আকাশ মেঘে ঢাকাঃ

42

সাইফুল ইসলাম শিশিরঃ ঢাকা শহরে যানজট যেন প্রাত্যহিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। যা বিরক্তির উদ্রেক করে। পান্থপথের মাথায়- রাসেল স্কয়ারে প্রতিদিন জ্যামে পড়ে কতসময় যে বরবাদ হয় তার কোন ইয়ত্তা নেই।

সিগনালে গাড়ি দাঁড়ালেই ছোট ছোট মেয়েরা দৌড়ে এসে ফুল- ফুলের মালা কেনার জন্য কাকুতিমিনতি করে। “স্যার একটা ফুল ন্যান না।” না করলেও শোনে না। বার বার গ্লাসে টোকা দিতে থাকে। হাত দিয়ে মানা করি কিন্তু নাছোড়বান্দা। ড্রাইভার হাসমত বলে “স্যার গ্লাস তুলে দেই, এমনি চলে যাবে।”

সর্পিল বেগে দৌড়ায়- এগাড়ি থেকে অন্য গাড়িতে। পাল্লা দিয়ে চলে, দাঁড়াবার ফুরসত নেই। প্রতিটি মুহূর্তে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। তবু ওরা ছুটে- নিতান্তই পেটের দায়ে।

নয়-দশ বছরের একটি মেয়ে ফুল হাতে গাড়ির পাশে এসে দাঁড়ায়। গায়ের রঙটা মিশমিশে কালো। বড্ড অযত্নে বেড়ে ওঠা মাথা ভর্তি চুল। চুল নয়- যেন পাটের ফেঁসে হাওয়ায় উড়ছে। কতদিন যে ওমাথায় তেল সাবান পড়েনি তা কে জানে! ব্যতিক্রম তার মায়া ভরা রবি ঠাকুরের সেই ‘কালো হরিণ চোখ।’

ফুল কিনলাম। নামের কথা বলতেই সে লজ্জা পেল। মাথা নিচু করে বললো, এক ম্যাডাম তার নাম দিয়েছে ফুলকলি। সিগনাল ছেড়ে দিতেই হাসমত গাড়ি টান দিল। ফুলকলি গাড়ির সামনে দিয়ে এঁকেবেঁকে দৌড় দেয়। ট্রাফিক তাড়া দিলে সে মানুষের ভীড়ে হারিয়ে যায়।

মাঝখানে কদিন দেখা নেই ফুলকলির। হঠাৎ আজ গাড়ির সামনে এসে হাজির। চেহারার কোথায় যেন একটা পরিবর্তন – আলতো তুলির আঁচড় পড়েছে। সাদা নাকফুল, কানে গলায় রূপার দুল- ধানতাবিজ। তার চোখ তাকে আলাদা করে চেনায়।
এযেন অন্য এক ফুলকলি- আফ্রিকান সুন্দরী।

এক ম্যাডাম তার অনেকগুলি ছবি তুলেছে। পত্রিকায় ছাপাবে। পত্রিকায় ছবি ছাপলে কী হয়? ফুলকলি এসবের কিছুই বুঝেনা- শুধু হাসে। ম্যাডাম ফুলকলির বাপের জন্য জামা,লুঙ্গি এবং ছোট বোনের জন্য ফ্রক কিনে দিয়েছে। ফুলকলির বাবা এসব ভালো ভাবে নিচ্ছে না। “দেখ ফুলি তরে কয়া দিলাম ঐ মাইয়ালোকটা ডাকলে কোথায়ও যাবিনা না।” ফুলকলি মনে মনে ভাবে এটা তার বাপের মিছা সন্দেহ, মিছা ভয়।

নফেল মিয়া ফুলকলির বাপ। নব্বই এর দশকে ঘিওর থেকে নদি ভাঙ্গন ও উপর্যুপরি বন্যায় বাস্তুচ্যুত হয়ে ঢাকা শহরে আসে। সেই থেকে প্রথমে রিক্সা পরে সিএনজি’র ড্রাইভার হয়। বউ ছেলেমেয়ে নিয়ে ভালোই চলছিল নফেল মিয়ার সংসার।

