অধিকার তুমি কার!

11

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ  গত সংখ্যা শেষ করেছিলাম বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের গল্প দিয়ে। টেনেছিলাম তাঁর কথার উদ্ধৃতি। হয়ত ঠিক হয়নি। ভিনদেশিদের উদাহরণ টানলে অনেকের ভাল লাগে না। ভিনদেশী! সে সাধারণ জ্ঞানী, নাকি অসাধারণ বিজ্ঞানী; বিবেচনায় নেয় না। কিন্তু আমার তো উপায় নেই। আমাদের দেশে তো আইনস্টাইন নেই। থাকবে কিভাবে? হয়ই তো না। হয় বিসিএস ক্যাডার। পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাটাই এমন। বিজ্ঞানী হবার কোন পথই নেই এখানে। পথ একটাই। যে যাই পড়ে, সব তুচ্ছ। মূল লক্ষ্য, মূল গন্তব্য একটাই; বিসিএস।
বিসিএস আমলা হবার জন্যে বাংলাদেশের পুরো শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম প্রতিযোগীতায় নামে। যেনতেন প্রতিযোগীতা নয়। ঘুম হারাম করে নামা প্রতিযোগীতা। সবাইকে দলমিলে এমন নন প্রডাকটিভ ক্যাডার সেক্টরে নামতে চাইবার চেয়ে দুঃখজনক কোন ঘটনা একটি দেশের আর হতে পারে না। এটা কোনভাবেই দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্যে ভাল নয়। তবে দেশের জন্যে না হোক, নির্বাচিতদের নিজেদের জন্যে এখানে ভালোর কোন শেষ নেই। শাসন কিংবা ভাষন, ভোগের কিংবা ভোজের; সব অধিকারই তাদের।
এদেশে বিজ্ঞানীর কোন অধিকার নেই। বিজ্ঞানীর না আছে পাওয়ার; না আছে কিছু চাওয়ার! তাহলে বিজ্ঞানী হয়ে কী লাভ? তাই সাধারণত যেমনি কেউ বিজ্ঞানী হতে চায় না, তেমনি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায়ও বিজ্ঞানী বানাবার আয়োজন নেই। আয়োজন তো থাকবে প্রয়োজন বুঝলে। বাংলাদেশের কেউই এর প্রয়োজন কখনো বুঝেছে বলেও মনে হয় না। তবে এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ভারত। ভারত প্রয়োজনটা বুঝেছে ১৯৪৭ সালেই; স্বাধীনতা লাভের দিন থেকেই। সেই প্রথম দিন থেকেই ভারত নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের বিজ্ঞানী বানানো নিয়ে কাজ করে।
আর করে বলেই আজ তারা প্রযুক্তির নানা শাখায় যথেষ্ঠ স্বয়ং সম্পূর্ণ হয়েছে। জয় করেছে মহাকাশ এবং এখন জয়ের পথে চাঁদের দেশ। বিষয়টি আমার শোনিমকে খুব নাড়া দিয়েছে। শোনিম ছোট্ট মানুষ। এতদিন ভারত বাংলাদেশকে মোটামুটি একই পাল্লায় মাপতো। ওর মাপার শক্তি যতটুকু ঠিক ততটুকুই মাপতে পারতো। কিন্তু তলে তলে ভারত যে এত এগিয়ে গেছে সেটা শোনিমের জানার মধ্যে ছিল না। তাই খুব অবাক বিস্ময়ে চোখে পলক না ফেলে ভারতের চন্দ্রভ্রমণ টিভি পর্দায় অবলোকন করেছে। এবং আনন্দ চিত্তে এর সফলতাও কামনা করেছে। হয়ত তাই বেশ কষ্ট পেয়েছিল, অভিযানের একেবারে শেষধাপে চন্দ্রযানের পথহারা হতে দেখে। চন্দ্রযান পথহারা হয়েছে ঠিকই। কিন্তু ভারতীয় বিজ্ঞানীরা লক্ষ্যহারা হননি। তারা ঠিকই লেগে ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে গেছেন। এটা তাঁরা পেরেছেন প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস থেকে।  