আসুন আমরা বালেগ হই

22

বনি আদম সোলাইমানঃ চাকরি করার বা চাকর হওয়ার মানসিকতা তৈরির সম্পূর্ণ কৃতিত্ব ব্রিটিশ শাসকদের। ব্রিটিশরা তৎকালীন ভারতবর্ষ দখল করার পূর্বের বৈবাহিক প্রথা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মুসলিম ও হিন্দু সমাজে বিবাহ রীতি ছিল ঠিক ছেলে বা মেয়ের বালেগ হওয়ার সময়ে বা তার কিছু আগে পরে, যা পরবর্তী সময়ে বাল্য বিবাহ বলে গণ্য করা হয়।

ব্রিটিশরা এসে প্রথম এই উপমহাদেশের মানুষদের শিখালো যে চাকরি করতে হবে, সরকারি কর্মচারী কিংবা কর্মকর্তা হতে হবে। তাহলে সামাজিক অবস্থান এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। এ উপমহাদেশের সরল-সহজ মানুষগুলোকে গোলামী করবার জন্য, অর্থের বিনিময়ে কিনে নেবার জন্য নানান আর্থিক ও সামাজিক সুবিধা দিতে শুরু করলো ব্রিটিশ রাজ্যের অধীনে কর্মরত ব্যক্তিদের। এতদিন পর্যন্ত সমাজ কৃষিকাজেই ছিল চরম সন্তুষ্ট। কিন্তু তাদের মধ্য থেকে যখন একটি চাকুরিজীবী শ্রেনী প্রতিষ্ঠিত হলো যারা নিয়মিত বেতন, রেশন, উৎসব-পার্বনে বোনাস, পদ মর্যাদা অনুযায়ী গাড়ি-বাংলো বাড়ী পান তাদের দেখে কৃষক, ব্যবসায়ী আর গৃহস্থ্য সমাজের হা-হুতাশ তৈরি হলো। কৃষিকাজ আর ব্যবসা ভুলে সবাই তখন তাদের সন্তানদের ব্রিটিশ কর্মচারী-কর্মকর্তা রূপে দেখার স্বপ্নের ব্যাধিতে আক্রান্ত।

প্রাথমিকভাবে সাধারণ কর্মচারী হতে পারাটাই অনেক বড় ব্যাপার হলেও এ উপমহাদেশের স্বাধীনতা বিক্রি করতে অগ্রগামী মানুষগুলোর সীমাহীন লোভ তৈরি হলো বড় পদে চাকুরির প্রতি। তাদের দেখাদেখি সাধারণ মানুষও আর পিছিয়ে থাকতে চাইলো না। সন্তানদের ব্রিটিশ কর্মচারী বানাতে শুরু হলো প্রতিযোগিতা, চাকুরির আবেদনের যোগ্যতা অর্জনের জন্য আগে পড়াশোনা শেষ করা, তারপর চাকুরি পেয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ব্যাপারটা তখন থেকেই শুরু হলো। তখনও অবশ্য পরিবার ছেলে-মেয়েকে বিয়ের জন্য এতদিন অপেক্ষা করাতেন না, ছেলের পিতার অবস্থান, ছেলের পড়াশোনা বা কর্ম এবং মেয়ের পারিবারিক অবস্থানই ছিলো বিয়ের বিবেচ্য বিষয়। কিন্তু ব্রিটিশরা এ উপমহাদেশের মানুষদের মাঝে যে চাকুরি প্রীতি প্রোথিত করেছিলো তা কালক্রমে আমাদের ভেতর গেঁথে গেছে।

এখন পিতাদের কাছে পুত্র এবং পাত্র উভয়ের চাকুরিজীবী হবার কোন বিকল্প নেই। কারণ ছেলের পরিবারের দৃষ্টিতে সুপুত্র ও বিবাহযোগ্য হতে আর মেয়ের পরিবারের কাছে সুপাত্র ও প্রতিষ্ঠিত জামাই হতে সরকারি চাকুরিজীবী (নিদেন পক্ষে উচ্চপদস্থ বেসরকারি চাকুরিজীবী) হবার কোন বিকল্প নেই। যে বাস্তবজ্ঞান সম্পন্ন সাহসী ছেলেটির ব্যবসায়ী কিংবা উদ্যোক্তা হয়ে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে H.S.C. পাশই যথেষ্ট ছিল তাকেও বাধ্যতামূলক ভাবে চাকুরিজীবী হবার চেষ্টাটুকু করার জন্যই কেবল ক্যারিয়ার এবং বাস্তব জীবনের সাথে সামান্যতম সম্পৃক্ততা না থাকা বিষয়গুলো নিয়েও নির্লিপ্ত ভাবে অনার্স-মাস্টার্স করতে হয়। ২৫-২৭ বছর বয়সে অনার্স/মাস্টার্স পাশ করে প্রথম শ্রেনীর চাকরির আশায় ছুটতে থাকা ছেলেটিকে কখনো কখনো তৃতীয় শ্রেনীর চাকুরিতেই সন্তুষ্ট থাকতে হয় তবুও ব্রিটিশ কলোনীর মানসিকতায় নিমজ্জিত আমাদের পরিবার বা সমাজ তাদের ছেলেদের ব্যবসায়ী কিংবা উদ্যোক্তা হতে দেবে না কারণ তাদের চোখে উদ্যোক্তা মানেই বেকার ঘোরাঘুরি, চাকরি না করার ধান্ধা আর ব্যবসায়ী মানেই লস করে পথে বসবে অর্থাৎ ভবিষ্যত অন্ধকার।-লেখকঃ একজন গবেষক ও প্রগতিশীল লেখক।