আমার সিনেমা; আমাদের সিনেমা!!

-ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীন
৪র্থ পর্বঃ ক্লাশ এইটে উঠেছি কেবল। বাবার বদলির চাকুরীর সুবাদে পূরো পরিবার ধলা ছেড়ে ঢাকা চলে আসলো। আমিও আসলাম এবং এসে পূবাইলের ভাদুন হাইস্কুলে নিয়মিত ক্লাশ করা শুরু করলাম। তবে বেশীদিন পারিনি; ধলা স্কুল আমাকে কিছুতেই ট্রান্সফার সার্টিফিকেট দেবে না এবং আব্বার কাছে সকল শিক্ষকদের আকুল আবদার আমাকে ধলা হাইস্কুলেই এসএসসি পর্যন্ত পড়তে হবে। আমার সহজ সরল বাবা স্যারদের আবদার রক্ষাকল্পে ধলা বাজারে ছোট একটা বাসা ভাড়া করে আমাকে পুবাইল থেকে নিয়ে আসলেন। শুরু হল আমার ছোটবেলার অনেকটা একাকী জীবন।
একাকী থাকলেও আমি আর যাই করতাম কোনদিন পড়শুনায় গাফিলতি করিনি। (এই একটি পুঁজি নিয়ে আজো আমি চলছি।) তবে মুক্ত বিহঙ্গের মত লুকিয়ে সিনেমা দেখতে কোনদিনও কার্পন্য করিনি। সে সময় দক্ষিণে গফরগাঁয়ের সাথী সিনেমা আর উত্তরে বালিপাড়ার চিত্রপুরী আমাকে কঠিনভাবে টানতো। দিনের বেলা এই দুটি হলের পাবলিসিটির জন্যে দুটো রিক্সা সারাদিন আমাদের এলাকায় মাইকিং করতো। রিক্সার দুপাশে চলতি সিনেমার বড় বড় দুটি পোষ্টার লাগানো থাকতো। আমি সুযোগ পেলেই রিক্সার কাছে এসে দাঁড়াতাম এবং মাঝে মাঝে পোষ্টারে বড় করে ছাপা নায়ক নায়িকাদের ছবির উপর হাত বুলাতাম। সে এক মহা শান্তির ব্যাপার; লিখে বোঝানো যাবে না।
কোথায়ও সিনেমার পোষ্টার দেখলেই দাঁড়িয়ে যেতাম। ধলা স্টেশনের মুখেই শচীন্দ্র কাকার চমৎকার একটি রেস্টুরেন্ট ছিল। সারাক্ষন গমগম করতো লোকজনে। এই রেস্টুরেন্টের বিশেষ বৈশিষ্ট্যই ছিল এর দেয়ালে সাঁটানো সিনেমার পোষ্টার। এমন কোন সিনেমা ছিল না যার পোষ্টার শচীন্দ্র কাকার রেস্টুরেন্টে থাকতো না। তাই কারনে অকারনে কাকার দোকানে যেতে মন চাইতো এবং যেতামও। কাকাও বুঝতেন; তবে বুঝতে দিতেন না। হাসি দিয়ে কেবল বলতেন, পড়াশুনার খবর কি? ঠিক মত লেহাপড়া না করলে খবর আছে।
একদিন যেয়ে দেখি অঞ্জন স্যার বসে চা খাচ্ছেন ওখানে। ভারী মজার মানুষ অঞ্জন স্যার আরো দুতিনজন স্যারকে নিয়ে বসে ছিলেন। আমাকে দেখেই ডাকলেন এবং বললেন, তুমি বেশী বেশী পোষ্টার দেখ সেটা ঠিক আছে। তবে বেশী বেশী সিনেমা দেখবা না। সিনেমা খুব খারাপ জিনিস। যেই ঘরে ঢুকলে দরজা বন্ধ করে বাতি নিভায়া দেয় সেই সিনেমা ঘর আবার ভাল হয় কেমনে? বোঝবার পারছো? স্যার গম্ভীর মুখে কথাগুলো বলছেন কিন্তু একটুও হাসছেন না; তবে আশেপাশের সবাই হেসে কুটিকুটি। স্যারের কথায় কলা গাছও হাসতো বলে আমরা বিশ্বাস করতাম।
স্যারের কথা মানার বয়স তখনও হয়নি আমার। তাই পড়াশুনার চাপ একটু কম থাকলেই ইভিনিং শো ধরার জন্যে আমি বালিপাড়া যেতাম; হেটে হেটেই যেতাম। রিক্সায় কারো সাথে শেয়ারে গেলে এক টাকা লাগতো। তখন এক টাকাই বা পাই কোথায়? তবে টাকার অভাবে চিত্রপুরীতে সব সময় ঢুকতে পারতাম না। তবুও যেতাম। দুটো কারনে যেতাম। এক, হলটি ছিল পূরোপুরি টিনের গোডাউন। ছবির শব্দ পূরোটাই বাইরে চলে আসতো। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছবির ডায়লগ শুনতাম। আবার মাঝে মাঝে টিনের ফাঁক দিয়ে ভেতরে দেখার চেষ্টা করতাম। চিত্রপুরীর টিনের বেড়ায় বেশ কয়েকটি বড় বড় ফুটা ছিল; যা দিয়ে কেবল আমি নই; আমার মত অনেকেই ছবি দেখতো।
জাভেদ ববিতার সাড়া জাগানো নিশান ছবিটি চলছে চিত্রপুরীতে। হল লোকে লোকারন্য। সবার মুখে মুখে সেই গান, চুপি চুপি বলো কেউ জেনে যাবে! জেনে যাবে কেউ জেনে যাবে! জাভেদের ডাবল মানে দ্বৈত অভিনয়। একটি চরিত্রের নাম কালা খাঁ। আমাদের মোখলেস বিকেলে খেলার মাঠে বল খেলে, দৌঁড়ায় আর সারাক্ষন কালা খাঁর ডায়লগ ছাড়ে। ওর মুখে জসিম এবং আহমেদ শরীফের ডায়ালগও দারুন মানাতো। আমি টিনের ফুটো দিয়ে চুপি চুপি নিশান দেখছি গভীর আনমনে। হঠাৎ দেখায় ব্যাঘাত ঘটিয়ে পেছন থেকে কার যেন শক্ত হাত এসে পরলো আমার ঘাড়ে। ধমকের সুরে “কেডা রে” বলেই ঘুরে তাকালাম; দেখি আমাদের কার্তিক স্যার। “পকেটে একটা ফুডা পয়সাও নাই, আবার আইছে ফুডা দিয়া ছবি দেখতে!” বলেই আমাকে সমাদরের সাথে হলের মেশিন রুমে নিয়ে বসিয়ে দিলেন। এরপর কী আরামে বসে সেদিন ছবিটি দেখেছিলাম তা বলাই বাহুল্য।
ছবি শেষে স্যার আমার পকেটে দুই টাকা দিলেন এবং বললেন, রিক্সা নিয়ে সোজা ধলা। আমি সোজা ধলাই ফিরেছিলাম তবে রিক্সায় নয়; হেটে হেটে। এবং খুব যতœ করে টাকা দুটো রেখে দিয়েছিলাম সাথী সিনেমায় যেয়ে আমীর ফকির ছবিটি দেখার জন্যে। সাথী সিনেমা অনেক দূর; হেটে যাওয়া যাবে না। তবে ট্রেনে গেলে, আসলে টাকা লাগবে না। পূরো টাকাটাই ছবি দেখায় কাজে লাগানো যাবে।
একদিন কয়েক বন্ধু মিলে সাথী সিনেমায় দি রেইন ছবিটি দেখতে গেছি। নাইট শো দেখবো। মানে শুরু হবে নয়টায় আর শেষ হবে রাত বারোটায়। নায়িকা অলিভিয়ার ছবি; হিট গান আর সুপার হিট কাহিনী। ছবিটি বিদেশেও চলছে। ঢাকা ছেড়ে প্রায় তিন মাস পরে গফরগাঁয়ে এসেছে। এটাতো মিস করা যায় না। ধলা থেকে রওনা দেবার পর থেকেই থেমে থেমে বৃষ্টি আর ঝড়। রিক্সা আর এগোয় না। অনেক কষ্টে অবশেষে পৌঁছে টিকিট কিনলাম। অপেক্ষায় বাইরে বসে আছি; হলের সামনের দোকানের পুড়ি খেয়ে পকেট অলরেডী খালি। কিন্তু ছবি আর শুরু হয় না। এক পর্যায়ে জানা গেল আজ আর ছবি দেখা হবে না।
টিকিটের টাকা ফেরত দিয়ে দিল। ঝড়ে প্রজেক্টারে সমস্যা হওয়ায় ছবি চালানো যাবে না। কী আর করা! কঠিন কষ্ট মনে নিয়ে ফিরতি রিক্সায় চেপে বসেছি। এখন বৃষ্টি নেই; আকাশ পরিস্কার। গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে সরু রাস্তা মাড়িয়ে রিক্সা ফিরছে নিজের গ্রামে। রিক্সাওয়ালার মনে দারুন ফূর্তি। কিন্তু আমার মনে কোন ফূর্তি নেই, আনন্দ নেই। দুঃখ ভরা মনে কেবলই মনে পড়েছে দেখতে না পারা দি রেইনের সেই জনপ্রিয় গান, একা একা কেন ভাল লাগে না! কোন কাজে মন কেন বসে না!! আমার কী হতে কী হয়ে গেল, আমি নিজেই তো কিছুই বুঝি না!!! চলবে…
-লেখকঃ উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা