অবরুদ্ধ বঙ্গবন্ধু ও সংশপ্তক জাসদ: পর্ব ১৩

197

জিয়াউল হক মুক্তা:

[জিয়াউল হক মুক্তা জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক। এ রচনায় সপরিবারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পারিবারিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক-আর্থরাজনীতিক-অন্তঃদলীয়-আন্তঃদলীয়-প্রশাসনিক-গোয়েন্দা-আধাসামরিক-সামরিক-ভূরাজনীতিক প্রেক্ষাপট আলোচনা করা হয়েছে। এখানে বঙ্গবন্ধুর নিজের ভাষ্যের সাথে যোগ করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু-হত্যা বিচার-আদালতের বিচারকের পর্যবেক্ষণ ও কিছু সাক্ষ্যভাষ্য এবং বঙ্গবন্ধুতনয়া জননেত্রি প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনার ও তাঁর পরিজনদের কিছু বক্তব্য; এবং বর্তমান লেখকের গবেষণালব্ধ কিছু পর্যবেক্ষণ। সবশেষে প্রধানমন্ত্রির সদয় বিবেচনা ও সকলের আলোচনার জন্য যোগ করা হয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু হত্যা সত্যানুসন্ধান কমিশন’ বিষয়ক কিছু বিষয়গত ও কাঠামোগত প্রস্তাবনা। পাঠকদের সুবিধা বিবেচনায় লেখাটি ১৬ কিস্তিতে প্রকাশিত হচ্ছে; আজ প্রকাশিত হচ্ছে ত্রয়োদশ পর্ব।]

[গতকালের পর]
[৫] সেপ্টেম্বরে কর্নেল তাহেরকে মোশতাক নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের অনুরোধ জানিয়ে অর্থায়নের প্রস্তাব দিলে তিনি তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন।

[৬] মোশতাক আমলে “… মুজিব আমলে গ্রেফতারকৃত কোন জাসদ নেতা-কর্মীকে কারাগার থেকে মুক্তি দেয়া হল না। বরং মোশতাক আমলেও জাসদের উপর নির্যাতন অব্যাহত রইল।” [যৌথ কমিটি (১৯৯০): প্রাগুক্ত] এ বিষয়ে এখানে একটি উদাহরণ দেয়া যাক। বঙ্গবন্ধু হত্যার ১৫ দিন পর ১৯৭৫ সালের ৩০ আগস্ট খোন্দকার মোশতাকের শাসনামলে জাসদের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার এমপি তার বেইজ এলাকা রংপুর থেকে গ্রেফতার হন ও অমানুষিক নিপীড়নের শিকার হন। ২৫ অক্টোবর তাঁকে ঢাকায় এনে গোয়েন্দা বিভাগের অধীনে রিমান্ডে রাখা হয় আরও এক সপ্তাহ; আর আরও এক দফা নির্যাতন চালানো হয়। ৩ নভেম্বর ভোরের কুখ্যাত জেল-হত্যার পরপরই তাঁকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রেরণ করা হয়। ১৯৭৭ সালের ১৩ জুলাই তিনি মুক্তি পান।

[৭] “আওয়ামী লীগের স্বেচ্ছাচারী রাজনীতির নিকৃষ্টতম ষড়যন্ত্রকারী অংশ— যা মোশতাকের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছিল— জাসদ তাকে উচ্ছেদ করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করলো। ফলে মোশতাক সরকার জাসদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। আর এক দফায় জাসদ নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করা হলো, কম্বিং অপারেশন চালানো হলো; মোশতাককে প্রতিরোধ করতে গিয়ে জাসদ এবং গণবাহিনীর অনেকে শহীদ হলেন।” [যৌথ কমিটি (১৯৯০): প্রাগুক্ত] এখানেও একটা উদাহরণ দেয়া যাক। মোশতাক-রশীদ-ফারুকচক্রের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামে মিছিল সংগঠিত করার অপরাধে— মুক্তিযুদ্ধে ১৫৪ নম্বর প্লাটুনের প্লাটুন-কমাণ্ডার ও জাসদের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগ চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার সাধারণ সম্পাদক আবু তাহের খান খসরুকে— ১৯৭৫ সালের ৪ অক্টোবর খন্দকার মোশতাকের পেটোয়া বাহিনী তুলে নিয়ে যায়। চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর হাজি ক্যাম্পে নিয়ে তাঁকে অমানবিক নির্যাতন করা হয় এবং এক সপ্তাহ ধরে ধারাবাহিকভাবে নির্যাতন চালিয়ে ১০ অক্টোবর তাঁকে হত্যা করা হয়। এ বীর মুক্তিযাদ্ধা ও ছাত্রনেতা অতীতে দোহাজারী ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন।

উল্লেখ অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে ১৫ আগস্টের পর ৩ নভেম্বর যে ক্যু হলো, তাকে বঙ্গবন্ধু-হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান হিসেবে চালানোর চেষ্টা হয়েছিল একসময়। সেসূত্রে ‘মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস’ নামে একটা দিবসও বাজারজাতকরণের চেষ্টা হয়েছিল বিশ/পঁচিশ বছর আগে। সিপিবি ও আওয়ামী লীগের কেউ কেউ এতে হাওয়া দেয়ারও চেষ্টা করেছেন। কিন্তু দল হিসেবে আওয়ামী লীগ বা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা এগুলোকে পাত্তা দেননি। ফলে সে প্রয়াস ব্যর্থ হয়েছে। ৩ নভেম্বর ক্যু’র পর বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সাথে নেগোশিয়েট করে খুনীদের দেশ থেকে চলে যেতে দেয়া হয়েছে— যদিও এর মধ্যে এদিন ভোরে কারাগারের অভ্যন্তরে আওয়ামী লীগের চার নেতাকেও হত্যা করা হয়ে গিয়েছে। অভ্যুত্থান সংঘটনকারীদের প্রধান হয়ে খালেদ মোশাররফ বা তার অপরাপর সহযোগীগণ কেউ তা জানতেন না এ অবিশ্যাস্য। তথাকথিত ‘চেইন অব কমান্ড’ প্রতিষ্ঠার বুলির আড়ালে ব্যস্ত খালেদ মোশাররফের তখন মূল লক্ষ্য ছিলো নিজের প্রমোশন ও একই সাথে ক্ষমতারোহন।

খুবই চিত্তাকর্ষক ব্যাপার, যা কেউ কখনও আলোচনা করেন না— ৩ নভেম্বর ক্যু’র মূল সংগঠকরা— তিন দিনের মাথায়— ৬ নভেম্বরে— ব্রিগেডিয়ার নূরুজ্জামানের নেতৃত্বে [শাফায়াত জামিলকে সাথে নিয়ে], কর্নেল গফফার ও মেজর নাসিররা— পরিকল্পনা করেন খালেদ মোশাররফের বিরুদ্ধে আরেকটি ক্যু সংগঠনের— পরবর্তী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে। এর বিস্তারিত পাওয়া যাবে মেজর (অব.) নাসির উদ্দিনের ‘গণতন্ত্রের বিপন্ন ধারায় বাংলাদেশের সশস্ত্রবাহিনী’ বইয়ের ১৩৬–১৩৭ পৃষ্ঠায়। আর বঙ্গবন্ধু-হত্যায় শাফায়াত জামিল, খালেদ মোশাররফ ও জিয়াউর রহমানের ভূমিকা কী তা এ রচনায় আগেই দেখানো হয়েছে।

প্রসঙ্গত, অন্যদিকে, আরও চিত্তাকর্ষক ব্যাপার হলো, একই সময়ে খালেদ মোশাররফও রাষ্ট্রপ্রধান হবার জন্য আবারও ক্যু’র পরিকল্পনা করছিলেন ও ঢাকায় শক্তিসমাবেশ করছিলেন। এখানেও রক্ষিবাহিনীর ডেপুটি ডিরেক্টর অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল সারোয়ার হোসেন মোল্লার বই থেকে সেনাবাহিনীর তথ্য ও সেনাকর্মকর্তাদের বিশ্লেষণ দেখা যাক, “… ২ নভেম্বরের ক্যুর ব্যর্থতা এবং জাসদ ও গণবাহিনী সমর্থিত ৭ নভেম্বর বিপ্লব সম্পর্কে ব্রিগেডিয়ার সাবিহউদ্দিন এবং সংশ্লিষ্ট অন্য কর্মকর্তাদের বক্তব্যের মর্মার্থ অনেকটা এমন দাঁড়ায় যে, ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ যদি শুধু সেনাপ্রধান হতে চাইতেন, তা তিনি সহজেই হতে পারতেন। কিন্তু তার আসল উদ্দেশ্য ছিল একই সঙ্গে সেনা ও রাষ্ট্রপ্রধানের পদ লাভ করা। সেই লক্ষ্যে [তিনি] ব্যক্তিগত শক্তি সুসংহত করতে এবং একটি সাংবিধানিক পথ উদ্ভাবনের কাজে বেশি সচেষ্ট ছিলেন। এমন চিন্তা করার পেছনে প্রথম কারণ — ৩ নভেম্বর সকালেই ক্যু-এর সপক্ষে কারণগুলো ব্যাখ্যা করে একটি ঘোষণাপত্র লিখে তার হাতে দিয়ে তা বেতারে পাঠ করার জন্য বলা হয়, যাতে করে দেশের মানুষ অন্ধকারের মধ্যে না থেকে প্রকৃত অবস্থাটা জানতে পারে। কিন্তু বারবার অনুরোধের পরও তিনি তা বেতারে ঘোষণা করেননি। শেষের দিকে এক সময় তিনি জানান, ঘোষণার কপিটি খুঁজে পাচ্ছেন না। আরেকটি লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, যুদ্ধের সময় তার অনুগত সেক্টর-২-এর অফিসারদের ঢাকায় একত্রিত করা। অনেক পর্যবেক্ষক এমনও মত পোষণ করেন যে, ‘Brig. Khaled Mosharraf was trying to stage a coup within a coup.’ ২ থেকে ৬ নভেম্বর সারা দেশের মানুষ থাকে অন্ধকারে। ঢাকা শহর পরিণত হয় গুজবের শহরে।”

এভাবে মোশতাক-রশিদ-ফারুকের ১৫ আগস্টের ক্যু ও খালেদ-শাফায়াতের ৩ নভেম্বরের ক্যু’র পর— আবারও ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামানের নেতৃত্বে আরেকটি ক্যু আর ক্ষমতারোহনের জন্য ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে নতুন করে আরও একটি ক্যু-পরিকল্পনার প্রেক্ষাপটে— ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর— [১] বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নেতৃত্বে, [২] বিপ্লবী গণবাহিনীর সহায়তায়, ও [৩] জাসদের সমর্থনে— সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক সুমহান সিপাহী জনতার অভ্যুত্থান। ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের ক্যু’র প্রেক্ষাপটে সিপাহী-জনতার এ অভ্যুত্থান সংঘটনের প্রধানতম অনুপ্রেরণা হলো ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার ১২ দফা’।

বহু রাজনৈতিক সাহিত্যে ও গবেষণাপত্রে এ ১২ দফা দশক দশক ধরে প্রকাশিত হয়ে চলেছে, কিন্তু কোথাও আজ পর্যন্ত তা পুরোপুরিভাবে বিশ্লিষ্ট হয়নি। ১২ দফার প্রথম দফায় বলা হয়েছে, “… ধনিক শ্রেণি তাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য আমাদের ব্যবহার করেছে। পনেরই আগস্টের ঘটনা এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আমাদের এবারের বিপ্লব ধনিক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষার জন্য নয়। …”

৭ নভেম্বরের এ অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়েছে— কারণ— অভ্যুত্থানের সামরিক দিকটির সাফল্যের পরপরই অতি দ্রুত পাকিস্তানপন্থার মোশতাক চক্র, পাকিস্তানপন্থার সামরিক-বেসামরিক গোয়েন্দা-চক্র ও সেনাবাহিনীর পাকিস্তানফেরত সামরিক অফিসাররা জিয়ার সাথে যোগ দিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে জাসদ-গণবাহিনী-সৈনিক সংস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবিপ্লব সংগঠিত করে। এর বিস্তারিত বিবরণ আছে লরেন্স লিফস্যুলৎসের ‘বাংলাদেশ: দি আনফিনিশড রেভ্যুল্যুশন’ বইয়ের প্রথম খণ্ডে। ৭ নভেম্বর সকালেই মোশতাক-ঠাকুরচক্র বেতারকেন্দ্রে গিয়ে ভাষণ দেয়ার চেষ্টা করেন; তাদেরকে সেখান থেকে বের করে দেয়া হয়। অভ্যুত্থানে গণসমাবেশের দিকটি বানচাল করতে গোয়েন্দা বাহিনীগুলো ৮ নভেম্বর শহীদ মিনারের জনসভা গোলাগুলি করে বানচাল করে দেয়; ৯ নভেম্বর বায়তুল মোকাররমের জনসভাও বানচাল করে দেয়। পাকিস্তানপন্থার ও পাকিস্তানফেরত অফিসাররা জিয়ার সহায়তায় ক্রমে অভ্যুত্থানের বিজয় বানচাল করে দেয়। ২৪ নভেম্বর কর্নেল তাহেরকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৭৬ সালে কর্নেল তাহের ও জাসদ নেতাদের গোপন সামরিক আদালতে বিচার প্রহসনের মাধ্যমে দণ্ড দেয়া হয়। ২১ জুলাই ১৯৭৬ তারিখে কর্নেল আবু তাহের বীরউত্তমকে হত্যা করা হয়। সারাদেশে জাসদের ওপর নেমে আসে নৃশংস নির্যাতন-নিপীড়ন-গুম-খুন। বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে দল।

১৫ আগস্টের ক্যু ও বঙ্গবন্ধু-হত্যা, ৩ নভেম্বরের ক্যু-র [আর সাম্প্রতিক-তথ্যে ৬ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের বিরুদ্ধে আরেকটি ক্যু সংগঠনের পরিকল্পনা ও ৩ নভেম্বরের ক্যুর ভেতরে আরেকটি ক্যু সংগঠনে খালেদের পরিকল্পনার] প্রেক্ষাপটে ৭ নভেম্বরের মহান সিপাহী জনতার অভ্যুত্থান— এ অতিসুনির্দিষ্ট ঘটনাবলীর তথ্য-উপাত্তের ‘তাত্ত্বিক অনুধাবন’ কী?

প্রথমত, [১] ১৯৭২ সালের শুরু থেকে আমলাতন্ত্র, গোয়েন্দা বিভাগ, সেনা পুলিশ, প্রতিরক্ষা গোয়েম্দা ও সশস্ত্রবাহিনীতে পাকিস্তানপ্রেমীদের অব্যাহত পুনর্বাসন ও পদায়ন; ও [২] দীর্ঘ এক দশক ধরে গড়ে ওঠা জাতীয় মুক্তি ও স্বাধীনতা সংগ্রামের শক্তির ১৯৭২ সালের জুলাই ও অক্টোবরের দ্বিবিভাজন এবং আওয়ামী লীগের ভেতরে আরও উপ-দলীয় ও উপ-উপ-দলীয় কোন্দল; আর—

দ্বিতীয়ত, [৩] ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টে ১৯৭১-এর পরাজিতদের প্রথম সংগঠিত আক্রমণটি হলো— আওয়ামী লীগ ও বাকশালে ঘাপটি মেরে থাকা তাদের নিকৃষ্টতম রাজনীতিকদের নেতৃত্বে পাকিস্তানপ্রেমীদের মাধ্যমে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ইঙ্গিতে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যা; ও [৪] ১৯৭৫-এর ৭ নভেম্বরের পর ১৯৭১-এর পরাজিতদের দ্বিতীয় সংগঠিত আক্রমণটি হলো— বঙ্গবন্ধুর খুনিদের নেতৃত্ব পাকিস্তানপ্রেমী গোয়েন্দা-সেনা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে মহান সিপাহী জনতার অভ্যুত্থান বানচাল করে দেয়া ও জাসদের ওপর হায়েনার মতো হামলে পড়া।

এতে দিবালোকের মতো স্পষ্ট প্রমাণিত হয়—
বঙ্গবন্ধু হত্যাকারী ও জাসদ-বিনাশপ্রয়াসকারীরা একই গোষ্ঠি।

স্বাধীন দেশের ইতিহাসে সূচিত হলো এক দীর্ঘমেয়াদী অন্ধকার যুগ। এ অন্ধকার যুগে ১৯৭১-এর পরাজিত ও ১৯৭৫-এর বিজয়ীদের বিরুদ্ধে আলোর দিশারীর মতো রুখে দাঁড়ালো বাংলার সংশপ্তক— জাসদ।

[১] ১৯৭১-এর পরাজিত মতাদর্শের অনুসারীগণ ১৯৭৫-এ প্রথমত বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলেন ও দ্বিতীয়ত জাসদ-বিনাশ শুরু করলেন। তাই— বিপরীত পক্ষে [২] ১৯৭৫ সালের পর থেকে আওয়ামী লীগ ও জাসদ এবং অন্য যেসব দল মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের অনুসারী তাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া আবশ্যক হয়ে ওঠলো— ওই ১৯৭১-এর পরাজিত ও ১৯৭৫-এর বিজয়ীদের বিরুদ্ধে— ১৯৭১-এর অর্জন পুনরুদ্ধার করতে। জাসদ এ ‘তাত্ত্বিক অনুধাবন’ ‘প্রায়োগিক রাজনীতি’তে ব্যবহারের চেষ্টা করতে লাগলো।

১৯৭৫ সাল থেকেই জাসদ উল্লিখিত ঐক্যের রাজনীতি প্রয়োগের সর্বাত্মক চেষ্টা করতে থাকলো বছরের পর বছর ধরে; ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ে কিছু উদ্যোগ ব্যর্থ হলো আর কিছু সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে গিয়েও সফল হলো না; আর অবশেষে তা সফলও হলো, কিন্তু সে অনেক পরে, বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রায় তিরিশ বছর পর ২০০৪ সালে; ততদিনে ১৯৭১-এর পরাজিত ও ১৯৭৫-এর বিজয়ীরা এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়ে ধর্মীয় জঙ্গিবাদ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। জাসদের এ ঐক্য-প্রয়াসের ইতিহাস দেখা যাক—

[১] আওয়ামী লীগ ও বাকশাল বনাম জাসদ— এই যে বিরোধ ও সংগ্রাম— সে পরিস্থিতি পুরোপুরি উল্টে গেল ১৫ আগস্ট ও ৭ নভেম্বর। বঙ্গবন্ধু হত্যাকারী ও জাসদ-বিনাশপ্রয়াসকারীরা একই গোষ্ঠি, আর বিপরীতক্রমে বললে আওয়ামী লীগ ও জাসদের শত্রুও একই গোষ্ঠি।

[২] ১৯৭৫ সালে মোশতাক আমলে নিষিদ্ধ-অপ্রকাশ্য-গোপন জাসদ একা সংগ্রামের সূচনা করলো; পরে জাসদের প্রচার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় অতি দ্রুত ঐক্যবদ্ধভাবে জাসদ-ইউপিপি-জাগমুই মোশতাকের বিরুদ্ধে প্রচার আন্দোলন পরিচালনা করলো— যদিও তা দীর্ঘমেয়াদী হতে পারেনি। আওয়ামী লীগ ও ন্যাপ-সিপিবির তখন কোন সাংগঠনিক অস্তিত্ব ছিলো না।

[৩] ১৯৭৫ সালের ২২ ডিসেম্বর জাসদ ‘সাম্রাজ্যবাদী-আধিপত্যবাদী ষড়যন্ত্রকে রুখে দাঁড়ান: জঙ্গী জনতার ঐক্য গড়ে তুলুন’ শিরোনামের একটি পুস্তিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে আবারও ‘গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল’ শক্তির ঐক্যের আহ্বান জানালেও তাতে অন্য কোন দল সাড়া দেয়নি।

[৪] ১৯৭৬ সালে নানা ধর্মভিত্তিক দল রাজনীতি করার অধিকার ফিরে পায়। আওয়ামী লীগ রাজনীতি করার সুযোগ পায় ১৯৭৬ সালের ৪ নভেম্বর। জাসদ ও সিপিবিকে ১৯৭৮ সালের আগে সে অধিকার দেয়া হয়নি। জাসদ বা সিপিবিকে প্রকাশ্য হতে দেয়ার জন্য অন্য কোন দল কোন দাবি জানায়নি।

[৫] ১৯৭৭ সালে জিয়ার টিকে থাকার কৌশল ‘হ্যাঁ-না’ গণভোট বর্জন করলো আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ-অপ্রকাশ্য-গোপন জাসদ; জিয়া প্রশ্নে আওয়ামী লীগ ও জাসদের নীতিগত অবস্থান এক হলেও কোন নীতিগত বা জোটগত ঐক্য হয়নি। সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির পরামর্শে সিপিবি ‘হ্যাঁ’র পক্ষে অবস্থান নেয় ও পরবর্তীকালে জিয়ার সাথে খাল কাটতে যায়— তা আগেও বিস্তারিত বলা হয়েছে।

[৬] ১৯৭৮ সালে জাসদ ও সিপিবি সাংগঠনিক রাজনীতির অধিকার ফিরে পায়। এ বছর জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট থেকে জিয়াউর রহমান ও জাতীয় ঐক্যজোট থেকে এমএজি ওসমানী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন। জাতীয় ঐক্যজোটে ছিলো আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, সিপিবি ও গণআজাদী লীগ; যদিও এ নির্বাচন ছিল ভোটারবিহীন নির্বাচন; লক্ষ্য ছিলো জিয়াকে বৈধতা দান। তখনও জাসদের প্রায় সকল নেতা-কর্মী কারাগারে; নির্বাচনে জাসদ কাউকে সমর্থন দেয়নি; অংশগ্রহণের তো প্রশ্নই আসেনা।

[৭] ১৯৭৭-১৯৭৮ সালের অভিজ্ঞতা থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সামরিক আইন প্রত্যাহারের আগে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত থাকলেও ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জাসদ ও আওয়ামী লীগসহ সব দল গণআকাঙ্ক্ষার বাইরে গিয়ে তাতে অংশগ্রহণ করে। জাসদ রাজপথে বা নির্বাচনে কোন ঐক্য গড়ে তুলতে না পারলেও এ সময় ছাত্রঅঙ্গনে সংগ্রামী ছাত্র ঐক্য গড়ে তুলতে সক্ষম হয়, ভবিষ্যত রাজনীতিতে যা বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখে।

[৮] ১৯৮০ সালে খুলনা জেল হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে জাসদ ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১০ দলীয় ঐক্যজোট গঠন করে জিয়ার বিরুদ্ধে সংগ্রাম গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হলে আফম মাহবুবুল হক, খালেকুজ্জামান ভূঁইয়া ও আব্দুল্লাহ সরকার প্রমুখ দলত্যাগ করেন; বাসদ গঠন করেন। জাসদের শক্তিক্ষয় হলো, কাঙ্খিত ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন আর হলো না। বলে রাখা ভালো এই বাসদ পরবর্তীতে ১৫ দলে জাসদ ও আওয়ামী লীগের সাথে ঐক্য করেছিল।

[৯] ১৯৮১ সালে জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি ও সমাজবাদী দল ত্রিদলীয় ঐক্যজোট গঠন করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। এর বাইরে আওয়ামী লীগের, ন্যাপ-সিপিবির, অপরাপর বাম দলের ও ধর্মীয় দলগুলোর আলাদা আলাদা প্রার্থী ছিলেন। জাসদ উল্লিখিত তিন দলের বাইরে অপরাপর বাম দলে ও তারও বাইরে ঐক্যকে সম্প্রসারিত করে বাম-ঐক্য ও বৃহত্তর ঐক্য গড়ার চেষ্টা করলেও তা সফল হয়নি; যদিও সে সময় বামপন্থীদের মধ্যে কিছু কর্মসূচিগত ঐক্য হয়েছিল।

[১০] ১৯৮১ সালে জাসদের কাউন্সিল বিভিন্ন শ্রম-কর্ম-পেশার জনগণের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তার বাস্তবায়ন করা হয়; পরে এরশাদ-স্বৈরাচার বিরোধী গণআন্দোলনে পেশাজীবীদের এসব ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।

[১১] ১৯৮২ সালে সামরিক শাসন কায়েম হতে পারে সে বিষয়ে জাসদ সচেতন ছিল। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এরশাদের ক্ষমতা দখলের পর জাসদের সহযোগী ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ছাত্রদের মধ্যে দ্রুত সামরিক শাসন বিরোধী ঐক্য গড়ে তুলতে সক্ষম হয়; দুর্বার আন্দোলন গড়ে ওঠে। ১৯৮৩-র মধ্য ফেব্রুয়ারির ছাত্র আন্দোলনের পর— ইতোপূর্বে ত্রিদলীয় ঐক্যজোটকে সম্প্রসারিত করার জন্য জাসদের নেতৃত্বে ও উদ্যোগে যে বাম-সমঝোতা হয়— তার আরও সম্প্রসারণ হয়— আর আওয়ামী লীগ ও অপরাপর দল নিয়ে— গঠিত হয় ১৫ দল।

আন্দোলন এগোতে থাকে। কিন্তু সিপিবি চিরাচরিত নিয়মে গণবিরোধী অবস্থান নেয়; তারা বলতে শুরু করে যে ‘নির্বাচনের আগে সামরিক আইন প্রত্যাহার হল কথার কথা, এটা কোন শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়’। আগেও বলা হয়েছে যে ১৯৮৬-র ২১ মার্চ সিপিবির ষড়যন্ত্রে ১৫ দল ভেঙে ৮ দল ও ৫ দল হয়; আওয়ামী লীগ ও সিপিবির নেতৃত্বে ৮ দল ১৯৮৬-র ৭ মে’র নির্বাচনে যায়। বৃহত্তর ঐক্যের জন্য জাসদের দীর্ঘ দিনের প্রয়াস সফল হতে হতেও ব্যাহত হয়।

জাসদ ৫ দল নিয়ে নির্বাচন বর্জন করে আন্দোলনে থাকে। পরে জাসদের অব্যাহত প্রচেষ্টায় ৫ দল, ৮ দল ও ৭ দলের যুগপৎ আন্দোলন চলতে থাকে; কিন্তু আন্দোলনের নেতৃত্বের নমনীয়তার কারণে ১৯৮৭-র শেষ দিক থেকে ১৯৮৮-র শুরুর দিক পর্যন্ত সময়ে আন্দোলন বিজয়ের কাছাকাছি গিয়েও সফল হয় না। ১৯৮৭ সাল থেকে এরশাদ আন্দোলনের গণতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধে জামাত-শিবির ও ফ্রিডম পার্টিকে লেলিয়ে দেয়; জাসদ ও পাঁচ দল এবং ৫ দলের সহযোগী সংগঠনগুলো তা মোকাবেলা করে; বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী খুনি রশিদ-ফারুকের ফ্রিডম পার্টিকে মোকাবেলায় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীগণ সারাদেশে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন।

১৫ দল ভেঙে ৮ দল নির্বাচনে গেলেও দুই বছরের কম সময়ের মধ্যে তাদেরকে সংসদ থেকে পদত্যাগ করে রাজপথে ফিরে আসতে হয়। ১৯৮৮-র ৩ মার্চের নির্বাচন ৫ দল, ৮ দল ও ৭ দল বর্জন করে। অবশেষে সকল শ্রেণি-পেশা, বিশেষত ছাত্রদের জঙ্গি ভূমিকা এবং তিন জোটের [৫ দল, ৮ দল ও ৭ দল] যুগপৎ আন্দোলনে ১৯৯০ সালের ৪ ডিসেম্বর এরশাদ পদত্যাগের ঘোষণা দেন ও ৬ ডিসেম্বর তার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
[আগামী কাল চতুর্দশ পর্ব]

*মতামত বিভাগে প্রকাশিত সকল লেখাই লেখকের নিজস্ব ব্যক্তিগত বক্তব্য বা মতামত।