আ’লীগ নেতা তোরাব আলীসহ খালাস ৪৯ জন

যুগবার্তা ডেস্কঃ ২০০৯ সালে পিলখানায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে হত্যার দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগ নেতা তোরাব আলীসহ ৪৯ জনকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট। আর পিলখানা হত্যাযজ্ঞের অন্যতম পরিকল্পনাকারী তৎকালীন বিডিআরের ডিএডি তৌহিদসহ ১৩৯ জনের সাজা বহাল রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ১৮৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ১৯৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে।
বিচারপতি মো. শওকত হোসেনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ সোমবার এ মামলার আপিলের রায় ঘোষণা শেষ করেন। এই বেঞ্চের অপর দুই সদস্য হলেন—বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার।
আলোচিত এ মামলার রায় পড়া শুরু হয় রোববার। আসামির সংখ্যা বিবেচনায় দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এ মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির জন্য ২০১৫ সালে এই বৃহত্তর বেঞ্চ গঠন করা হয়। দু’দিন ধরে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের মধ্য দিয়ে চাঞ্চল্যকর মামলাটির বিচার প্রক্রিয়ার দুটি ধাপ শেষ হলো।
রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, ফাঁসির দণ্ডাদেশ ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা এখন চাইলে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করতে পারবেন।
২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পিলখানায় তৎকালীন বিডিআর সদরদপ্তরে বিদ্রোহে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন প্রাণ হারান। দু’দিন জওয়ানরা পিলখানায় নারকীয় তাণ্ডব চালায়। বিদ্রোহের মামলায় বিচার হয় বাহিনীর নিজস্ব আদালতে।
২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর হত্যাকাণ্ডের বিচারের রায় হয় পুরান ঢাকার বকশীবাজারে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত আদালতে। ওই দিন বিচারিক আদালত ৮৫০ আসামির মধ্যে ১৫২ জনকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছিলেন। এ ছাড়া ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন ও ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন। ২৭৮ জনকে খালাস দেওয়া হয়েছিল। এর চার বছর পর হাইকোর্টে আপিলের রায় হলো।
হাইকোর্টের রায়ে বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ পাওয়া ১৫২ জনের মধ্যে ১৩৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড, আটজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও চারজনকে খালাস দেওয়া হয়। এক আসামির মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস পাওয়া চারজন হলেন—বিডিআর সদস্য আলী আজগর, বিল্লাল হোসেন, মেজবা উদ্দিন ও খায়রুল।
বিচারিক আদালতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া ১৬০ জনের মধ্যে ১৪৬ আসামির সাজা বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। দুজনের মৃত্যু হয়েছে। ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের ৪৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সভাপতি তোরাব আলীসহ ১২ জনকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট।
এ ছাড়া বিচারিক আদালতে খালাসপ্রাপ্ত ৬৯ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের করা ফৌজদারি আপিল আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৩১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন হাইকোর্ট। এ ছাড়া চারজনকে সাত বছর করে কারাদণ্ড ও ৩৪ জনের খালাসের রায় বহাল রাখা হয়।
এ মামলার সাড়ে আটশ’ আসামির মধ্যে ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছিলেন বিচারিক আদালত। তাদের মধ্যে ১৮২ জনকে ১০ বছর করে, আটজনকে সাত বছর করে, চারজনকে তিন বছর করে, দুজনকে ১০ ও তিন বছর করে কারাদণ্ডাদেশ দেন হাইকোর্ট। এ ছাড়া ২৯ জনকে খালাস দেওয়া হয়েছে। ২৮ আসামি আপিল না করায় তাদের সাজা বহাল রয়েছে।
রায় ঘোষণা শেষ হওয়ার পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, রায়ে আদালত সাতটি পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। বিজিবির ভাবমূর্তি রক্ষা, এর সদস্যদের বিভিন্ন স্বার্থসংশ্নিষ্ট বিষয় এবং ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি সংঘটিত নারকীয় ওই ঘটনা বিষয়ে আগাম তথ্য দিতে ব্যর্থতা বিষয় খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে।
রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা বলেন, গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা নির্দোষ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন। তৎকালীন বিডিআর বাহিনীর কিছু সদস্যের উচ্ছৃংখল হিংস্রতা ও অমানবিকতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যা অকল্পনীয়।
তিনি বলেন, ফাঁসির দণ্ডাদেশ ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করতে পারবেন। রায়ে রাষ্ট্রপক্ষ সন্তুষ্ট কি-না এবং যেসব আসামি খালাস পেয়েছেন তাদের খালাস প্রাপ্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করবে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, খুব বেশি আসামি খালাস পায়নি। পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পেলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিচারিক আদালতে রায় ঘোষণার পর মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামিদের সাজা কার্যকরের অনুমতি (ডেথ রেফারেন্স) ও আপিল হাইকোর্টে আসে। ৩৭০ কার্যদিবসে শুনানি শেষ হওয়ার সাত মাস পর রোববার থেকে শুরু করে সোমবার হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ রায় দেওয়া শেষ করেন।
সংশ্নিষ্টরা বলছেন, শুধু দেশের ইতিহাসে নয়, বিশ্বের ইতিহাসের এটি সর্ববৃহৎ ফৌজদারি মামলা। এক মামলায় একসঙ্গে এত সংখ্যক আসামির ফাঁসিও নজিরবিহীন।
এদিকে, পিলখানা হত্যাকাণ্ড মামলায় দণ্ড পাওয়া আসামিরা বিভিন্ন কারাগারে বন্দি রয়েছেন। কারা সূত্র জানায়, এসব আসামির বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের দেওয়া রায় ঘিরে কারাগারগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
কারা অধিদপ্তরের ডিআইজি (ঢাকা বিভাগ) তৌহিদুল ইসলাম সমকালকে বলেন, সব সময়েই কারাগারে বিশেষ নিরাপত্তা থাকে। তবে বিশেষ কোনো ঘটনায় এ নিরাপত্তা আরও বাড়ানো হয়।
ফিরে দেখা পিলখানা হত্যাকাণ্ড:
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ওই বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি লালবাগ থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা করেন তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক নবজ্যোতি খিসা। পরে মামলা দুটি নিউমার্কেট থানায় স্থানান্তর হয়। ২০১০ সালের ১২ জুলাই পিলখানা হত্যা মামলায় ৮২৪ জনকে আসামি করে চার্জশিট দেয় সিআইডি। পরে সম্পূরক চার্জশিটে আরও ২৬ জনকে আসামি করা হয়।
পিলখানা হত্যা মামলার ২৩৩তম কার্যদিবসে মামলায় ৬৫৪ জন সাক্ষী আদালতে তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করেন। হত্যা মামলায় সাক্ষীর সংখ্যা ছিল এক হাজার ২৮৫ জন। ২০১১ সালের ৫ জানুয়ারি হত্যা মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। ওই বছরের ২২ আগস্ট অভিযোগ গঠন করা হয়।
পিলখানা বিদ্রোহের ঘটনায় দায়ের করা মামলারও বিচার শেষ হয়েছে। গত বছরের ২০ অক্টোবর সদর রাইফেলস ব্যাটালিয়নের ৭২৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়ার মধ্য দিয়ে বিদ্রোহ মামলার বিচার শেষ হয়। বিদ্রোহের ঘটনায় ১১টি বিশেষ আদালতে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে ৫ হাজার ৯২৬ জনের।-সমকাল