অবরুদ্ধ বঙ্গবন্ধু ও সংশপ্তক জাসদ: পর্ব ১২

187

জিয়াউল হক মুক্তা:

[জিয়াউল হক মুক্তা জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক। এ রচনায় সপরিবারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পারিবারিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক-আর্থরাজনীতিক-অন্তঃদলীয়-আন্তঃদলীয়-প্রশাসনিক-গোয়েন্দা-আধাসামরিক-সামরিক-ভূরাজনীতিক প্রেক্ষাপট আলোচনা করা হয়েছে। এখানে বঙ্গবন্ধুর নিজের ভাষ্যের সাথে যোগ করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু-হত্যা বিচার-আদালতের বিচারকের পর্যবেক্ষণ ও কিছু সাক্ষ্যভাষ্য এবং বঙ্গবন্ধুতনয়া জননেত্রি প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনার ও তাঁর পরিজনদের কিছু বক্তব্য; এবং বর্তমান লেখকের গবেষণালব্ধ কিছু পর্যবেক্ষণ। সবশেষে প্রধানমন্ত্রির সদয় বিবেচনা ও সকলের আলোচনার জন্য যোগ করা হয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু হত্যা সত্যানুসন্ধান কমিশন’ বিষয়ক কিছু বিষয়গত ও কাঠামোগত প্রস্তাবনা। পাঠকদের সুবিধা বিবেচনায় লেখাটি ১৬ কিস্তিতে প্রকাশিত হচ্ছে; আজ প্রকাশিত হচ্ছে দ্বাদশ পর্ব।]

[গতকালের পর]
১৯৭৪ সাল। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু-কথিত চাটার দল আর চোরের দল আর নরপশুর দল সারা দেশের দখল নিয়ে নিয়েছে। দুর্নীতি-লুটপাট-কালোবাজারি-মজুদদারি-চোরাকারবারি আর সন্ত্রাস-নৈরাজ্য-দুঃশাসনে দেশ টালমাটাল। জেডএইচ খান সম্পাদিত চার খণ্ডে প্রকাশিত ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নির্বাচিত ভাষণ’ গ্রন্থে বঙ্গবন্ধুকে পাঠ করলে বিস্তারিত বোঝা যায় যে এদের বিরুদ্ধে তিনি ব্যাপকভাবে সোচ্চার থাকলেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলেন না— দল-প্রশাসন-পুলিশ-সেনা-গোয়েন্দা— সব ছিল তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী নামানো হলে তারা দেখতে পায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পরিবারগুলোতে রয়েছে একটির পরিবর্তে একাধিক— এমনকি ১০/১২টি করে— রেশন কার্ড। এ বছরের শুরু থেকেই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল আসন্ন দুর্ভিক্ষের; আর তা এসেওছিল; চলেছিল বছরের শেষ পর্যন্ত।

এসময় জাসদ চাটার দল ও চোরের দল ও নরপশুর দলের বিরুদ্ধে সারা দেশে ‘প্রত্যক্ষ কর্মসূচি’র অংশ হিসেবে ‘ঘেরাও’ ঘোষণা করে— সারা দেশে কেন্দ্র থেকে প্রান্ত পর্যন্ত দুর্নীতির কেন্দ্র এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি-আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো ঘেরাওয়ের কর্মসূচি দেয়। এগুলোর মধ্যে ছিল— রেডক্রসের চেয়ারম্যান, মহল্লা ত্রাণ কমিটির চেয়ারম্যান, বেআইনী গাড়ি-বাড়ি-জমি-সম্পত্তির দখলদার, রাষ্ট্রীয় বাণিজ্য সংস্থা, ভূয়া লাইসেন্সধারী, সরকারি আমদানি-রফতানি নিয়ন্ত্রকের অফিস, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট, কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন, কেন্দ্রীয় কারাগার, সচিবালয়, পরিকল্পনা কমিশন, মন্ত্রি-উপমন্ত্রি-এমপিদের অফিস ও বাসা, বেতার-টিভি ও সরকার নিয়ন্ত্রিত সংবাদপত্র, রক্ষীবাহিনীর কার্যালয় এবং বিভিন্ন সরকারি ও আধাসরকারি প্রতিষ্ঠান। এসব কর্মসূচির সিদ্ধান্ত হয়েছিল দলের সভায়, ঘোষণা করা হয়েছিল আনুষ্ঠানিকভাবে, সারা দেশে তা জানানো হয়েছিল সাংগঠনিকভাবে, সরকারকেও সময় বেঁধে দেয়া হয়েছিল, আর পত্র-পত্রিকায়ও এসব প্রকাশিত হয়েছিল স্বাভাবিকভাবে। এসব কর্মসূচির উদ্বোধন হয়েছিল ঢাকায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাও কর্মসূচি পালনের মধ্য দিয়ে— ১৭ মার্চ ১৯৭৪ সালে— ঘোষণা ছিল এসব কর্মসূচি সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়ার।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে সারা দেশে যাতে ঘোষিত কর্মসূচিগুলো পালিত/বাস্তবায়িত হতে না পারে— তার জন্য প্রথম দিনের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও স্মারকলিপি প্রদানের কর্মসূচিতে পেছন থেকে চার্জ করে রক্ষীবাহিনী— অতর্কিতে, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের দিক থেকে এসে। সরাসরি গুলি চালায় জাসদ নেতকর্মীদের ওপর; ৫০ জন শহীদ হন, অসংখ্য আহত হন, আর গ্রেফতার হন দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ অনেক নেতাকর্মী। জাসদ-বিরোধী অনেকে বলে থাকেন যে জাসদের নেতাদের কেউ কেউ গুলি করে এ ঘটনার সূচনা করেন; কিন্তু পরদিন দেশের সরকার সমর্থক সবগুলো পত্র-পত্রিকা সেদিনের সকল ঘটনার অনুপুঙ্খ বিবরণ দিয়েছে [দৈনিক ইত্তেফাক এমনকি ঘণ্টা-মিনিট ধরে ধরে ধারাবিবরণী ছেপেছে] এবং বাংলাদেশ বিষয়ে বিভিন্ন দেশের ডিক্লাসিফাইড গোয়েন্দা প্রতিবেদনও এখন সহজলভ্য— এসবের কোনোটিতেই জাসদ সংঘর্ষের সূচনা করেছে এমন কোন তথ্য থাকা তো দূরের কথা, তার কোন ইঙ্গিতও নেই। এমনকি কোথাও এ তথ্যও নেই যে সেখানে তথাকথিত ‘সংঘর্ষ’ হয়েছে— সকল প্রতিবেদন জানায় যে হামলা হয়েছিল আকস্মিক ও একতরফাভাবে রক্ষীবাহিনীর দিক থেকে— পুলিশ বাহিনীর দিক থেকে নয়।

পরদিন ১৮ মার্চ দুপুরে জ্বালিয়ে দেয়া হয় জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়; হামলা করে তছনছ করা হয় দলের মুখপত্র দৈনিক গণকণ্ঠের কার্যালয়। শেখ মনির পত্রিকা ‘বাংলার বাণী’ তার পর দিন ১৯ মার্চ ৮ কলামে পরিবেশন করে উদ্ধত শিরোনামের সংবাদ— ‘নেতারা পালিয়ে যান। কেউ হতাহত হয়নি। জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ভস্মীভূত।’ ১৭ মার্চেই সিপিবির কেন্দ্রীয় সম্পাদকমন্ডলির দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, “আমাদের পার্টি সুস্পষ্টভাবেই মনে করে যে, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ও উহার রাজনীতি দেশ ও জাতির স্বার্থবিরোধী। দেশ ও জনগণের স্বার্থেই এই রাজনীতির মোকাবেলা করা দরকার।”

১৭ মার্চ রাত থেকেই সারা দেশে শুরু হয় নবউদ্যমে জাসদ দমনের নৃশংস অভিযান। জাসদ নেতা-কর্মীদের আত্মগোপনে চলে যেতে হয়; রক্ষীবাহিনীর হামলা মোকাবেলায় কোথাও কোথাও জাসদের সহযোগী সংগঠনগুলোর উদ্যোগে গড়ে তোলা হয় ‘স্বেচ্ছাসেবী দল’। বছরের শেষে ২৮ ডিসেম্বরে ঘোষণা করা হয় জরুরি অবস্থা; স্থগিত করা হয় সকল মৌলিক অধিকার। এ পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বিপ্লবী সরকার কায়েমের বদলে সংসদীয় রাজনীতির যে চিরায়ত ধারা প্রবর্তন করা হয়েছিল— সে সংসদীয় রাজনীতিতে জাসদকে বাধা দেয়ার ধারাবাহিকতায়, আবারও—সর্বোতভাবে জাসদকে বাধা দেয়া হলো নিরস্ত্র শান্তিপূর্ণ গণঅভ্যুত্থানমূলক রাজনীতিতেও।

অবশেষে ১৯৭৩ সালের ১৪ অক্টোবর আত্মপ্রকাশিত ‘গণ ঐক্যজোট’-এর পথ ধরে— ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একক ‘জাতীয় দল’ ‘বাকশাল’ কায়েম আর একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হলো, যাকে অনেকে পার্লামেন্টারি ক্যু’ও বলে থাকেন; ২৪ ফেব্রুয়ারি বাকশালের সাংগঠনিক কাঠামো গঠন করা হলো; ২৮ এপ্রিল জাসদের সংসদ সদস্যপদ শূন্য ঘোষণা করা হলো; ৬ জুন বাকশালের সংবিধান, কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটি ও কেন্দ্রীয় কমিটি এবং অঙ্গ সংগঠনগুলোর কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষিত হলো। সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ জাসদ সশস্ত্র-গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক লাইন গ্রহণ করলো; গড়ে তুললো ‘বিপ্লবী গণবাহিনী’— চোর-ডাকাত নিয়ন্ত্রণ, শ্রমিকের মজুরি আদায়ের সংগ্রাম, খাস জমি বণ্টন ইত্যাদি গণমুখী কার্যক্রম পরিচালনার ধারায় ‘বিপ্লবী গণবাহিনী’ ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করলো। নিষিদ্ধ গোপন জাসদের এছাড়া আর কোন উপায় ছিল না।

আগস্ট ১৯৭৫। জাসদের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দসহ সারা দেশের প্রায় সকল উল্লেখযোগ্য নেতৃবৃন্দ ও কর্মী-সদস্যগণ তখন কারাগারে অন্তরীণ। যারা কারাগারের বাইরে, তারা জীবন নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন এক আশ্রয় থেকে অন্য আশ্রয়ে। এসময় ইতোমধ্যে বর্ণিত পারিবারিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক-আর্থরাজনীতিক-অন্তঃদলীয়-আন্তঃদলীয়-প্রশাসনিক-গোয়েন্দা-আধাসামরিক-সামরিক-ভূরাজনীতিক প্রেক্ষাপটে ১৫ তারিখে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরের পাক-মার্কিন দালাল বিশ্বাসঘাতকদের বুলেটে ঢাকায় ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে সপরিবারে প্রাণ হারালেন টুঙ্গিপাড়ার খোকা— বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

আওয়ামী লীগ ও বাকশালে থাকা বঙ্গবন্ধু-কথিত চাটার দল ও চোরের দল ও নরপশুর দল বঙ্গবন্ধু হত্যার পর প্রায় তিরিশ বছর ধরে আকারে-ইঙ্গিতে প্রচ্ছন্নভাবে জাসদের প্রতি তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছে এই বলে যে জাসদ আওয়ামী লীগ ও বাকশাল সরকারের বিরোধিতা করেছে; এ ক্ষোভ প্রকাশে সমস্যা নেই; জাসদ তো সে বিরোধিতা করেছে। কিন্তু পরবর্তী ১৫ বছর ধরে এরা বলছে যে জাসদ বঙ্গবন্ধু হত্যার ‘প্রেক্ষাপট’ তৈরি করেছে— বঙ্গবন্ধু হত্যার ‘সকল ও সামগ্রিক প্রেক্ষাপট’ নাকচ করে এরা টার্গেট করে জাসদকে। এদের এ ষড়যন্ত্রমূলক বক্তব্যের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি তৈরি ও তার প্রচারণার প্রধান দায়িত্ব পালন করেছে মূলত আওয়ামী লীগের ছদ্মশুভাকাঙ্খী ন্যাপ-সিপিবি ও ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতা-কর্মী লেখক ও সাংবাদিকগণ। অতীত-বর্তমানের পরাজয়জনিত আত্মশ্লাঘা জর্জরিত প্রতিহিংসাপরায়ণতার ফলেই এরা এমনটি করে থাকেন তা আগেই বলা হয়েছে। পারলে এরা জাসদকে সরাসরি খুনি বানাতেও দ্বিধা করতেন না।

বঙ্গবন্ধু-কথিত চাটার দল ও চোরের দল ও নরপশুর দলকে রক্ষা করতে— চাটার দল ও চোরের দল ও নরপশুর দলের দায় এড়াতে, চাটার দল ও চোরের দল ও নরপশুর দলের রক্ষকদের রক্ষা করতে— আর বঙ্গবন্ধু হত্যায় নিজেদের দায় এড়াতে— গত ৩০ যোগ ১৫ সমান ৪৫ বছর ধরে— এরা জাসদের বিরুদ্ধে একটা রাজনৈতিক বিবরণী বা ন্যারেটিভ তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। রাজনৈতিক বক্তব্য-বিবৃতি ও কিছু লেখালেখির মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ ও বাকশালে থাকা চাটার দল ও চোরের দল ও নরপশুর দলের প্রতিভূ নেতৃবৃন্দও জাসদের বিরুদ্ধে এ রাজনৈতিক বিবরণী বা ন্যারেটিভ তৈরি করতে সহায়তা করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উদ্ভব হলে পরে জাসদ বিরোধী এ প্রচারণায় ব্যাপকতা দেয়া হয়; বিশেষত জামাত-জঙ্গি-তেঁতুল-বিএনপি ও অপরাপর স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিকে ক্ষমতার বাইরে রাখার জন্য আওয়ামী লীগ ও জাসদের মধ্যে ২৩ দফা ভিত্তিক রাজনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে ১৪ দল গঠনের পর থেকে— আর ১৪ দলের সরকারের মন্ত্রিসভায় তথ্যমন্ত্রীর পদে জাসদের অংশগ্রহণের পর থেকে। এ পর্যায়ে চাটার দল ও চোরের দল ও নরপশুর দল ও তাদের রক্ষকগণ জাসদ বিরোধী প্রচারণায় শক্তি দিতে এমনকি জামাত-জঙ্গি-তেঁতুল-বিএনপির অপপ্রচারগুলোও ব্যবহার করতে থাকেন নির্বিচারে।

১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সময়কালে বঙ্গবন্ধুর দেয়া বক্তব্যগুলো পর্যালোচনা করলে এটা স্পষ্ট দেখা যায় যে তিনি জাসদের বিরুদ্ধে কখনও কিছু বলেন নি। এ সময়কালে তাঁর বক্তব্যগুলোতে ঘুরেফিরে প্রধান পাঁচটি বিষয় ছিল—

[ক] প্রথম তিন বছর জনগণকে কিছু দেয়ার অপারগতা প্রকাশ করা, [খ] মাটির/দেশজ/বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র ও সংবিধানের চার মূলনীতি ব্যাখ্যা করা, [গ] সোনার মানুষ চাওয়া এবং দলের নেতাকর্মীদের আত্মসমালোচনা, আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধির আহ্বান জানানো, [ঘ] চীনপন্থী কমিউনিস্টদের সন্ত্রাস-নৈরাজ্য বন্ধ করা, এবং [ঙ] চাটার দল ও চোরের দল ও নরপশুর দলের অপরাধ বন্ধ করা। ১৯৬২ থেকে ১৯৭১-এর মধ্যে যাঁদের মেধা-শ্রম-ঘাম-রক্তে-যুদ্ধে তিনি বঙ্গবন্ধু ও জাতির পিতা হয়ে ওঠেছেন, তাঁদের সাথে তাঁর রাজনৈতিক মান-অভিমান-বিরোধ যতোই থাক না কেন, তিনি জানতেন তাঁরা তাঁর প্রাণসংহারী হবেন না।

শেখ হাসিনাও কখনও সপরিবারে বঙ্গবন্ধু-হত্যাকাণ্ডের সাথে জাসদকে জড়িয়ে কোন ধরনের কথা বলেননি। বরং নিকট অতীতে এ নিয়ে একবার পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠলে তিনি তাঁর দলের সাধারণ সম্পাদককে ডেকে দলের নেতা-কর্মীদের সামলানোর নির্দেশ দেন— এ আগেও বলা হয়েছে। শেখ হাসিনা বারবার প্রকাশ্যে বলেছেন তাঁর পরিবারের সাথে ঘনিষ্ঠরা, তাঁর মা মহিয়সী ফজিলাতুন্নেসা মুজিব যাদের রান্না করে খাইয়েছেন ও তাঁর দলের ভেতরের লোকজনই তাঁর পিতাকে হত্যা করেছেন। শেখ মনির ছোট ভাই শেখ সেলিমও একই কথা বলেছেন।

বঙ্গবন্ধু-হত্যার বিচার চলাকালেও অনেকের সাক্ষ্য থেকে বেরিয়ে এসেছে অনেক তথ্য-উপাত্ত। আদালত রায়ে খুনিদের শাস্তি প্রদানের ঘোষণা দেয়ার পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা বিভাগের ওপর একটি পর্যবেক্ষণ প্রদান করেছেন। এ পুরো বিচার প্রক্রিয়াটির সাক্ষ্য-তথ্য-উপাত্ত-পর্যবেক্ষণের কোথাও ঘূর্ণাক্ষরেও জাসদের কোন উল্লেখ নেই; কেউ জাসদের দিকে আঙুল তোলেননি।

জাসদ মনে করে— বঙ্গবন্ধু হত্যা কেবল একজন ব্যক্তির হত্যা নয়, একজন শেখ মুজিবের হত্যা নয়, একজন রাজনীতিবিদের হত্যা নয়, একজন রাষ্ট্রপতির হত্যা নয়; কিংবা একজনকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের ঘটনা নয়, কেবল ক্ষমতা হাতবদলের ঘটনা নয়; আর এ হত্যা কিছু বিচ্ছিন্ন ব্যক্তির উদ্যোগ নয়, কেবল কতিপয় উচ্ছৃঙ্খল সেনা কর্মকর্তার প্রতিহিংসার ঘটনাও নয়;— এ হত্যা একটি ‘অত্যন্ত সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড’। এ ঘটনা মূলত বাংলাদেশকে পরাজিত পাকিস্তানপন্থার দিকে ফিরিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে পরিচালিত এক সুসংগঠিত রাজনৈতিক-সামরিক অপপ্রয়াস; মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র-ধর্মনিরপেক্ষতা-জাতীয়তাবেদের বিরুদ্ধে এক প্রতিবিপ্লবী মিশন। এ প্রতিবিপ্লবে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়েছেন খন্দকার মোশতাক, তিনি সাথে পেয়েছিলেন আওয়ামী লীগ ও বাকশালের বঙ্গবন্ধুহীন-মন্ত্রিসভা, জেলা-গভর্নর এবং সংসদ সদস্যদের, টুল হিসেবে পেয়েছিলেন বেসামরিক-আধাসামরিক-সামরিক প্রশাসন-বাহিনী ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের, আর মুরুব্বি হিসেবে আমেরিকাকে।

এ রাজনৈতিক প্রতিবিপ্লবে আওয়ামী লীগ ও বাকশালের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের বাইরে একজনও অন্য কোন দল থেকে আসেননি— যারা প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ ও বাকশাল সরকারের বিরুদ্ধে রাজনীতি করেছেন, তাদের মধ্য থেকে আসেন নি।

মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবিপ্লবের নেতা মোশতাকের পাকিস্তানপন্থা পরে অনুসরণ করেছেন জিয়াউর রহমান, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও খালেদা জিয়া। তাদের পরবর্তী কার্যক্রম তাই প্রমাণ করে। এরা কেউ বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারকার্যের উদ্যোগ তো নেনইনি বরং বিচার বন্ধে সক্রিয় বাধা দিয়েছেন এবং খুনিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছেন ও পুনর্বাসন করেছেন; সাথে সাথে একাত্তরের পরাজিত অপশক্তিকেও পুনর্বাসন করেছেন, রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদার করেছেন এবং স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের অর্জন ও ইতিহাস বিকৃত করেছেন; একাত্তর ও পঁচাত্তরের খুনিদের নিয়ে ও তাদের দিয়ে রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন এরং রাজনীতির মাঠে ও শিক্ষাঙ্গণে গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও সংগঠনের বিরুদ্ধে এদেরকে— বিশেষ করে জামাত-শিবির ও ফ্রিডম পার্টিকে— লেলিয়ে দিয়েছেন হত্যা-খুনে। সামরিক-বেসামরিক স্বৈরতন্ত্রের সাথে একাত্তর ও পঁচাত্তরের খুনিরা ঐক্যবদ্ধ হয় আর পরে এদের আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে বাংলাদেশে বিকশিত হয় চরমপন্থার ধর্মীয় জঙ্গিবাদ।

আওয়ামী লীগ ও বাকশাল সরকারের সাথে জাসদের রাজনৈতিক বিরোধ ছিল— জাসদ কখনোই তা অস্বীকার করেনি ও এখনও করেনা। সে সময় জাসদই একমাত্র বিরোধি দল ছিল না; ন্যাপ ও সিপিবি বাদে আর সকল প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য দল সরকারের বিরোধিতা করেছে; এসবের বিবরণ এ রচনায় আগেই দেয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ ও বাকশাল সরকারের আমলে জাসদ পর্যায়ক্রমে সংসদীয়, নিরস্ত্র গণঅভ্যুত্থানমূলক ও সশস্ত্র গণঅভ্যুত্থানমূলক রাজনীতি করেছে; গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে চাটার দল, চোরের দল ও নরপশুর দলকে মোকাবেলা করতে চেয়েছে; সরকার দলীয় ও বিরোধী দলীয় সংসদীয় রাজনীতির চিরায়ত ও স্বাভাবিক ধারায় সরকারকে অপসারণও করতে চেয়েছে; এসবও জাসদ অস্বীকার করে না। জাসদ যা কিছু করেছে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েই করেছে; রাজনৈতিক কারণেই জাসদ আওয়ামী লীগ (১৯৭২–১৯৭৪) সরকারের বিরোধিতা করেছে, বাকশাল (১৯৭৫) সরকারের বিরোধিতা করেছে, মোশতাক সরকারের বিরোধিতা করেছে, কখনও এককভাবে কখনও জোটবদ্ধভাবে জিয়া-এরশাদ-খালেদার সরকারের বিরোধিতা করেছে; এবং জাসদ এখন আওয়ামী লীগ ও জাসদের মধ্যে সম্পাদিত ২৩ দফার রাজনৈতিক-চুক্তির ভিত্তিতে ১৪ দলেও আছে। জাসদের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল ঘোষিত ও প্রকাশ্য; ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের রাজনীতি জাসদ করে না।

জাসদ ব্যক্তি-হত্যার রাজনীতি সমর্থন করেনি-করেনা-করবেনা। জাসদ কখনোই মনে করেনি যে ব্যবস্থা পরিবর্তনের পথে না গিয়ে ব্যক্তি-হত্যার মধ্য দিয়ে দেশে-সমাজে কোন পরিবর্তন আসতে পারে। ‘ষড়যন্ত্রমূলক হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে অবৈধ ক্ষমতা দখল জাসদের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। মোশতাকের শাসন তাই জাসদ বিরোধিতা করেছিল।’ বঙ্গবন্ধু-হত্যাকাণ্ডের পরপরই জাসদ মনে করেছে বঙ্গবন্ধু-সরকারের বিকল্প কোনভাবেই মোশতাকের সরকার হতে পারে না। পরিস্থিতি বুঝতে ১৫ ও ১৬ আগস্ট কর্নেল তাহের বেতার ও বঙ্গভবনে গিয়ে সংবিধান স্থগিত করা, সকল রাজনৈতিক বন্দির মুক্তিদান, সর্বদলীয় গণতান্ত্রিক জাতীয় সরকার গঠন ও নির্বাচন দেয়ার প্রস্তাব জানানোর পর মোশতাক তার ভাষণে সেগুলো উপেক্ষার পর তিনি স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন শুধু খুনি মেজররা ও মোশতাক নন, হত্যাকাণ্ডে আওয়ামী লীগের পুরো শীর্ষমহল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জড়িত ছিল; সুতরাং তিনি তাদের কাছে আর সেসব প্রস্তাব উত্থাপন করেননি। এসবের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে ১৯৭৬ সালে গোপন সামরিক আদালতে দেয়া কর্নেল তাহেরের জবানবন্দিতে।

তাই আওয়ামী লীগ ও বাকশালের সবাই যখন মোশতাকের সাথে বঙ্গবন্ধুহীন-ক্ষমতার মসনদে আসীন, তখন—
[১] বাকশালের, বাকশালে বিলুপ্ত দলগুলোর ও বিরোধী দলের অনেকে মোশতাককে অভিনন্দন জানালেও [এর আগে বিস্তারিত বলা হয়েছে] জাসদ তা জানায়নি বা মোশতাক সরকারকে সমর্থন করেনি। কেউ তার কোন ন্যূনতম প্রমাণ দিতে পারবেনা।

[২] ১৫ আগস্ট সকালে খুনি রশীদ কর্নেল তাহেরকে মন্ত্রিসভায় যোগ দেয়ার অনুরোধ জানালে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।

[৩] ১৭ আগস্ট মোশতাক সরকারের বিরুদ্ধে দলের বক্তব্য দিয়ে প্রচারপত্র প্রকাশ করেছে।

[৪] ২০ আগস্ট জাসদ-ইউপিপি-জাগমুই ‘যৌথ বিবৃতি’ প্রদান করে মোশতাকের সামরিক সরকারকে প্রত্যাখ্যান করে ও ‘গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল’দের বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানায়। “মোশতাক সরকার বিরোধী রাজনৈতিক সংগ্রামে জাসদ ছাড়া অন্য কোন গণতান্ত্রিক শক্তিকে সক্রিয় দেখা যায় নি। তবে জাসদ-ইউপিপি-জাগমুই যৌথভাবে মোশতাককে প্রতিরোধের ডাক দিয়ে প্রচারপত্র বিলি করে। আওয়ামী লীগের কোন সক্রিয় অস্তিত্ব ছিল না। বেআইনী অবস্থায় জাসদ মোশতাক সরকার বিরোধী প্রতিরোধ সংগ্রাম চালিয়ে গেল।” [যৌথ কমিটি (১৯৯০): বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাসদের ভূমিকা। পৃষ্ঠা ১৩]
[আগামী কাল ত্রয়োদশ পর্ব]

*মতামত বিভাগে প্রকাশিত সকল লেখাই লেখকের নিজস্ব ব্যক্তিগত বক্তব্য বা মতামত।