বেঁধে ছিল ছোট্ট ওই শরীরে। শওকত ভাই মারা যাবার আগে ওকে ভারত থেকে চিকিৎসাও করিয়ে আনেন। তারপরও শেষ রক্ষা হয়নি। মাত্র চার মাসের ব্যবধানে স্বামী এবং সন্তানকে হারিয়ে সুমী ভাবী নিজেও শেষের পথে; পাগল প্রায়। আমরা সকলে তার কথা ভাবছিলাম। এমন পরিস্থিতিতে যে না পড়বে সে বুঝবে না তার মনের অবস্থা। তার মনোবেদনা বোঝার মত অবস্থায় আমরা ছিলাম না সত্যি। তবে তিনদিন পরে আয়োজিত কুলখানিতে উপস্থিত সবার চেহারায় যে কষ্টের ছাপ দেখেছি সেটাও ফেলে দেবার মত নয়। বিষন্ন মনে সমাজের সবার উপস্থিতিতে কুলখানিস্থল শোকে কাতর। মোনাজাতে ইমাম সাহেব দোয়া করেছেন কচি শিশুটির বিদেহী আত্মার জন্য। কান্নাকাটি করেছেন আল−াহ রাব্বুল আ’লামিনের কাছে। তার আবেগী দোয়ায় চোখে পানি ধরে রাখতে পারেনি অনেকেই।
দোয়া শেষে বেদনায় আক্রান্ত ভারী মন নিয়ে বের হয়ে আসবো। কেউ একজন হাতে ধরিয়ে দিলেন মিষ্টিভরা তবারকের প্যাকেট। কেন জানি না প্যাকেট হাতে নিতে খুবই লজ্জা হচ্ছিল। অল্প বয়সে স্বজনহারা একজন অসহায় ভদ্রমহিলার দোয়ার দাওয়াতে আসলাম; দোয়া করতে এবং তাকে সহমর্মিতা জানাতে। এ কেমন সহমর্মিতা যে প্রচন্ড কষ্টে জর্জরিত বুকফাটা গগনবিদারী কান্না করা একজন মায়ের হাত থেকেও খাবারের প্যাকেট নিতে হবে! ক’দিন ধরে তার মুখেই তো দানা পানি পড়েনি! তার তো কিছুই নেই, সবই শেষ। স্বামী গেল, সন্তান গেল; যায়নি শুধু কষ্ট, বেদনা আর নিঃসঙ্গতার হাহাকার। আর আছে অনিশ্চিত এক গন্তব্যের পথে একাকী যাত্রার শঙ্কা!
দুঃখসুখের দিনগুলো নিয়েই মানুষের জীবন যাত্রা। সুখের দিনগুলো নিয়ে মানুষ অনেক অনুষ্ঠান করে। বিয়ে, জন্মদিন, ম্যারেজডে, সুন্নতে খৎনাসহ বিভিন্ন আনন্দানুষ্ঠানেও দোয়া চেয়ে দাওয়াত দেয়। আমরা দোয়া দেই বা না দেই, দাওয়া ঠিকই দেই। বড় বড় গিফ্টের প্যাকেট নিয়ে তাদের আনন্দে হাজিরা দেই। কালচারটি এমনই হয়েছে যে উপহার দিতে বাধ্য থাকি। আনন্দভরা এই সব অনুষ্ঠান আয়োজন করে তারা মজা পায়, কঠিন মজা। এমনিতে আনন্দানুষ্ঠান, তাই তারা আনন্দ পায়, আবার গিফ্ট পেয়েও আনন্দ পায়। তাদের হারাবারও কিছুই থাকে না। অনুষ্ঠান শেষে হিসেব কষে মিলিয়ে নেয় খরচ হলো কত, আর লাভ কত।
কষ্টের অনুষ্ঠান আয়োজনে কোন লাভ হয় না; কেবল লস হয়। একে তো কষ্টের অনুষ্ঠান; আবার লস গুনেও কষ্ট পায়। তাদের পাবার আর কিছুই থাকে না। তারা কেবল হারায়। প্রথমে স্বজন হারায়, পরে সুখ আনন্দ হারায়। সব শেষে হারায় অর্থ। নামকাওয়াস্তে পায় কেবল দোয়া; দাওয়া পায় না কোনদিনই। যারা দোয়া দেয় তাদের কোন পয়সা লাগে না। দোয়া কাজে লাগে কি না কে জানে।
আমার শোনিমের এক বছর বয়সপূর্তিতে দোয়ার আয়োজন করেছিলাম দশ বছর আগে; সাথে আকিকার। কাছের দূরের সবাইকে দাওয়াত করেছিলাম। দাওয়াতী কেউ বাদ যাননি; সবাই এসেছিলেন। যাবার বেলায় এ্যাডভোকেট হানিফ ভাই বলেছিলেন, আপনার দাওয়াতে এসে আমিও সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। ছেলে অষ্ট্রেলিয়া থেকে ফিরলেই বিয়ের আয়োজন করবো। আপনার মত করেই করবো; কোন ধরনের গিফট গ্রহন করবো না। গিফট ছাড়াই অনুষ্ঠান করবো। হানিফ ভাই কথা রেখেছিলেন। মহা ধুমধামে কয়েক হাজার লোককে দাওয়াত করে রাজকীয় বিয়ের অনুষ্ঠান করেছিলেন। কাউকে গিফট আনতে দেননি। অনুষ্ঠানে পানসুপারীর টেবিল রেখেছেন; গিফটের নামে চাঁদাবাজির কোন টেবিল রাখেননি।
আসুন না হানিফ ভাইয়ের মত করে দাওয়াতের অনুষ্ঠানের দাওয়া নিয়ে আমরাও ভাবি। আসুন না আনন্দানুষ্ঠানের সস্মুখ ভাগে থাকা গিফটের টেবিল সরিয়ে কষ্টের অনুষ্ঠানের সামনে নিয়ে আসি। চলুন না কষ্টে ভরা অনুষ্ঠানের দাওয়াতে সাধ্যমত গিফট নিয়ে টেবিল ভরে দেই। চলুন না ভুলে ভরা প্রচলিত কালচারকে শোধরে দেই; পাল্টে দেই। আসুন না এভাবেই নিজেরা বদলে যাই, সমাজটাকেও বদলে দেই!!!- লেখকঃ উপদেষ্টা সম্পাদক