অবরুদ্ধ বঙ্গবন্ধু ও সংশপ্তক জাসদ: পর্ব ৮

228

জিয়াউল হক মুক্তা:

[জিয়াউল হক মুক্তা জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক। এ রচনায় সপরিবারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পারিবারিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক-আর্থরাজনীতিক-অন্তঃদলীয়-আন্তঃদলীয়-প্রশাসনিক-গোয়েন্দা-আধাসামরিক-সামরিক-ভূরাজনীতিক প্রেক্ষাপট আলোচনা করা হয়েছে। এখানে বঙ্গবন্ধুর নিজের ভাষ্যের সাথে যোগ করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু-হত্যা বিচার-আদালতের বিচারকের পর্যবেক্ষণ ও কিছু সাক্ষ্যভাষ্য এবং বঙ্গবন্ধুতনয়া জননেত্রি প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনার ও তাঁর পরিজনদের কিছু বক্তব্য; এবং বর্তমান লেখকের গবেষণালব্ধ কিছু পর্যবেক্ষণ। সবশেষে প্রধানমন্ত্রির সদয় বিবেচনা ও সকলের আলোচনার জন্য যোগ করা হয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু হত্যা সত্যানুসন্ধান কমিশন’ বিষয়ক কিছু বিষয়গত ও কাঠামোগত প্রস্তাবনা। পাঠকদের সুবিধা বিবেচনায় লেখাটি ১৬ কিস্তিতে প্রকাশিত হচ্ছে; আজ প্রকাশিত হচ্ছে অষ্টম পর্ব।]

[গতকালের পর]
এ ছাড়াও মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানী রাষ্ট্রপতি মোশতাকের প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা হয়েছিলেন মন্ত্রির পদমর্যাদায়।

মোশতাক সরকারের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের পথ উন্মুক্ত করে দেন সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী পররাষ্ট্রমন্ত্রি হয়ে ও মহিউদ্দীন আহমদ বিশেষ দূত হয়ে। বঙ্গভবনের এই বিশেষ দূত বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার মাত্র এক সপ্তাহ আগে ৮ আগস্ট দেশে ফিরে মন্ত্রি হিসেবে শপথ নেন।

বঙ্গবন্ধু সরকারের আরেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদউল্লাহর স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে প্রবর্তন হয়েছিল বাকশাল। বাকশালের অধীনে বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি হলে মোহাম্মদউল্লাহ মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে শপথ নেন। ১৫ আগস্টের পর মোশতাকের উপ-রাষ্ট্রপতি হন এ মোহাম্মদউল্লাহ। পরে বিএনপিতে যোগ দেন তিনি। জিয়াউর রহমান হত্যার পর বিচারপতি আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি হলে উপ-রাষ্ট্রপতি করা হয় মোহাম্মদউল্লাহকে। কিন্তু শপথের দুই দিনের মধ্যে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তৎকালীন সেনাপ্রধান এইচএম এরশাদ ক্ষমতা দখল করলে তার পতন ঘটে।

মোশতাক সামরিক শাসন কায়েম করলেও জাতীয় সংসদ বহাল রেখেছিলেন। স্পিকার ছিলেন আবদুল মালেক উকিল। স্পিকার হওয়ার আগে ছিলেন বঙ্গবন্ধু সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রি। তিনি স্পিকার হিসেবে বিদেশে স্পিকারদের একটি সম্মেলনেও যোগ দেন।

মোশতাকের পতনের পর ফণিভূষণ মজুমদার, আবদুল মান্নান, আবদুল মোমিন, সোহরাব হোসেন, অধ্যাপক ইউসুফ আলী, আবদুল মালেক উকিল ও আসাদুজ্জামান খান আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। মালেক উকিল আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন শেখ হাসিনা নেতৃত্বে আসার আগ পর্যন্ত। অধ্যাপক ইউসুফ আলী মোশতাকের পরিকল্পনামন্ত্রি ছিলেন। পরে তিনি আওয়ামী লীগের (মিজান) সাধারণ সম্পাদক হন। পরে যোগ দেন জিয়ার মন্ত্রিসভায়। জিয়ার মৃত্যুর পর এরশাদেরও মন্ত্রি হন তিনি।

মোশতাকের মন্ত্রিদের মধ্যে কেউ বেঁচে না থাকলেও বেঁচে আছেন প্রতিমন্ত্রি অনেকে। মোশতাকের ডেমোক্রেটিক লীগ থেকে এরশাদের উপ-প্রধানমন্ত্রী হয়ে আসা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন এখন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান। নূরুল ইসলাম মঞ্জুরও বিএনপিতে আছেন।

আবু সাঈদ চৌধুরী আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফিরে না এলেও মহিউদ্দীন আহমদ ফিরে আসেন। ১৯৮৩ সালের ৮ আগস্ট তিনি বহিষ্কার হলে বাকশাল গঠন করে তার চেয়ারম্যান হন। ১৯৯৩ সালে বাকশাল আওয়ামী লীগে অন্তর্ভুক্ত হলে তাকে প্রেসিডিয়াম সদস্য করা হয়। বেঁচে নেই তিনিও। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হলেও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে পরাজিত হন। আবদুল মান্নান ও আবদুল মোমিনও বেঁচে নেই। ২০০২ সাল পর্যন্ত দুজনই আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন। খন্দকার আসাদুজ্জামান আওয়ামী লীগে সক্রিয় ছিলেন। বেঁচে নেই বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীও। তার পুত্র শেখ হাসিনার প্রথম মেয়াদের মন্ত্রিসভায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রি ও আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হলেও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে বহিষ্কৃত হন।

মোশতাক মন্ত্রিসভার সদস্য দেওয়ান ফরিদ গাজী আওয়ামী লীগের এমপি ও উপদেষ্টা পরিষদেরও সদস্য তিনি। ১৯৯৬ সালেও এমপি ছিলেন। সৈয়দ আলতাফ হোসেন বাকশাল প্রবর্তনের পর ন্যাপ মোজাফফরের কোটায় প্রতিমন্ত্রি হন। পরে মোশতাকের প্রতিমন্ত্রি। মোশতাকের পতনের পর আবার ন্যাপের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। মোমিনউদ্দিন আহমদ বঙ্গবন্ধু-মন্ত্রিসভায় না থাকলেও মোশতাক তাকে প্রতিমন্ত্রি করেন। পরে তিনি বিএনপি হয়ে জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। রিয়াজউদ্দিন আহমদ ভোলা মিয়াও বিএনপি হয়ে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে মন্ত্রি হন। ডা. ক্ষিতিশ চন্দ্র মণ্ডলও জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে মন্ত্রি হন।

মোশতাকের প্রতিমন্ত্রি নূরুল ইসলাম চৌধুরী ছিলেন বঙ্গবন্ধু সরকারের প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রি। তিনি সামরিক বাহিনীর সমর্থন আদায়ে বিশেষ ভূমিকা রাখেন।

আজকাল অনেকে বঙ্গবন্ধু-হত্যাকাণ্ডের সাথে জাসদ বা অন্য কোন দলের সংযোগ নিয়ে গলা বড় করে লেকচার কপচাতে দেখা যায়। এদের ভাবটা এমন যে মনে হয় এরা শেখ হাসিনার চেয়েও বেশি জানেন ১৫ আগস্ট কী ঘটেছিল, কে কোথায় ছিলেন, কে কী করেছিলেন ও আগে-পরে কে কী বলেছিলেন। এরা এমন ভাব দেখান যেন তারা শেখ হাসিনার চেয়েও বড় আওয়ামী লীগার ও বঙ্গবন্ধু-প্রেমিক। এরা এতটাই উদ্ধত ও বোকা যে শেখ হাসিনাকে তারা পরামর্শ পর্যন্ত দেন যে তাঁর মন্ত্রিসভায় কে থাকবেন বা কে থাকবেন না। নিজেদের হাতে লেগে থাকা থকথকে রক্তের দিকে তাদের কোন নজর নেই।

