আমার সিনেমা; আমাদের সিনেমা!!

-ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীন
৫ম পর্বঃ যত না ছবি দেখতে ভাল লাগতো আমার তার চেয়ে ঢের ভাল লাগতো পূরো ছবির পূরো কর্মকান্ড নিয়ে ভাবতে। সিনেমার শ্যুটিং কিভাবে করা হয়, অভিনেতারা কিভাবে চলে, সিনেমা হলে কী ভাবে ছবি প্রদর্শন করে, এক একটি হলে মেশিন কটা করে থাকে, বিজ্ঞাপন স্ঢাইড কিভাবে দেখায়, ইত্যাদি। যারা সিনেমা হলে চাকুরী করতো তাদেরকে দেখে আমার খুব ঈর্ষা হতো। মনে হতো ওরা কত ভাগ্যবান; সব ছবি দেখার সুযোগ পায়! ইস, আমি যদি এমন সুযোগ পেতাম! বিশেষ করে সিনেমার প্রজেক্টর ম্যান হবার প্রবল আগ্রহ আমার এককালে ছিল।
ক্লাশ টেন এ উঠার পর পরই ধলা বাজারে একটা বিশাল কান্ড ঘটে গেল। তখনকার দিনের বাজারের সবচেয়ে ধনবান ব্যবসায়ী রুসমত চাচা সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি সিনেমা হল বানাবেন। বালিপাড়া আর গফরগাঁয়ের সিনেমা ব্যবসার জয়জয়কার দেখেই হয়ত তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। চারিদিকে রব পরে গেল। শুরু হলো হল বানানোর কর্মযজ্ঞ। ইটবালু আসলো, সিমেন্ট আসলো; আসলো রাজমিস্ত্রির দল। তারা একটি একটি ইট গাঁথে আর পাশে বসে বসে আমি দেখি। কাজ আর শেষ হয় না। সকালে স্কুলে যাবার আগে আর বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে আমার কাজই হলো হলের কন্সট্রাকশন সাইটে বসে থাকা।
মাঝে মাঝে ঢাকা থেকে হল বিশেষজ্ঞরা এসে কাজ তদারক করে যেতেন। ইটবালুর কাজ শেষে এবার ভেতরের ডেকোরেশনের কাজ শুরু হল। দর্শকদের সিট বানানোর জন্যে ময়মনসিংহ থেকে বিশেষ টিম আসলো। তারা ওয়েলডিং মেশিন দিয়ে একটি একটি সিট বানিয়ে হলের ভেতর বসালো। হলের পর্দা হচ্ছে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় এবং আকর্ষনীয় জিনিস। একদিন সেটাও আনা হলো। মুশকিল হলো টানাতে যেয়ে। পর পর কয়েকদিন চেষ্টা করেও টানাতে পারলো না। আমি এসএসসির ফাইনাল পরীক্ষার চিন্তা বাদ দিয়ে মহা চিন্তায় পরে গেলাম পর্দা নিয়ে। অবশেষে কারা যেন এসে টানিয়ে ফেলল। কী খুশী হলাম আমরা সবাই। যেন বিশ্ব জয় করে ফেলেছি। এভাবে একদিন আমার এসএসসি পরীক্ষার পরপরই চালু হলো স্বপ্নের হল। চাচা নাম রাখলেন “ঝর্না”! রাজ্জাক-শাবানার সুপার হিট “সানাই” ছবিটি দিয়ে বিকেল তিনটায় ঝর্নার উদ্বোধন হয়েছিল।
এতো গেল হলের গল্প। শ্যুটিং এর গল্পও আছে আমার জীবনে। ঢাকার মগবাজারে আমাদের বাসা। আমি গ্রাম থেকে বেড়াতে আসলে এখানেই তখন উঠি। কোন এক ছুটিতে বেড়াতে এসে পণ করলাম এফডিসিতে যাবো। যেই ভাবা সেই কাজ। মগবাজারের বাসা থেকে রেল লাইন ধরে হেঁটে হেঁটে এফডিসির কাছে চলে আসলাম। মুছুয়া গেইটম্যান আমাকে কেন, কাউকেই ঢুকতে দেবে না ভিতরে। কঠিন হুংকার তার; ভাবসাবই আলাদা। সে নিজেও অভিনেতা। মাঝেমধ্যে পর্দায় তাকে দেখা যায়। এই ডাটেই সে বাঁচে না আর কি!
অগত্যা পেছন দিক দিয়ে পানি ডিঙিয়ে অনেক উঁচু দেয়াল টপকে কোনভাবে ভেতরে ঢুকে পরলাম। কেবল আমি নই, আমার মত আরো দুএকজন ছেলেও এভাবেই ঢুকেছে। ঘুরে ঘুরে এফডিসি দেখা শেষ। বাইরে খোলা জায়গায় একটা জটলা দেখে এগিয়ে গেলাম; দুটো ছবির সেট ফেলা হয়েছে সেখানে। একটি “এখনই সময়” আর অন্যটি “হুর এ আরব” ছবির। দীর্ঘক্ষন ঠায় দাঁড়িয়ে “হুর এ আরব” ছবির শ্যুটিং দেখলাম। জসিম, রোজী, আনোয়ার হোসেন, শওকত আকবরসহ আরো অনেকে শ্যুটিং করছিলেন। সহজে টেক হয় না। একই দৃশ্যে বার বার টেক করেছেন পরিচালক। কিন্তু হচ্ছিলই না। কড়া রৌদ্রতে সবাই ঘেমে নেয়ে একাকার। অভিনেতারা সবাই ক্লান্ত। তাদের বিশ্রাম দরকার, টিফিন দরকার। আমার মত টোকাই মার্কা দুএকজনের গরমও লাগে না; ক্ষুধাও লাগে না। তবে আমার সামনে বসে বসে জসিম যখন মুখ বড় করে সিংগারায় কামড় দিচ্ছিলেন, ইচ্ছে হচ্ছিল তার সামনে থাকা প্লেট থেকে থাবা মেরে সিংগারা নিয়ে পালাই। পাশের সেটে আব্দুল্লাহ আল মামুনের “এখনই সময়” ছবির শ্যুটিং চলছে। মামুন নিজে সহ, টেলি সামাদ, এটিএম শামছুজ্জামানরা শ্যুটিং করছিলেন। মজার বিষয় হলো ওই শ্যুটিং এ আমার মত মেলা লোক ওদের দরকার ছিল। তাই হঠাৎ দেখলাম আমাদের কদর বেড়ে গেল। শ্যুটিংয়ের জন্যে আমরা তৈরী। লুঙ্গি কাছা দেয়া খালি গায়ের আমার হাতে ছোট সাইজের একটি বাঁশ ধরিয়ে দিল! আমি সাংঘাতিক রকমের উত্তেজিত। এ কি ভাবা যায়? খোদ এফডিসির ভিতরে আমি সিনেমার শ্যুটিং করছি!
