আচরণবিধি সংস্কারের পক্ষে বিশেষজ্ঞরাও

যুগবার্তা ডেস্কঃ বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন করা হলে আচরণবিধি সংস্কার করতে হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরাও। তাঁরা বলছেন, এ জন্য রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের জন্য আচরণ বিধিমালা সংশোধনের জন্য এখনো সময় রয়েছে। তাঁদের কারো কারো মতে, সংসদ নির্বাচনের সময় সংসদ সদস্যদের ক্ষমতা কমানো প্রয়োজন। কারো অভিমত, নির্বাচনের সময় সংসদ সদস্যদের অর্থপ্রাপ্তির জায়গাটি এবং অনুদানের সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হবে। আবার কারো মতে, সংসদ বহাল রেখে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব কি না সে বিষয়ে নিজেকেই আগে প্রশ্ন করা দরকার নির্বাচন কমিশনের (ইসি)। কেউ আবার মনে করেন, বিদ্যমান আচরণ বিধিমালায় যে ব্যবস্থা রয়েছে তার থেকে বেশি কিছু করার নেই। এর যথাযথ প্রয়োগে সমস্যা অনেকটাই কমে আসতে পারে। তার পরও বিষয়টি গভীর মনোযোগের সঙ্গে দেখা হলে আরো কিছু পথ বের হতে পারে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা মনে করেন, সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে নির্বাচনের সময় সংসদ সদস্যদের ক্ষমতা কমানো প্রয়োজন। গত শনিবার বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটে (পিআইবি) এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন করলে আচরণবিধি সংস্কার করতে হবে। এ বিষয়ে অবশ্যই ইসি ভেবে দেখবে।তাদের রেখে নির্বাচন করতে হলে আচরণবিধিতে কিছু পরিবর্তন আনা দরকার।

সিইসির ওই বক্তব্য সম্পর্কে সাবেক নির্বাচন কমিশনার আব্দুল মোবারক বলেন, ‘সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর পর দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ বহাল রেখে নির্বাচনব্যবস্থা চালু হওয়ার পর আমরা দশম সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের জন্য সংশোধিত আচরণ বিধিমালা প্রণয়ন করি। সে সময় আমরা যা করেছি তার বেশি কিছু করার আছে বলে মনে করিনি। তা ছাড়া বিএনপি-জামায়াত জোট ওই নির্বাচন বর্জন ও প্রতিহত করার কর্মসূচি নেওয়ায় এবং আরো অনেক রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ না থাকায় অর্ধেকেরও বেশি আসনে বিনা ভোটে নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা ঘটে। সে কারণে সংসদ বহাল রেখে নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা কী ধরনের প্রভাব সৃষ্টি করতে পারেন তা পুরোপুরি অনুধাবন করা যায়নি। তার পরও ১৪৭টি আসনের নির্বাচনে কিছু ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের প্রভাব লক্ষ করা যায়। এ কারণে যশোর-১ ও যশোর-২ আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত দুই সংসদ সদস্য শেখ আফিল উদ্দিন ও মনিরুল ইসলামের ফল প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের তদন্তে তাঁদের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিল। তবে আদালতের রায়ে তাঁরা এ অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পান। পরে ইসির কাছে তাঁরা দোষ স্বীকার করেন। ’

আব্দুল মোবারক আরো বলেন, ‘নির্বাচনকে প্রভাবমুক্ত করার জন্য সংসদ সদস্যদের ক্ষমতা আরো কমানোর জন্য চিন্তা-ভাবনা করা যেতে পারে। এখনো সময় আছে। বিষয়টি গভীর মনোযোগের সঙ্গে দেখা হলে আরো কিছু পথ বের হতে পারে। ’

ইসি সচিবালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব বেগম জেসমিন টুলি বলেন, ‘নির্বাচনের সময় সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকলে তাঁদের ক্ষমতার দাপট কেমন থাকে তা সবারই জানা। এ সময় তাঁদের অর্থপ্রাপ্তির জায়গাটা আগে বন্ধ করা দরকার। নির্বাচনী এলাকায় তাঁদের মাধ্যমে কোনো প্রকার সরকারি অনুদান দেওয়া পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হবে। আর নির্বাচন কমিশনকে এ বিষয়ে কমিটেড হতে হবে। লোক-দেখানো কিছু করে সুফল পাওয়া যাবে না। ’

নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা জানিপপের চেয়ারম্যান ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ বলেন, ‘বর্তমান নির্বাচন কমিশন নতুন। এ কমিশনে ব্যক্তিরাও ভিন্ন। নতুনতর বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখে এ কমিশনকে সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের জন্য সময়োপযোগী আচরণ বিধিমালা করতে হবে। কমিশনকে এটাও বিবেচনায় রাখতে হবে যেকোনো সংসদ সদস্য নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য তাঁর দলের মনোনয়ন না পেলে তাঁর ক্ষমতা খর্ব করা ঠিক হবে কি না। ’

সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘সংসদ বহাল রেখে নির্বাচনের জন্য আচরণ বিধিমালায় নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা দরকার। সোশ্যাল মিডিয়ার জন্যও আচরণবিধি হওয়া দরকার। তবে তার আগে নিজেকেই ইসির প্রশ্ন করা দরকার, সংসদ বহাল রেখে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব কি না। এই নির্বাচন কমিশন বলেছে, সরকার যেভাবে আইন-কানুন করে দিয়েছে সেভাবেই নির্বাচন হবে। এতে আমাদের দ্বিমত রয়েছে।

সরকার বা সরকারি দল তো চাইবেই নিজেদের জন্য সুবিধাজনক আইন-কানুনের মাধ্যমে নির্বাচন করতে। নির্বাচন কমিশনের উচিত হবে না সরকারের পাতা ফাঁদে পা দেওয়া। সংসদ বহাল রেখে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব না হলে ইসিকে এ বিষয়ে এই ব্যবস্থা পরিবর্তনের দাবি জানাতে হবে। ’

সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন সম্প্রতি দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে এমন এক পরিস্থিতিতে যেখানে ২০১৪ সালের মতোই পার্লামেন্ট বহাল থাকবে। আমাদের পার্লামেন্ট মেম্বাররা আইনানুগভাবে না হলেও অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে উঠেছেন। তাঁরা তাঁদের এলাকার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। ডিসি কে আসবেন, কে আসবেন না, ওসি কে থাকবেন, থাকবেন না—এসব বিষয়ে তাঁদের প্রভাব কাজ করে। স্থানীয় সরকারগুলো ঠিকভাবে কাজ করছে না। পার্লামেন্ট মেম্বাররা কার্যত প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করছেন। এ অবস্থায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে অনেকের মনেই শঙ্কা রয়েছে। ’

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ইসির আইন সংস্কার কমিটি আচরণ বিধিমালা সংশোধনীর যেসব প্রস্তাব রেখেছে তাতে সংসদ সদস্যদের ক্ষমতা কমানোর বিষয়টি নেই। গত ১৯ মার্চ কমিশন বৈঠকে অন্যান্য প্রস্তাবের সঙ্গে আচরণ বিধিমালা সংশোধনীর প্রস্তাবও তোলা হয়।

ইসি আইন সংস্কার পরিকল্পনা সামনে রেখে গত ৩১ জুলাই থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত রাজনৈতিক দল, নির্বাচন বিশেষজ্ঞসহ সমাজের বিভিন্ন অংশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপ করে। সংলাপে সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচনসহ ইসির এখতিয়ারবহির্ভূত বেশ কিছু প্রস্তাব আসে। সংলাপ শেষে গত ২৬ অক্টোবর সিইসি সাংবাদিকদের বলেন, বিদ্যমান আইনে বড় কোনো পরিবর্তন আনার দরকার নেই। যে আইন রয়েছে তাই যথেষ্ট। আইন প্রয়োগ করতে হবে।

খসড়া আচরণ বিধিমালায় যা আছে : ইসি সচিবালয় সূত্রে জানা যায়, আচারণবিধি সংশোধনের যে খসড়া কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে, তাতে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দুটি। একটি হচ্ছে, নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলের নেতারা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে সভাপতি বা সদস্য পদে থাকতে পারবেন না। অন্যটি হচ্ছে ইলেকটোরাল ইনকোয়ারি কমিটি নির্বাচনী আচরণ বিধিমালা লঙ্ঘনের জন্য জেল-জরিমানা ছাড়া ইসির কাছে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সুপারিশ করতে পারবে।

কমিশনের আইন সংস্কার কমিটির এক সদস্য জানান, আইন সংস্কারের প্রস্তাবগুলো সম্পর্কে কমিশন এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। কমিশন জানিয়েছে, সরকারের মাধ্যমে সংসদে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংস্কারের কাজ চূড়ান্ত হওয়ার পর আচরণ বিধিমালা সংস্কার করা হবে। আচরণ বিধিমালা সংস্কারের এখতিয়ার ইসিরই।

বিদ্যমান আচরণ বিধিমালায় যা রয়েছে : বিদ্যমান নির্বাচনী আচরণ বিধিমালা অনুসারে সরকারি সুবিধা না নিয়ে প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার, মন্ত্রী, চিফ হুইপ, ডেপুটি স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা, বিরোধীদলীয় উপনেতা, প্রতিমন্ত্রী, হুইপ, উপমন্ত্রী ও তাঁদের সমমর্যাদার কোনো ব্যক্তি, সংসদ সদস্য ও সিটি করপোরেশনের মেয়রদের নির্বাচনী প্রচারের সুযোগ রয়েছে।

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুসারে দলীয় সরকারের অধীনে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ২০১৩ সালের নভেম্বরে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের জন্য এই সংশোধিত আচরণ বিধিমালা প্রণয়ন করে। এই সংশোধনীতে ভারতের ‘মডেল কোড অব কন্ডাক্ট ফর দ্য গাইডেন্স অব পলিটিক্যাল পার্টিস অ্যান্ড ক্যান্ডিডেটস’ কিছুটা অনুসরণ করা হয়। ভারতের ওই নীতিমালায় নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর মন্ত্রীদের সরকারি সুবিধা নিয়ে নির্বাচনী প্রচার করার সুযোগ নেই। মন্ত্রীরা তাঁদের দাপ্তরিক পরিদর্শনের সঙ্গে নির্বাচনী কার্যক্রমকে এক করতে পারেন না। সরকারি কোনো যানবাহনও নির্বাচনী প্রচারে ব্যবহার করতে পারেন না। এমনকি তফসিল ঘোষণার পর কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়োগ-বদলিও করতে পারেন না তাঁরা। আগে বদলির অর্ডার থাকলে তফসিল ঘোষণার পর তা বাস্তবায়ন করা যাবে না। কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে তলব করার এখতিয়ারও থাকবে না। রাষ্ট্রীয় কোনো দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে নির্বাচন প্রসঙ্গে কোনো কথা বলাও যাবে না।

কাজী রকিবের কমিশনের সংশোধিত নির্বাচন আচরণ বিধিমালায় এর প্রভাব পড়ে। বিধিমালার ১৪ ধারায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। এতে ‘সরকারি সুবিধাভোগী ব্যক্তিবর্গের নির্বাচনী প্রচারণা’ শিরোনামে বলা আছে—(১) সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ তাঁদের সরকারি কর্মসূচির সঙ্গে নির্বাচন কর্মসূচি যোগ করতে পারবেন না। (২) তাঁদের নিজেদের বা অন্যদের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় সরকারি যান, সরকারি প্রচারযন্ত্রের ব্যবহার বা অন্যবিধ সরকারি সুবিধা ভোগ করতে পারবেন না এবং এতদুদ্দেশ্যে সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার কর্মকর্তা বা কর্মচারী বা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক বা কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ব্যবহার করতে পারবেন না। (৩) কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী তাঁর নির্বাচনী এলাকায় সরকারি উন্নয়ন কর্মসূচিতে কর্তৃত্ব অথবা এসংক্রান্ত সভায় যোগ দিতে পারবেন না। ’ সংসদ সদস্য শব্দ দুটি উহ্য রেখে বলা হয়েছে, ‘(৪) কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে সভাপতি বা সদস্য পদে আগে মনোনীত বা নির্বাচিত হলে তিনি বা তাঁর মনোনীত কোনো ব্যক্তি নির্বাচনপূর্ব সময়ে ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো সভায় সভাপতিত্ব বা অংশগ্রহণ করবেন না। অথবা ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো কাজে জড়িত হবেন না। (৫) সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ ভোট দেওয়া ছাড়া ভোটের দিনে নির্বাচনী কেন্দ্রে প্রবেশ বা নিজে প্রার্থী না হলে ভোট গণনার সময়ে গণনা কক্ষে প্রবেশ বা উপস্থিত থাকতে পারবেন না। ’

বিদ্যমান আচরণ বিধিমালার ৩ ধারায় কোনো প্রতিষ্ঠানে চাঁদা, অনুদান ইত্যাদি বিষয়ে নতুন (ক) উপধারা তৈরি করে বলা হয়েছে, ‘নির্বাচনপূর্ব সময়ে কোনো সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে রাজস্ব বা উন্নয়ন তহবিলভুক্ত কোনো প্রকল্পের অনুমোদন, ঘোষণা বা ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অথবা ফলক উন্মোচন করা যাবে না। ’-কালেরকন্ঠ