‘১৪ সালে মারাত্মক এক সড়ক দুর্ঘটনায় নফেল মিয়া পঙ্গু হয়ে যায়। চিকিৎসা করতে গিয়ে একদম পথে বসে পড়ে। ধানমন্ডি লেকের পাড়ে ঝুপড়ি ঘরে এসে ঠাঁই নেয়। ফুলকলির মা রাস্তার পাশে চা- বিস্কুট এর দোকান দেয়। ছেলের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। সে মাকে সাহায্য করে।

নফেল মিয়াকে ডুব গোসল খাওয়া দাওয়া করানো, ঔষধ খাওয়ানো, বাজার ঘাট করা, দোকান চালানো, এক হাতে এতসব করতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছে ফুলকলির মা। নফেল মিয়া কিছু বলতেই “আমি আর মরা টানতে পারবো না। ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে যেদিক চোখ যায় চলে যাবো।”

এক রিক্সাওয়ালা কারণেঅকারণে ঝুপড়ি চালির পাশ দিয়ে ঘোরাঘুরি করে, বসে থাকে, বিড়ি টানে। ফুলকলির মার সাথে আড়ালে আবডালে কথা কয়। নফেল মিয়া কিছু জিজ্ঞেস করলে একথা সেকথা বলে পাশ কাটিয়ে যায়।

একদিন কাকডাকা ভোরে ফুলকলির মা ঘর থেকে বেরিয়ে যায়- আর ফিরেনি। বড়ছেলেটা এক হোটেলে বয়ের কাজ করে। আগে মাঝেমধ্যে আসতো,খবর নিতো। বেশকিছু দিন থেকে সেও আর আসেনা।

নফেল মিয়া ফুলকলিকে নিয়ে রাস্তার পাশে বসে। পথচারীরা দুচার টাকা দেয় তাই দিয়ে খেয়ে না খেয়ে কোন মত দিন পার করে। ফুলকলি এখন বড় হয়েছে- বুঝতে শিখেছে। রাস্তায় বসে হাত পাততে তার ভালো লাগেনা। আশেপাশে মেয়েরা পার্কে, ট্রাফিক মোড়ে ফুল- মালা বিক্রি করে। ফুলিও ওদের সাথে হাত লাগায়।

সারাবেলা দৌড়ে বেড়ায় ফুল মালা বিক্রি করে। বিকেল হলে লাকড়ির চুলায় বাপ-বেটি মিলে রান্না করে। দু’মুঠো ভাত- কোন মতো মাথা গুজে থাকা। ব্যস! ফুলিদের জন্য মন্দ কী?

করোনা এসে সব লণ্ডভণ্ড করে দেয়। লকডাউন, গাড়ি ঘোড়া বন্ধ। ফুলকলির ফুল বিক্রি বন্ধ। কী করে বেঁচে থাকবে নফেল মিয়া, তার মাথাতেই আসেনা। ক’দিন আগে ম্যাডাম এসে চাল-ডাল বাজার করে দিয়ে গেছে। কমিশনারের লোকরা এসে নাম লিখে নিয়ে গেছে। ফুলি বাবাকে সাহস দেয়, একটা ব্যবস্থা হবেই।

ক’দিন থেকেই নফেল মিয়ার জ্বর কাশি গলা ব্যাথা ছিল। ফুলকলি জ্বরের বড়ি এনে খাওয়াইছে। কাজ হয়নি। ফুলকলি সারা রাত বাবার পাশে বসে অসহায়ের মত কেঁদেছে। আজ ভোরে ফুলকলির বাবা নফেল মিয়া মারা গেলেন।

ফুলকলি বুঝতে পারছে তার মাথার উপর থেকে আকাশটা যেন সরে গেছে।-লেখক: একজন সমাজকর্মী।
২৬ জুন, ২০২০ খ্রিঃ
লেক সার্কাস, ঢাকা