দুই দল গ্রামবাসীর মধ্যে মারামারির রেকর্ডিং হবে। আমরা দুইপক্ষের দুই লাঠিয়াল বাহিনী দূর থেকে বাঁশ উঁচিয়ে চিৎকার করতে করতে মুখোমুখি হয়ে মারামারি শুরু করি। তিনচার বারের চেষ্টায় ওকে হলো। মারামারির সময় দুচারটি বাঁশের আঘাত আমার পিঠেও পরে। তবে মাইন্ড করিনি; আফটার অল জীবনের প্রথম শ্যুটিং। এবার অন্য শ্যুটিং; ক্যামেরা অন করলো। দৃশ্যটি ছিল এরকম- আমাদেরকে গোল হয়ে দাঁড় করিয়ে একপাশে টেলিসামাদ গান গাইছে, আমি রাজ্জাক হইলাম না, আমি কবরী পাইলাম না। আল্লায় কেন নায়ক কইরা জন্ম দিল না! আর আমরা দর্শক সেজে সেসব দেখছি। এভাবে চলার এক পর্যায়ে পেছন থেকে মানুষ ঠেলে ভেতরে ঢুকে আমার পাশে দাঁড়াবেন পুলিশের পোষাক পড়া এটিএম শামছুজ্জামান। কঠিন আদেশ; ক্যামেরার দিকে তাকানো যাবে না; আর হাসা যাবে না। এটিএম ঢুকলেন আর আমি তাকিয়ে রইলাম ক্যামেরার দিকে। এভাবে দুইবার হলো। তৃতীয় বার হতেই ক্যামেরা কাট করে প্রোডাকশনের কেউ একজন এসে আমাকে একখানা বেদম গালি দিয়ে শ্যুটিং থেকে বের করে দিল। গালিটি এখনো পুরো মনে আছে আমার। গালিটির দুটো অংশের শেষাংশে ছিল “পুত”। কষ্টভরা মনে গেইট দিয়ে বের হয়ে আসছি; ধরলো সেই মুছুয়া। তার একটাই কথা, আগে ক, তুই ভিতরে ঢুকলি কেমনে? কান ধরে ক্ষমা চেয়ে সে যাত্রায় রক্ষা পেলাম; আর এভাবেই শেষ হলো আমার অভিনয় জীবনের। মান অপমানবোধ আমার তেমন ছিল না তখন। এ সবই পানিভাত ছিল আমার কাছে। কাছের পরিচিত কেউ না থাকলে, না দেখলে এসবে সমস্যা হতো না আমার কোন কালেই।
একবারের ঘটনা। ঢাকার শ্যামলী সিনেমায় সমবয়সী খালাতো ভাই (বলা যায় পেয়ারে দোস্ত, আমার সকল অপকর্মের গুরু) মিন্টুকে নিয়ে টিকেট কেটে ঢুকেছি। থার্ড ক্লাশের টিকেট। তাই বসতে দিয়েছে একেবারে সামনের সিটে। পকেটে পয়সা যা থাকতো তা দিয়ে সচরাচর ফার্ষ্ট ক্লাশের টিকেট চাইলেও কাটতে পারতাম না। ছবি শুরু হলো। মুশকিল হলো একেবারে সামনের সিটে বসাতে সব ছবিই বাঁকা বাঁকা দেখাচ্ছিল। ছবির নাম ‘গাঁয়ের ছেলে’। এতদিনকার অতি চেনা রাজ্জাক সুচরিতাকে চেনাই যাচ্ছিল না। মিন্টু বললো, চিন্তা করিস না। আমি ব্যবস্থা করতাছি। ছবি শুরুর কিছুক্ষন পরই এদিক ওদিক তাকিয়ে আমাকে নিয়ে সিট টপকিয়ে পেছনের ফার্ষ্ট ক্লাশে গিয়ে বসলো। মিন্টুর বুদ্ধিমত্তায় ওকে গুরু হিসেবে মেনে নিলাম।
মনের সুখে ছবি দেখছি। আর ভাবছি এখন থেকে ভুলেও দাম দিয়ে পেছনের টিকিট কিনবো না। ঢুকবো থার্ড ক্লাশে আর বসবো ফার্ষ্ট ক্লাশে। মিন্টুকে সেদিন আরো বেশী আপন মনে হলো। ছবি চলছে; রাজ্জাক গাঁয়ের ছেলে; জমিতে চাষ করছে। শহর থেকে এসেছে সুচরিতা। গাড়ী থামিয়ে রাজ্জাকের কাছে গ্রামের নাম জানতে চাইলো। রাজ্জাক ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতে যাবে। তখনই টের পেলাম আমার ঘাড়ে কে যেন ধরেছে। আর বলছে, হোউরের পোলা! এইবার পাইছি; ওঠ, তাড়াতাড়ি ওঠ!! থার্ড কেলাশের টিকেট কাইট্যা চুরি কইর্যান ফাস্ট কেলাশে আইছস!!! তগো দুইডারে আইজকা গামছা দিয়া বানমু!!! চলবে…
-উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা