আদিবাসীদের মানবাধিকার-পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক

যুগবার্তা ডেস্কঃ ঢাকার ডেইলি স্টার ভবনে ২০১৭ সালের বাংলাদেশের আদিবাসীদের ওপর মানবাধিকার পরিস্থিতির প্রতিবেদন প্রকাশ ও আলোচনা সভার আয়োজন করেছে কাপেং সংগঠন নামে একটি মানবাধিকার সংগঠন।

এ উপলক্ষে অনুষ্ঠিত প্রতিবেদন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন ও আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন কাপেং ফাউন্ডেশন চেয়ারপার্সন এবং জাতীয় আদিবাসী পরিষদ-এর সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল।
সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলন, আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাস-এর সদস্য উষাতন তালুকদার এমপি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ-এর ডীন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-এর সদস্য অধ্যাপক বাঞ্ছিতা চাকমা, অক্সফ্যাম-এর প্রোগ্রাম ডিরেক্টর এম বি আক্তার, এবং বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম-এর সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং। অনুষ্ঠানের শুরুতে কাপেং ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ও ‘বাংলাদেশের আদিবাসীদের মানবাধিকার রিপোর্ট ২০১৭’-এর অন্যতম সম্পাদক পল্লব চাকমা স্বাগত বক্তব্য দেন এবং প্রতিবেদনের সামগ্রিক রুপ সংক্ষিপ্তকারে তোলে ধরেন।

অনুষ্ঠানে কাপেং ফাউন্ডেশনের সদস্য সোহেল হাজং-এর সঞ্চালনায় প্রধান অতিথি, সম্মনিত অতিথি ছাড়াও মুক্ত আলোচনায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার বিভিন্ন অঞ্চলের আদিবাসী ভিকটিমরা অংশগ্রহণ করেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সুলতানা কামাল বলেন, দেশে এক প্রকার যে অধিকারহীনতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলমান রয়েছে তা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আসা এ দেশে হতে দেয়া যাবে না। এই প্লাটফর্ম থেকেই আমাদের বিচারহীনতা সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে।
সুলতানা কামাল আরো বলেন, বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ৭ মার্চ বক্তব্যে বলেছিলেন ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল এবং প্রত্যেকটা মানুষ যেন তার এই অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সচেষ্ট থাকে, কাজ করে। তিনি এক জায়গায় বলেছিলেন, আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে মহল্লায় মহল্লায় সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলার কথা। সেটা কি ভূমি দখল, বিচারহীনতা ও নারীর ওপর নির্যাতনের জন্য সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলার কথা ছিল না এসব ঘটনা যেন না হয় তার জন্য! সরকারের কাছে একটি প্রশ্ন এখন যারা নেতৃত্বে আছেন এবং বঙ্গবন্ধুর দল বলে সকল সুযোগ সুবিধার দাবি করেন সেই জায়গা থেকে তাদের যে দায়িত্ব সেটা কেন পালন করেন না। তিনি বলেন, কেউ নাগরিক সমাজের অধিকারকে খর্ব করতে পারে না কারণ মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি জনযুদ্ধ। তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কাজ করার জন্য এগিয়ে আসতে বলেন।

ঊষাতন তালুকদার এমপি বলেন, আমরা ভিডিও ফুটেজে দেখেছি, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের বাগদা ফার্মে পুলিশ সরাসরি গিয়ে আদিবাসীদের ঘরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছেন। আইন সেখানে অন্ধ।

অধ্যাপক সাদেকা হালিম বলেন, আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমি অধিকারের বিষয়টি দেখতে হবে। তারপর আদিবাসী নারী যারা প্রতিনিয়ত মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছে। দুইজন মারমা মেয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছে আবার কিছুদিন আগে আদিবাসী ২ জন নারীনেত্রী অপহরণের শিকার হয়েছে। তিনি সরকারের কাছে আবেদন জানান একটি বিষয়ে নজর দেয়ার জন্য, তা হলো: দেশ এখন উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, আমরা উন্নয়ন নিয়ে কথা বলছি কিন্তু সেই উন্নয়ন যদি সমাজের অন্যান্য ঘটনার সাথে সমান তালে না চলে তাহলে আমাদের উন্নয়নশীল দেশের ধারায় চলতে গিয়ে অনেক ধরনের প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে হবে। সুতরাং আদিবাসী নারীর প্রতি সহিসংসতা বন্ধ করতে হবে।

অধ্যাপক বাঞ্চিতা চাকমা বলেন পার্বত্য চট্টগ্রামে বেশিরভাগ মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো ঘটনা ঘটে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দ্বারাই। কিন্তু নিরাপত্তা বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারা সংঘাটত কোন ঘটনার তদন্ত করা যাবে না-দেশের এমন আইন সংশোধন করতে হবে।

এম বি আক্তার বলেন, দেশে ধর্মীয় মৌলবাদ ও উগ্র জাতীয়তাবাদ একসাথে উত্থাপিত হওয়ার ফলে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন বেড়ে চলেছে।
সভাপতির বক্তব্যে জাতীয় আদিবাসী পরিষদের

সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন বলেন, শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামে নয় সমতলের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্রামের পর গ্রাম আদিবাসীরা নিজ ভূমি হতে উচ্ছেদ হচ্ছে এবং দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে। তারা কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে সরকারকে তা খুঁজে বের করতে হবে। এটা রাজনৈতিক সমস্যা রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে হবে।

কাপেং ফাউন্ডেশন তার প্রকাশিত প্রতিবেদনে তোলে ধরে যে, ২০১৭ সালের আদিবাসীদের সার্বিক মানবাধিকার-পরিস্থিতি ছিল খুবই উদ্বেগজনক। এ বছরটিতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ, গুম ও বিচার-বহির্ভূত হত্যাকান্ডের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা জনমনে চরম উদ্বেগ ও আতংকের সৃষ্টি করেছে।