অর্থাভাবে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বামনেতা সরোজ বিশ্বাস

174

রেজাউল করিমঃ অর্থের অভাবে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর দিন গুনছে আন্দোলন-সংগ্রামের লড়াকু যোদ্ধা ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার হরদেবপুর গ্রামের বামনেতা কমরেড সরোজ বিশ্বাস।লিভার,কিডনি,ডায়াবেটিস ও হাইপ্রেসার রোগে আক্রান্ত হয়ে বিনা চিকিৎসায় তিনি মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছেন। টাকার অভাবে চিকিৎসার আশা একেবারে ছেড়েই দিয়েছেন।আজ প্রায় দু’বছর ধরে তিনি নিজ বাড়িতে বিছানায় শয্যশায়ী। শুধু হাইপ্রেসার ছাড়া অন্য কোনো রোগের ঔষধ কিনে খাওয়ার ক্ষমতা তার নেই। এখন আর রাজনীতির কোনো খোঁজও রাখতে পারেন না। অসুস্হতার প্রথম দিকে দেশে কয়েকবার ও ভারতে একবার বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখালেও ডাক্তারের পরামর্শমতো ফলোআপ চিকিৎসা তো দূরে থাক সে সময়ের ব্যাবস্হাপত্র অনুযায়ী ঔষধই ঠিকমতো কিনে খেতে পারেন নি। এ প্রতিবেদককে তিনি বলেন, এসব রোগের চিকিৎসা খুবই ব্যয়বহুল, কয়েক লাখ টাকার দরকার। যে ক্ষমতা আমার বা আমার পরিবারের নেই। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, দেশের অনেক লোকই তো অর্থাভাবে বিনা চিকিৎসায় মারা যায়। আমিও একই পথের যাত্রী। জীবন-যৌবন ব্যয় করেছি গরীব শ্রমজীবী মানুষের শোষণ মুক্তির সংগ্রামে। এখন চিকিৎসার টাকা পাবো কোথায়? সরোজ বিশ্বাসের দুই পুত্র, বিঘেখানেক চাষযোগ্য জমি আছে। বড় ছেলে শারিরীক প্রতিবন্ধি। কোনো কাজ করতে পারেন না। ছোট ছেলে কখনো নিজেদের জমিতে কখনো পরের জমিতে কামলার কাজ করেন। দু’ছেলেরই স্ত্রী-সন্তান রয়েছে। এমনিতেই তাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্হা। পিতার চিকিৎসা করানোর ক্ষমতা তাদের নেই। সরোজ বিশ্বাসও চান না সন্তানরা ধ্বংস হয়ে তার চিকিৎসা করাক। এরপর সরোজ বিশ্বাসের প্রায় শতবর্ষী মাতাও জীবিত। তার পিছনেও টুকটাক ঔষধ লাগে। ছেলের দুরবস্হার জন্য প্রায়ই চোখের পানি ফেলেন শতবর্ষি মা।
১৯৫০ সালের ৮ মে কালিগঞ্জ উপজেলার হরদেবপুর গ্রামে জন্মগ্রহন করেন কমরেড সরোজ বিশ্বাস। পিতার নাম মৃত শশাঙ্ক বিশ্বাস। পিতা ছিলেন একজন কৃষক। সংসারিক অবস্হাও ভাল ছিল। কিন্ত ছেলে রাজনিতীতে জড়িয়ে ও জেল -হাজতে গিয়ে ছেলের কথামতো ৩/৪ বিঘা জমি বিক্রি করে খরচ করেন। এ টাকা দিয়ে সরোজ বিশ্বাস অনেক অসহায় কমরেডকে চিকিৎসা করিয়েছেন, রাজনৈতিক কারণে বাড়িছাড়া অনেক কমরেডকে নিজ বাড়ীতে রেখে মাসের পর মাস খাইয়েছেনও।

১৯৬৮ সালে অবিভক্ত ছাত্র ইউনিয়নের মাধ্যমে সরোজ বিশ্বাাস রাজনীতিতে হাতে খড়ি নেন। ১৯৭৩/৭৪ সালে পূর্বপাকিস্তানের কমিউনিষ্ট পার্টি সদস্য হিসেবে আত্মগোপনের রাজনীতিতে যান। ১৯৭৭ সালে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন এবং ১৯৮০ সালে জেলমুক্তির মাধ্যমে পুনরায় প্রকাশ্য রাজনীতিতে আসেন। পরবর্তিতে বিপ্লবী কমিউনিষ্ট পার্টি ( মুনির) গ্রুপে যোগদান করেন। তিনি কৃষক আন্দোলনেও অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। অসুস্হ হবার আগ পর্যন্ত তিনি কমরেড টিপু বিশ্বাসের নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সদস্য ছিলেন। এ ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে তিনি দলের জেলা-উপজেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি কালীগঞ্জের সামনের সারিতে থেকে যেসব আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন তারমধ্যে রয়েছে অযৌক্তিক হাট খাঁজনা বিরোধী আন্দোলন, ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলন, পানচাষী ও আখচাষী আন্দোলন প্রভৃতি। এসব আন্দোলনে ব্যাপক লোক সমাগম ও দাবী আদায় হতো। তার সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টকারী আন্দোলন ছিল ১৯৮৭ সালে একটি ধর্ষনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে গণনির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি গঠনের মাধ্যমে জাতীয় পার্টির মাস্তান বিরোধী আন্দোলন। সে আন্দোলন দেশে- বিদেশে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। ওয়ার্কার্স পার্টি ও কৃষক সংগ্রাম সমিতির সাথে যৌথভাবে যৌথ নেতৃত্বে তিনি এ আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন তখন। এ আন্দোলনে হাজর হাজার লোক সমবেত হতে থাকে। এক পর্যায়ে তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারের এমপি আন্দোলন কারীদের সাথে বৈঠকে বসতে বাধ্য হন। জাতীয় পার্টির মাস্তানরা এলাকা ছেড়ে পালায়। ধর্ষনের আসামীরা পুলিশের হাতে ধরা দিতে বাধ্য হয়। সে ধর্ষনের আসামীরা ছিল তৎকালীন এমপির নিজ গ্রামের। পুলিশ প্রথম দিকে তাদেরকে গ্রেপ্তারে অনিহা দেখায়।

সরোজ বিশ্বাস বাংলাদেশ পানচাষী সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সাধারন সম্পাদক। রাজনীতি করতে গিয়ে রাজনীতির পিছনে জীবন-যৌবনসহ ৪/৫ বিঘা জমি বিক্রির টাকা ঢাললেও তার খোঁজ-খবর কেন্দ্রীয় নেতাদের কেউ আর এখন রাখেন না। তিনি অসুস্হ হবার পর এখন কেন্দ্রীয় কমিটিতে তার নাম আছে কিনা তাও বলতে পারেন না। মাঝে মধ্যে এলাকার দু’একজন শিষ্য ছাড়া কেউ আর তার খোঁজ নেন না।সবার বিশ্বাস উপযুক্ত চিকিৎসা পেলে তিনি সুস্হ হয়ে আবারো রাজনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারতেন।