আংকেল হোচিমিন কাহিনী :

34

সাইফুল ইসলাম শিশিরঃ ‘৮৩ সালের ঘটনা। সামরিক স্বৈরাচার লেজেহোমো এরশাদ তখন রাষ্ট্র ক্ষমতায়। মধ্য ফেব্রুয়ারি সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে সামরিক আইন ভঙ্গ করে মিছিল বের করে। সে এক অভূতপূর্ব ছাত্র-গণ অভ্যুত্থান। স্বৈরাচার এরশাদ কর্তৃক অবৈধ ক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে সেটা ছিল প্রথম ‘হনুমানথাবা’। এক কঠিন চপেটাঘাত।

বিদ্যুৎ বেগে সে খবর ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। গর্জে ওঠে বাংলার ছাত্রসমাজ। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সামরিক আইন ভঙ্গ করে দলেদলে মিছিল বের করে। স্বৈরাচারের হৃৎপিণ্ডে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। সেই উত্তাল হাওয়া এসে লাগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে।

ততদিনে বগুড়ার সামরিক আদালতে রাবি’র ১৭ জন ছাত্রনেতার নামে মিথ্যা মামলার বিচার কাজ শুরু হয়েছে। অপর দিকে সামরিক শাসন বিরোধী ছাত্র আন্দোলন তখন ধীরে ধীরে বেগবান হচ্ছে। উত্তাপ ছড়াচ্ছে।

ছাত্রনেতাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলার রায় ছাত্রসমাজ মানবেনা। দেয়ালে দেয়ালে – পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে গেছে ক্যাম্পাস। “সামরিক আইন মানিনা – সামরিক আদালত মানিনা। ছাত্রনেতাদের মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার কর- করতে হবে।” এব্যাপারে সবাই একাট্টা।

কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ বিবৃতির মাধ্যমে রাবি’র চলমান আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেন। তাঁরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবেন। প্রতিবাদসভা করবেন। যুদ্ধযাত্রার ডঙ্কা যেন বেজে ওঠে। রায়ের আগে বড় ধরণের একটি শো-ডাউন করে সামরিক জান্তাকে একটি মেসেজ পৌঁছে দিতে চায় সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ।

দিনক্ষণ ঠিক হলো। আমতলায় ছাত্র সভা হবে। সকল প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। আগের দিন কানে এলো কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে ছাত্রসভায় কোন সংগঠন সভাপতিত্ব করবে তা নিয়ে মতদ্বৈততা দেখা দিতে পারে।

সন্ধ্যায় হাবিবুর রহমান হলে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের সভা ডাকা হলো। সভাপতিত্ব করার প্রশ্নে রাকসুর এজিএস জাতীয় ছাত্রলীগের নেতা আবুল কালাম আজাদ তখন প্রস্তাব করে বসে “বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রী বড় সংগঠন, তারা সবসময় মিটিং- এ সভাপতিত্ব করে থাকেন। এবার জাতীয় ছাত্রলীগ সভায় সভাপতিত্ব করতে চায়। বিষয়টা বিবেচনা করবেন।” এ প্রশ্নে ছাড় দেওয়াটা কঠিন। ছাত্রমৈত্রীর কর্মী- সমর্থকদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে। বিষয়টা নিয়ে সবাইকে ভাবতে বলি। আলোচনা করে কিছুতেই সমাধানে আসা যাচ্ছেনা। ১ ঘন্টার জন্য মিটিং মুলতবি করা হয়।

পরিস্থিতি পরিবেশ দেখে আঁচ করতে পারলাম অপর পক্ষ গাঁটছড়া বেঁধে এসেছেন। ছাড় দেবে না। বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের নেতা নুর আহমেদ বকুল আমাকে বলল “ভোটে দিয়ে দেন।” সেক্ষেত্রে সমান সমান হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। প্রধান গ্রুপ ছাত্রলীগের নেতা শাহজাহান সরকার থাকলে সমস্যা হত না। কিন্তু সে আজ ক্যাম্পাসে নেই। হঠাৎ সেসময় ব্রেইনে ক্লিক করল। ইউরেকা! পেয়েছি- পেয়েছি।

মিটিং শুরু হলে সিদ্ধান্ত হলো বিষয়টি ভোটে যাবে। এমন সময় ইকবাল প্রধান নামে এক ছেলে এসে বলল আমি প্রধান গ্রুপ ছাত্রলীগ করি। শাহজাহান ভাই বিশেষ কাজে শহরে গেছেন। আমাকে মিটিং এ থাকতে বলেছেন। সে এসে আমার পিছনে বসলো। ভোট হল গোপন ব্যালটে। এক সংগঠন এক ভোট। ছাত্রমৈত্রীর পক্ষে ৬, জাতীয় ছাত্রলীগের পক্ষে ৫ ভোট। শেষ রক্ষা হলো সেদিনের মত।

