আগের অবস্থানেই ইউনেসকো; রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের আগে নয়

যুগবার্তা ডেস্কঃ সুন্দরবনের পাশে রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিষয় নিয়ে নিজেদের আগের অবস্থানেই অটল রইল জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো। সুন্দরবন ও এর আশপাশের এলাকা (দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল) নিয়ে একটি কৌশলগত পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের (এসইএ) আগ পর্যন্ত রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বড় আকারের কোনো শিল্পকারখানা বা বড় অবকাঠামোর কাজ শুরু না করতে অনুরোধ করেছে সংস্থাটি।

ইউনেসকো বলেছে, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের (এসইএ) পর সেটি জমা দিতে হবে বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্রের কাছে। এসইএ পর্যালোচনা করবে আরেক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন)। গত ২ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত পোল্যান্ডের ক্রাকাও শহরে অনুষ্ঠেয় ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্রের ৪১তম বার্ষিক সাধারণ সভার সিদ্ধান্ত গতকাল রবিবার সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

এদিকে ইউনেসকোর বার্ষিক সাধারণ সভা চলাকালে গত ৬ জুলাই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নিজেদের আপত্তি তুলে নিয়েছে ইউনেসকো। একই সঙ্গে সুন্দরবনের নাম বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল হয়েছে। কিন্তু গতকাল ইউনেসকোর ওয়েবসাইটে যে সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে, সেখানে সুন্দরবনের পাশে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে তাদের যে আপত্তি ছিল, সেটি প্রত্যাহার করা হয়েছে কি না সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি।

ইউনেসকো বলছে, সুন্দরবন রক্ষায় সরকার কী ব্যবস্থা নিয়েছে তার হালনাগাদ প্রতিবেদন আগামী ১ ডিসেম্বর ২০১৮ সাল নাগাদ বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্রে জমা দিতে হবে। সেই প্রতিবেদন নিয়ে ২০১৯ সালে ৪৩তম বার্ষিক সাধারণ সভায় আলোচনা হবে।

ইউনেসকো বলেছে, গত বছর মার্চে ইউনেসকোর তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফরে এসে সুন্দরবনের পাশে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। এতে বাতাস ও পানিদূষণের কথা জানানো হয়। এ বিষয়টি বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্রের ৪১তম বার্ষিক সাধারণ সভায় আবারও উত্থাপন হলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে পরিবেশদূষণ রোধে সর্বোচ্চ সচেষ্ট সরকার। সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতি হবে না বলে জানানো হয় সরকারের পক্ষ থেকে।

বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্রের ৪১তম বার্ষিক সাধারণ সভায় সুন্দরবন নিয়ে যেসব সিদ্ধান্ত হয়েছে তা গতকাল ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে ইউনেসকো। তাতে বলা হয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায় সুন্দরবনসহ আশপাশের এলাকায় লবণাক্ততা বাড়ছে। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগের। লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাচ্ছে। এতে সুন্দরবনের ইকোসিস্টেমের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সুন্দরবনসহ আশপাশের এলাকায় লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় বস্তুগত (ইকোলজিক্যাল) যেসব পরিবর্তন আসছে, সেগুলো নিয়মিত নজরদারি করে হালনাগাদ তথ্য বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্রের কাছে জমা দেওয়ার অনুরোধ করেছে ইউনেসকো। সরকারের তরফ থেকে এ বিষয়ে একমত পোষণ করা হয়েছে। সরকারের এই অবস্থানকে স্বাগত জানিয়েছে ইউনেসকো।

ইউনেসকোর ওয়েবসাইটে আরো বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আন্তর্দেশীয় নদী ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশ অংশে মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে গেছে। তাই মিষ্টি পানির প্রবাহ বাড়াতে দুই দেশের সরকারকে যৌথভাবে কাজ করার অনুরোধ করেছে ইউনেসকো।

এর আগে প্রথম গত বছরের আগস্টে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে নিজেদের আপত্তির কথা জানায় ইউনেসকো। গত বছর ১১ আগস্ট সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে ৫০ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হলে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্থান ও সর্ববৃহৎ শ্বাসমূলীয় জলাবন (ম্যানগ্রোভ) সুন্দরবন ও এর জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রস্তাবিত বিদ্যুৎকেন্দ্রটি রামপাল থেকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে সরকারকে পরামর্শও দিয়েছিল সংস্থাটি। এরপর দুই দফা প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল ইউনেসকোর সদর দপ্তর ফ্রান্সের প্যারিসে যান। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের কোনো ক্ষতি হবে না বলে আশ্বস্ত করা হয় ইউনেসকোকে। সর্বশেষ গত ২ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টার নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্রের ৪১তম বার্ষিক সাধারণ সভায় যোগ দেয়।

সভায় সিদ্ধান্ত হয়, সুন্দরবনের ভেতরে দফায় দফায় জাহাজডুবির ঘটনায় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা নিরূপণের জন্য একটি বিস্তারিত সমীক্ষা করে তা ইউনেসকোতে জমা দেবে সরকার। সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত করতেও ইউনেসকো থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। সরকার একটি সমীক্ষা করে জাহাজডুবির কারণে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে দ্রুত সে প্রতিবেদন ইউনেসকোতে জমা দেবে।

সভায় আরো সিদ্ধান্ত হয়, পশুর নদ নিয়ে একটি পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করতে হবে। কারণ পশুর নদ দিয়ে কয়লা আনা-নেওয়ার কথা রয়েছে। পশুর নদ খনন করলে পরিবেশের কী ক্ষয়ক্ষতি হবে তা নির্ণয়ের জন্য এই সমীক্ষা জরুরি। সরকারের পক্ষ থেকে এই প্রস্তাবও গ্রহণ করা হয়েছে। তাতে স্বাগত জানিয়েছে ইউনেসকো।-কালেরকন্ঠ