এই আত্নবিশ্বাস থেকেই তাঁরা নিজেদের টাকায় নিজেদের প্রযুক্তি দিয়ে চাঁদে নভোযান পাঠায়। সারা বিশ্ব তাকিয়ে থাকা এই অভিযানটি প্রত্যাশা মাফিক সফল হতে না পারলেও তারা চেষ্টা চালিয়ে যাবে ততদিন, যতদিন পুরো সফলতা না আসে। হয়ত এ যাত্রায় সফল হবে না। প্রথমবার বলেই সফল হবে না। কিন্তু এটা নিশ্চিত ভারত ২য় বার অথবা ৩য় বার কিংবা ১০০তম বারে সফল হবে।
ভারতের পাশের দেশ বাংলাদেশ। এখানেও ছেলেমেয়েরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। মহা ধুমধামেই পড়ে। তবে মেধাবী আর অতি পড়ুয়ারা ক্লাশের পরে লাইব্রেরীতে বিসিএস গাইড মুখস্ত করে। দুনিয়ার সবচেয়ে বড় বিসিএস কোচিং সেন্টার হচ্ছে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে বিজ্ঞানী হবার সুযোগ নেই। এখান থেকে তারা বিজ্ঞানী না হয়ে হয় আমলা। তারপর তারা মনে করে ৪ লাখ টাকার যন্ত্র নিজেদের দেশে না বানিয়ে ৪০ লাখ টাকা দিয়ে বাইরে থেকে আনাই সফলতা।
সফলতার ভিন্ন গল্পও আছে। এই বাংলাদেশেরই কেউ কেউ অনেকটা নিরবে নিভৃতে নিজের গরজে বিজ্ঞানী হওয়ার চেষ্টা করে; এবং কখনো কখনো সফলও হয়। কাঙ্খিতভাবেই দেশের কেউ এসব খবর রাখে না। কিন্তু দেশের কেউ না রাখলেও বা না জানলেও বিদেশে জানে; যৎ সামান্য নজর কাড়ে। এবং পুরস্কারও পায়। তবে বিপত্তি বাঁধে এরপরই। মহা বিপত্তি। পুরস্কার নেবার জন্যে বিদেশ যেতে হয় এবং এর জন্যে নিতে হয় ভিসা। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তারা ভিসার জন্যে আবেদন করে এবং দূর্ভাগ্যজনক ভাবে তাদের ভিসা হয় না।
ভিসা হয় বিসিএস আমলাদের। ভিসার জন্যে তাদের কাঠখড় পোড়াতে হয় না। যাদের পুরস্কার পাওয়ার উছিলায় সঙ্গের সাথী হিসেবে বিদেশ যাবার সুযোগ হয়, এক সময় তাদেরকে রেখেই বিসিএসরা হাসতে হাসতে বিদেশে চলে যায়। এই তো ক’দিন আগেই বাংলাদেশ সরকারের এক   প্রতিনিধিদল বিজয়ী বিজ্ঞানীদের রেখে নিজেরাই ঘুরে এসেছেন আমেরিকার নাসা থেকে! যাবার সময় একবারও মনে হয়নি, তারা করছেনটা কি! একটা লজ্জা শরমের ব্যাপারও তো আছে। তারা সেটাও ভাবেননি।
জনগণের ভিসা ভোগান্তি নিয়েও তারা কোনকালে ভাবেননি। অথচ জনগণের সকল ভোগান্তি নিয়ে ভাবার দায়িত্ব কেবল তাদের। অবশ্য সাধারণ জনগণ তো বেসরকারী জনগণ। আমলারা হলেন সরকারী জনগণ। ঠিক সংসদের বিরোধী দলের মত; সরকারী বিরোধী দল। আর বাইরে আছে বেসরকারী বিরোধী দল। আমলারা সরকারী জনগণ বলেই নিশ্চিন্তে ভিসা পান। ভিসা পায় না এই বেসরকারী জনগণ। তারা যে কী পরিমাণ হয়রানীতে ভোগে, কিংবা নাজেহাল হয় ভিসা নামক সোনার হরিণ নিয়ে এটা ভাবার মত দেশে কেউ নেই। অথচ তারা আমলা হয়েছেন জনগণের ভোগান্তি লাগবের জন্যে। নিজেদের ভিসাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্যে নয়।
তারা সুযোগ পেলে সেটাই করেন। যখনই কোন দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা হয়, তখনই তারা ভিসার ইস্যুটি সামনে আনেন এবং মোটামুটিভাবে দাবীটি আদায় করে ছাড়েন। বলা যায় প্রতিপক্ষ কর্মকর্তাদের ঘাম ঝরিয়েই আদায় করেন। ফলত পত্রিকায় নিউজ হয়। বড় করে হেডলাইন নিউজ হয়। ক’দিন আগেও হয়েছে। ঘটা করে পত্রিকায় ছাপা হয়েছে বাংলাদেশীদের জন্যে রাশিয়া যাবার ভিসা অবমুক্ত। পাঠক ঝাঁপিয়ে পড়েছে নিউজের দিকে।
আমিও পড়েছি। তবে পুরোটা পড়ে খুশী হতে পারিনি। বরাবরের মত আশাহত হয়েছি। নিউজের একেবারে শেষ লাইনটি আমার আশাহত হবার মূল কারণ। ওখানে বলা ছিল, ভিসা অবমুক্তির বিষয়টি কেবলমাত্র সরকারী কর্মকর্তাদের জন্যে প্রযোজ্য। জ্ঞান হবার পর থেকে এমনই যত সংবাদ পড়েছি সবই ছিল কেবল সরকারী কর্মকর্তাদের জন্যে। শুনলে খারাপ শোনালেও এটাই সত্যি যে, স্বাধীনতার পুরো ৪৮টা বছর সরকারী কর্মকর্তারা জনগণের জন্যে নয়, কেবল নিজেদের ভিসা প্রাপ্তি নিশ্চিতের জন্যে কাজ করে যাচ্ছেন।
ক’মাস আগে বিদেশ যাত্রায় পাশের সিটে মাঝবয়সী একজন ভদ্রমহিলাকে পেয়েছিলাম। মিশুক প্রকৃতির মানুষ। কথাও বলেন বেশ। গায়ে পড়েই যেচে আমার সাথেও অনেক কথা বললেন। আমি কোথায় যাচ্ছি, কী করি না করি, এসব কথাই। শেষমেষ নিজে থেকেই নিজের পরিচয়ও দিলেন। শুনে আমি নড়েচড়ে বসলাম। সম্মানিত মানুষ। সাবেক হোক, সংরক্ষিত আসনের হোক; তবুও তো সাংসদ। আফটার অল জাতীয় সংসদের জাস্ট আগের টার্মের সাংসদ। আইন প্রণেতা। টকশোতেও মাঝেমধ্যে আসেন।
এমন বড় মাপের একজনের সাথে দেশের কথা, দশের কথায় কখন সময় চলে গেছে আর কখন দুবাই পৌঁছেছি টের পাইনি। প্লেন থেকে নেমে নিপুন স্থাপত্যে গড়া দুবাই এয়ারপোর্টের ট্রানজিট লাউঞ্জের দিকে হাঁটছি। “দেখছেন আপা! কত সুন্দর এয়ারপোর্ট! আমাদের দেশে এমনি এয়ারপোর্ট আমরা কবে পাবো?” আমার কথায় তিনি এদিক ওদিক তাকিয়ে এয়ারপোর্টটি আরো ভাল করে দেখলেন। “নারে ভাই! আপনার মাথা খারাপ! এইটা স্বপ্নবিলাশ হবে। শত বছর লাগবে আমাদের।” বললাম, “দুবাই শহর আরো বেশী সুন্দর। ট্রানজিট টাইমে ঘুরে আসতে পারেন। সময়টা ভাল কেটে যাবে আপনার।” তাঁর মুখটা মলিন হলো। বলতে না চাইলেও বললেন, “ইচ্ছে তো করে। এমপি থাকা অবস্থায় পারতামও। লাল পাসপোর্ট ছিল। ভিসা লাগতো না।” অনেকটা আক্ষেপ করেই বললেন।
“এমপি থাকা অবস্থায় যদি ভাবতেন একদিন এমপি থাকবেন না এবং ক্ষমতায় থাকতেই যদি আমাদের মত আমজনতার ভিসা হয়রানীর সমাধান করতেন তাহলে আজকে আপনার সমস্যা হতো না আপা! আপনার আমার সাধারণ পাসপোর্টেই ভিসা নিয়ে দুবাই শহর ঘুরে দেখতে পারতাম।” আমার চাছাছোলা কথায় তিনি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। এমন কথার জন্যে মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। অবশ্য তাঁরা কোনকালেই আমার মত আমজনতার কথা শোনার জন্যে প্রস্তুত থাকেন না। তারা সব সময় আমজনতাকে কেবল বলেন। বলার জন্যেই প্রস্তুত থাকেন।-লেখক: উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা।