অবরুদ্ধ বঙ্গবন্ধু ও সংশপ্তক জাসদ: পর্ব ১৪

218

জিয়াউল হক মুক্তা:

[জিয়াউল হক মুক্তা জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক। এ রচনায় সপরিবারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পারিবারিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক-আর্থরাজনীতিক-অন্তঃদলীয়-আন্তঃদলীয়-প্রশাসনিক-গোয়েন্দা-আধাসামরিক-সামরিক-ভূরাজনীতিক প্রেক্ষাপট আলোচনা করা হয়েছে। এখানে বঙ্গবন্ধুর নিজের ভাষ্যের সাথে যোগ করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু-হত্যা বিচার-আদালতের বিচারকের পর্যবেক্ষণ ও কিছু সাক্ষ্যভাষ্য এবং বঙ্গবন্ধুতনয়া জননেত্রি প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনার ও তাঁর পরিজনদের কিছু বক্তব্য; এবং বর্তমান লেখকের গবেষণালব্ধ কিছু পর্যবেক্ষণ। সবশেষে প্রধানমন্ত্রির সদয় বিবেচনা ও সকলের আলোচনার জন্য যোগ করা হয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু হত্যা সত্যানুসন্ধান কমিশন’ বিষয়ক কিছু বিষয়গত ও কাঠামোগত প্রস্তাবনা। পাঠকদের সুবিধা বিবেচনায় লেখাটি ১৬ কিস্তিতে প্রকাশিত হচ্ছে; আজ প্রকাশিত হচ্ছে চতুর্দশ পর্ব।]

[গতকালের পর]
[১২] ১৯৯০-এর ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের পর জাসদ মুক্তিমুদ্ধের চেতনায় বৃহত্তর ঐক্য গঠনের আহ্বান জানালেও নিজেদের বিজয়ের বিষয়ে ব্যাপক আস্থাশীল আওয়ামী লীগ তাকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে। ফলে ১৯৯১-এর ২৭ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয় ও জামাতের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে। জামাত-বিএনপির মধ্যে তখনও কোন জোট হয়নি; কিন্তু ভোটের মাঠে পরস্পরের আদর্শিক অবস্থান থেকে তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দলগুলোর বিরুদ্ধে অনানুষ্ঠানিক ভোট-সমঝোতায় থাকে।

[১৩] ১৯৯১-এর নির্বাচনের পর ১৯৯৪ সালের এপ্রিলে জাসদ ও সিপিবিসহ আটটি বামপন্থী দল গঠন করে ‘বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট’, যদিও জাসদের ভেতরে এ ফ্রন্ট নিয়ে ভিন্নমত ছিলো। প্রসঙ্গত, ন্যাপ-সিপিবি’র যারা বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রেক্ষাপট নির্মাণে জাসদের ভূমিকা ছিল বলে গত ১৫ বছর ধরে দাবি করছেন— ১৯৯৪ সালে তারা কোথায় ছিলেন? জাসদ-সিপিবি মিলেমিশে একসাথে বামফ্রন্টে থাকা নিয়ে তারা কেউ তখন কোন বিরোধিতা করেছিলেন কি?

এ পর্বে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’ গঠনের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধ বিচারের আন্দোলনের অংশ হিসেবে ঐতিহাসিক ‘গণআদালত’ সংগঠিত হয়; জাসদ ও আওয়ামী লীগসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল শক্তি এ আন্দোলনে সর্বাত্মক সহায়তা দেয়; সেই ১৯৬২ সালের স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ বা নিউক্লিয়াসের তিন নেতার দু’জন— আওয়ামী লীগের আব্দুর রাজ্জাক ও জাসদের কাজী আরেফ আহমেদ ‘জাতীয় সমন্বয় কমিটি’র স্টয়িারিং কমিটিতে অবস্থান করেন। খালেদা জিয়ার সরকার যুদ্ধাপরাধ বিচার আন্দোলনকে দমন করার সকল উদ্যোগ গ্রহণ করে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিগুলোর মধ্যে গণআদালতকেন্দ্রীক এক ধরনের আদর্শিক অবস্থান প্রকাশ্য হলেও তা কোন ধরনের জোটগত বা নির্বাচনকেন্দ্রীক ঐক্যে রূপান্তরিত হয়নি।