ইকবাল প্রধান। পঞ্চগড়ের ছেলে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে এসেছে। একদম ছোটখাট চেহারা। ফিটফাট- সদাহাস্য যেন পৌষের রোদমাখা সূর্য। এর আগে সে কখনো রাজশাহীতে আসেনি। এখানে তার চেনাজানা তেমন কেউ নেই। রাতে স্টেশনে রফিকের হোটেলে খেতে গিয়ে তার সাথে পরিচয়। ভর্তির সুবাদে সে আমার হলে- রাকসু ভবনে, জয়নালের ক্যান্টিনে প্রায়ই আসতো।

একদিন হঠাৎ করে সকলের মাঝে অদ্ভুত এক প্রশ্ন করে বসলো সে। “মিছিলতো প্রায় দিনই হয়। আমতলা মিটিং হবে কবে?” তার এই ইনোসেন্ট প্রশ্ন শুনে উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কেন?
“আপনার বক্তৃতা শোনার আমার খুব সখ।”

ইকবাল প্রধান তখন মিছিল মিটিং এ নিয়মিত এক চেনা মুখ। একদিন সে আমার হলে আসে। অভিমান করে বলে “নেতা ইচ্ছা ছিল, আপনার সাথে- আপনার দল করবো। আর আপনি কিনা আমাকে ঠেলে দিলেন প্রধান গ্রুপে। বলেন নেতা এইটা কি হয়?”

ইকবাল তুমি TL বোঝো? ট্যাকটিক্যাল লাইন। রাজনীতির কারণে- ট্যাকটিক্যাল লাইনে তোমাকে ওখানে রাখা হয়েছে। স্মর্তব্য: TL কথাটা প্রথম চালু করেন তৎকালীন ডাকসুর ভিপি সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা জনাব আখতারুজ্জামান। মিটিং-এ কোন বিষয়ে একমত হওয়া না গেলে সতীর্থদের বলতেন, “হবে হবে চিন্তা করোনা। একটু TL করে আগাতে হবে।”

ছুটি থেকে ক্যাম্পাসে আসার পর ইকবাল প্রধানের চেহারায় কোথায় যেন একটু পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম।
ইকবাল ব্যাপারটা কী?
লিডার, নেতা বানিয়ে দিলেন। চেহারায় একটু ভারিক্কি আনতে হবেনা? তাই দাড়ি রেখেছি।

ইকবালের থুতনিতে সর্বসাকুল্যে দাড়ি হবে গণ্ডা পাঁচ- ছয়েক। তাতেই তার চেহারায় একটা স্বাতন্ত্র্য ভাব ফুটে উঠেছে। যেন আংকেল হোচিমিন। এরপর থেকে তাকে আমি আংকেল বলে ডাকতাম। ইকবাল শুধু হাসতো- খুব এনজয় করতো।

এক সময় শাহজাহান সরকার ক্যাম্পাসে অনিমিত হয়ে পড়ে। শোনা যায় সে রাজনীতির দর্শন পরিবর্তন করে সর্বহারা পার্টিতে যোগ দিয়েছে। রাবি’তে ইকবাল প্রধান তখন প্রধান গ্রুপ ছাত্রলীগের প্রধান নেতা। সংগত কারণেই জাপার শফিউল আলম প্রধান, আব্দুল জলিল প্রধান প্রমুখের সাথে তার পরিচয় ঘটে।

তারপর আর দেখা হয়নি বহুদিন। ঢাকাতে কথা প্রসঙ্গে এক সুহৃদ জানালেন ইকবাল প্রধান এখন মীরপুরে একটি বেসরকারি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রিন্সিপাল। জাগপার কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। ২০ দলীয় জোটে সে শফিউল আলম প্রধানকে রিপ্রেজেন্ট করে।

দীর্ঘ চল্লিশ বছর পর হাবিবুর রহমান হলের, সেদিনের সেই ঘটনা সেলুলয়েড’র পর্দার মতো ভেসে উঠল। রাজনীতির এক TL কাহিনী। যা আমার চোখে আজও দেদীপ্যমান।-লেখকঃ একজন সমাজকর্ম।
৬ আগস্ট, ২০২০ খ্রি.
লেক সার্কাস, ঢাকা