অবরুদ্ধ বঙ্গবন্ধু ও সংশপ্তক জাসদ: পর্ব ১৫

174

জিয়াউল হক মুক্তা:

[জিয়াউল হক মুক্তা জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক। এ রচনায় সপরিবারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পারিবারিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক-আর্থরাজনীতিক-অন্তঃদলীয়-আন্তঃদলীয়-প্রশাসনিক-গোয়েন্দা-আধাসামরিক-সামরিক-ভূরাজনীতিক প্রেক্ষাপট আলোচনা করা হয়েছে। এখানে বঙ্গবন্ধুর নিজের ভাষ্যের সাথে যোগ করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু-হত্যা বিচার-আদালতের বিচারকের পর্যবেক্ষণ ও কিছু সাক্ষ্যভাষ্য এবং বঙ্গবন্ধুতনয়া জননেত্রি প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনার ও তাঁর পরিজনদের কিছু বক্তব্য; এবং বর্তমান লেখকের গবেষণালব্ধ কিছু পর্যবেক্ষণ। সবশেষে প্রধানমন্ত্রির সদয় বিবেচনা ও সকলের আলোচনার জন্য যোগ করা হয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু হত্যা সত্যানুসন্ধান কমিশন’ বিষয়ক কিছু বিষয়গত ও কাঠামোগত প্রস্তাবনা। পাঠকদের সুবিধা বিবেচনায় লেখাটি ১৬ কিস্তিতে প্রকাশিত হচ্ছে; আজ প্রকাশিত হচ্ছে পঞ্চদশ পর্ব।]

[গতকালের পর]
উল্লিখিত প্রচারপত্রে জাসদ যে যুক্তি ও বক্তব্য তুলে ধরেছে— আওয়ামী লীগ যদি মনে করে এ বক্তব্য ভুল— তা হবে তার জন্য আত্মঘাতি আর পুরো জাতির জন্য সর্বনাশা। আওয়ামী লীগ যদি মনে করে জোটের মাধ্যমে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল হয়ে গিয়েছে ও এবার তারা একটু ‘ডান’ দিকে সরে যেতে পারে— তাও হবে আত্মঘাতি। আওয়ামী লীগ এদেশের রাজনীতির ইতিহাসে কখনোই ‘ডান’দের কোন ভোট পায়নি এবং আগামীতেও কখনও পাবে না।

আওয়ামী লীগের এও নিশ্চয়ই জানা আছে যে কোন জোটের ভোটের রাজনীতি শরিকদের আলাদা আলাদা ভোটের মোট সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না— সেটা বিচার করতে হয় ‘পরিমাণ’-এর ‘গুণগত’ রূপান্তরের অনুধাবনের মাধ্যমে— তার মানে, জোটের শরিকদের সংখ্যাগত ভোট আলাদা আলাদাভাবে যাই হোক না কেন, জোটবদ্ধ নির্বাচন শরিকদের আলাদা আলাদা ভোটের যোগফলের চেয়ে বেশি হয় সকল সময়। এখানে জোটের শরিকদের রাজনৈতিক অবস্থান ও তাদের সমর্থক-শুভানুধ্যায়ীরাও ভূমিকা রাখেন। আওয়ামী লীগ যদি মনে করে গত তিনটি নির্বাচনে পাওয়া ভোট সব আওয়ামী লীগের একার— তা হবে বোকার স্বর্গে বসবাস করার নামান্তর।

বিএনপি-জামাত এখনও ঐক্যের রাজনীতিকে কতোটা গুরুত্ব দিচ্ছে তা আশা করা যায় আওয়ামী লীগ ভেবে দেখবে; ঐক্যের বিরুদ্ধে একা নয়, ঐক্য দিয়েই লড়তে হয়; বাংলাদেশে ১৯৯০ সাল পরবর্তী ৩০ বছরের রাজনীতি তাই প্রমাণ করে। উল্লিখিত প্রচারপত্রের বক্তব্য থেকে আশা করা যায় যে তা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল দল-মতের অনুসারীগণ বিবেচনা করে দেখবেন এবং আরও বৃহত্তর ও শক্তিশালী ঐক্য গড়ে তুলবেন।

জাসদের অপরিমেয় ধারাবাহিক প্রয়াসের মধ্য দিয়ে ১৯৭৫-এর তিরিশ বছর পর আওয়ামী লীগ ও জাসদের মধ্যে এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির মধ্যে যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা হয়েছে— তা শুরু থেকেই অনেকের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করে ও অনেকের চক্ষুশূল হয়ে ওঠে। কিন্তু এ ঐক্যের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিলে যেহেতু এদের চরিত্র দিবালোকে প্রকাশ পেয়ে যাবে, তাই এরা ঐক্যের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান না নিয়ে কৌশল হিসেবে জাসদ ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সম্পর্ক ফাটল ধরাতে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক ও অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।

পুনশ্চ— মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শত্রুদের কথা বাদ থাক; আওয়ামী লীগ ও ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়নের জাসদ-বিরোধী জেনে রাখুক— গত ৪০ বছরে ১০ দলীয় ঐক্যজোট, ১৫ দল ও ১৪ দলে আওয়ামী লীগ ও জাসদ একত্রে রাজনীতি করেছে— বঙ্গবন্ধু-হত্যার সাথে যদি জাসদের দূরতম-ন্যূনতম-ক্ষুদ্রতম সংশ্লিষ্টতা থাকতো, তাহলে শেখ হাসিনা জাসদের সাথে কোন ঐক্য করতেন না। এদের বুদ্ধিমত্তার স্তর এতটাই নিম্নমানের যে এরা শেখ হাসিনার প্রতিও আস্থা রাখেন না যে তিনি পিতৃ-হন্তারকদের সাথে কোন ঐক্য করতে পারেন না; এদের ঔদ্ধত্য এতটাই যে তারা এমনকি শেখ হাসিনাকেও ঐক্য-নির্বাচন-সরকার নিয়ে জ্ঞানদানের চেষ্টা করেন জাসদকে ভিলেন সাজিয়ে; এরা মনে করেন যে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের সভাপতি শেখ হাসিনার চেয়েও তারা পাওয়ার-পলিটিক্সের ইকুয়েশন ভালো বোঝেন। এসবের মধ্য দিয়ে তারা শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বিবেচনা-নীতি-কৌশলকে অপমান করার অপচেষ্টা করেন।

উল্লেখযোগ্য বিষয়, প্রধানমন্ত্রি জননেত্রী শেখ হাসিনা বা জননেতা হাসানুল হক ইনু ঐক্যবিরোধী মিথ্যাচারগুলো এন্টারটেইন করেননি। অন্যদিকে, যারা জাসদ ও আওয়ামী লীগের ঐক্য ও ১৪ দলকে ক্ষতিগ্রস্ত করার মিশন নিয়ে— বঙ্গবন্ধু হত্যায় একটুখানি ‘জাসদ মাখিয়ে রেখে’— বঙ্গবন্ধু-হত্যা বিষয়ক ‘কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব রেখেছেন, তাদের মুখে ছাই দিয়ে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু এমপি নিজেই ১৯ আগস্ট ২০২০ তারিখে ১৪ দলের ভার্চুয়াল সভায় বঙ্গবন্ধু-হত্যা বিষয়ে একটি কমিশন গঠনের প্রস্তাব করেন। এ সভায় ১৪ দলের সমন্বয়ক জনাব আমির হোসেন আমু এমপি বলেন, “আমি মনে করি এ প্রস্তাব গ্রহণ করা যেতে পারে।”

অধ্যায় পনের. ইতিহাসের মুক্তি: বঙ্গবন্ধু হত্যা সত্যানুসন্ধান কমিশন

কমিশন বিষয়টি নতুন কিছু নয়; সরকার-প্রশাসন বিভিন্ন বিষয়ে কমিশন গঠন করে থাকে; যেমন— শিক্ষা কমিশন, পাট কমিশন, মানবাধিকার কমিশন ইত্যাদি। তবে নিকট ও সমকালীন রাজনীতিতেও বিভিন্ন বিষয়ে কমিশন গঠন একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক উদ্যোগ (initiative) হিসেবে অনুসৃত ও উপকরণ (tool/instrument) হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনা বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের কমিশনের অনেক উদাহরণ আছে। অতীতের ধারাবাহিকতায় চলমান দ্বন্দ্ব-সংঘাত নিরসনে অতীতের অন্যায়ের অনুসন্ধানের জন্য ‘সত্যানুসন্ধান কমিশন’ বা ‘সত্য ও সম্পর্ক/সদ্ভাব পুনরুদ্ধার কমিশন’ গঠন করা হয়ে থাকে। এগুলো সাধারণভাবে সরকার কর্তৃক গঠিত হয়ে থাকে— বিশেষত অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা, গৃহযুদ্ধ বা একনায়কতন্ত্র বিষয়ে। তবে, নীতিগতভাবে বেসরকারি কমিশন গঠনও নতুন কিছু নয়।
নিচে উইকিপিডিয়া থেকে বিভিন্ন ধরনের কমিশন বিষয়ে মানবসভ্যতার অভিজ্ঞতার সারসংকলন বর্তমান রচনাকার সরাসরি অনুবাদ ও সামান্য সম্পাদনা করে কউপস্থাপন করছেন।

আর্জেন্টিনায় ১৯৮৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর গঠন করা হয়েছিল ‘ন্যাশনাল কমিশন অন দি ডিজঅ্যাপিয়ারেন্সেস অফ পারসনস’। ‘ডার্টি ওয়ার’-এর সময় ৩০,০০০ ব্যক্তিকে গুম করা ও মানবাধিকার লংঘনের ওপর এ কমিশন গবেষণা করে। কমিশন ৯,০০০ ব্যক্তির নিখোঁজ হওয়ার কেইসস্টাডিসমৃদ্ধ ‘নেভার এগেইন’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে ১৯৮৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর। এ প্রতিবেদন বেসামরিক আদালতে সামরিক জান্তার বিচারের পথ উন্মুক্ত করেছিল।

ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে ধারাবাহিক আয়োজনের একটি হিসেবে বলিভিয়ায় ১৯৮২ সালে ‘দি ন্যাশনাল কমিশন অফ ইনকোয়ারি ইনটু ডিজঅ্যাপিয়ারেন্সেস’ গঠন করা হয়। এ কমিশন তার প্রতিবেদন রচনা শেষ করতে পারেনি।

২০১১ সালে ফেডারেল সিনেট এবং প্রেসিডেন্ট ডিলমা রোফেস-এর অনুমোদনে ব্রাজিলে দুই বছর মেয়াদী সাত-সদস্যবিশিষ্ট অশাস্তিমূলক ‘ন্যাশনাল ট্রুথ কমিশন’ গঠন করা হয়। কমিশনকে ১৯৪৬ সাল থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত সকল সরকারি নথিপত্র পর্যালোচনার অধিকার দেয়া হয় এবং কমিশন চাইলে অভিযুক্ত ও সন্ত্রাসের শিকারদের সাক্ষ্য সংগ্রহের বিধান রাখা হয়। কমিশন চাইলে কোন তথ্য না প্রকাশেরও বিধান রাখা হয়।

কানাডায় ‘কানাডিয়ান ইনডিয়ান রেসিডেন্সিয়াল স্কুল সিস্টেম’-এ মানবাধিকার লংঘন বিষয়ে ২০০৮ সালের জুন থেকে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত পরিচালনা করা হয় ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন অফ কানাডা’।

চাদে ১৯৯০ সালে গঠন করা হয় ‘কমিশন অফ ইনকোয়ারি ইনটু ক্রাইমস অ্যান্ড মিসঅ্যাপ্রোপ্রিয়েশনস কমিটেড বাই ফরমার প্রেসিডেন্ট হিসেনে হাবরে’। এ কমিশন ৪০,০০০ নাগরিকের হত্যা ও দুই লক্ষ নির্যাতন-ঘটনা বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিল করে।

চিলিতে অগাস্টো পিনোশের আমলে সংঘটিত রাজনৈতিক গুম ও খুনের ওপর ‘ন্যাশনাল ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠন করা হয় ১৯৯০ সালের এপ্রিলে। ১৯৯১ সালে এ প্রতিবেদন [রেটিগ রিপোর্ট] প্রকাশিত হয়। ‘ন্যাশনাল কমিশন অন পলিটিক্যাল ইমপ্রিজনমেন্ট অ্যান্ড টর্চার’ প্রতিবেদন [ভ্যালেচ রিপোর্ট] প্রকাশ করে ২০০৪ ও ২০০৫ সালে। এ প্রতিবেদন পিনোশের আমলের হত্যাব্যতীত মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা— বিশেষত নির্যাতনের— তদন্ত করে; এতে সেসব শিশুদের প্রতি বিশেষ মনযোগ দেয়া হয় যাদের বাবা-মা নিহত বা খুন হয়েছেন। কমিশনের এ প্রতিবেদন ব্যবহার করে সরকার বেঁচে যাওয়া ক্ষতিগ্রস্তদের পেনশন ও অন্যান্য সুবিধা প্রদান করে।

চেক রিপাবলিকের ক্রিমিনাল পুলিশের উপবিভাগ ‘দি অফিস ফর দি ডকুমেন্টেশন অ্যান্ড দি ইনভেস্টিগেশন অফ দি ক্রাইমস অফ কমিউনিজম’ ১৯৪৮ থেকে ১৯৮৯ সালে কৃত সেসব অপরাধের তদন্ত করে যেগুলো কমিউনিস্ট শাসনামলে রাজনৈতিক কারণে সমাধান করা হয়নি।

এল সালভাদরে গৃহযুদ্ধ অবসানের জন্য প্রতিষ্ঠিত শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে জাতিসংঘ ‘কমিশন অন দি ট্রুথ ফর এল সালভাদর’ গঠন করা হয়। কমিশন এল সালভাদরের যুদ্ধকালে অস্কার রোমেরো ও ক্যাথলিক চার্চের ছয়জন প্রতিনিধিকে হত্যাসহ অপরাপর যে হত্যাকাণ্ড পরিচালিত হয় তা তদন্ত করে।

গাম্বিয়ায় ইয়াহিয়া যামেহ-এর আমলের মানবাধিকার লংঘনের ওপর জাতীয় সংসদ ২০১৭ সালের ডিসম্বরে ‘দি ট্রুথ, রিকনসিলিয়েশন অ্যান্ড রিপ্যাট্রিয়েশনস কমিশন’ আইন পাশ করে। ২০১৮ সালের ১৫ অক্টোবর এটা তার প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

বাংলাদেশের নিকটবর্তী দেশ নেপালে ১৯৬১ থেকে ১৯৯০ সময়কালের ওপর ১৯৯১ সালে গঠন করা হয় ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’। ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ‘কমিশন অন ইনভেস্টিগেশন অফ ডিজঅ্যাপিয়ার্ড পারসনস’ নামে আরও একটি কমিশন গঠন করা হয়।

নিউজিল্যান্ডে ১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘দি ওয়াইতাঙ্গি ট্রাইব্যুনাল’টি একটি কমিশন হিসেবেও কাজ করে। ১৮৪০ সালের ওয়াইতাঙ্গি-চুক্তির বিপরীতে গিয়ে রাজতন্ত্র যেসব আইনকানুন, নীতি, কার্যক্রম ও নিষ্ক্রিয়তা প্রদর্শন করে— মাওরি জনগণ সেগুলো ট্রাইব্যুনাল/কমিশনের কাছে উপস্থাপন করে— ট্রাইব্যুনাল/কমিশন সেগুলো বিবেচনা করে সুপারিশমালা প্রণয়ন ও উপস্থাপন করে।

ফিলিপিন্সের বিষয়টি খুব কৌতুহলোদ্দীপক। ২০১০ সালে প্রেসিডেন্ট বেনিগনো নয়নয় অ্যাকিনো পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্ট গ্লোরিয়া ম্যাকাপাগাল-আরোয়ো প্রশাসনের অমীমাংসিত বিষয়াবলীর ওপর ‘ফিলিপিন্স ট্রুথ কমিশন’ গঠনের ঘোষণা দেন। ৩০ জুলাই অ্যাকিনো ‘ফিলিপিন্স ট্রুথ কমিশন অফ ২০১০’ গঠনের এক্সিকিউটিভ অর্ডার নম্বর ১ স্বাক্ষর করেন। কিন্তু ফিলিপিন্সের সুপ্রিম কোর্ট এ এক্সিকিউটিভ অর্ডারকে অকার্যকর করে দেন এই বলে যে অর্ডারটি কেবলমাত্র আরোয়ো প্রশাসনকে এককভাবে বিবেচনায় নিয়েছে যা ‘ইক্যুয়াল প্রোটেকশন ক্লজ’-এর সাথে সাংঘর্ষিক। পরে ‘বিরাওগো বনাম ট্রুথ কমিশন মামলা’র রায়ে আদালত অ্যাকিনোর ট্রুথ কমিশনকে ‘প্রতিহিংসাপরায়ন এবং চিহ্নিতদের প্রতি শাস্তিপ্রদানমূলক মাধ্যম’ হিসেবে বিবেচনা করে।

রুয়ান্ডায় কর্মরত আন্তর্জাতিক বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠনগুলো [এনজিওগুলো] গঠন করে একটি ‘ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অফ ইনভেস্টিগেশন অন হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশনস ইন রুয়ান্ডা সিন্স অক্টোবর ওয়ান, নাইনটিন-নাইনটি’। কমিশন ১৯৯৩ সালে প্রতিবেদন দেয়; কিন্তু তা আর এগোয়নি ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় গণহত্যা-উদ্ভূত পরিস্থিতিতে। গণহত্যার পর ১৯৯৯ সালে গণহত্যা-পরবর্তীকালে সদ্ভাব পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে একটি নতুন ‘ন্যাশনাল ইউনিটি অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠন করা হয়।

১৯৯০ সালে সিয়েরালিওনের গৃহযুদ্ধের সমাপ্তির পর ‘সিয়েরালিওন ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠন করা হয়েছিল। কমিশন জানায় যে বিবাদমান দু’পক্ষই শিশুসহ বেসামরিক নাগরিকদের টার্গেট করেছে; এটা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানায়।

সলোমন দ্বীপপুঞ্জের সরকার ২০০৯ সালের ২৯ এপ্রিল একটি ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ চালু করে। এর লক্ষ্য ছিল ১৯৯৯ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত সংঘটিত গুয়াডালকানাল জাতিগত সহিংসতার ভীতিকর অভিজ্ঞতা বিবেচনা করা। এটা দক্ষিণ আফ্রিকার ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন’-এর আদলে গঠন করা হয়। ২০১০ সালের মার্চে এর ‘গণশুনানি’ হয়।

বর্ণবাদ থেকে রূপান্তরের পর প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলা সাবেক অ্যাংলিকান আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটুর নেতৃত্বে কমিশন গঠনের অনুমোদন দেন। এ কমিশন দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ স্টাডি করেছিল। একে খুব সাধারণ ভাষায় ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ বলা হতো।
দক্ষিণ কোরিয়ায় ‘দি প্রেসিডেন্সিয়াল ট্রুথ কমিশন অন সাসপিশাস ডেথস ইন দি রিপাবলিক অফ কোরিয়া’ গঠন করা হয়েছিল ২০০৪ সালে। ২০০৫ সালে দ্বিতীয় আরেকটি ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠন করা হয়। জেজু দ্বীপের জন্যও একটা স্থানীয় কমিশন গঠন করা হয়।

গৃহযুদ্ধোত্তর শ্রীলংকায় গঠন করা হয়েছিল ‘লেসনস লার্নট অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’। ১৮ মাসের তদন্ত শেষে কমিশন রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতিবেদন দাখিল করে ২০১১ সালের ১৫ নভেম্বর। সংসদে উপস্থাপনের পর এটা ২০১১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সকলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।

তিমুর-লেসথে (পূর্ব তিমুর) গঠন করেছিল ‘কমিশন ফর রিসেপশন, ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন ইন ইস্ট তিমুর’; পাশাপাশি ‘ইন্দোনেশিয়া-তিমুর লেসথে কমিশন অন ট্রুথ অ্যান্ড ফ্রেন্ডশিপ [২০০৫–২০০৮]’ গঠন করা হয়।

উরুগুয়েতে ১৯৮৫ সালে কাজ শুরু করে ‘দি ইনভেস্টিগেটিভ কমিশন অন দি সিচুয়েশন অফ ডিজঅ্যাপিয়ারর্ড পিপল অ্যান্ড ইটস কজ’। এটা ১৯৭২ থেকে ১৯৮৩ সালের ওপর প্রতিবেদন দেয়। এ সময়ের ওপর রাষ্ট্রপতি একটি নতুন ‘পিস কমিশন’ গঠন করেন যা ২০০৩ সালে প্রতিবেদন দেয়।

আমেরিকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘দি গ্রিনসবোরো ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ ২০০৪ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত কাজ করে— ১৯৭৯ সালের ৩ নভেম্বরে ওই শহরে ঘটে যাওয়া মর্মন্তুদ ঘটনাবলীর তদন্তের জন্য— যা ‘গ্রিনবোরো গণহত্যা’ নামে পরিচিত পেয়েছিল। ‘দি মেইনি ওয়াবানাকি-স্টেট ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ ওয়াবানাকি জনগোষ্ঠির শিশুকল্যানের বিষয়াদি তদন্ত করে।

এসব ছাড়াও আরও অনেকে দেশে অনেক ধরনের কমিশন গঠন করা হয়। আলজেরিয়ায় ১৯৯০ দশকের মানবাধিকার লংঘনের ঘটনার ওপর ২০০৩ সালে গঠন করা হয়েছিল ‘অ্যাডহক ইনকোয়ারি কমিশন ইন চার্জ অফ দি কোয়েশ্চেন অফ ডিজঅ্যাপিয়ারেন্সেস’। সশস্ত্র সংঘাতের শিকারদের সহায়তা করতে কলম্বিয়ায় গঠন করা হয়েছিল ‘ন্যাশনাল কমিশন ফর রিপ্যাট্রিয়েশন অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন’। ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গোর ২০০৪ সালের শান্তি চুক্তিতে ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠনের বিধান রাখা হয়; এ কমিশন ২০০৭ সালে তাদের প্রশাসনিক প্রতিবেদন দাখিল করে। ইকুয়েডরে ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৮ সালে মানবাধিকার লংঘনের ঘটনার তদন্তের জন্য সরকার ‘দি ট্রুথ কমিশন’ গঠন করে। ফিজিতে ‘রিকনসিলিয়ন অ্যান্ড ইউনিটি কমিশন’ গঠন করা হয়। ১৯৯২ সালে জার্মানির পুনরিকেত্রীকরণের পর ‘কমিশন অন ইনকোয়ারি ইনটু ক্রাইমস অফ দি এসইডি ইন ইস্ট জার্মানি’ গঠিত হয়। ঘানা ‘ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠন করে। গুয়েতেমালায় ‘হিস্টরিক্যাল ক্ল্যারিফিকেশন’ কমিশন গঠন করা হয়। হাইতিতে ‘দি হাইতিয়ান ন্যাশনাল ট্রুথ অ্যান্ড জাস্টিস কমিশন’ গঠন করা হয়। ২০০৯ সালে হন্ডুরাসে ক্যুদেতাকেন্দ্রীক ঘটনামালার তদন্ত করতে হন্ডুরাস ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠন করা হয়। কেনিয়ায় ‘ওয়াকি কমিশন’; ‘দি ট্রুথ, জাস্টিস অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন অফ কেনিয়া’ গঠন করা হয়। লাইবেরিয়া ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠন করে। মরক্কোতে গঠন করা হয়েছিল ‘ইক্যুইটি অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’। ১৯৯৯ সালে নাইজেরিয়ায় গঠিত হয় ‘হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশনস ইনভেস্টিগেশন কমিশন’ যা ২০০২ সালে তাদের প্রতিবেদন প্রদান করে। পানামায় ২০০০ সালে গঠিত ‘দি পানামা ট্রুথ কমিশন’ পূর্ববর্তী সামরিক শাসনামলের হিংস্র, অমানবিক ও অবমাননাকর আচরণ আর নির্যাতনের ওপর প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্যারাগুয়েতেও ‘ট্রুথ ও জাস্টিস কমিশন’ গঠন করা হয়। পেরুতে গঠন করা হয় ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’। পোলান্ডে গঠন করা হয় ‘ইনস্টিটিউট অফ ন্যাশনাল রিমেমব্রেন্স’। টোগো-তে ১৯৫৮ থেকে ২০০৯ সময়পর্ব তদন্ত করতে ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘ট্রুথ, জাস্টিস অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’। তিউনিসিয়ায় ২০১৪ সালে গঠন করা হয়েছিল ‘ট্রুথ অ্যান্ড ডিগনিটি কমিশন’। উগান্ডায় গঠিত হয়েছিল ‘উগান্ডা কমিশন অফ ইনকোয়ারি ইনটু ভায়োলেশনস অফ হিউম্যান রাইটস [১৯৮৬–১৯৯৪]’। ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভিক্তর ইউশেচেঙ্কো ২০০৬ সালে গঠন করেন ‘ইউক্রেনিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ন্যাশনাল রিমেমব্রেন্স’। ফেডারেল রিপাবলিক অফ ইয়োগোশ্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট ১৯৯৯ সালে একটি ‘কমিশন অফ ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন’ গঠন করেন যা তার প্রতিবেদন সমাপ্ত করেনি।

এসবের বাইরে আন্তর্জাতিক পরিসরেও কমিশন গঠনের নজির আছে। ২০১৯ সালে বুলগেরিয়া ও নর্থ মেসিডোইয়া নিজেদের সম্পর্ক পর্যবেক্ষণ চুক্তির অধীনে গঠন করে ‘কমিশন ফর হিসটোরিক্যাল অ্যান্ড এডুকেশনাল ইস্যুজ’।

বর্তমান রচনাকার মনে করেন যে— জাতীয় মুক্তি ও স্বাধীনতা আন্দোলন এবং সশস্ত্র সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় স্বাধীন বাংলাদেশের আগামীর শান্তিপূর্ণ নির্মাণপ্রয়াসে ইতিহাসের মুক্তি আবশ্যক। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের অতীত ও বর্তমান নেতা-কর্মীদের অনেক কিছু করণীয় আছে। কেননা, বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রেক্ষাপট নির্মাণকারী, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ও বঙ্গবন্ধু হত্যার সুফলভোগীদের চরিত্র উন্মোচন করা গেলে জাতীয় রাজনীতিতে বিদ্যমান ষড়যন্ত্রমূলক প্রচার-প্রচারণা থেকে থেকে মুক্তি পাবে আওয়ামী লীগের ও জাসদের ইতিহাস। এ ইতিহাসের মুক্তি উভয় সংগঠনের রাজনীতির বিকাশে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। এ ইতিহাসের মুক্তি বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি উন্নততর দেশে পরিণত করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।
[আগামী কাল ষোড়শ/শেষ পর্ব]

*মতামত বিভাগে প্রকাশিত সকল লেখাই লেখকের নিজস্ব ব্যক্তিগত বক্তব্য বা মতামত।