অনেক গল্প শোনা বাকি আছে

74

সাইফুল ইসলাম শিশিরঃ অনেকদিন পর সকালে বাদল ফোন করেছিল। সে এখন চলনবিলে ধানকাটার কামলা দিতে গেছে। কথা শুনে তাকে বেশ খুশিখুশি মনে হলো। পরিবেশ-পরিস্থিতিকে মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতা বাদলের স্বভাবগত।
প্রথমেই বলল “স্যার আজকা ফ্যাঁস তুলমু।”
কী বললে! ফাঁস –?
“না স্যার! ফাঁস না, ধান কাটা শেষ। শেষ মুঠা কাইটা জমি থাইকা উইঠা আসা, হ্যারে কয় ‘ফ্যাঁস তোলা’। জোতদার দেলবার হাজী সাব খুব খুশি। সে কামলাদের আইজ মইষের মাঠা – গরুর গোস্ত দিয়া ভাত খাওয়াইব।”

রফাতুল্লা হাজী বিলাঞ্চলের একজন বড় জোতদার ছিলেন। ১০০ খাদা সম্পত্তি, পঞ্চাশ জোড়া গরু- মহিষ, ভরা সংসার তার। একদিক দিয়ে একটু খাটো। চার বিবির ঘরে তার একমাত্র পুত্র সন্তান, দেলবার হাজী। এজন্য মনোকষ্ট যেমন ছিল- তেমনি সরমিন্দা ছিলেন। রফাতুল্লা হাজীর ‘সোনার থালার’ মত দুই খাদা সম্পত্তি পাশের গ্রামের মিয়ারা বেদখল দেয়।

রফাতুল্লা হাজী সেদিন ঘরে এসে দরজার খিড়কি লাগিয়ে অঝরে কেঁদেছিলেন। স্বগতোক্তি “আজ যদি আমার লাঠির জোর থাকত –“। অনেকে মামলা-মোকদ্দমা করার পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু রফাতুল্লা হাজী জানে ‘দশ ডিক্রি সমান এক দখল।’

তাই ছেলেকে ডেকে অছিয়ত করে গেছেন “তোমার ঘরে তিন গণ্ডা পুত্র সন্তান দেখেতে চাই। এটা আমার অনুরোধ নয়,পিতা হিসেবে আমি তোমাকে নির্দেশ দিয়ে গেলাম।” পিতার ইচ্ছায় দেলবার হাজীও চার বিবি ঘরে আনে। কিন্তু অল্পের জন্য পিতার ইচ্ছা অপূর্ণ রয়েগেছে। ১১ পুত্র- ৭ কন্যা। পিতার ইচ্ছার কথা স্মরণ হলে দেলবার হাজী মনে বড় কষ্ট পান।

দোয়েল কোয়েল তিতির শ্যামা ঘুঘু ডাকা প্রকৃতির এক অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি চলনবিল। চারদিক শুধু ধু ধু পাথার। তিন-চার মাইল পরপর দু’একটা গ্রাম- বাড়িঘর দেখা যায়। বর্ষাকালে মনে হয় সাগরের জলে জেগে ওঠা ছোট্ট দ্বীপ। ধানশালিকের দেশ।

কার্তিক মাসে পানি নামতে শুরু করে। জেগে ওঠে হালট, রাস্তাঘাট। জেগে ওঠে ফসলি জমি। গম, খেসারি, চিনা, কাউন, তিল, বুট, কলাই, যব, সরিষা চৈতালী ফসলে ভরে যায় মাঠ। উঁচুনিচু কাদাজল, বিস্তৃত বিরানভূমি অনাবাদী পড়ে থাকে। রাখালেরা দলবেঁধে গরু- ছাগল- মহিষ চরায়- নাড়াতে আগুন ধরিয়ে দেয়। সাঁঝেরবেলা ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশপানে ধায়- মেঘের ভেলায় রং ছড়ায়।

নিচু বিলাভূমিতে সারা বছর পানি থাকে। হিজলের ডালে বক, শালিকের ঝাঁক বসে। দেখে মনে হয় যেন পাখির মেলা। ডাহুক- পানকৌড়িরা জল ডুব খেলে। বরসি- ছিপের ডগায় মাছরাঙ্গা পাখি টালমেরে বসে থাকে। পানির ভিতর বকপাখি একপায়ে দাঁড়িয়ে যেন ধ্যানমগ্ন এক ধবল ঋষি।

ঘাম ঝরে দরদর গ্রীষ্মের দুপুরে /খালবিল চৌচির জল নেই পুকুরে। সেদিনও চলনবিলে অথৈ জল থৈ থৈ করতো। মাছ ধরতে বাঐত নামতো। মাথার উপর দিয়ে মাছরাঙ্গা, চিল, গাংশালিক ডানামেলে চি চি আওয়াজ করে উড়ে বেড়াত। সে এক অপূর্ব দৃশ্য।

কালের স্রোতে বদলে গেছে সেদিনগুলি। পানির প্রবাহ এখন কমে গেছে। বিলের তলানি ভরাট হয়ে গেছে। চলনবিল এখন উর্বর ভূমি- উত্তর জনপদের শস্য ভাণ্ডার। ‘দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে— ওগো মা –‘

করোনা লাখো মানুষের ন্যায় বাদলকেও করেছে কর্মচ্যুত। তাকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে জীবন-মৃত্যুর মুখোমুখী। জীবিকার সন্ধানে বাদল আজ চলনবিলে কৃষি শ্রমিক। ধানের পাতা গায়ে হানে, গা চুলকায়। প্রথম প্রথম কিছুটা সমস্যা হয়েছিল বটে। এখন গাসহা হয়ে গেছে। এ ক’দিনে রোদ- ঝড়- শিলাবৃষ্টি পিঠের উপর দিয়ে বয়ে গেছে।

বাদল এখন ধান কাটে– অন্যদের সাথে কোরাস ধরে ধুয়া গান গায়। “জয়নাল কাইন্দা বলে আজগুবি এক মউতের খবর দেইখাছি স্বপনে বেশুমার লাশ পইড়া আছে সাইরে সাইরে উত্তর সিথানে। জয়নাল কাইন্দা বলে ~~।

বাদলকে জিজ্ঞেস করলাম ওদিকে করোনার কী খবর ?
“স্যার বিলের মধ্যে করোনা পাইবেন কই? রইদ বৃষ্টি ঝড়ের মধ্যে মইরবার লাইগা আসব নাহি? এইহানকার মানুষ করোনা কী তা জানেইনা।”
বাদলের কথা শুনে মনে পড়ল পুরানো কল্পকথা। এক মাছি বিশাল ষাঁড়ের শিঙ এর উপর বসে বলছে- “ও ষাঁড় ভাই! আমি যে তোমার শিঙ এর উপর বসেছি। তোমার কি তাতে কোন সমস্যা হচ্ছে? খুব কি বেশি ভারি লাগছে?”
ষাঁড় বলছে- “ও মাছি! তুমি কোথা থেকে বলছো? তুমি যে আমার শিঙ এর উপর এসে বসেছ, তাতো আমি টেরই পাইনি।”

ঢাকা থেকে আসার সময় বাদল দুটো মাস্ক এনেছিল। সে মাঠে ধান কাটার সময় তা পরে যায়। দেলবার হাজী খুব উৎসুক হয়ে দেখে। জিজ্ঞেস করে “ক্যারে বাহ! এটা আবার কী? বাদলের স্বব্যাখ্যায়িত উত্তরঃ “চাচা মিয়া এটা ফুঁসফুঁসে ভালো বাতাস দ্যায় আর খারাপ বাতাস বাইর কইরা দেয়। আরাকটা কাজ করে, যাদের নিশ্বাস নিতি কষ্ট হয়, এটা পরলি কষ্ট কমে –“।
“ভাতিজা! — ছোট বিবির জন্য একটা দরকার।” তারপর থেকে দেলবার হাজী বাদলকে খুব ইজ্জত করে। একদিন বাদলকে সে অন্দর মহলে ডেকে নেয়।

‘৮০ দশকে প্রফেসর এম এ মতিন তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি সকালে সিরাজগঞ্জ, বিকালে বগুড়া, রাতেই প্যাঁপু- প্যাঁপু বাজিয়ে ঢাকায় ফিরতেন। চণ্ডিদাসগাঁতী বাজারে চায়ের দোকানে বসে অনেকেই বলাবলি করছে, এতো স্টেমিনা মতিন সাহেব পান কোথায়? একজন বলে উঠে, আমি শিয়ালকোল হাটখোলায় একবার খুব কাছ থেকে দেখেছি। মতিন সাহেব পকেট থেকে কী যেন বের করে ঝাঁকালেন। তারপর মুখের ভিতর নিয়ে টান দিলেন। আমি শিওর– উনি দামি ভিটামিন খান।
হায়রে চিন্তার অপচয়। মতিন সাহেব ছিলেন একজন এজমার রোগী।

রোদ বৃষ্টিতে ঝলসে গেছে- পুড়েছে শরীর- ঝরেছে ঘাম। শ্রমের মজুরি বিশ মন ধান। হাজী সাব একখানা নতুন লুঙ্গি কিনে দিয়েছেন- ছোট বিবিজান দিয়েছেন রঙ্গিন শাড়ি। ‘এই শাড়িটার প্রতিটি সুতায় ভালবাসার টান।’

বাদলের মনটা ঘুঁড়ির মতো উড়ছে। আজ সে ফিরে যাবে তেকানীর চরে। যেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছে ক’জোড়া ক্ষুধাতুর চোখ।

সুস্থ হয়ে উঠুক পৃথিবী। ভালো থেক বাদল! এখনো যে অনেক গল্প শোনা বাকি। -লেখক- একজন সমাজকর্মী।
১৫ মে, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ
লেক সার্কাস, ঢাকা