অধ্যায় তের. বঙ্গবন্ধু হত্যার আগে-পরে রাজনৈতিক দলের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মুখপত্র উত্তরণ-এ শেখর দত্ত মাত্র ক’দিন আগে [১৭ আগস্ট ২০২০] লিখেছেন ’১৫ আগস্টের নিষ্ঠুরতম হত্যাকাণ্ডের পূর্বাপর রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকার পর্যালোচনা’, তার লেখাই এখানে মূলসূত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে; নগণ্য ক্ষেত্রে প্রায় হুবহু উপস্থাপন করা হচ্ছে; প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ব্যাখ্যা ও জবাবও দেয়া হচ্ছে। বলে রাখা ভালো শেখর দত্ত একজন সোভিয়েত ইউনিয়নপন্থী ছাত্র ইউনিয়ন ও কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় অনুসারী; সুতরাং তার লেখায় অতি-অবশ্যই বিকৃত-তথ্য থাকতেই হবে— বিশেষত জাসদ প্রসঙ্গে— তা না হলে তাদের স্কুল অব থট বা ঘরানার শিক্ষা বিফলে যাবে যে!

[১] বাকশাল গঠনের আগ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী প্রকাশ্য রাজনৈতিক দলগুলো ছিল— জাসদ, ন্যাপ (ভাসানী), বাংলা জাতীয় লীগ (অলি আহাদ), বাংলাদেশ জাতীয় লীগ (আতাউর রহমান), জাতীয় গণ মুক্তি ইউনিয়ন (হাজী দানেশ-সিরাজুল), শ্রমিক-কৃষক সমাজবাদী দল (মোকলেসুর), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (লেনিনবাদী-নাসিম আলী)। এদের মধ্যে জাসদ বাদে বাকি দলগুলো একটি সর্বদলীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে। বাকশাল গঠনের কিছুদিন আগে আগে ইউনাইটেড পিপলস পার্টি (জাফর-রনো-মেনন) গঠিত হয়।

[২] আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থনে ছিল ন্যাপ (মোজাফফর) ও সিপিবি। শেখরের ভাষ্যে, ন্যাপ (মোজাফফর) পুরো সময় সরকারের পক্ষে-বিপক্ষে দোল খায়। সিপিবি ধারাবাহিক ও দৃঢ়ভাবে সরকারের পক্ষে অবস্থান নেয়।

[৩] বর্ণিত প্রকাশ্য দলগুলোর বাইরে নকশাল ও চীনপন্থী অনেক সরকার-বিরোধী গোপন দল-উপদল ছিল; এদের একটা অংশ ন্যাপ (ভাসানী)-তে প্রকাশ্য ছিল। পূর্ব বাংলার সাম্যবাদী দল (সুখেন্দু- তোয়াহা), বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (এমএল-নগেন), পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল-আবদুল হক), পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল-দেবেন-সিরাজ) ও সর্বহারা পার্টি (সিরাজ শিকদার) অপ্রকাশ্য কার্যক্রম চালাত।

[৪] ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ, ন্যাপ (মোজাফফর) ও সিপিবি নিজেদের বিলুপ্ত ঘোষণা করে একদল বাকশাল গঠন করলে ন্যাপ (ভাসানী) প্রধান মওলানা ভাসানী, জাতীয় লীগের প্রধান আতাউর রহমান খান এমপি, জাগমুই-এর নেতা হাজী মোহাম্মদ দানেশ একদল বাকশাল গঠনকে সমর্থন করেন; শেষের দুজন বাকশাল কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হন। এখানে একটি চিত্তাকর্ষক বিষয় আছে— ন্যাপ-সিপিবি’র যারা যারা বাকশালের সদস্য হয়েছেন, তারা তাদের পরিচয়/জীবনবৃত্তান্ত থেকে বাকশালের সময়টুকু হাওয়া করে দেন। তা কেন? এখন অস্বীকার করতে চান? দেখা যাক সিপিবি ও ন্যাপ থেকে কে কে বাকশালে ছিলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. কামাল হোসেন তার ডক্টোরাল থিসিসে— পরে যা অঙ্কুর প্রকাশনী থেকে ‘তাজউদ্দীন আহমদ: বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং তারপর’ নামে বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে— জানাচ্ছেন যে বাকশালের কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটিতে ছিলেন ন্যাপ-এর মহিউদ্দিন আহমেদ (সদস্য নম্বর ১১); কেন্দ্রীয় কমিটিতে ছিলেন ন্যাপ-এর মোজাফফর আহমদ (সদস্য নম্বর ৭৩), সৈয়দ আলতাফ হোসেন (সদস্য নম্বর ৭৬) ও বেগম মতিয়া চৌধুরী (সদস্য নম্বর ৭৮) আর সিপিবি’র মোহাম্মদ ফরহাদ (সদস্য নম্বর ৭৭); বাকশালের জাতীয় কৃষক লীগ কেন্দ্রীয় কমিটিতে ছিলেন সিপিবির মনি সিং (সদস্য নম্বর ৬); বাকশালের জাতীয় শ্রমিক লীগ কেন্দ্রীয় কমিটিতে ছিলেন সিপিবি’র সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক (সদস্য নম্বর ৯), মঞ্জুরুল আহসান খান (সদস্য নম্বর ২২); এবং বাকশালের জাতীয় ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটিতে ছিলেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম (সদস্য নম্বর ২), নূহ উল আলম লেনিন (সদস্য নম্বর ৬) ও মাহবুব জামান (সদস্য নম্বর ৮)। অর্থাৎ ন্যাপ-সিপিবি’র ১১ জনের মধ্যে চারজন জন ন্যাপ থেকে ও সাতজন সিপিবি থেকে বাকশাল ও এর অঙ্গ সংগঠনগুলোতে ছিলেন। ধারণা করা যায়, বাকশালের অঙ্গ সংগঠনগুলোতে ন্যাপ-সিপিবি’র অঙ্গ/সহযোগী সংগঠনগুলোর আরও অনেকেই হয়তো ছিলেন— এসব সংগঠনের তৎকালীন নেতাদের না চেনার কারণে বর্তমান রচনার লেখক তা বের করতে পারেননি।

[৫] ১৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হলে বিভিন্ন দল ও নেতাদের অবস্থান পাল্টায়। আওয়ামী লীগ নেতা মোশতাকের নেতৃত্বে ক্যু’র পর আওয়ামী লীগ নেতারা উপ-রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রি, প্রতিমন্ত্রি হিসেবে মন্ত্রিসভা গঠন করে দেশ পরিচালনা করতে থাকেন। জেলা গভর্নরগণ বহাল থাকেন। সংসদ বহাল থাকে; সংসদে স্পিকার ও অন্যরা নিজ নিজ পদে বহাল থাকেন। মোশতাকের আশেপাশের রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মধ্যে একজনও অন্য কোন দল থেকে আসেননি; সবাই ছিলেন আওয়ামী লীগের। এসব আগেই খুবই বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে; আর পরেও আরও কিছুটা আলোচনা হবে।

[৬] প্রকাশ্য দলগুলোর দিকে তাকানো যাক। ১৯৭৫ সালের ১৭ আগস্ট মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ১৫ আগস্ট পরিবর্তনকে ‘ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’ আখ্যায়িত করে অভিনন্দন জানান। ১৯৭৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর হাজী মোহাম্মদ দানেশ ‘দেশে যেভাবে এক ব্যক্তির শাসন প্রতিষ্ঠিত হতে চলছিল উহা নস্যাৎ করে দেওয়ার জন্য দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনীকে অভিনন্দন’ জানান। আতাউর রহমান খানের অবস্থাও ছিল একই রকম। ন্যাপের সাবেক নেতা বাকশালের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য মহিউদ্দিন আহমেদ খুনি মোশতাকের বিশেষ দূত হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নে যান। সোভিয়েত ইউনিয়নপন্থী সিপিবি’র লোকজন আরেক সোভিয়েত ইউনিয়নপন্থী দল ন্যাপ-এর নেতা মোজাফফর আহমেদ ‘ওয়েট অ্যান্ড সি-নীতি নিয়ে দুর্বলতা দেখান’ বলে দাবি করেন; তিনি মোশতাকের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন বলেও তারা জানান।

[৭] অপ্রকাশ্য/গোপন চীনপন্থী দল-উপদলগুলোর প্রায় সব দল বঙ্গবন্ধু হত্যায় আনন্দিত হয়েছে; যেমন, পূর্ব বাংলার সাম্যবাদী দল (এমএল-তোয়াহা) ১৮ আগস্ট ১৯৭৫ এক বিবৃতিতে বলে, ‘বিগত ১৫ই আগস্ট সেনাবাহিনী রুশ-ভারতের নিয়ন্ত্রিত খুনি দুর্নীতিবাজ মুজিব সরকারকে উৎখাত করেছেন। দেশবাসী তাতে আনন্দিত। আমরা সেনাবাহিনীর দেশপ্রেমিক অংশকে স্বাগত জানাই।’

[৮] ইদানিং সিপিবি’র কেউ কেউ দাবি করেন যে তারা বঙ্গবন্ধুর হত্যার তীব্র বিরোধিতা করেন এবং মোশতাক সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। তাদের কাছে প্রশ্ন হলো, বাকশালে বিলুপ্ত সিপিবি পুনরুজ্জীবিত হলো কবে আর তাদের দ্বারা কবে কোথায় কীভাবে ‘বঙ্গবন্ধু হত্যার তীব্র বিরোধীতা’ করা হলো? এর কোন জবাব বা প্রমাণ নেই; তারা আরও দাবি করেন যে ন্যাপের মধ্যে কর্মরত সিপিবি’র সদস্যরা পার্টির লাইন গ্রহণ করেন; যদিও তখন ন্যাপ-সিপিবি বা আওয়ামী লীগের কোন সাংগঠনিক অস্তিত্বই নেই! ২০১৯ সালের ৭ আগস্ট সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ফেইসবুক-মাধ্যমে জানান যে ১৯৭৫ সালে নিজেদের দল বিলুপ্ত করে সিপিবি বাকশালে যোগ দিয়েছিল— এমন অভিযোগ অসত্য। তিনি বলেন, বাকশালে যোগ দিলেও নিজস্ব দলীয় কাঠামোতে গোপনে সিপিবি সক্রিয় ছিল। তিনি আরও বলেন যে ১৯৭৫ সালে সিপিবি ‘একদলীয় ব্যবস্থা’ ‘বাকশাল’ গঠন না করার জন্য বঙ্গবন্ধুকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরামর্শ দিয়েছিল; তিনি তা গ্রহণ করেননি। সিপিবি সভাপতি আরও জানান যে ‘বাকশাল’ গঠিত হয়ে যাওয়ার পরে ‘আইনের’ বিধানমতে প্রকাশ্যে পার্টিকে ‘বিলুপ্তির’ একটি ঘোষণা প্রচার করা হয়েছিল। আইনগত বাধ্যবাধকতার কারণে এ ধরনের একটি প্রকাশ্য ঘোষণা দিতে হলেও আসলে পার্টি কখনোই বিলুপ্ত করা হয়নি। খুবই গোপনে, অনেকটা সংকুচিত আকারে, পার্টির অস্তিত্ব ও তার কাঠামো বহাল এবং সক্রিয় রাখা হয়েছিল। কিন্তু স্বাভাবিক কারণেই ‘পার্টির গোপন অস্তিত্বের’ কথা গোপন রাখা হয়েছিল। সে কথা বাইরে প্রকাশ করা হয়নি। এমনকি অনেক পার্টি সদস্যকেও সে বিষয়টি অবগত করে ওঠা সম্ভব হয়নি। গোপনীয়তা রক্ষা করার বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়ে ধীরে-ধীরে পার্টি কাঠামো সম্প্রসারিত করা হচ্ছিল। মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, পার্টিকে কখনই ‘বিলুপ্ত’ করা হয়নি এবং পার্টির অস্তিত্ব এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধ থাকেনি। পার্টির একটি ‘হার্ড কোর’ কাঠামো আগাগোড়া গোপনে সংগঠিত ছিল। তা ছিল বলেই ১৫ আগস্টের পরবর্তী কঠিন ও বিপদজনক পরিস্থিতিতে সব পার্টি সদস্যদেরকে দ্রুত মাঠে নামানো ও পার্টি কাঠামোতে সংগঠিত করা সম্ভব হয়েছিল।

জনাব সেলিমের এত কাঁচা গল্পটা ঠিকঠাক করে দেয়ার মতো লোকজন কি সিপিবিতে নেই? একদল বাকশাল গঠন না করার পরামর্শ দিলেন বঙ্গবন্ধুকে, সে বাকশালে সিপিবি তাহলে যোগ দিল কেন? নৈতিক স্খলন হলো না! নাকি বাধ্য হয়ে গেলেন? বাধ্য হয়ে গেলে কি পরাজিত হলেন না? আচ্ছা, তাহলে কি স্বেচ্ছায় বাকশালে যোগ দিলেন? ভালো কথা; সেক্ষেত্রে বাকশালের সাংগঠনিক নীতির বিরুদ্ধে গোপনে সিপিবি রাখলেন কেন? কোন ষড়যন্ত্র ছিলো মনে? আচ্ছা, দলকে সংকুচিত অস্তিত্ব ও কাঠামোর মাধ্যমে রাখলেন যা এমনকি দলের অনেক ‘সদস্য’কেও পোনে সাত মাসে [২৫ জানুয়ারি সংবিধান সংশোধনের দিন থেকে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ বঙ্গবন্ধু-হত্যা পর্যন্ত] কিংবা সোয়া দুই মাসেও [৬ জুন ১৯৭৫ বাকশালের কমিটি ঘোষণার দিন থেকে থেকে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ বঙ্গবন্ধু-হত্যা পর্যন্ত] জানাতে পারলেন না, সে দলকে আবার ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত করা হলো কীভাবে? গোপন সংকোচনের প্রসারমানতা বিষয়টা আবার কী জিনিস? আজগুবি কথা না? গোপনে সংগঠিত ‘হার্ড কোর’ ১৫ আগস্টের পর সব সদস্যদের দ্রুত মাঠে নামায় কী করে? দ্রুত মাঠে নেমে তারা কী করলেন? যাদুকরি ব্যাপার হয়ে গেল না! মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের এ বক্তব্যের জবাবে সৈয়দ ইশতিয়াক রেজার একটি প্রতিক্রিয়া ‘সিপিবি-র কৈফিয়ত’ শিরোনামে বিডিনিউজটুয়েন্টিফোরডটকম-এর মতামত বিভাগে প্রকাশিত হয়; এতে লেখক বলেন, “সিপিবি সভাপতির বক্তব্য নতুন প্রশ্ন সামনে এনেছে তার দল সম্পর্কেই। যেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি অপেক্ষায় ছিল কবে বঙ্গবন্ধু মারা যাবেন আর প্রকাশ্যে বাকশালে যোগ দিয়েও [কবে] গোপনে থাকা পার্টিকে দ্রুত সামনে এনে রাজনীতি করা যাবে।” সে সময় এটা কে না জানতেন যে বাকশাল শুরুর পর সিপিবি নেতৃত্ব প্রকাশ্যেই তার ক্রেডিট নিতে শুরু করেছিলেন এই বলে যে বঙ্গবন্ধুও তাদের কথা শোনেন। মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের বক্তব্য যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে পুরো বিষয়টির দুয়ে দুয়ে চার মাত্রএকটিই জবাব— তারা বাকশালেই বিলুপ্ত ছিলেন, কিন্তু বাকশালের ভেতরে আরও একটা উপদলীয় ধারা চালু রেখেছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও এর গোয়েন্দা বিভাগ কেজিবির উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য। [আগামী কাল নবম পর্ব]

*মতামত বিভাগে প্রকাশিত সকল লেখাই লেখকের নিজস্ব ব্যক্তিগত বক্তব্য বা মতামত।