[১৪] ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেলেও তা সরকার গঠনের জন্য পর্যাপ্ত ছিল না; জাসদের সমর্থনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। জাতীয় সংসদ কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে; বঙ্গবন্ধু-হত্যার বিচার শুরু করে। এ পর্বে ক্ষমতার বাইরে থাকা জামাত-বিএনপি— ১৯৭১ ও ১৯৭৫-এর খুনিরা— সম্মিলিতভাবে ‘চার দলীয় ঐক্যজোট’ গঠন করে।

[১৫] ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনের জন্য আওয়ামী লীগ কোন ঐক্য করেনি; ফলে ইতোমধ্যে গঠিত জামাত-বিএনপি’র ‘চার দলীয় ঐক্যজোট’ ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচন করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে সরিয়ে ক্ষমতায় আসে। ২০০১—২০০৬ কালপর্বে বাংলাদেশে ১৯৭১-এর পরাজিত ও ১৯৭৫-এর বিজয়ী শক্তির সর্বোচ্চতম বিকাশ হয়।

১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলা ও ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল রমনা বটমূলে বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে গ্রেনেড হামলার ধারাবাহিকতায় চার দলীয় ঐক্যজোটের সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ২০০৪ সালের ৭ মে প্রকাশ্যে টঙ্গীর শ্রমিকনেতা আহসানউল্লাহ মাস্টারকে গুলি করে হত্যা করা হয়, ২০০৪ সালের ২১ মে সিলেটে শাহজালালের মাজারে ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলা করা হয়, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যার জন্য আওয়ামী লীগের জনসভায় ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা করা হয় ও গ্রেনেড হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া শেখ হাসিনার হত্যা নিশ্চিত করতে স্নাইপার দিয়ে তার ওপর গুলি করা হয়, ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি অর্থমন্ত্রি শাহ এএসএম কিবরিয়াকে গ্রেনেড হামলায় হত্যা করা হয় ও ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারাদেশে ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা হামলা করা হয়। চার দলের সরকার এসব হত্যা-হামলায় আঞ্চলিক ও জাতীয় পরিসরে হয় সমর্থন দেয়, আর না হয় তাদেরকে বিচার-প্রক্রিয়ার বাইরে রাখতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে; আর বলা বাহুল্য, প্রমাণিত হয়েছে সে সময়ের বিরোধী দলের নেতা শেখ হাসিনাকে সদলবলে জানে মেরে ফেলতে তারা নিজেরা পরিচালিত করেছিল ২১ আগস্ট নৃশংস গ্রেনেড হামলা।

এ পর্বের সূচনাকাল থেকে জাসদ একক উদ্যোগে দেশব্যাপী একের পর এক অনবরত বিভিন্ন ধরনের সৃজনশীল কর্মসূচি পরিচালনা করে এবং এসব সৃজনশীল কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগ ও জাসদের মধ্যে ২৩ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে রাজপথে-নির্বাচনে-সরকারে যাওয়ার রাজনৈতিক চুক্তি প্রতিষ্ঠা পায়। পরে ন্যাপ ও ১১ দলের সাথে জাসদের উদ্যোগে পরিচালিত আলোচনার পরিণতিতে ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগ, জাসদ, ন্যাপ ও ১১ দলের সমন্বয়ে গঠিত হয় ১৪ দল। জামাত-জঙ্গি-বিএনপি’র চার দলীয় ঐক্যজোটের বিরুদ্ধে ১৪ দল মাঠের আন্দোলন পরিচালনা করতে থাকে। আন্দোলনের এক পর্যায়ে সিপিবিসহ ১১ দলের কয়েকটি দল ১৪ দল ত্যাগ করে। জামাত-জঙ্গি-বিএনপি মোকাবেলার লক্ষ্যে ১৪ দলের ‘আদর্শিক’ ঐক্যের বাইরেও ‘মহাজোট’ নামে একটি নির্বাচনী সমঝোতাও গড়ে তোলা হয়।

[১৬] ১৪ দলের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায়— ওয়ান-ইলেভেনের ষড়যন্ত্র ও সেনাসমর্থিত সরকারের শাসনামল পেরিয়ে— ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ১৪ দল ও মহাজোট সরকার গঠন করে। এ পর্বে আওয়ামী লীগের আগের শাসনামলে সূচিত বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার সমাপ্ত হয় ও দোষীদের বিরুদ্ধে দেয়া আদালতের রায় বাস্তবায়ন শুরু হয়, কর্নেল তাহের হত্যার বিচার সম্পন্ন হয়, যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হয়।

জামাত-জঙ্গি-বিএনপি একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার জন্য জনগণ ও সরকারের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী ৯৩ দিনের এক নারকীয় আগুনসন্ত্রাস পরিচালনা করে, এ আগুনসন্ত্রাসের প্রধান শিকার হন দেশের দিন-এনে-দিন-খাওয়া শ্রমজীবী-মেহনতি মানুষ ও টেম্পো-বাস-ট্রাক-ট্রেনসহ গণপরিবহণে ভ্রমণকারী সাধারণ নাগরিকগণ। পরে ১৯৭১-এর ঘাতকদের যথাযথ শাস্তি প্রদানের দাবিতে গড়ে ওঠা ‘গণজাগরণ মঞ্চ’-র বিরুদ্ধে ২০১৩ সালের ৫ মে তেঁতুলগোষ্ঠি হেফাজতে ইসলাম ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি পালন করে; জামাত-জঙ্গি-বিএনপি এ সমাবেশের মাধ্যমে সরাসরি সরকার অপসারণের উদ্যোগ নেয়।

এ সরকারের নেতৃত্বে জামাত-জঙ্গি-তেঁতুল-বিএনপির বিরুদ্ধে গৃহীত বিবিধ রাজনৈতিক উদ্যোগের পাশাপাশি আর্থসামাজিক সূচকগুলোতে দেশ এগিয়ে যেতে থাকে, জনজীবনের সমস্যা মোকাবেলায় বিবিধ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়; যেমন দ্বিপাক্ষিক-বহুপাক্ষিক দাতাদের পরিকল্পনা-দলিল ছুঁড়ে ফেলে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন প্রক্রিয়া পুনরায় চালু করা, দেশব্যাপী সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বৃদ্ধি করা, স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি পরিমাণে কৃষিতে সহায়তা দেয়া, নারীর ক্ষমতায়ন ও মেয়েশিশুর স্বার্থরক্ষায় ব্যাপকতর উদ্যোগ নেয়া ইত্যাদি অনেক বিষয়। যদিও নাগরিকদের মধ্যে ধনি-গরিব বৈষম্যসহ বিভিন্ন ধরনের বৈষম্য নিরোধে এখন পর্যন্ত বৈপ্লবিক কোন পরিবর্তন সাধিত হয়নি।

পরবর্তী দুটো নির্বাচনে— যথাক্রমে ৫ জানুয়ারি ২০১৪ সালে ও ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত— আওয়ামী লীগ ও জাসদের নেতৃত্বে ১৪ দলের আদর্শিক ঐক্য ও ১৪ দলের বাইরে মহাজোটের নির্বাচনী ঐক্য বজায় থাকে। টানা তৃতীয়বারের মতো ১৪ দলের সরকার বহাল রয়েছে। ১৯৯০ সাল থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাস বলছে যে এককভাবে নির্বাচন করে কোন দল ক্ষমতায় যেতে পারেনি।

[১৭] ১৯৭১ সালের পরাজিত ও ১৯৭৫ সালের বিজয়ীদেরকে গত ১৫ বছরের [২০০৪ থেকে ২০২০] ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে অনেকটা কোণঠাসা করা গিয়েছে; তারা সাময়িকভাবে পিছু হঠেছে। ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৫ সালের শিক্ষা-অভিজ্ঞতা বলে— সামান্যতম সুযোগে এরা হামলে পরবে। আগের তিরিশ বছরের [১৯৭৫ থেকে ২০০৫] হানিমুনের বিপরীতে গত ১৫ বছরে [২০০৫ থেকে ২০২০] জামাত-জঙ্গি-তেঁতুল-বিএনপি’র মধ্যে যে পরিমাণ ক্রোধ জন্মেছে ১৪ দলের বিরুদ্ধে, সামান্যতম বা ক্ষীণতম বা ন্যূনতম সুযোগ পেলেই এরা দেশে আবারও ‘রক্তগঙ্গা’ বইয়ে দেবে; আর এবারের রক্তগঙ্গা হবে ১৯৭৫ সালের চেয়ে ব্যাপক ও ‘নির্বিচার’। তাই ১৪ দলের ঐক্যকে চোখের মণির মতো রক্ষা করতে হবে; যতক্ষণ না জামাত-জঙ্গি-তেঁতুল-বিএনপি’র রাজনৈতিক-সাংগঠনিক বিনাশ হয়। ক্ষমতায় একবার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল, একবার মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের দল— রাজনীতির এই মিউজিক্যাল চেয়ার খেলা ভেস্তে দিয়ে সরকারে ও বিরোধী দলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল— এই রাজনীতির সূচনা পর্যন্ত সংহত রাখতে হবে বর্তমান ঐক্য।

এখানে ২০১৯ সালের ১৯ জানুয়ারি শনিবার দৈনিক কালের কণ্ঠে তৈমুর ফারুক তুষারের ‘১৪ দলীয় জোট না থাকলেও আপত্তি নেই শরিকদের’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদনে দেখা যাক। এতে বলা হয়েছে,”প্রায় ১৪ বছর ধরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোটে থাকা শরিক দলগুলো এখনো জোটবদ্ধ থাকতে চায়। তবে প্রধান শরিক আওয়ামী লীগ যদি জোট ভেঙে দিতে চায় সে ক্ষেত্রেও মানসিক প্রস্তুতি আছে অন্য শরিকদের।”

“বৃহস্পতিবার [১৭ জানুয়ারি ২০১৯] আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘১৪ দলের শরিকরা যদি সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসেন তবে তাঁদের জন্যও ভালো, আমাদের জন্যও ভালো।’ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের এমন বক্তব্যের পর গতকাল কালের কণ্ঠ’র পক্ষ থেকে শরিকদের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তাঁরা জানান, জোটে থাকা না থাকার বিষয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে এখনো কোনো আলোচনা হয়নি। যে রাজনৈতিক বাস্তবতায় জোট গঠন হয়েছিল, তা এখনো বিদ্যমান আছে। তবে আওয়ামী লীগ যদি মনে করে জোট ভেঙে দেবে সে ক্ষেত্রে দলগুলো নিজেদের অবস্থানে থেকে রাজনীতিতে ভূমিকা রাখার মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।

“সংসদের বিরোধী দলে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিরোধী দলে কেন যাব? আমরা ১৪ দলও করব আবার বিরোধী দলেও যাব? একসঙ্গে তো দুটো করা যায় না। আমরা তো জাতীয় পার্টি না যে সরকারি দল ও বিরোধী দল একসঙ্গে করব।’ মেনন বলেন, ‘নির্বাচনের পরে জোটের শরিকরা বিরোধী দলে যাবে এ ধরনের কোনো আলোচনা আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমাদের হয়নি।’

“জোট থাকা না থাকা প্রসঙ্গে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেছেন, ‘এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো আলোচনাই হয়নি। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যে রাজনৈতিক কারণে আমরা ঐক্য করেছি তা এখনো বিদ্যমান আছে। সে হিসাবে ঐক্য টিকে থাকাই সবার জন্য মঙ্গলজনক। আমরা মনে করি, ১৪ দলের প্রয়োজন এখনো আছে। তবে আওয়ামী লীগ যদি মনে করে ১৪ দলের প্রয়োজন নেই, তবে সেটা তারা বলবে। কিন্তু আওয়ামী লীগ কখনোই বলতে পারে না কে বিরোধী দলে বসবে আর কে সরকারি দলে বসবে। কে সরকারের পক্ষে বলবে আর কে বিরোধিতা করবে সেটা নিজ নিজ দল সিদ্ধান্ত নেবে। এই সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগ দিতে পারে না।’ ….।

“জাসদের সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জোটের বিষয়ে আমরা যেটাই করি তা আলোচনা করে করতে হবে। সম্প্রতি আমরা নির্বাচনে আমাদের শত্রুদের পরাজিত করেছি। অসাম্প্রদায়িক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শক্তির জয় হয়েছে। এখন জোটের বিষয়ে আমরা দ্রুত আলোচনায় বসব। আলোচনার মধ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’

“সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা চাই জোট থাকুক। কারণ এই জোটটি একটি রাজনৈতিক ব্র্যান্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে রাজনৈতিক বাস্তবতায় ১৪ দল গঠন হয়েছিল, আওয়ামী লীগ যদি মনে করে যে রাজনৈতিক বাস্তবতা এখন আর নেই, তবে তা ভুল হবে। তবে জোট থাকা না থাকার প্রশ্নে আমরা যেকোনো অবস্থার জন্য মানসিকভাবে তৈরি আছি।’ ….।

“ন্যাপের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘আওয়ামী লীগ যদি জোট না চায় তবে বৈঠকে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিতে পারে যে আপাতত জোটের দরকার নেই। এটা না করে কথা ছোড়াছুড়ি করে জোটের রাজনৈতিক মান নিচে নামানো হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ এখন বাম ঝোঁক থেকে সরে ডান দিকে ঝুঁকে পড়েছে। ফলে বামদের সঙ্গে জোট নিয়ে তাদের অনেকের মধ্যে অস্বস্তি থাকতে পারে।

“শরিক দলগুলোর একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জামায়াত বিএনপির আমলে আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে দলটির সঙ্গে জোটবদ্ধ হলেও শরিকদের কোনো ছাড় দেওয়া হয়নি। টানা দুই মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেও জেলা, উপজেলা পর্যায়ে ১৪ দলকে বিস্তৃত করা যায়নি। তৃণমূলে আওয়ামী লীগের কাছ থেকে কোনো ছাড় পায়নি ১৪ দলের শরিকরা। শুধু কেন্দ্রেই কিছুটা গুরুত্ব পেয়েছেন ১৪ দলের নেতারা। ফলে গত এক দশকে সাংগঠনিকভাবে লাভবান হয়নি ১৪ দলের শরিকরা। উল্টো আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করার পরে ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, সাম্যবাদী দল, গণতন্ত্রী পার্টি, ন্যাপ, তরীকত ফেডারেশন ভাঙনের কবলে পড়েছে।” বর্তমান লেখক এখানে এ শেষ অনুচ্ছেদটির ক্ষেত্রে বলে রাখতে চান যে তারপরও বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে এ রাজনৈতিক ঐক্য বজায় রাখতে হবে; আর বর্ণিত ভাঙনগুলোও ষড়যন্ত্রের উর্ধে নয়— তবে এ আলোচনা আপাতত উহ্য থাকাই শ্রেয়!

উত্থাপিত প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে এখানে এর দুই বছর দুই মাস আগে ২০১৬ সালের ৯ নভেম্বর প্রকাশিত ও প্রচারিত জাসদের একটি প্রচারপত্র হুবহু তুলে ধরা হচ্ছে। এর শিরোনাম ছিল ‘শান্তি ও উন্নয়নের জন্য জঙ্গি নির্মূল কর। জঙ্গি-সঙ্গী বর্জন ও বিচার কর। দুর্নীতি ও বৈষম্যের অবসান কর। সুশাসন ও সমাজতন্ত্রের বাংলাদেশ গড়’।

“প্রিয় দেশবাসী, “বেগম খালেদা জিয়া ও বিএনপির নেতৃত্বে বাংলাদেশের ওপর সশস্ত্র আক্রমণ পরিচালনাকারী জঙ্গিরা দেশের শান্তি ও উন্নয়নের ধারা নষ্ট করছে। জঙ্গি দমনে ১৪ দল ও মহাজোট সরকার প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে; পাশাপাশি ১৪ দল এদের চিরতরে নির্মূল করতে রাজপথে সংগ্রাম পরিচালনা করছে। তার বিপরীতে গণতন্ত্রের পথ ত্যাগ করে বেগম খালেদা জিয়া ও বিএনপি তাদের লেলিয়ে দেয়া জঙ্গিদের রক্ষার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেছে, দেশ ও জনগণের ওপর পাল্টা হামলার অপচেষ্টা করছে। এ অবস্থায় দেশে দুর্নীতি ও বৈষম্যের অবসান করতে এবং সুশাসন ও সমাজতন্ত্র কায়েমের লক্ষ্যে শান্তি ও উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য জঙ্গি নির্মূলের পাশাপাশি এখনই জঙ্গি-সঙ্গী বেগম খালেদা জিয়া ও বিএনপিকে বর্জন ও বিচার করতে হবে।

“প্রিয় দেশবাসী, “স্বাধীন বাংলাদেশে জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ সাল থেকে মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে— ১. পলাতক জামাত-শিবির-রাজাকার-আলবদরদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনে এবং বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পুরষ্কৃত করে; ২. পাকিস্তানের পক্ষ নেয়া যুদ্ধাপরাধী জামাত-শিবির ও নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলগুলোকে রাজনীতি করার অধিকার দেয়; ৩. নিজের দল বিএনপিতে ও সরকারের মন্ত্রিসভায় তাদেরকে ব্যাপকভাবে পুনর্বাসন করে; এবং ৪. পাকিস্তানী দ্বিজাতি তত্ত্ব অনুযায়ী বাংলাদেশী জাতিয়তাবাদ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি চালু করে।

“১৯৯১ সাল থেকে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি— ১. যুদ্ধাপরাধীদের সরকারের অংশীদারে পরিণত করে ও যুদ্ধাপরাধের বিচার-আন্দোলনের ওপর হামলা পরিচালনা করে; ২. সারা দেশে রাজনৈতিক-প্রশাসনিক উদ্যোগে অসংখ্য জঙ্গি দল-উপদল উৎপাদন-পুনরুৎপাদন শুরু করে; এবং ৩. এসব জঙ্গিদের দিয়ে জনগণের ওপর সশস্ত্র হামলা শুরু করে; এক সাথে ৫০০ স্থানে বোমা হামলা করে; আদালত-অফিস-সিনেমা=মন্দির-চার্চ-জনসভায় হামলা করে; এমনকি জননেত্রী শেখ হাসিনাকে একাধিকবার হত্যার চেষ্টা করে।

“এখানেই তাদের অপরাধ থেমে থাকেনি। ২০০৯ সাল থেকে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি— ১. জামাত-শিবিরকে সাথে নিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার জন্য নাশকতা-অন্তর্ঘাত শুরু করে; ২. হেফাজতের জঙ্গি তাণ্ডবে প্রকাশ্য সমর্থন দেয় ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের অপচেষ্টা করে; ৩. ৯৩ দিনের আগুনযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়ে শিশু-নারী-শ্রমিকদের জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা শুরু করে; ৪. একের পর এক গুপ্ত হত্যায় প্রকাশ্য সমর্থন দেয়া শুরু করে; এবং ৫. গুলশান-শোলাকিয়া-কল্যাণপুর-নারায়নগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে নিহত জঙ্গিদের পক্ষ নেয়, তাদের রক্ষার অপচেষ্টা করে।

“প্রিয় দেশবাসী, “বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি বাংলাদেশে সশস্ত্র জঙ্গিবাদের সমর্থনকারী, উৎপাদন ও পুনরুৎপাদনকারী, আশ্রয়-প্রশ্রয়দানকারী ও রক্ষাকারী। সশস্ত্র জঙ্গিদের নির্মূল করলেও দেশ জঙ্গি হামলার আশঙ্কা থেকে মুক্ত হবে না যদি বিএনপি এদের উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন বন্ধ না করে। বারবার অনুরোধ করার পরও বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি জঙ্গিদের ত্যাগ করেনি। তাই আজ জঙ্গিদের নির্মূল করার পাশাপাশি জঙ্গি-সঙ্গী বেগম খালেদা জিয়া ও বিএনপিকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থেকে বর্জন ও তাদের বিচার ছাড়া দেশকে জঙ্গিবাদের হামলা থেকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। গণতন্ত্রে যেমন জঙ্গির কোন স্থান নেই, তেমনি জঙ্গি উৎপাদন ও পুনরুৎপাদনকারীরও কোন স্থান নেই।

“জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ জঙ্গি নির্মূল ও জঙ্গি-সঙ্গীর বর্জন ও বিচারের দাবিতে সারা দেশে আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য সকল দেশপ্রেমিক শক্তির প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে।”
[আগামী কাল পঞ্চদশ পর্ব]

*মতামত বিভাগে প্রকাশিত সকল লেখাই লেখকের নিজস্ব ব্যক্তিগত বক্তব্য বা মতামত।