অনিশ্চয়তায় হল ছাড়ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা

যুগবার্তা ডেস্কঃ দেশের ৩৭টি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের লাগাতার কর্মবিরতিতে অনিশ্চয়তায় হল ছাড়ছেন শিক্ষার্থীরা। যাঁরা ছুটিতে বাড়ি গেছেন, তাঁদের অনেকেও ফিরছেন না। সবাই অনিশ্চয়তায় আছেন। ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ হয়ে সেশনজটের আশঙ্কায় শিক্ষার্থীরা দ্রুত এই সংকট নিরসনের জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছেন।
গত শুক্র ও গতকাল শনিবার ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, ইসলামী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে হলে গিয়ে ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে এই তথ্য পাওয়া গেছে।
সিলেকশন গ্রেড বহাল, গ্রেড সমস্যা নিরসন ও পৃথক বেতন স্কেলের দাবিতে ১১ জানুয়ারি থেকে লাগাতার কর্মবিরতি পালন করছেন শিক্ষকেরা। বর্তমানে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক আছেন ১২ হাজারের কিছু বেশি। আর শিক্ষার্থী আছেন প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার। শিক্ষকদের কর্মবিরতিতে ক্লাস-পরীক্ষা পিছিয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীরা সেশনজটের আশঙ্কা করছেন। ইতিমধ্যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। তবে কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্বঘোষিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গতকালও কোনো ক্লাস হয়নি। তবে পূর্বঘোষিত পরীক্ষাগুলো হয়েছে। শুক্রবার দুপুরের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারদা সূর্য সেন হলের নিচতলার একটি ‘গণকক্ষে’ (হল ছাত্র সংসদের কক্ষে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে) গিয়ে দেখা যায়, এই কক্ষে ২৩টি বিছানা। থাকেন ৫০ জন। আসাদ আহমেদ নামে প্রথম বর্ষের একজন শিক্ষার্থী প্রথম আলোকে বলেন, ক্লাস না হওয়ায় ১৫ জনের মতো আছেন, বাকিরা বাড়ি চলে গেছেন। তিনি বলেন, তাঁদের পরিচিতিমূলক অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল ১২ জানুয়ারি। কিন্তু এখন অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
এই হলের প্রাধ্যক্ষ মাকসুদ কামাল প্রথম আলোকে বলেন, গত শুক্রবার জুমার নামাজে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি আগের চেয়ে কম দেখা গেছে।
হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলে কথা হয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মো. কায়েস খানের সঙ্গে। তিনি বলেন, তাঁদের কক্ষের তিনজন বাড়িতে গেছেন। ক্লাস না হওয়ায় তাঁরা ফিরছেন না। তিনি আরও বলেন, ‘ক্লাস না হওয়ায় খারাপ লাগছে, মনে হচ্ছে সেশনজটে পড়তে হবে। আমরা চাই, সরকার শিক্ষকদের দাবি মেনে নিয়ে ক্লাস সচল করা হোক।’
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) নিয়মিত পরীক্ষা হচ্ছে। রুয়েটে ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ থাকলেও চুয়েটে ক্লাস বন্ধ রয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জানান, গত প্রায় এক সপ্তাহে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক বিভাগে চূড়ান্ত পরীক্ষা হয়নি। সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের ৪১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী শফিউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘কবে থেকে ক্লাস শুরু হবে তা জানি না। এ অবস্থায় হলে থাকব, না বাড়ি চলে যাব তা-ও বুঝতে পারছি না।’ তবে ঢাকা ও আশপাশের জেলার শিক্ষার্থীদের অনেকেই বাড়ি চলে গেছেন। কর্মবিরতির কারণে ইতিমধ্যে উদ্ভিদবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনসহ কয়েকটি বিভাগের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জানান, ক্লাস-পরীক্ষা না হওয়ায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীই হল ছেড়ে বাড়ি চলে গেছেন। তাঁদের অধিকাংশের বাড়ি ময়মনসিংহের আশপাশের জেলায়। কৃষি অনুষদের ছাত্রী শাহানা আফরোজ বলেন, ক্লাস-পরীক্ষা না থাকায় হলে অলস সময় কাটাচ্ছেন। আবার বাড়ি (দিনাজপুর) যাওয়ার সিদ্ধান্তও নিতে পারছেন না। গত সপ্তাহে কৃষি, কৃষি প্রকৌশল ও কারিগরি, ভেটেরিনারি, পশুপালন এবং কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদের প্রথম বর্ষের সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা। এ ছাড়া মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের প্রথম বর্ষের ব্যবহারিক পরীক্ষাও হয়নি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জানান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শীতের ছুটি শেষে গতকাল বিশ্ববিদ্যালয় খুললেও অনেক শিক্ষার্থী এখনো হলে ফেরেননি। পরীক্ষাও পেছাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ মখদুম হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বলেন, ছুটি শেষ হলেও বেশির ভাগ শিক্ষার্থী হলে আসেননি। হলে যেখানে সব সময় ৪০০ থেকে ৫০০ শিক্ষার্থী থাকেন, সেখানে এখন ১০০-১৫০ জনের মতো শিক্ষার্থী আছেন।
শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জানান, বিভাগভেদে কম-বেশি প্রায় এক বছরের সেশনজটে আছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এখন সেশনজট আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা। গত দুই দিনে বিভিন্ন বিভাগের অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হলে তাঁরা উদ্বেগ জানান। প্রায় সবাই অভিন্ন সুরে বলেছেন, শিক্ষকদের মর্যাদা তাঁরাও চান, তবে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ করে নয়। গত সোমবার থেকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৬টি বিভাগের কোনোটিতেই ক্লাস-পরীক্ষা হয়নি।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জানান, গতকাল ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল একেবারেই কম। ক্লাস-পরীক্ষা না হওয়ায় বেশ কিছু শিক্ষার্থী হল ছেড়ে বাড়িতে চলে গেছেন। গতকাল কয়েকটি বিভাগের পৃথক বর্ষের পাঁচটি চূড়ান্ত পরীক্ষা হওয়ার কথা থাকলেও তা স্থগিত হয়ে গেছে। কর্মবিরতির জন্য এখন পর্যন্ত মোট ২২টি পরীক্ষা স্থগিত হয়ে গেছে।
চট্টগ্রাম অফিস জানায়, গত সোমবার থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ক্লাস-পরীক্ষা হচ্ছে না। সাদ্দাম হোসেন নামে হিসাববিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের এক ছাত্র বলেন, তাঁরা এমনিতে সেশনজটে আছেন, এখন ক্লাস, পরীক্ষা বন্ধ থাকায় এই জট আরও বাড়বে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতিও ফেডারেশনের চলমান আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে। গতকাল তারা সভা ও মৌন মিছিল করেছে। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও কমবেশি একই চিত্র বিরাজ করছে।
আজ যা থাকছে শিক্ষকদের প্রস্তাবে: বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষা কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে গেলেও অচলাবস্থা দূর করতে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। এর মধ্যে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বিদেশে থাকায় অনানুষ্ঠানিক আলোচনাও থেমে গেছে। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ শুক্রবার রাতে লন্ডনে গেছেন, ফিরবেন আগামী বুধবার। আর অর্থমন্ত্রী এখন চীনে আছেন, ফেরার কথা ১৮ জানুয়ারি। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের সভাপতি অধ্যাপক ফরিদউদ্দিন আহমেদ গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, এখন পর্যন্ত তাঁদের কোনো অগ্রগতি নেই। তবে আজ রোববার তাঁরা সরকারের কাছে ‘প্যাকেজ প্রস্তাব’ পাঠাবেন।প্রথম আলো