অশান্ত মনে সেই প্রশান্তের পাড়ে! ক্লান্ত মন চায় যেতে বারে বারে!!

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ
খুব ভোরের টোকিওর সকাল। সুবেহ সাদিকের আলো তখনো শেষ হয়ে যায়নি। পাশের রাস্তায় গাড়ীর আনাগোনা বেড়ে গেছে। নিত্যদিনের মত ফজর নামাজ শেষে অনলাইনে বেশ কয়েকটি পত্রিকায় চোখ বুলিয়ে নাস্তা সেরে নিয়েছি। আজকে আর পড়াশুনা কিংবা লেখালেখি করা হবে না; এমনকি রোজকার মত এসব শেষে আবার একটু ঘুমিয়েও নেবো না। আটটা বাজলেই বেরুবো। হাসপাতালে ডাক্তারের এপয়েনমেন্ট নেয়া আছে। হাঁটুর ব্যাথাটা দিন দিন বাড়ছে। ডাক্তার না দেখালেই নয়।
গিওতকু জেনারেল হাসপাতাল; টোকিওর সীমানা ঘেষা ইচিকাওয়া শহরে সদ্য নতুনভাবে নতুন জায়গায় নতুন ভবনে চালু হয়েছে। তবে আর দশটার মতই সাধারন মানের হাসপাতাল; তেমন নাম ডাক নেই। জাপানের বিখ্যাত হাসপাতালের তালিকায় এর নাম নেই। প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে স্থানান্তরিত এ হাসপাতালে আগে কখনো যাওয়া হয়নি; পূরানোটায় যেতাম। নতুন জায়গাটি একটু দূর হওয়াতে ভাবছিলাম কিভাবে যাবো। পুলিশ বক্সে জিজ্ঞেস করলাম। ওরা জানালো পূরানো হাসপাতালের সামনে শাটল বাস আছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিশ মিনিট অন্তর ফ্রি বাস দিয়েছে যেন পূরানো এলাকার রোগীরা সহজেই নতুন হাসপাতালে বিনা ঝামেলায় আসাযাওয়া করতে পারে।
আমি ঠিক সাড়ে আটটায় গিয়ে পৌঁছালাম। নতুন হাসপাতাল তো নয়, যেন একটি পাঁচ তারকা মানের হোটেল। ছিমছাম নিরবতায় ছেয়ে আছে পূরো পরিবেশ। অভ্যর্থনায় হাসিমুখে দাঁড়িয়ে দুটি ফুটফুটে মেয়ে। যেন আমারই অপেক্ষায় সেই সকাল থেকে তারা অপেক্ষমান। তথ্য কাউন্টারে হাসপাতাল থেকে দেয়া পেশেন্ট কার্ড জমা দিয়ে বসে আছি সামনের সোফায়। কাউন্টারের মেয়েদের দৌঁড়ঝাঁপ শুরু হয়ে গেল। একটু পর পর এটা সেটা ফরম এনে আমাকে জিজ্ঞেস করে করে পূরণ করে নিল। আমাকে আর কাউন্টারে যেতে হয়নি। উল্টো আমার কাছে বারবার ওরাই আসলো। এসে আমার প্রধান সমস্যাটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জেনে নোট নিল। এর বাইরেও আর কিছু আছে কি না, বসতে অসুবিধে হচ্ছে কি না, ইত্যাদি আরো কত কী! সবশেষে একটি নাম্বার টিপ দিয়ে পাঠিয়ে দিল বহির্বিভাগের অর্থোপেডিকস্ কাউন্টারে। জাপানে হাসপাতালের বহির্বিভাগ চালু হয় ঠিক নটায়; আর শেষ হয় বিকেল চারটায়। এরপর ডাক্তারগন আর রোগী দেখেন না। সাপ্তাহিক ছুটির দুদিন হাসপাতাল বন্ধ থাকে; বন্ধ থাকে ডাক্তারের চেম্বারও। কোন হাসপাতালে ইমারজেন্সি বিভাগ নেই; তবে আলাদা করে ইমারজেন্সি হাসপাতাল আছে। এই ইমারজেন্সি হাসপাতালগুলোই ২৪ ঘন্টা চালু থাকে। তবে কোন হাসপাতালেই এ্যাম্বুলেন্স নেই। এ্যাম্বুলেন্স আছে ফায়ার সার্ভিস বিভাগের। একেকটি এ্যাম্বুলেন্স মানেই এক একটি ইমারজেন্সি বিভাগ। ডাক্তার, নার্স এবং লাইফ সাপোর্ট মেশিনে সুসজ্জিত ফায়ার সার্ভিসের একেকটি এ্যাম্বুলেন্স কল পেলেই বাসায় ছুটে আসে। এ্যাম্বুলেন্সে বসেই ইমারজেন্সি ডাক্তার রুগীকে কোন্ হাসপাতালে রেফার করবেন সেটা ঠিক করেন এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পৌঁছে দেন।
বহির্বিভাগের আর্থোপেডিকস্ কর্ণারে ডাক্তার ইয়ামামতোর চেম্বারে আমার ডাক পড়লো। বয়সে তরুন, ব্যক্তিত্বে মধ্যবয়সী, আত্মবিশ্বাসে প্রবীন এই ডাক্তার আমার ফাইল ভাল করে স্টাডি করে নিয়েছেন আমি রুমে ঢোকার আগেই। এরপরও আমার কাছে সবকিছু আবার জানতে চাইলেন, ফিজিক্যালি দেখলেন এবং কী যেন একটু ভেবে বললেন একটি এক্সরে করে দেখবেন। পাশাপাশি সামনের কম্পিউটার মনিটরে নোট লিখে দিলেন এক্সরে করার।
আর্থোপেডিকস্ কাউন্টারের নার্স মেয়েটি আমাকে দোতলার এক্সরে ইউনিট দেখিয়ে দিল। ওরা আগেভাগেই নেটে পাঠানো নোটে জেনে গেছে আমি আসছি; কম্পিউটারে আমার ফাইল খুলে বসে আছে। আমি কেবল যেয়ে এক্সরে করে খালি হাতে বেরিয়ে এসে আবার কাউন্টারে জানালাম। মেয়েটি আমাকে আবারো ডাক্তারের রুমের সামনে অপেক্ষা করার কথা বলে পাঠিয়ে দিল। ভাবলাম বসেই তো থাকতে হবে; ফাকে টয়লেট ঘুরে আসি।টয়লেট তো নয় যেন ডাইনিং রুম। পরিষ্কার টিপটপ এবং ঝকঝকে টয়লেট। কোন কিছু হাত দিয়ে ধরার দরকার নেই। দেখলেই টয়লেট করতে ইচ্ছে করবে সবার। আমিও চেষ্টা করলাম টয়লেট করতে। আসলো না। মানুষের জীবনে মাঝে মাঝে এমন হয়। কঠিন চাপ আসলেও টয়লেট খুঁজে পায় না। আবার ভাল টয়লেট পেলেও চাপ আসে না। জীবনটা আসলেই অদ্ভুত।
অগত্যা অর্থোপেডিকস্ কর্ণারে ফিরে এলাম। বেশীক্ষন লাগেনি; তাড়াতাড়িই ডাক পড়লো ভেতর থেকে। ততক্ষনে নেটে পাওয়া কম্পিউটারে প্রস্তুত আমার এক্সরে ইমেজ ডঃ ইমামতোর হাতে। মনিটরে এক্সরের ইমেজ দেখে দেখে ডাক্তার আমাকে বিস্তারিত বুঝিয়ে বললেন। প্রেসক্রিপশন আমাকে দিলেন না; যা লিখার সব কম্পিউটারেই লিখলেন। কোন ঔষধ কেন দিচ্ছেন সেটা সময় নিয়ে বুঝিয়ে বললেন। এবং ঔষধের কার্য্যকারীতা ব্যাখ্যা দিলেন; সাথে আরো কিছু টিপস্ দিয়ে গুডলাক বলে বিদায় দিলেন। অর্থোপেডিকস্ কাউন্টার থেকে মেয়েটি একটি বারকোড সিস্টেমের পেস্লিপ দিয়ে বললো, তোমার কাজ শেষ। আটোমেশিনে পেমেন্ট পরিশোধ করে আরো একটি নতুন নাম্বার পাবে। ওটা নিয়ে মেডিসিন কর্ণারে গেলেই ঔষধ পেয়ে যাবে।
বিল পরিশোধের জন্য লাইন ধরে গোটা দশেক অটোমেশিন বসানো। পে স্লিপ খানি মেশিনের সামনে ধরতেই মনিটরে জানান দিল আমার বিল কত হয়েছে। টাকা মেশিনে দিতেই মূহুর্তেই নতুন নাম্বারসহ পেইড বেরিয়ে এল; সেখানে বিস্তারিত লেখা কী কাজে কোথায় কত বিল হয়েছে। এক নিমিষেই ঝামেলা শেষ। হাতে এই একটি নাম্বার ছাড়া আর কিছুই নেই; এমনকি প্রেসক্রিপশনটিও কেউ দেয়নি আমায়। কী আর করা! সামনে বামে তাকিয়ে মেডিসিন কর্ণার মানে ফার্মেসী খুঁজে নিলাম।
ফার্মেসী তো নয় যেন এক অদেখা ভুবন; ঢুকতেই চোখে পড়লো আমার নাম্বার বড় স্ক্রিনে ডিসপে− হচ্ছে। মানে আমার ঔষধ প্রস্তুত হয়ে আছে; কাউন্টারে এসে যেন বুঝে নেই। স্লিপখানা জমা দিলাম। পরক্ষনেই সামনে এসে বসলেন একজন ফার্মাসিস্ট। তিনি কম্পিউটারে আমার ফাইল দেখে দেখে শুরু করলেন আবার প্রথম থেকে। আমার সমস্যা কি, কেমন করে হল, এলার্জি আছে কিনা, বড় অন্য কোন রোগ আছে কিনা, আরও কত কি! অর্থাৎ তিনি ঝালিয়ে নিলেন ডাক্তার যা প্রেস্ক্রাইপ করেছেন তা ঠিক আছে কিনা। সব শুনে তিনি যখন নিশ্চিত হলেন কেবল তখনই আমাকে ঔষধগুলো বুঝিয়ে দিলেন। কোন ঔষধে কি ফাংশন সেটা বললেন। কিভাবে খাব, খাওয়ার আগে না পরে, সেটাও বললেন। লক্ষ্য করলাম ঔষধ ভর্তি প্যাকেটের গায়ে ডাক্তার প্রদত্ত প্রেসক্রিপশনটিও ছাপানো আছে।
কোন ডাক্তারের নাম ওখানে নেই। চিকিৎসায় সুনাম হলে হাসপাতালের; বদনাম হলেও হাসপাতালেরই। মানুষ হাসপাতালকেই চিনবে, ডাক্তারকে নয়। ঠিক বাংলাদেশে উল্টো। সব জায়গায় বাংলাদেশের উল্টো দেখতে দেখতে মাথাটাই আমার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কোন মতে মাথা ঠিক রেখে রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসলাম। লাঞ্চ সারলাম রাজকীয় আতিথেয়তা আর ভি.আই.পি সম্মানে অসম্ভব সুন্দর অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন এবং অবিশ্ব্যাস্য পরিপাটি হাসপাতাল ক্যাফেটেরিয়াতে। বলা বাহুল্য, এদেশের সবচেয়ে হাইজেনিক খাবারের পরিবেশ হাসপাতাল ক্যাফেটেরিয়াতেই থাকে। এখানে ভাইরাস বেশি; তাই সাবধানতাও বেশি।
ওদের এমন মনমুগ্ধকর আতিথেয়তা, যত্ব আত্মিক দেখে হাসপাতাল ছেড়ে আসতে ইচ্ছে করছিলনা। জুমার নামাজের তাড়া থাকায় আর দেরি করিনি। সাঁটল বাসে করে ফিরছিলাম। এখানেও খুব যত্ব করে মেয়েটি প্রতিটি রোগীকে সিটে বসিয়ে নিজে চালকের আসনে বসে যাত্রা শুরু করল। ফেরার পথে ভাবছিলাম কেবল দেশ হিসাবেই জাপান বিশ্বে উন্নত নয়; জাতি হিসাবেও অনেক বেশি উন্নত।
খুব করে মনে পড়ছিল দেশের কথা; দেশের হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার কথা। বাংলাদেশে দুটো জায়গায় একবার গেলে কেউই আর দ্বিতীয় বার যেতে চায় না; একটি জেলখানা অপরটি হাসপাতাল। জাপানের হাসপাতালে মানুষ বার বার যেতে চাইবে! -লেখকঃ উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা