আর কোন ধর্ষণের বিনিময়ে রেমিট্যান্স নয়!

55

জিনাত নেছাঃ বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছরে অনেক নারী কর্মী কে পাঠানো হয় সৌদি আরবসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।কাগজ কলমে নারী গৃহকর্মী হলেও বাস্তবতায় যৌনদাসী বলাটায় অধিক যুক্তিযুক্ত বলে দাবি করে প্রেরণকৃত নারীরা।একযুগ আগের কথা যখন স্কুলে পড়তাম আমার এলাকায় একজন মহিলা সৌদিতে গিয়েছিলেন উনি প্রায় এক বছরের ব্যবধানে ফিরে ও এসেছেন।উনাকে আবার যাবে কিনা জিজ্ঞেস করলে উনি বিনা বাক্যে বলতেন দেশে ভিক্ষা করে খাবো কিন্তু সৌদিতে যাবোনা।ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে উদাহরণ দিলাম যে,মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষত সৌদি আরবে নারী কর্মী নির্যাতিত হয়ে আসছে অনেক বছর আগে থেকেই।যে সকল নারী গৃহকর্মী হিসেবে যায় তাদের বিবরন থেকে বলা যায় অনেকটা পতিতালয়ে যেসকল বন্ডেড পতিতা(সুকরি) থাকে ঐ সকল নারী গৃহকর্মীর জীবন কাটে তেমনি।

গবেষণার সুবাদে সৌদি ফেরত অনেক নারীর সাথেই কথা বলার সুযোগ হয়েছিলো এক সময়।তাদের মাঝে দেশে ফেরত আসা এমন একজন কেও খুঁজে পাইনি যার মুখে তৃপ্তির হাসি ছিলো।সবার মুখেই লোমহর্ষক নির্যাতন, ধর্ষণ এর বর্ননা শুনেছি।

একজন সম্মানিত সচিব সাহেব সেসব নারীদের মিথ্যাবাদী সাবস্ত করায় ব্যস্ত।একজন নারী হিসেবে সেসকল নির্যাতিত নারীদের হয়ে দৃঢ়ভাবে বলতে চাই,সমাজ থেকে শিখা আসা নিজের সবচেয়ে দামী সম্পদ(ইজ্জত) নিয়ে মিথ্যা বলার মতো মানুষ তারা নন।

সম্মানিত সচিব আপনি নিজেও একজন নারী,তাই অন্তত আপনার বোঝা উচিত ছিলো। কেন?মিথ্যা বলবে।বাংলাদেশ থেকে যে যাবত সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মী পাঠানো শুরু হয়েছে সেই যাবত থেকেই নারীরা এই ধরনের নির্যাতন এর শিকার হয়ে আসছে।অনেক নারী নিঃস্ব হয়ে কোন রকম জীবন নিয়ে পালিয়ে এসেছে।অনেকে মারাও গিয়েছে।অনেকেই আছেন এখন সৌদি থেকে ফিরে এইচ আই ভি পজিটিভ ভাইরাস নিয়ে ঘুরছে,মানবেতর জীবন অতিবাহিত করছে।পরিবার,সমাজ তাদের জায়গা দিচ্ছেনা।আপনার নিকট মনে হচ্ছে এই নারীরা মিথ্যা বলছে?এমন বিদ্রুপ আপনার কাছ থেকে আশা করা যায় না সচিব সাহেবা।

আসলে আপনাদের শুধু দরকার রেমিট্যান্স, দেশের জিডিপির হার বাড়ানো।আপনাদের নিকট এগুলো খুব আষাঢ়ে গল্পই মনে হবে।

বাংলাদেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে একজন নারী যখন বিদেশ যায় সেটা পড়ালেখার জন্য হউক আর গৃহকর্মী হউক কোনটাকেই আমাদের সমাজ খুব ভালোচোখে দেখেনা।গৃহকর্মী হলে তো আরো কথায় নাই।তাকে নিয়ে নানান রমরমা কানাঘুষা ও শুরু হয় পরিবার,সমাজ ও আত্নীয় স্বজনদের মাঝে। এতোকিছু উপেক্ষা করে একজন নারী যখন বিদেশ পাড়ি জমায় সহায় সম্বল,অর্থ,সম্মান সব তুচ্ছ জ্ঞান করে তখন আপনার নিকট মনে হলো তারা পরিবেশের সাথে খাপখাওয়াতে পারেনা,বাসি রুটি খেতে পারেনা তাই ফিরে এসে মিথ্যা গল্প ফাঁদে।কি খোড়া যুক্তি আপনার! কিন্তু দেশে ফিরে ও যে তাদের যাবার জায়গা নাই,কেউই তাদের ভালোভাবে গ্রহন করেনা এই খবর কি রাখেন?
বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স পায় বৈদেশিক কর্মসংস্থান থেকে।কিন্তু একজন কর্মী বিদেশ যাওয়ার শুরু থেকে যেমনঃপাসপোর্ট,মেডিক্যাল, ভিসা কোন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নাই।এসবের স্তরে স্তরে দালাল চক্র কাজ করে।এক টাকার জায়গায় ১০টাকা হাতিয়ে নেয়।এমনকি বিদেশ যাবার পর যে টাকা বেতন তা পায়না,যে কাজ পাবার কথা তা পায়না।চোরের বেশে থাকতে হয়।নির্যাতন, নিপীড়ন সহ্য করে ও দেশে ফিরতে চায় না।অনেকের মুখেই বলতে শুনেছি,আপা,এতো টাকা খরচ করে বিদেশ গিয়েছি কিছু টাকার জন্য।তাই শতকষ্ট হলেও ফিরতে চাই না দেশে।দেশে এসে কি করবো,জমি বন্দক দিয়েছি,ঋন করেছি এগুলো কিভবে শোধ করবো।আর আপনি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে বলছেন সেসব নারীরা মিথ্যা গল্প ফাঁদে দেশে ফিরার জন্য?

সরকারের কাছে বিনীত অনুরোধ, দয়া করে এই ধর্ষণ বন্ধ করুন।আর কোন ধর্ষণের বিনিময়ে আমরা রেমিট্যান্স কিংবা জিডিপির হার বাড়াতে চাইনা।দয়া করে এসব অসহায়দের উৎসর্গ করে জিডিপি বাড়ানো বন্ধ করায় সুনজর দিন।-লেখকঃ উন্নয়ন কর্মী ও গবেষক।