অবরুদ্ধ বঙ্গবন্ধু ও সংশপ্তক জাসদ: পর্ব ৭

185

জিয়াউল হক মুক্তা:

[জিয়াউল হক মুক্তা জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক। এ রচনায় সপরিবারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পারিবারিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক-আর্থরাজনীতিক-অন্তঃদলীয়-আন্তঃদলীয়-প্রশাসনিক-গোয়েন্দা-আধাসামরিক-সামরিক-ভূরাজনীতিক প্রেক্ষাপট আলোচনা করা হয়েছে। এখানে বঙ্গবন্ধুর নিজের ভাষ্যের সাথে যোগ করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু-হত্যা বিচার-আদালতের বিচারকের পর্যবেক্ষণ ও কিছু সাক্ষ্যভাষ্য এবং বঙ্গবন্ধুতনয়া জননেত্রি প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনার ও তাঁর পরিজনদের কিছু বক্তব্য; এবং বর্তমান লেখকের গবেষণালব্ধ কিছু পর্যবেক্ষণ। সবশেষে প্রধানমন্ত্রির সদয় বিবেচনা ও সকলের আলোচনার জন্য যোগ করা হয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু হত্যা সত্যানুসন্ধান কমিশন’ বিষয়ক কিছু বিষয়গত ও কাঠামোগত প্রস্তাবনা। পাঠকদের সুবিধা বিবেচনায় লেখাটি ১৬ কিস্তিতে প্রকাশিত হচ্ছে; আজ প্রকাশিত হচ্ছে সপ্তম পর্ব।]

[গতকালের পর]
এ লেখা তৈরির সময়— ২১ আগস্ট ২০২০— মার্কিন অনুসন্ধানী সাংবাদিক লরেন্স লিফস্যুলৎসকে উদ্ধৃত করে “জিয়াউর রহমানকে ‘সাইকোপ্যাথ’ বললেন মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজ” শিরোনামে দৈনিক ইত্তেফাক-এর অনলাইন ডেস্ক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে লিফস্যুলৎসের ভাষ্য, “তখন আমি ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউ ম্যাগাজিনের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক প্রতিনিধি। … ১৯৭৫ সালের মাঝামাঝি আমি ঢাকায় আসি। তখন আমার এক পরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে আমার কথা হয়। তবে ওই ব্যক্তির নাম আমি কখনো প্রকাশ করিনি।… সে আমাকে জানায়, পরিকল্পতিভাবে আগস্টে ক্যু করা হয়েছিল বাংলাদেশ।… তোমার জানতে হবে ১৯৭১ সালে খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে কলকাতায় কী হয়েছিলো। … ১৯৭১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট [এটা প্রতিবেদনের/অনুবাদের এরর; প্রেসিডেন্ট নন, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা] হেনরি কিসিঞ্জার তার বিশেষ দূত জর্জ গ্রিফিনকে কলকাতায় পাঠিয়েছিলেন। তখন গ্রিফিন মোশতাক, মাহবুবুল আলম চাষি [ও] তাহেরউদ্দিন ঠাকুরের সঙ্গে বৈঠক করেন। … ১৯৭১ সালের অক্টোবর মোশতাক যুক্তরাষ্ট্রে যান। মোশতাক গ্রুপের পরিকল্পনা ছিল যে জাতিসংঘের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধ থামিয়ে বাংলাদেশকে আবারো পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্বশাসিত প্রদেশ করা … । তবে এই পরিকল্পনার বিষয়ে তৎকালীন তাজউদ্দিন সরকার কিছু জানতে পারলে রাষ্ট্রদ্রোহিতার দায়ে খন্দকার মোশতাককে গৃহবন্দী রাখা হতো। … যারা ১৯৭১ সালে ওই পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন তারাই শেখ মুজিবুরকে হত্যা করেছে এবং মোশতাককে সেনা অভিযানের মাধ্যমে ক্ষমতায় বসিয়েছেন। … ক্যু-এর ঘটনার কিছুদিন আগে মার্কিন দূতাবাসের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন জিয়াউর রহমান। সেখানে সিআই’র পক্ষ থেকে তাকে গোপন বার্তা দেওয়া হয়। তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিস ইউজেন বোস্টার এই ক্যু-এর পরিকল্পনায় খুব উদ্বিগ্ন ছিলেন। তখন তিনি মার্কিন দূতাবাসের কর্মীদের এই পরিকল্পনা না প্রকাশ করার নির্দেশ দেন। ক্যু-এর ঘটনার ছয় মাস আগে ওই পরিকল্পনা হয়। … ক্যু-এর আগে বাংলাদেশের একজন ব্যবসায়ীর বাড়িতে ডিনারের আয়োজনে জিয়া সিআইএ সদস্যের সঙ্গে বৈঠক করেন। জিয়াউর রহমান এই ক্যু-এর অন্যতম নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন। তার প্রমাণ পাওয়া যায় তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাহর লেখাতেও। শফিউল্লাহ লেখেন, সেনাবাহিনীর ডেপুটি চিফ হিসেবে জিয়া সেনাদের ৩২ নম্বরে যাওয়া ঠেকাতে পারতেন। এছাড়া ক্যু নিয়ে জিয়া কর্নেল ফারুক এবং কর্নেল রশিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। জিয়া তাদের আশ্বস্ত করেন যে তাদের পরিকল্পনায় সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করবে না। ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন। তখন বাংলাদেশের যে সব সেনা সদস্যরা ১৫ আগস্টের ঘটনার জন্য জিয়াকে দায়ী করতেন তাদেরকে আটক করা হয়। ওই সময় প্রায় ৩ হাজার সেনা সদস্যের বিনাবিচারে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। জেনারেল শাখওয়াত আলী এবং মঈন চৌধুরী তাদের বইতে এমনটি বলেছেন। আমার মতে জিয়াউর রহমান মানসিক বিকারগ্রস্ত একজন ব্যক্তি ছিলেন। কারণ সে অরাজকতার মাধ্যমে অনেকের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। … জিয়ার সমর্থন ছাড়া এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো সম্ভব না। আবার যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছাড়াও জিয়াউর রহমান এমন কাজ করতে পারেননি।”

লে. কর্নেল [অব.] এমএ হামিদ পিএসসি তার ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা’ বইয়ে জানাচ্ছেন, “ঐ সময় ফারুক রশিদ অথবা অন্য ক’জন জুনিয়ার অফিসার ছোটখাট কিছু একটা করতে পারে, এমন অস্পষ্ট আভাষ ডিজিএফআই-এর কাছে থাকলেও তারা যথোপযুক্ত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হয়। তারা সবাই বরং মেজর জলিলের জাসদের দিক থেকে সরাসরি চোরাগুপ্তা আক্রমণের আশঙ্কা নিয়ে ব্যস্ত থাকে।”

প্রসঙ্গত, এখানে রক্ষীবাহিনীর সারোয়ার হোসেন মোল্লা ও আনোয়ার উল আলমের আরেকটি মর্মন্তুদ অভিজ্ঞতা শোনা যাক। বঙ্গবন্ধু হত্যার খবর জেনে তারা উভয়ে প্রথমে সেনাপ্রধান শফিউল্লাহকে ফোন করে করণীয় জানতে চান। তিনি বলেন যে তিনি ৪৬-ব্রিগেড কমান্ডার শাফায়াত জামিলকে খুঁজে পাচ্ছেন না, তাই তিনি পরে ফোন করে তাদের জানাবেন করণীয় কী; সে ফোন আর আসেনি। এরপর তারা বারবার ফোন করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে। তারা উভয়ে একে অপরের সাথে কথা বলে রক্ষীবাহিনীর করণীয় জানাবেন বললেও তা আর জানাননি। আব্দুর রাজ্জাককে তারা পাননি। তোফায়েল আহমেদকে পেয়েছিলেন, তিনিও কোন দিকনির্দেশনা দিতে পারেননি; বরং নিজ নিরাপত্তা রক্ষায় বাসা থেকে তাকে রক্ষীবাহিনীর সদর দফতরে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন; সারোয়ার-আনোয়ার তাই করেন। বঙ্গবন্ধু-হত্যার ঘটনায় বাকশাল-এর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব [অর্থাৎ এতে বিলুপ্ত আওয়ামী লীগ ও ন্যাপ-সিপিবি নেতৃত্ব]— এমনকি রক্ষীবাহিনীকে পর্যন্ত কোন দিক নির্দেশনা দিতে তারা ব্যর্থ হয়েছেন।

এ অধ্যায়ের সমগ্র আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে পুরো সশস্ত্র বাহিনী আগস্ট ক্যু’তে সরাসরি অংশগ্রহণ না করলেও নগণ্য ব্যতিক্রম ছাড়া সার্বিকভাবে সেনাবাহিনীর অধিকাংশ শীর্ষ কর্মকর্তাগণ সকলে— উপপ্রধান জিয়া, সিজিএস খালেদ, ৪৬-ব্রিগেড কমান্ডার শাফায়াত, ডিজিএফআই প্রধান ব্রিগেডিয়ার রউফ, গোয়েন্দা পরিদফতরের পরিচালক সালাহউদ্দিন, এজি এরশাদ, ঢাকা স্টেশন কমান্ডার কর্নেল হামিদ পিএসসিসহ অন্যরা সকলে— মোশতাক-চাষি-ঠাকুর-রশিদ-ফারুক-ডালিম-নূরের এ ক্যুর সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। সেনাপ্রধান শফিউল্লাহ, এয়ার চিফ একে খন্দকার ও নেভাল চিফ এমএইচ খান এ ক্যুর বিরুদ্ধে ন্যূনতম কোন প্রতিরোধ গড়ে তোলেননি, তার কোনো চেষ্টাও তারা করেননি; মৌনভাবে তারা ক্যু মেনে নিয়েছিলেন এবং ক্যু’র আগে অতীতে এমনসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন ও পরিবেশ তৈরি করেছেন— যার ফলে ক্যু সংগঠিত হতে পেরেছে।উপরন্তু, ক্যু’র পরে তারা বেতারে বক্তব্য দিয়ে মোশতাক সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। রক্ষীবাহিনীর পক্ষে সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এবং আব্দুর রাজ্জাক ও তোয়ায়েল আহমেদের সাথে উপর্যুপরি যোগাযোগ করার পরও তারা কোন দিকনির্দেশনা দেননি। চারপাশের সকল ষড়যন্ত্রের সাথে সাথে যুক্ত হয়েছিল ইতোমধ্যে সকল ধরনের নৈতিক মনোবল হারানো আওয়ামী লীগ/বাকশালের রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ; ভীত-সন্ত্রস্ত খুনিদের বিরুদ্ধে তারা কোন ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের কথা এমনকি কল্পনাও করেননি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ক্যু’র প্রধানতম রণকৌশল ছিল বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে বাকি প্রত্যেককে সে হত্যাকাণ্ডের বেনিফিশিয়ারিতে পরিণত করা। সেনাবাহিনী থেকে কোন বাধা আগস্ট-ক্যু’র সংগঠকগণ আশা করেননি; প্রতিরোধ আশংকা করেছিলেন দুর্বল রক্ষীবাহিনীর দিক থেকে, তাই রক্ষীবাহিনীকে তারা ট্যাংক দিয়ে ঘেরাও করে রেখেছিলেন। এই পুরো রক্ষীবাহিনীকেও মোশতাকের পক্ষে জেনারেল ওসমানী এক আশ্চর্য-সাধারণ উপায়ে নিজেদের পক্ষে নিয়ে এলেন বঙ্গবন্ধু হত্যার মাত্র ৩/৪ দিনের মধ্যে— ১৮ বা ১৯ আগস্ট— পুরো রক্ষীবাহিনীকে সেনাবাহিনীতে আত্মীকরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে— রক্ষীবাহিনীতে যে যে পদে ছিলেন, সেনাবাহিনীতে সমপর্যায়ের পদে নিয়োগদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে!

অধ্যায় এগারো. স্বজনহারার আর্তনাদ

আদালতের বর্ণিত পর্যবেক্ষণে কেবল গোয়েন্দা বাহিনীর ও সেনা বাহিনীর কলঙ্কের কথাই বলা হয়েছে; অপরাপর গোষ্ঠিগুলোর কথা বলা হয়নি। এ রচনার দশম অধ্যায়ে সম্ভাব্য সকলের সংশ্লিষ্টতার কথাও বলা হয়েছে। সেজন্য উল্লিখিত তথ্যাবলীর সাথে সাথে আরও কিছু তথ্য যোগ করা যাক। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মারা যাওয়া শেখ মনির ছোট ভাই, আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য ও দৈনিক বাংলার বাণী’র সম্পাদক শেখ সেলিম ১৯৯৬ সালের ১৫ আগস্ট ঢাকায় কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে ‘বঙ্গবন্ধু হত্যার দলিল’ শীর্ষক বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বলেন, “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ডের সময় তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল শফিউল্লাহ, উপপ্রধান জিয়া, ডিএফআইর প্রধান তাদের দায়িত্ব পালন করেননি কেন? তারা কেন প্রতিরোধ করেননি? তারা তো সব জানতো। তাদের ভূমিকার তদন্ত হওয়া উচিত। … সেনাবাহিনী যদি রাত ১০টায় রশিদের নেতৃত্বে মুভ করে তখন শফিউল্লাহ কী করছিলেন? যদিও তিনি এ বিষয়ে একটি বক্তব্য দিয়েছেন। কিন্তু তার অনেক কিছু করার ছিল। বৈঠকের অযুহাত দেখিয়ে পার পাওয়া যাবে না।

“সে রাতে বঙ্গবন্ধু শফিউল্লাহ, শাফায়াত জামিল, কর্নেল জামিল, তোফায়েল আহমেদ, আব্দুর রাজ্জাক, গাজী গোলাম মোস্তফা সবাইকে ফোন করেছিলেন। একমাত্র কর্নেল জামিলই এগিয়ে এলো এবং নিহত হলো। বাকিরা কী করেছে? বাকিরা চুপচাপ থাকলো, একটি লোকও প্রতিরোধ করলো না। তোফায়েল আহমেদ ও আব্দুর রাজ্জাক বেঁচে আছেন [শেখ সেলিমের এ বক্তব্য ১৯৯৬ সালের; ইতোমধ্যে আব্দুর রাজ্জাক মৃত্যুবরণ করেছেন]। তাদের দুই জনের সাক্ষাৎকার নিন। কী কথা হয়েছিল তাদের বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে, তাদের কী ভূমিকা ছিল, তারা কেন পারলো না? … আজকে বড় বড় কথা বলছেন শাফায়াত জামিল, তিনি এবং খালেদ মোশাররফ বঙ্গবন্ধুর হত্যার দায়ভার এড়াতে পারবেন না, তারা সবাই তখন দায়িত্বে অবহেলা করেছে, তারা প্রতিরোধ করলে এমন ঘটনা ঘটতো না। কিন্তু তারা তখন নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিতে ব্যস্ত ছিল বলে প্রতিরোধ করেনি। ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অনেক ষড়যন্ত্র ছিল। অনেকে জড়িত ছিল। … অনেক শত্রু বঙ্গবন্ধুর কাছের লোক ছিল। তারা আগে বঙ্গবন্ধুর বেডরুম পর্যন্ত গেছে, তারাই তাঁকে হত্যা করেছে। … বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করা যেত না।”

বঙ্গবন্ধু যেমন বিভিন্ন বক্তব্যে তাঁর চারপাশের চাটার দল ও চোরের দল ও নরপশুর দলের কথা বলেছেন; তেমনি তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা ২০১৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর গভীর দুঃখের সাথে তাঁর দলের নেতাকর্মীদের সাংস্কৃতিক মান সম্পর্কে বলেন, “আওয়ামী লীগের সব নেতাকে কেনা যায়, এটাই সমস্যা। শেখ হাসিনা ছাড়া।”

২০১৭ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা স্বাধীনতার চার বছরের মাথায় বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের জন্য দলের ভেতরের মানুষদের ষড়যন্ত্রকেই দায়ী করেন। বঙ্গবন্ধু হত্যায় তৎকালীন মন্ত্রি মোশতাকের জড়িত থাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আরও অনেকে এর মধ্যে জড়িত ছিল, এই ষড়যন্ত্রের সাথে। আসলে ঘরের শত্রু বিভীষণ। ঘরের থেকে শত্রুতা না করলে বাইরের শত্রু সুযোগ পায় না। সে সুযোগটা [দলের ভেতরের মানুষ] করে দিয়েছিল।” তিনি বলেন, “অনেকেই তাঁকে [বঙ্গবন্ধুকে] সাবধান করেছিলেন; এরকম একটা ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি বিশ্বাসই করেন নাই। আব্বা বলতেন, ‘না, ওরা তো আমার ছেলের মতো, আমাকে কে মারবে?’” এই হত্যাকাণ্ডে যারা জড়িত ছিলেন, তাদের অনেকের ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে নিয়মিত যাওয়ার কথাও বলেন শেখ হাসিনা। “ডালিম [শরিফুল হক ডালিম], ডালিমের শ্বাশুড়ি, ডালিমের বউ, ডালিমের শালী ২৪ ঘণ্টা আমাদের বাসায় পড়ে থাকত। ডালিমের শ্বাশুড়ি তো সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত … ডালিমের বউ তো সারাদিনই আমাদের বাসায়।” নিজের ভাই শেখ কামালের সঙ্গে খুনি মেজর এএইচএমবি নূর চৌধুরীর মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রধান সেনাপতি কর্নেল আতাউল গণি ওসমানীর এডিসি হিসাবে কাজ করার কথাও বলেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, “এরা তো অত্যন্ত চেনা মুখ।” তিনি জানান আরেক খুনি সৈয়দ ফারুক রহমান বঙ্গবন্ধুর তৎকালীন মন্ত্রিসভার অর্থমন্ত্রী এ আর মল্লিকের শালীর ছেলে। তিনি বলেন, “খুব দূরের না। এরাই ষড়যন্ত্র করল।” বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের জড়িত থাকার কথা বলেন শেখ হাসিনা; যে সেনা কর্মকর্তা তার কয়েক মাসের মধ্যে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিলেন। তিনি বলেন, “যারা এভাবে বেইমানি করে, মোনাফেকি করে, তারা কিন্তু এভাবে থাকতে পারে না। মোশতাক রাষ্ট্রপতি হয়ে জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান করে। তাদের মধ্যে অবশ্যই যোগসাজশ ছিল।” জিয়ার পারিবারিক সমস্যা সমাধানে বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগ নেয়ার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, “জিয়াউর রহমান প্রতি সপ্তাহে একদিন তার স্ত্রীকে [খালেদা জিয়া] নিয়ে ওই ৩২ নম্বরের বাড়িতে যেত।” বঙ্গবন্ধুর বাড়ির দুয়ার সবার জন্য অবারিত ছিল, যার সুযোগ ষড়যন্ত্রকারীরা নিয়েছিল বলে জানান শেখ হাসিনা। “তাদের যাওয়াটা আন্তরিকতা না.. চক্রান্ত করাটাই ছিল তাদের লক্ষ্য; সেটা বোধ হয় আমরা বুঝতে পারি নাই।” শেখ হাসিনা বলেন, “আমার মাঝে মধ্যে মনে হয়, আব্বা যখন দেখেছেন, তাঁকে গুলি করছে, তাঁরই দেশের লোক, তাঁর হাতে গড়া সেনাবাহিনীর সদস্য, তাঁর হাতে গড়া মানুষ…. জানি না তাঁর মনে কী প্রশ্ন জেগেছিল?”

২০১৯ সালের বিজয় দিবসে আরেক ভাষণে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু-হত্যার ঘটনা উল্লেখ করতে গিয়ে শেখ হাসিনা প্রশ্ন রাখেন, “এত বড় একটা ঘটনা, বাংলাদেশের কোনো লোক জানতে পারল না? কেউ কোনো পদক্ষেপ নিল না? লাশ পড়ে থাকল ৩২ নম্বরে! সেই কথা আমি এখনও ভাবি। এত বড় সংগঠন, এত নেতা— কোথায় ছিল তখন? মাঝে মাঝে আমার জানতে ইচ্ছে করে, কেউ সাহসে ভর করে এগিয়ে আসতে পারল না? বাংলার সাধারণ মানুষ তো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিল।”

ক’দিন আগেও, ২০২০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি, শেখ হাসিনা অন্য আরেক বক্তব্যে বলেছেন, “পাকিস্তানিরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে পারেনি, কিন্তু এদেশীয় দালালরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে হারের প্রতিশোধ নিয়েছে। আমাদের বাড়িতে যারা আসা-যাওয়া করতেন, আমার মা যাদের রান্না করে খাওয়াতেন তারাই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছেন।”

সর্বশেষ ২০২০ সালের ২৩ আগস্ট তিনি আরও বলেছেন যে বঙ্গবন্ধু হত্যার পেছনে সরাসরি যুক্ত ছিলেন জিয়াউর রহমান। বঙ্গবন্ধুর হত্যা প্রক্রিয়ায় শুরুতে দলের ভেতরেই চক্রান্ত হয়েছিলো। পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যমূলক সমালোচনার মাধ্যমে হত্যার পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছিলো বলেও মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

অধ্যায় বারো. শেখ হাসিনা সবই জানেন

শেখ হাসিনার প্রশ্ন, “এত নেতা, কোথায় ছিল তখন?” এ গভীর অভিমানী প্রশ্ন করলেও তিনি কিন্তু সব খবর রাথেন, খবর জানেন— কে কখন কোথায় ছিলেন। এ বিষয়ে ’৭১ এর কন্ঠ’ নামের এক ফেইসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে ২০১৮ সালে বিশেষ কিছু বলা হয়েছে; সে পোস্ট নিচে কিছুটা পরিমার্জন করে প্রায়-হুবহু তুলে ধরা হচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু সরকারের আইনমন্ত্রি ছিলেন মনোরঞ্জন ধর। বঙ্গবন্ধু তাকে সম্মান করে দাদা বাবু বলে ডাকতেন। মনোরঞ্জন ধরকে মন্ত্রি হতে অনুরোধ করে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “দাদা আপনার কথার উপরে জীবনে কোন কথা বলিনি, আপনি যা বলবেন, যা করবেন, সেটাতেই আমি রাজি।” এই দাদা ১৫ আগস্টের পর মোশতাকের আইনমন্ত্রি হিসেবে শপথ নেন। তিনি ছিলেন কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের রচয়িতা। ‘দি বাংলাদেশ গেজেট, পাবলিশড বাই অথরিটি’ লেখা অধ্যাদেশটিতে দুটি ভাগ ছিল। প্রথম অংশে বলা হয়েছিল, “১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বলবৎ আইনের পরিপন্থী যা কিছুই ঘটুক না কেন, এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টসহ কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না।” দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছিল, “রাষ্ট্রপতি উল্লিখিত ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে যাদের প্রত্যয়ন করবেন তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হলো। অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না।”

উল্লেখ্য মোশতাকের ৮১ দিনের শাসনামলে তার সঙ্গী ছিলেন বঙ্গবন্ধু মন্ত্রিসভার ২১ সদস্য। মোশতাকের উপ-রাষ্ট্রপতি হলেন মোহাম্মদউল্লাহ। আর মন্ত্রিসভার সদস্যরা হলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, আইনমন্ত্রি মনোরঞ্জন ধর, পরিকল্পনামন্ত্রি অধ্যাপক ইউসুফ আলী, অর্থমন্ত্রি ড. আজিজুর রহমান মল্লিক, শিক্ষামন্ত্রি ড. মোজাফফর আহমদ চৌধুরী, স্বাস্থ্যমন্ত্রি আবদুল মান্নান, কৃষি ও খাদ্যমন্ত্রি আবদুল মোমিন, এলজিআরডি মন্ত্রি ফণিভূষণ মজুমদার, নৌপরিবহনমন্ত্রি আসাদুজ্জামান খান, গণপূর্ত ও গৃহায়নমন্ত্রি সোহরাব হোসেন। প্রতিমন্ত্রিরা হলেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রি কে এম ওবায়দুর রহমান, ভূমি ও বিমান প্রতিমন্ত্রি শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, রেল ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রি নূরুল ইসলাম মঞ্জুর, তথ্য প্রতিমন্ত্রি তাহেরউদ্দিন ঠাকুর, শিল্প প্রতিমন্ত্রি নূরুল ইসলাম চৌধুরী, ত্রাণ ও পুনর্বাসন প্রতিমন্ত্রি ডা. ক্ষিতিশ চন্দ্র মণ্ডল, পশু ও মৎস্য প্রতিমন্ত্রি রিয়াজউদ্দিন আহমদ ভোলা মিয়া, যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রি সৈয়দ আলতাফ হোসেন ও মোমিনউদ্দিন আহমদ [ইনি বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভায় ছিলেন না]। [আগামী কাল অষ্টম পর্ব]

*মতামত বিভাগে প্রকাশিত সকল লেখাই লেখকের নিজস্ব ব্যক্তিগত বক্তব্য বা মতামত।